বুকের দুধ খাওয়ানো সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা জানা উচিত

ঘুমন্ত শিশুকে জাগানো

নবজাতক শিশুদের কেউ কেউ নিদ্রালু হয়। এর অর্থ হল আপনার শিশু খাওয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমপক্ষে ৮ বার নিজের থেকে ঘুম থেকে উঠতে পারেনা। অথবা আপনার শিশু স্তন মুখে ঢুকাতে পারে কিন্তু খাওয়া শুরু করার অল্প কিছুক্ষন পরেই সে ঘুমিয়ে পড়তে পারে। যতক্ষণ না আপনার শিশু নিয়মিতভাবে ঘুম থেকে জেগে উঠে এবং স্থিরভাবে তার ওজন বাড়ে, আপনাকে মাঝে মাঝে আপনার শিশুকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতে হতে পারে।

ঘুমন্ত শিশুকে ঘুম থেকে জাগানো এবং খাওয়ানোর পরামর্শসমূহঃ

  • আপনার শিশু খাওয়ানোর ইঙ্গিত দেখালে, আপনি যাতে তা লক্ষ্য করতে পারেন সে জন্য তাকে কাছাকাছি রাখুন। এমনকি শিশুরা যখন পুরোপুরিভাবে সজাগ না থাকে বা তন্দ্রালু থাকে তখনও তারা খেতে পারে। কিন্তু যখনই তারা খাওয়ানোর ইঙ্গিত দেখায় তখনই তাদের খাওয়ানো সবচেয়ে ভালো।
  • যখনই আপনার শিশু খাওয়ানোর ইঙ্গিত দেখায় তখনই তাকে খাওয়ান, নইলে সে গভীর ঘুমে ফিরে যেতে পারে।
  • আপনার শিশুকে ত্বকের সাথে ত্বক লাগিয়ে ধরে রাখুন। আপনি জেগে থাকার সময় শিশুকে ত্বকের সাথে ত্বক লাগিয়ে আপনার বুকের উপর ধরে রাখলে সে বুকের দুধ আরও ঘন ঘন খাবে।
  • আপনার শিশুকে উন্মুক্ত করুন এবং তার পোশাক খুলে নিন। ভিজা বা ময়লা হলে তার ডায়াপার পরিবর্তন করুন।
  • তাকে আপনার কাঁধের উপরে তুলুন এবং তার পিঠ ঘষে দিন। তার শরীর মালিশ করুন।
  • একপাশ থেকে আরেকপাশ তাকে আলতো করে গড়িয়ে দিন। তার সাথে কথা বলুন।
  • তাকে আপনার স্তনের কাছে আনার সময় স্তন মুখে ঢুকাতে বাড়তি অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে অল্প একটু দুধ বের করুন।
  • নিদ্রালু শিশুকে আরও বেশী সজাগ থাকার জন্য অনুপ্রানিত করতে খাওয়ানোর সময় স্তনের সংকোচন ব্যাবহার করুন। এটি দুধের পরিমান বাড়াবে।
  • প্রতিটি স্তন একাধিকবার প্রদান করুন। আপনার শিশুকে জাগাতে এবং সক্রিয়ভাবে খাওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে সাহায্য করার জন্য আরও ঘন ঘন স্তন বদল করুন।

খিটখিটে শিশুকে শান্ত করা

শিশুরা অনেক কারণে কান্নাকাটি করে- অস্বস্তি, নিঃসঙ্গতা, ক্ষুধা, ভয়, স্নায়ুর চাপ বা অবসন্নতা। শিশুদের কেউ কেউ সুস্থ থাকলেও এবং তাদের ভালোভাবে খাওয়ানো হলেও অন্যদের তুলনায় বেশী কান্নাকাটি করে। এটি প্রথম তিন মাসের মধ্যে প্রায়ই ঘটে। এছাড়াও, এটি রাতে বেশী ঘটে। আপনার শিশুকে বুকে জড়িয়ে ধরে এবং সান্তনা দেয়ার মাধ্যমে আপনি তাকে নষ্ট করতে পারেন না। আসলে, শিশুদের পিতা-মাতা যখন তাদের চাহিদা এবং ইঙ্গিতে সাড়া দেয়, তখন তাদের সবচেয়ে ভালোভাবে বিকাশ হয়।

আপনার শিশু কোন কারণ ছাড়াই কান্নাকাটি করছে মনে হলে নিচের পরামর্শ সমূহ পালনের চেষ্টা করে দেখুন-

আপনি যদি জানেন যে আপনার শিশুকে ভালো করে খাওয়ানো হয়েছে এবং ঢেকুর তোলা হয়েছে তবে ত্বকের সাথে ত্বক লাগিয়ে ধরে রাখতে, হাঁটাহাঁটি করতে, এপাশ ওপাশ করতে, দাঁড়িয়ে থাকতে এবং দোলা দিতে চেষ্টা করুন। জন্মের আগের মাসগুলোতেই শিশুরা তাদের মায়ের হৃদস্পন্দন, গলার কণ্ঠস্বর এবং চলাফেরার সাথে পরিচিত হয়ে যায় এবং এভাবেই তাদের শান্ত করা হয়। একজন সঙ্গী যে শিশুর সাথে পরিচিত তার এই ব্যাপারগুলো করতে পারেন।

