বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েরা যে সব খাবার খেলে বাচ্চার অসুবিধা হতে পারে

নবজাতক শিশুর খাবার মানেই মায়ের বুকের দুধ। জন্মের পর নবজাতক শিশুকে মায়ের দুধ ছাড়া অন্য কোনো খাবার দেওয়া উচিত নয়। এ সময়ে শিশুর পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য মায়ের দুধই যথেষ্ট। বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের খাবার নিয়ে অনেক ধরণের উপদেশ শোনা যায়। এগুলোর বেশিরভাগই ভুল। মায়ের খাবারের কারণে বুকের দুধের গুনগত মানের কোন পরিবর্তন হয়না। এমনকি মা যদি দু একদিন উপোষ থাকেন তাতেও বুকের দুধের গুণগত মান এবং পরিমাণ অটুট থাকে। তবে হ্যাঁ, মায়ের স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য মায়েদের পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।

বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের জন্য নিষিদ্ধ খাবারের তালিকা বলে কিছু নেই। তবে মায়েরা যে সব খাবার খান সেসব খাবারের সামান্য অংশ বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর পেটে যেতে পারে। কিছু কিছু শিশুর এতে অসুবিধা হতে পারে আবার কারো কারো কোন অসুবিধা নাও হতে পারে। যেটা জরুরী সেটা হলো আপনি কি খাচ্ছেন এবং এতে বাচ্চার উপর কোন প্রভাব পড়ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখা। এমনি কিছু সাধারণ খাবার এবং শিশুর উপর সেসবের প্রভাব নিয়ে আজকের আলোচনা।

মা যে খাবার খেলে বাচ্চার অসুবিধা হতে পারে

 

কফি, চকলেট এবং কলা জাতীয় খাবার

কফি বা চকলেটে ক্যাফেইন নামক পদার্থ থাকে। মা বেশি পরিমাণে কফি খেলে বা ক্যাফেইন জাতীয় খাদ্য খেলে তা মায়ের রক্তে মিশে যায়। রক্তে যে পরিমাণ ক্যাফেইন মেশে তার ১ শতাংশ বুকের দুধের সঙ্গে বের হয়। চার মাসের কম বয়স্ক শিশু এই ক্যাফেইন পরিপাক করতে পারেনা। ধীরে ধীরে এ ক্যাফেইন শিশুর শরীরে জমা হতে থাকে। এর ফলে শিশু ঘুমাতে চায়না, সব সময় চঞ্চল থাকে এবং খিটখিটে হয়ে যায়।

থিওব্রোমিন নামে একধরণে পদার্থের উপস্থিতি আছে চকলেটে, যেটা অনেকটা ক্যাফিনের মতোই৷ দিনে ৭৫০ মিলিগ্রামের বেশি থিওব্রোমিন গ্রহণ করলে শিশুর ঘুমে ব্যাঘাত বা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে৷

তবে অল্প পরিমাণে খেলে তেমন অসুবিধা হয়না। দৈনিক ৩০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন (২ কাপ কফি বা চা) খাওয়া যেতে পারে। তার বেশি নয়। কিন্তু এই পরিমাণে খেলে যদি শিশুর উপরোক্ত লক্ষণ দেখা যায়, তবে ক্যাফেইন জাতীয় খাবার খাওয়া আরও কমাতে হবে বা বন্ধ রাখতে হবে।

ভেষজ চা

অনেকেই মনে করেন, ভেষজ চা খেলে রক্ত পরিষ্কার হয় আর দুধ উৎপাদনের মাত্রা বাড়ে৷ তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখনো তা প্রমাণ করতে পারেনি৷ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও মাদক অধিদপ্তর এটা মায়েদের জন্য অনুমোদন করেনি, কেননা, এর বিশুদ্ধতা, নিরাপত্তা ও এটা কতটা শক্তিশালী এসব সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নয়৷ তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, নতুন মায়েদের ভেষজ চা না খাওয়াই ভালো৷

মদ বা অ্যালকোহল

মদ বা মাদক দ্রব্য খেলে তা রক্তে মেশে। যে পরিমাণ মাদক রক্তে প্রবেশ করে, মায়ের বুকের দুধেও সে পরিমাণ মাদক নিঃসৃত হয়। অল্প পরিমাণ মদও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই নেশাগ্রস্থ অবস্থায় কোন মায়ের তার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো উচিৎ নয়। এছাড়া অধিক মদ্যপান মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে, শিশুর পরিচর্যার ব্যাঘাত ঘটায় এবং মায়ের পুষ্টির ব্যাঘাত ঘটায়। এজন্য বুকের দুধ খাওয়ানো মাকে মাদক দ্রব্য থেকে দুরে থাকতে হবে।

