নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানো সংক্রান্ত নির্দেশিকা

শিশুর যথাযথ পুষ্টির জন্য মায়ের বুকের দুধের কোন বিকল্প নেই।বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে মা ও শিশুর মধ্যে গড়ে উঠে এক স্বর্গীয় নিবিড় সম্পর্ক। শিশুকে দুধ খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে মা তার মাতৃত্ব পুরোপুরি উপভোগ করেন।বুকের দুধ আপনার শিশুকে যোগাবে জীবনের সম্ভাব্য সবচেয়ে ভাল শুরু। বুকের দুধ ওদেরকে দেয় সবচেয়ে বেশী পুষ্টি, ওদের বিকাশে সাহায্য করে এবং ওদের অসুখবিসুখ হবার এবং সংক্রমণে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি কমায়।

শাল দুধের উপকারিতা

প্রসবের পরে মায়ের বুকে প্রথম যে দুধ আসে তাকে শালদুধ বলে। শালদুধ ঘন, আঁঠালো এবং একটু হলুদ রংয়ের হয়ে থাকে। শিশুকে শাল দুধ খাওয়ানোর উপকারিতা গুলো হলো:

  • শালদুধ শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারী এবং শিশুর জীবনের প্রথম টিকা হিসাবে কাজ করে ।
  • শালদুধ আমিষ সমৃদ্ধ এবং এতে প্রচুর ভিটামিন-এ আছে।
  • এতে আছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ।
  • শালদুধ শিশুর পেট পরিষ্কার করে এবং নিয়মিত পায়খানা হতে সাহায্য করে।

প্রসবের পরে প্রথম ২-৩ দিন যতটুকু শালদুধ আসে তাই নবজাতকের জন্য যথেষ্ট। এসময় শিশুকে পানি, মধু বা চিনির পানি দেওয়া শিশুর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব দিলে পাতলা পায়খানা হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অন্যদিকে শিশুর বুকের দুধ খাবার আগ্রহ কমে যায়।

মায়ের দুধের উপকারিতা

শিশুর উপকার 

মায়ের দুধে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি উপাদান সঠিক মাত্রায় থাকে। ৫ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধই শিশুর জন্য যথেষ্ট । মায়ের দুধে পুষ্টি উপাদান ছাড়াও আছে শতকরা ৯০ ভাগ পানি। সেইজন্য শিশুকে ৫ মাস বয়স পর্যন্ত আলাদা পানি দেবার প্রয়োজন নেই।

মায়ের বুকের দুধ পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত। বায়ু বা পানি বাহিত জীবানু দ্বারা সংক্রমিত হবার সুযোগ নেই। উপরন্ত মায়ের দুধে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায়-যার ফলে শিশুর অসুখ বিসুখ বিশেষ করে ডায়রিয়া, কানপাকা, নিউমোনিয়া, শ্বাসনালীর রোগ, হাঁপানী, এলার্জি,  চুলকানি ইত্যাদি কম হয়।

  • মায়ের দুধে শিশুর  বুদ্ধি বাড়ে। তাছাড়া স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে।
  • অসুখ হলেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশী থাকার কারণে শিশু তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে যায়।
  • মায়ের দুধ শিশু মৃত্যুর হার কমায়।
  • মায়ের দুধ সহজে হজম হয় ।
  • মায়ের দুধে পূর্ণমাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ থাকে বলে শিশুর রাতকানা হবার সম্ভাবনা থাকে না।
  • এছাড়া পরবর্তীতে শিশুর ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ইত্যাদি ভয়াবহ রোগ হাবর সম্ভবনা কমে যায়।

মায়ের উপকার 

জম্মের সাথে সাথে শিশুকে বুকের দুধ দিলে মায়ের প্রসবজনিত রক্তপাত বন্ধ হয। পরবর্তীতে রক্তস্বল্পতা হয় না। মায়ের গর্ভফুল পড়তে সাহায্য করে, জরায়ু তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

  • মায়ের স্বাস্থ্য ভাল থাকে।
  • যে সব মা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান তাদের স্তন, জরায়ু এবং ডিম্বকোষের ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা কম থাকে।
  • ৫ মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ালে স্বাভাবিকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে এবং ২ বৎসর বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ালে ঘন ঘন গর্ভবতী হবার সম্ভাবনা কমে যায়।
  • মায়ের দুধ খাওয়ালে মায়ের আত্নবিশ্বাস বাড়ে।
  • মায়ের দুধ খাওয়ালে মা ও শিশুর মধ্যে সম্পর্ক নিবিড় হয়।
  • মায়ের দুধ নিরাপদ, ঝামেলামুক্ত এবং মায়ের বাড়তি খাটুনি ও সময় বাঁচায় এবং অর্থের সাশ্রয় হয়।
  • রাতে শিশু মায়ের কাছে শোয়া থাকে বলে মা শিশুকে যখন খুশী তখন শুয়ে শুয়ে খাওয়াতে পারেন।

জন্মের পরপর

যদি আপনি এবং আপনার শিশু সুস্থ থাকেন, তবে জন্মের পরপরই শিশুকে আপনার শরীরের সাথে লেপ্টে ধরা খুব জরুরী। এর মানে হল বাচ্চাকে খালি গায়ে (ডায়াপার পড়া থাকতে পারে) আপনার বুকের উপর ধরতে হবে। আপনারা দুজনই শুধুমাত্র একটি কম্বল দিয়ে ঢাকা থাকবেন। এই জড়িয়ে থাকার ফলে আপনার শিশুর শরীর গরম থাকবে, তার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হবে, হৃদপিণ্ডের স্পন্দন ঠিক হবে এবং ওদের ইনফেকশনের ঝুঁকি কমবে।

আপনার ত্বকের স্পর্শ পেলে শিশু আপনার বুক খুঁজবে এবং দুধ পানে আগ্রহী হয়ে পান শুরু করবে। জন্মের পর প্রথম ঘন্টাটি আপনার ও আপনার শিশুর নিজেদেরকে চিনে নেয়ার সবচেয়ে ভালো সময় এবং ওদেরকে তাড়াতাড়ি দুধ খেতে শুরু করতে সাহায্য করার মাধ্যমে আপনি আপনার বুকে দুধ তৈরি হওয়া শুরু করবেন। অল্প পরিমাণে শালদুধ (ঘন হলুদাভ তরল) যা জন্মের পর প্রথম কয়েকদিন তৈরি হয় তা শিশুর জন্য খুবই উপকারী কারন শাল দুধে থাকে ঘনীভূত পুষ্টি যা শিশুকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে বাঁচায়।

প্রাথমিক দিনগুলো

জন্মের পর প্রথম কয়েকদিন বা সপ্তাহ আপনার শিশু হয়তো ঘন ঘন খেতে চাইবে। এটা খুব স্বাভাবিক কারণ যত বেশী করে শিশু বুকের দুধ খাবে, আপনার বুকে তত বেশী দুধ তৈরি হবে। আপনার এবং আপনার শিশুর হয়তো একটু সময় লাগতে পারে সঠিক উপায়ে বুকের দুধ খাওয়া শিখে উঠতে। তাই যত বেশিবার আপনারা চেষ্টা করবেন তত বেশী ভাল।

শিশুকে আপনার কাছাকাছি রাখুন যাতে শিশু কখন খেতে চাচ্ছে তা আপনি দেখতে পারেন, যেমন নিজের আঙ্গুল চোষা, মুখ হা করে জিভ নাড়া ইত্যাদি। বাচ্চা কতক্ষনে খাবার জন্য কাঁদবে, সে পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই কারণ এতে আপনার ও শিশু উভয়ের জন্যই বিষয়টি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

শিশুকে দুধ পান করাবার জন্য মা ও শিশুর অবস্থান

বুকের দুধ পান করাবার শুরুর অবস্থায় আপনার ও শিশুর জন্য উপকারী কিছু পরামর্শ নিচে দেয়া হলো-

  • শিশুর নাক পেট ও পায়ের আঙ্গুল একই লাইনে থাকা অবস্থায় শিশুকে আপনার বুকের কাছে আনুন।
  • শিশুর মাথার পেছনে হাত দিয়ে না ধরে রেখে তার ঘাড়ের পেছনে ধরুন যাতে দুধ পান করার সময় শিশু তার সুবিধামত মাথা সামনে পেছনে করতে পারে।
  • শিশুর নাক ও ওপরের ঠোঁটের মাঝের অংশে আলতো করে আপনার স্তনের কাল অংশ (নিপল) ঘষুন, যাতে শিশু মুখ হা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
  • শিশু তার মুখ খুলে সামান্য জিভ বের করে মাথা পিছিয়ে নেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, তারপর হালকা করে বুকের কাছে টেনে আনুন, আপনার নিপলকে শিশুর মুখের ভেতর ওপরের ঠোঁটের দিকে মুখের ওপরের তালুর দিকে যেতে দিন।

আপনার হয়ত একটি শিরশিরানি অনুভূতি হতে পারে (যা ব্যাথাযুক্ত বা ব্যাথামুক্ত হতে পারে) কিন্তু ব্যাথা যদি এক মিনিটের মাঝে বন্ধ না হয়, তবে সাহায্য চান।

শিশু যথেষ্ট পরিমাণে দুধ পাচ্ছে তার লক্ষনসমূহ

  • আপনার শিশু বড় করে হা করবে
  • আপনার শিশুর গাল ফুলে উঠবে
  • আপনার শিশু খাবার সময় শান্ত থাকবে।
  • প্রতি- ২-৩ বার চোষার পর আপনি হয়ত শিশুর গিলে খাবার শব্দ পাবেন।
  • আপনার নিপল খাওয়া শেষ হওয়ার পর একই আকারের থাকবে কোন রকম দর্শনীয় ক্ষত বা ব্যাথা ছাড়াই।
  • আপনার শিশু অনেকগুল ন্যাপকিন ভেজাবে (শিশুর বয়স ৬ দিন হলে ৬-৮ টি) প্রতি ২৪ ঘণ্টায়।

আপনার শিশুর ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ২ টি তবে সাধারনত আরও বেশী পরিমাণে পায়খানা যুক্ত ন্যাপকিন থাকবে এবং তাদের পায়খানার রঙ যা প্রথম ১-২ দিন কাল এবং আঠালো, ৪ দিন থেকে হলদ এবং তরল হবে। যদি আপনার শিশু ২৪ ঘণ্টায় পায়খানা না করা তাহলে স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া জরুরী।

আপনার বুকের দুধ চাপ দিয়ে বের করা

বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করাতে উৎসাহী করার জন্য আপনার বুকের দুধ চেপে বের করার নিয়ম জানাটা একটি উপকারী কৌশল, বিশেষ করে যদি তারা একটু ঘুম ঘুম থাকে কিংবা আপনার বুক জমে ফুলে ওঠে। এটা কিভাবে করতে হবে তা জেনে রাখাটা জরুরী-

  • আলতো করে আপনার সত্নকে চাপড়ে দিন এবং ম্যাসাজ করুন যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
  • আপনার বুড়ো আঙ্গুল এবং তর্জনীর সাহায্যে “সি” এর মত তৈরি করুন।
  • আপনার নিপলের নিচ থেকে ২-৩ সে.মি. চওড়া করে বুড়ো আঙ্গুল এবং তর্জনীটি এগিয়ে আনুন।
  • এই অংশটি ২-৩ সেকেন্ডের জন্য চেপে রাখুন, তারপর ছেড়ে দিন। পুনরায় এমন করুন।
  • আপনার দুধ বেরিয়ে আস্তে কিছুটা সময় লাগতে পারে। দুধ কমে না যাওয়া পর্যন্ত একই স্থানে চেপে রাখা ও ছেড়ে দেয়া চালিয়ে যেতে থাকুন।
  • স্তনের চারপাশে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অন্যান্য অংশে একইভাবে চেপে যান ও ছেরে দেয়া ক্রমাগত রাখুন।
  • আপনার বুড়ো আঙ্গুল এবং তর্জনীকে পরস্পর থেকে উল্টো দিকে রাখুন যাতে তা স্তঙ্কে উপর নিচে পিছলে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে।

চেপে বের করা দুধ শিশুকে খাওয়ানোর নিয়ম

  • চেপে বের করা দুধ অবশ্যই কাপে/গ্লাসে করে বা চামচে শিশুকে খাওয়াতে হবে।
  • সাধারণ তাপমাত্রায় এই দুধ ৬-৮ ঘন্টা এবং ফ্রিজে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত রাখা যায়।
  • শিশুকে খাওয়ানোর পূর্বে দুধের পাত্র ঝাঁকিয়ে নিতে হবে। কেননা দুধ কিছুক্ষণ রেখে দিলে উপরে চর্বি ভাসতে থাকে।

আপনার শিশুর চাহিদা পূরণ

পৃথিবী দেখার পর থেকে আপনার নবাগত শিশু আপনার কাছে খাবার, নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা খুঁজবে। শিশুকে জড়িয়ে ধরা, আদর করা, কথা বলা ও প্রতি উত্তর করা হলে শিশুর হরমোন নিঃসরণ হয় যা শিশুর মানসিক বিকাশে সহায়তা করে এবং তাদের নিরাপত্তার অনুভূতি দেয়।

নতুন শিশুর চাহিদা পূরণের মাধ্যমে তাদেরকে বখে দেয়া যায়না এবং বুকের দুধ খাওয়ানো শিশুদের অতিরিক্ত খাওয়ানো যায়না। তাই আপনি শিশুকে আরাম দেয়া এবং খাওয়ার জন্য বুকের দুধ দিন। শিশুকে আদর করা এবং খাওয়াবার মাধ্যমে আপনিও একটু আরামে বসে বিশ্রাম নিতে পারেন এবং শিশুর সঙ্গ উপভোগ করতে পারেন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.