  • আপনার শিশুর ডায়াপার ভিজা বা ময়লা হলে তা পরিবর্তন করুন।
  • আপনার শিশুকে অধিক গরম বা অধিক ঠাণ্ডা মনে হলে তার আচ্ছাদন এবং কাপড়ের সমন্বয় করুন।
  • আপনার আপনার স্তন দিন। স্তনের সংকোচন ব্যাবহার করুন এবং প্রথম ও দ্বিতীয় স্তন আবার দিন।
  • আপনার নিজেকে শান্ত করতে শান্ত হওয়ার কৌশলগুলো, যেমন- ধীরে ধীরে দশ পর্যন্ত গননা করা, গভীরভাবে শ্বাস নেয়া ইত্যাদি করুন। আপনি শান্ত হলে তা আপনার শিশুকেও শান্ত থাকতে সাহায্য করবে।
  • আপনি অতিষ্ঠ হয়ে গেলে বিরতি নিতে আপনার সঙ্গী বা অন্য কাউকে শিশুকে ধরতে বলুন।

আপনার শিশুর ঢেকুর উঠানো

বুকের দুধ খাওয়া শিশু বেশি বাতাস গিলেনা। তারপরেও আপনার শিশুর ঢেকুর তোলার চেষ্টা করা একটি ভালো বুদ্ধি। ঢেকুর তোলার প্রয়োজন হলে শিশুদের কেউ কেউ খুঁতখুঁত করে। আপনার শিশুর কত ঘন ঘন ঢেঁকুর তোলার প্রয়োজন হয় তা দেখতে তাকে পর্যবেক্ষণ করুন। কোন কোন শিশুর জন্য খাওয়ার সময় এবং খাওয়ার শেষে আবার ঢেঁকুর উঠানোর প্রয়োজন হয়। শিশুদের কেউ কেউ খাওয়ার সময় বা খাওয়া শেষ হলে নিজে নিজেই ঢেকুর তোলে। কোন কোন শিশু প্রতিবার ঢেকুর নাও তুলতে পারে। শিশুদের কেউ কেউ খাওয়ার পর থুতু ফেলে। সপ্তাহগুলো পার হওয়ার সাথে সাথে যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার শিশুকে পরিতৃপ্ত দেখায় এবং তার ওজন বাড়ে, মুখভরে দুধের থুতু ফেলা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না।

ঢেকুর উঠাতে তার মাথায় কেবলমাত্র ঠেস দিন এবং তার পিঠ চাপড়ে দিন। তার পিঠ সোজা থাকলে বাতাসের একটি বুদবুদ সহজেই বের হয়ে আসতে পারে। নিচে ঢেকুর উঠানো সংক্রান্ত কিচু অবস্থান দেখানো হল-

শিশুকে ঢেকুর উঠানো

দ্রুত বিকাশের পর্যায়

কোন কোন দিন শিশুদের স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী ক্ষুধার্ত মনে হয়। এই সময়গুলোকে দ্রুত বিকাশের পর্যায় বলা হয়। যখন এটি ঘটে, মায়দের কেউ কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে তাদের যথেষ্ট দুধ নেই। চিন্তা করার কোন প্রয়োজন নেই। আপনি শিশুকে যত বেশী বুকের দুধ খাওয়াবেন, তত বেশী দুধ উৎপাদন করবেন।

চুষনি ব্যাবহার

বুকের দুধ খাওয়া অনেক শিশু কখনোই চুষনি ব্যাবহার করেনা। চুষনি একটি সমস্যা হতে পারে কারণ-

  • যে শিশু এখনও বুকের দুধ খাওয়া শিখছে এবং এমনকি যে শিশু বুকের দুধ খাওয়া শিখেছে সে চুষনি থেকে বুকের দুধ খাওয়াতে ফিরে আসা অসুবিধাজনক মনে করতে পারে।
  • শিশু চুষনি পছন্দ করতে পারে এবং স্তন প্রত্যাখ্যান করা শুরু করতে পারে।
  • দুই খাবার মাঝখানে তাকে চুষনি দেয়া হলে সে পর্যাপ্ত খাওয়া নাও খেতে পারে এবং তাদের ওজন নাও বাড়তে পারে।
  • খাওয়ানোর সময় প্রলম্বিত করলে, মায়েরা কম দুধ তৈরি করতে পারেন।
  • চুষনি শিশুদের কানের সংক্রমণ হওয়ার এবং পরবর্তীতে দাঁতের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

আপনি চুষনি ব্যাবহার করার সিদ্ধান্ত নিলে, আপনার শিশুর খাওয়ার পর কেবলমাত্র স্বল্প সময়ের জন্য দিতে চেষ্টা করুন। শিশুকে আপনার একটি পরিষ্কার আঙ্গুলও চাটতে দিতে পারেন।

স্তনের স্ফীতি

অধিকাংশ মহিলা শিশুর জন্মগ্রহনের ৩ বা ৪ দিনের সময় তাদের স্তনগুলো অপেক্ষাকৃত বড় এবং ভারী অনুভূত হয় বলে মনে করেন। এটি কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। আপনার স্তনগুলো স্ফীত ও যন্ত্রণাপূর্ণ অনুভূত হলে, এটাকে স্তনের স্ফীতি বলা হয়। আপনার স্তন স্ফীত হলে, আপনার শিশুর জন্য স্তন মুখে ঢুকানো আরও কঠিন হতে পারে।

স্তনের স্ফীতি ঘটলে, বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রথম সপ্তাহে যখন আপনার দুধের উৎপাদন শালদুধ থেকে দুধে পরিবর্তিত হতে শুরু করে সাধারনত তখন এটি হয়। এর কারন হতে পারে-

  • আপনার স্তনে বর্ধিত রক্ত প্রবাহ
  • আপনার স্তনের স্ফীতি
  • আপনার শিশু যতটুকু গ্রহন করছে তার চেয়ে আপনার স্তনে বেশী দুধ।

যেভাবে আপনি প্রায়ই স্তনের স্ফীতি প্রতিরোধ করতে পারেন

  • ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৮ বার বা তারও বেশী, যখনই আপনার শিশু খেতে চায় তাকে বুকের দুধ খাওয়ান।
  • আপনার শিশু ঠিকমত স্তন মুখে ঢুকিয়েছে এবং দক্ষতার সাথে খাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করুন। আপনাকে আপনার শিশুর ঘন ঘন গেলার শব্দ শুনতে হবে।
  • প্রতিবার খাওয়ানোর সময় উভয় স্তনই ব্যাবহার করুন। আপনার শিশু দ্বিতীয় স্তনটি গ্রহন না করলে এবং এটি সম্পূর্ণ ভরা মনে হলে, আপনার স্বাচ্ছন্দ্যবোধের জন্য সেই পাশ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ হাতে চাপ দিয়ে বের করুন।
  • চুষনির ব্যাবহার পরিহার করুন।

আপনার স্তন স্ফীত হলে-

  • আপনার শিশুকে আরও ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ান।
  • আপনার শিশুর স্তন মুখে না ঢুকালে, স্তনের বোঁটার চারপাশের লালচে স্থান নরম করতে বুকের দুধ চাপ দিয়ে বের করে আবার চেষ্টা করুন।
  • মায়দের কেউ কেউ অন্তর্বাস পরতে অনেক সাচ্ছন্দবোধ করেন। অন্য মায়েরা তা ছাড়া থাকতেই পছন্দ  করেন। আপনি অন্তর্বাস পরলে সেটি যেন খুব আঁটসাঁট না হয় তা নিশ্চিত করুন।
  • বিপরীত চাপ প্রয়োগে নরম করার পদ্ধতি (Reverse Pressure Softening) ব্যাবহার করুন।
  • দুইবার খাওয়ানোর মাঝখানে আপনার স্তনে একটি আবৃত বরফের প্যাকেট অথবা ঠাণ্ডা পুটুলি লাগান।

বিপরীত চাপ প্রয়োগে নরম করার পদ্ধতি

স্তনের পূর্ণতা সাধারন ব্যাপার এবং এটি কয়েক দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এই পর্যায় অতিবাহিত হওয়ার পর আপনার স্তন তুলনামুলকভাবে নরম এবং কম পূর্ণ মনে হবে। ফোলা চলে যাওয়ার কারণে এটি হয়। এর অর্থ এই নয় যে আপনি আপনার বুকের দুধের প্রবাহ হারাচ্ছেন।

বুকের দুধ সংরক্ষণ

আপনি বুকের দুধ কিছু চাপ দিয়ে বের করলে এবং আপনার শিশুর জন্য সংরক্ষণ করতে চাইলে, অ্যাকাডেমি অব ব্রেস্টফিডিং মেডিসিনের নির্দেশনাটি ব্যবহার করতে পারেন।

বুকের দুধ সংরক্ষণ

পরিষ্কার কাঁচ বা শক্ত প্লাস্টিকের পাত্র যা বি পি এ (BPA) মুক্ত, বা বরফে পরিনত করার জন্য তৈরি থলে ব্যাবহার করুন। আপনার বুকের দুধ চাপ দিয়ে বের করার তারিখ ব্যাগ বা বোতলের উপর লিখে রাখুন। প্রথমে পুরনো দুধ ব্যাবহার করুন। সংরক্ষনের সময় প্রদত্ত তারিখের চেয়ে পুরনো যে কোন দুধ ফেলে দিন।

সবার জন্য শুভকামনা।

তথ্যসূত্রঃ অন্টারিওস ম্যাটারনাল, নিউ বর্ণ এন্ড আর্লি ইয়ার্স চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট রিসোর্স সেন্টার।

 

Related posts

Leave a Comment