বেশি মসলা জাতীয় খাবার (Spicy Foods)

খাবার মসলা বা ঝাল বেশি হলে তা শিশুর সমস্যা তৈরি করতে পারে। পেটে ব্যাথা, খিটখিটে ভাব আস্তে পারে। আবার কিছু কিছু শিশুর এতে কোন প্রভাব নাও পড়তে পারে। তবে মায়ের নিজের ও শিশুর জন্য বেশি মসলা জাতীয় খাবার না খাওয়াই ভালো।

ব্রকোলি (Broccoli)

এটি দেখতে ফুলকপির মতো কিন্তু সবুজ রঙের। ফুলকপি ও ব্রকোলি শিশুর পেটে গ্যাস তৈরি করতে পারে যা পেটে ব্যাথার কারণ হতে পারে। মাকে খেয়াল রাখতে হবে তিনি কি খাবার খাচ্ছেন, তার সঙ্গে শিশুর অস্থিরতা, পেটে গ্যাস, বা রাতে কান্না সম্পর্ক আছে কিনা। সে রকম মনে হলে মাকে সে খাবার বন্ধ রাখতে হবে।

টক বা লেবু জাতীয় খাবার বা ফলের রস (Citrus fruit)

সাধারণত টকজাতীয় ফল নতুন মায়ের শরীরের জন্য ভালো, কেননা, এতে প্রচুর ‘ভিটামিন সি’ থাকে৷ তবে কিছু কিছু শিশু ‘ভিটামিন সি’ সহ্য করতে পারে না৷ ফলাফল-  শিশুদের ডায়রিয়া দেখা দেয়৷ অর্থাৎ ‘ভিটামিন সি’- তে শিশুটির অ্যালার্জি আছে৷

শিশুর অপরিণত পরিপাকতন্ত্রে এ রস হজমে সমস্যা তৈরি করে, ফলে শিশু সব সময় খিটখিটে হয়ে থাকে, মুখ দিয়ে বেশি লালা বের করে। এমনকি, কোনও কোনও শিশুর মলদ্বারের চারপাশে র‍্যাশ বা লাল হয়ে যেতে পারে। এসব হলে এই খাবার খাওয়া বন্ধ রাখতে হবে।

রসুন (Gerlic)

মা যদি রসুন খায়, সে গন্ধ বুকের দুধের মধ্যে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। শিশুর কাছে এই গন্ধ ভালো নাও লাগতে পারে। শিশু মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে বা উত্তেজিত হতে পারে। তবে এ সব নির্ভর করছে শিশুর উপর। বিভিন্ন শিশুর ক্ষেত্রে এই পছন্দ বিভিন্ন হতে পারে। ইতালিতে রসুনের প্রচলন বেশি, সেখানে মায়েদের ৪ মাস পর্যন্ত রসুন না খেতে বা কম খেতে বলা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে রসুন বেশী খেতে বলা হয়, কারণ মনে করা হয় এতে বুকের দুধের পরিমাণ বাড়ে এবং শিশুও নানা রকম খাদ্যবস্তুর গন্ধের সাথে পরিচিত হতে পারে। ফলে পরবর্তী সময়ে শিশু বিভিন্ন রকমের খাবার সহজে খায়। কিন্তু শিশু মায়ের খাওয়া রসুনের গন্ধ কিভাবে নেবে এটা শুধু তার উপরেই নির্ভর করে।

চিনেবাদাম (Peanuts)

চিনেবাদাম খাবার হিসেবে পুষ্টিকর, কিন্তু কোন কোন সময়ে এতে অ্যালার্জি দেখা দেয়। চামড়া লাল হয়ে যাওয়া, একজিমা বা শ্বাসকষ্ট হয়। এই লক্ষণ দেখা দিলে চিনেবাদাম বা অন্যান্য বাদাম জাতীয় খাবার বন্ধ করে দেখতে হবে।

আটা (Wheat)

যেসব খাবারে অ্যালার্জি হতে পারে বা খেলে অনেকেরই সহ্য হয়না, আটা বা গমের খাবার তার মধ্যে অন্যতম। শিশুর যদি এই খাবার অ্যালার্জি থাকে তবে শিশুর পেটে ব্যাথা হতে পারে, কান্না করতে পারে এবং রক্ত পায়খানা হতে পারে। এ সব হলে আটা জাতীয় খাবার ৩ সপ্তাহ বন্ধ করে দেখতে হবে শিশুর অবস্থার উন্নতি হয় কিনা। যদি উন্নতি হয় তবে বুঝতে হবে শিশুর এই খাবারে অ্যালার্জি আছে, তখন আটার তৈরি খাবার বন্ধ রাখতে হবে।

গরুর দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার (Dairy products)

অনেক শিশুরই গরুর দুধ বা দুগ্ধজাতীয় খাবারে অ্যালার্জি থাকে। মা গরুর দুধ খেলে দুধের অ্যালার্জি তৈরি করার অংশ দুধের মাধ্যমে শিশুর পেটে যায়। শিশুর অ্যালার্জি থাকলে তার পেটে ব্যাথা ও বমি হতে পারে। এর সঙ্গে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, একজিমা, চর্মরোগ এসবও হতে পারে। শিশুর গরুর দুধে অ্যালার্জি থাকলে মাকে গরুর দুধ খাওয়া বন্ধ রাখতে হবে।

পুদিনা পাতা

ধারণা করা হয়, পিপারমেন্টে মায়ের স্তনে দুধের পরিমাণ বাড়ে৷ তবে এটা এখনো প্রমাণিত হয়নি৷ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও মাদক অধিদপ্তর পিপারমেন্টকে মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ হিসেবে অনুমোদন করেছে৷ তবে সতর্কও করেছে এই বলে যে, মাত্রাতিরিক্ত পিপারমিন্ট গ্রহণ করলে মায়ের হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, অ্যালার্জি ও মাথাব্যথা হতে পারে, যা শিশুর দেহে প্রভাব ফেলবে৷

অন্যান্য খাদ্য

আরও কিছু খাবার আছে যা প্রায়ই আলার্জির কারণ হয়। এর মধ্যে আছে ডিম, কাঁকড়া বা চিংড়িমাছ, কিছু সামুদ্রিক মাছ বা সবজি। সামুদ্রিক মাছে পারদের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে৷ আর কোনো মা যদি বেশি সামুদ্রিক মাছ খান তবে তার দুধেও পারদের পরিমাণ বেড়ে যায়৷ আর এই দুধ খেলে শিশুর স্বাস্থ্যহানি হতে পারে৷ এমনকি সয়াবিন, ভুট্টার চিপস, পুদিনা পাতা ইত্যাদিতেও অ্যালার্জি থাকতে পারে। মা যদি জানেন, শিশুর কিসে অ্যালার্জি আছে বা কোন খাবার খেলে শিশুর অসুবিধা হচ্ছে, তবে সেই খাবার বুকের দুধ খাওয়ানো পর্যন্ত বন্ধ রাখা দরকার। এছাড়াও শিশুর যদি পেটে গ্যাস বেশি হয়, পেটে ব্যাথা থাকে বা অ্যালার্জির অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয় তবে মাকে তার খাবার নিয়ে ভাবতে হবে।

 

যে সব খাবার বুকের দুধ কমিয়ে দিতে পারে

কিছু কিছু খাবার যেমন বুকের দুধ বাড়ায় তেমনি কিছু খাবার বুকের দুধ কমিয়েও দিতে পারে। এর মধ্যে আছে বাঁধাকপি, ভুঁই তুলসী, পুদিনা ইত্যাদি। এছাড়া পানি কম খেলে, ঘুম কম হলে, খাবার কম খেলে বা থাইরয়েডের গোলমালের জন্য বুকের দুধ কম হতে পারে।

বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের মনে প্রায়ই একটা প্রশ্ন জাগে- কি খাব, কি খাবনা? এবং কতটা খাব? আমারা চেষ্টা করেছি কোন খাবার খেলে শিশুর অসুবিধা হতে পারে তার একটা আভাস দেয়ার। তবে অবশ্যই মায়ের ব্যাক্তিগত পছন্দ অপছন্দ থাকবে। মাকে যেমন নিজের জন্য পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে তেমনি দেখতে হবে শিশুরও যাতে কোন অসুবিধা না হয়। আর এই সময় মাকে প্রয়োজনীয় খাবার দেয়ার দায়িত্ব পরিবারের মানুষদেরই।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment