বাচ্চার বিছানায় প্রস্রাব করা বা বিছানা ভেজানো । কারণ ও করণীয়

সময়ের সাথে সাথে বেড়ে ওঠা শিশু নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে শেখে। প্রস্রাবের বেগ হলে বাথরুমে  যেতে হবে, এটি দুই থেকে চার বছর বয়সেই শিশুরা শিখে ফেলে। আবার অনেকেই দিনে ঠিকঠাক হলেও রাতে ঘুমের মাঝে বিছানা ভেজায়। বয়সের সঙ্গে এ সমস্যা দূর হয়। মেয়েদের থেকে এই সমস্যা ছেলেদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

বিছানায় প্রস্রাব করা সমস্যাটিকে ডাক্তারি পরিভাষায় নকচারনাল এনুরেসিস বলে। সাধারণত শিশুরা জন্মের পর দু’তিন বছর পর্যন্ত ঘুমের মধ্যে বিছানায় প্রস্রাব করে থাকে। এটি কোনও রোগ নয়। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জন সব শিশুর একই বয়সে হয় না। সাধারণত দিনে নিয়ন্ত্রণ দ্রুত হলেও রাতে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটি বিলম্বিত হয়। বেশির ভাগ শিশুই চার-পাঁচ বছর বয়সে এ ক্ষমতা অর্জন করে। আমেরিকান একাডেমী অফ পেডিয়াট্রিক্স এর মতে, ৫ বছর বয়সের ২০%, ৭ বছর বয়সের ১০% এবং ১০ বছর বয়সের ৫% শিশু বিছানা ভেজায়।

শিশুর বিছানায় প্রস্রাব করা বা বিছানা ভেজানোর পেছনে কারণ কি কি

এর পিছনে শারীরিক কারণ যেমন আছে, তেমনি আছে মানসিকও। শিশু অবস্থা থেকে কেউ যদি বড় হয়েও একই ঘটনা ঘটান, তবে ধরেই নিতে হবে যে, তার মানসিক কোন কারণ আছে। তাকে অহেতুক গালমন্দ বা সমালোচনা করে দেখতে হবে, পিছনের কারণটা কি? শারীরিক কারণের মধ্যে আছে, অসুস্থতা, মানসিক বিকাশের স্থবিরতা (সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়), পরিবেশগত ব্যাঘাত (মানে স্থানচ্যুতি), বংশগত প্রভাবও এক্ষেত্রে অনেকাংশেই দায়ী। অন্যদিকে মানসিক কারণের মধ্যে আছে, স্বল্পবুদ্ধি, তাকে প্রস্রাব করতে না শেখানো বা অভ্যাস না করানো, শিশুর প্রতি অবহেলা, পারিবারিক অশান্তি, শিশুর অতিরিক্ত আবেগ ইত্যাদি

বাচ্চারা কেন বিছানা ভেজায় সেটার কারণ এখন পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে বেশিরভাব বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বিছানায় প্রস্রাব করা একটি স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া এবং এর সাথে নীচের বিষয়গুলোর কোনটি জড়িত থাকতে পারে।

শারীরিক বৃদ্ধি

এমন হতে পারে যে বাচ্চার ব্লাডার, নার্ভাস সিস্টেম এবং মস্তিষ্ক এখন পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। এগুলো যথা সময়ে বিকশিত হবে এবং এর বিকাশ ত্বরান্বিত করার কোন উপায় নেই। স্বাভাবিক অবস্থায় জন্মের পর ২-৩ বছর পর্যন্ত দেহের মেরুদণ্ডের কোমরের অংশের স্নায়ুতন্ত্র যেটা সেকরাল প্লেক্সাস নামে পরিচিত সেটা প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ করে। এজন্য এই বয়স পর্যন্ত প্রস্রাব ঘনঘন হয় এবং সত্যিকার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তিন বছর পর মস্তিষ্কের মূল অংশ নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। ফলে প্রস্রাবের প্রক্রিয়াটিও কারো নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

জেনেটিক (বংশগত) কারণ

বাবা বা মায়ের যদি ছোটবেলায় বিছানা ভেজানোর সমস্যা থাকে, তা হলে তাঁদের সন্তানদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়। যদি বাবা বা মা, কোনও একজনের এই সমস্যা থাকে, তাহলে তাঁদের সন্তানের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। যদি দু’জনেরই থাকে, তাহলে এই সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় ৭৫ শতাংশ। আর যদি কারও না থাকে, তাহলে সম্ভাবনা হ্রাস পায় ১৫ শতাংশ।

হরমোন জনিত কারণ

আমাদের শরীরের যে হরমোন রাতের বেলা প্রস্রাবের উৎপাদন হ্রাস করে সে হরমোনের ঘাটতির কারণে শিশু রাতে বিছানা ভেজাতে পারে। বিছানায় যাওয়ার আগে বেশী পানি খেলেও এমন হতে পারে। কিন্তু পানি কম খেলে আবার এ সমস্যা মিটে যাবে এমনটা নয়।

ডিপ স্লিপার

শিশুর বিছানায় প্রস্রাব করে দেয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণটি হচ্ছে শিশুর গভীর ঘুম। এজন্যই সে তার ব্লাডার পরিপূর্ণ হয়ে গেলেও সেটা তার মস্তিষ্ক টের পায়না।

কনস্টিপেশন বা কোষ্ঠ কাঠিন্য

শিশুর যদি কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকে তাহলে তার পেট ভরা থাকে এবং ব্লাডার বা মূত্রথলির উপরে চাপ দিতে থাকে। ফলে সে বিছানায় প্রস্রাব করে দেয়।

স্ট্রেস বা ইমোশনাল ইস্যু

শিশু যদি মানসিক চাপে ভুগে, স্ট্রেস এ থাকে বা অসুস্থ থাকে তাহলে তাহলে তার বিছানা ভেজানোর সমস্যাটি হতে পারে।

মেডিক্যাল ইস্যু

শিশুর অন্তর্নিহিত কোন স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে এমন হতে পারে। এগুলো হতে পারে তার কোষ্ঠকাঠিন্য বা মুত্রথলীর ইনফেকশনের কারণে। আবার ডায়বেটিসের কারণেও এমনটা হতে পারে। তবে তা খুবই কম দেখা যায়। বাচ্চার যদি বিছানায় প্রস্রাব করার সাথে সাথে আর কোন উপসর্গ দেখা যায় তবে ডাক্তারকে জানাতে হবে।

রাতে বিছানায় প্রস্রাব করা নিয়ন্ত্রণে কি করা যেতে পারে?

প্রথমেই ধরে নিতে হবে যে, এটা কোন জটিল সমস্যা নয়। সবার সহযোগিতা থাকলে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আর বাচ্চা যদি বুঝতে সক্ষম হয়, তাহলে তাকে সমালোচনা না করে বোঝাতে হবে যে, তার পাশে সবাই আছে। কখনও তাকে এজন্য গালমন্দ করা যাবে না। অনেকেই এই ভুলটা করে থাকেন। ফলে শিশু কুঁকড়ে থাকে এই ঘটনার পর, হীনমন্যতায় ভূগে। সবার সামনে অপমান বোধ করে। এটা করতে দেওয়া যাবে না।

পানি পান কমানো নয়

অনেকে প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পানি খাওয়া কমিয়ে দেয়। তাতে সুবিধা না হয়ে অনেক সময় অসুবিধা বেড়ে যায়। কারণ পানি কম খেলে ধীরে ধীরে মূত্রথলি ছোট হয়ে যায়। ফলে কম ধারণ ক্ষমতার কারণে রাতে বিছানা ভিজে যায়। তাই পানি কম না খেয়ে স্বাভাবিক পরিমাণে পানি খেতে হবে। পানি কম খেলে এ সমস্যা কম হবে এটা খুবই ভুল ধারনা। তবে দিনের বেলা পানি বেশী খাইয়ে এবং সন্ধ্যার পর পানির পরিমাণ কমিয়ে দেখতে পারেন।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রস্রাব

ঠিক ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রস্রাব করানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করুন। বাচ্চার যদি রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় তবে তাকে বাথরুমে নিয়ে যান। তবে গবেষণায় দেখা গেছে বাচ্চাকে ঘুমে থেকে তুলে বাথরুম করানো বা ঘুমের ভেতর কোলে করে নিয়ে বাথরুম করালে এ সমস্যার সমাধান হয়না।

রাতে বাথরুমে যাওয়া সুগম করুন

শিশু অনেক সময় ভয়, অন্ধকার, শীত, বিছানা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, টয়লেট দূরে, ভূতের ভয় বা অন্যরা বিরক্ত হবে ভেবে প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙেও আবার ঘুমিয়ে যায়। এসব অসুবিধা দূর করুন। ভূত বা সাপের গল্প বলা ও নাটক দেখা থেকে বিরত রাখুন।

নিজের ও সন্তানের দোষী দোষী মনোভাব দূর করুন

সন্তান বিছানায় প্রস্রাব করে দেয় বলে মা-বাবার নিজেদের খারাপ মনে করার কোনো কারণ নেই। রাতে বিছানা ভেজানো একটি জৈবিক সমস্যা। শিশু ঘুমের মধ্যে তার মূত্রথলির স্ফিংটার বা দ্বার নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিটি শিখে উঠতে পারে না বলেই এই সমস্যা হয়। খুব কম ক্ষেত্রেই শিশুর মানসিক সমস্যাকে এ জন্য দায়ী হিসেবে দেখা যায়।

শিশুকে শাস্তি দেওয়া যাবে না

অনেক সময়ই দেখা যায়, সন্তান রাতে বিছানা ভেজায় বলে বাবা-মা তাকে শাস্তি দিয়ে থাকেন। কিন্তু বিছানা ভেজানোর অপরাধে শিশুকে কখনোই শাস্তি দেওয়া বা বকাঝকা করা উচিত নয়। যেহেতু কোনো শিশুই ইচ্ছা করে ঘুমের মধ্যে প্রস্রাব করে দেয় না, তাই এ ক্ষেত্রে শাস্তি শুধু কষ্ট দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজে আসবে না।

বিছানায় ক্লথ ব্যবহার করতে হবে

যেসব শিশুর বিছানা ভেজানোর অভ্যাস আছে, তাদের বিছানায় রাতে ক্লথ ব্যবহার করতে হবে। এতে করে বিছানার তোশক, ম্যাট্রেস—এগুলো নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। এ ছাড়া শিশু ও তার মাও এই ভেবে স্বস্তি পাবে যে বিছানা পরিষ্কার করার জন্য খুব বেশি কষ্ট, যেমন—চাদর ও কাঁথা ধোয়া, তোশক রোদে দেওয়া ইত্যাদি করতে হবে না।

শিশুকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য উৎসাহিত করুন

আপনার শিশুকে বলতে হবে, আপনি আশা করছেন সে ভেজানো বিছানা পরিষ্কার করবে অথবা এ কাজে আপনাকে সাহায্য করবে। এমনকি যদি তার বয়স চার থেকে পাঁচ হয় তবুও। কেননা, এই বয়সের বাচ্চা সহজেই বিছানার চাদর বা ওয়েল ক্লথের ওপর বিছানো কাঁথা সরিয়ে নিয়ে ধোবার স্থানে রাখতে পারে। এটা করার উদ্দেশ্য, শিশুকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং শিশুকে বুঝতে দেওয়ার যে নিজের বিছানা পরিষ্কার রাখাটা তার দায়িত্ব।

শিশুর শোবার সময় বাড়ির পরিবেশ শান্ত রাখুন

ঘুমের সময় চারদিকে এলোমেলো থাকলে, এমনকি টিভিতে কোনো উত্তেজনাকর অনুষ্ঠান থাকলে, অর্থাৎ ঘুমানোর সময় শান্ত মন নিয়ে ঘুমাতে না গেলে শিশুর ঘুমের মাঝে প্রস্রাব করে দেওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। কেননা, উত্তেজনা প্রস্রাব উৎপাদনের জন্য সহায়ক। তাই ঘুমানোর ঠিক আগে টেলিভিশন না দেখিয়ে শিশুকে গল্পের বই পড়তে দেওয়া যেতে পারে।

টয়লেটে যাওয়ার সময় নির্ধারণ করে দিন

ছোট শিশুরা খেলায় ব্যস্ত থাকলে অনেক সময়ই তাদের প্রস্রাব আটকে রাখে। তাই প্রতি ঘন্টায় একবার করে যেন আপনার শিশু টয়লেটে যায় সে বিষয়ে খেয়াল রাখুন। যদি তার বাথরুমে  যাওয়ার প্রয়োজন নাও হয় তাও তাকে পাঠান। এতে সে তার ব্লাডার খালি বা পূর্ণ হওয়ার অনুভূতি বুঝতে শিখবে এবং শরীরের চাহিদার প্রতি মনোযোগী হতে শিখবে।

বাচ্চাকে পুরস্কৃত করুন

বাচ্চার বয়স যদি ৫ বা তার বেশী হয় তবে তাকে তার ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করুন। তবে মনে রাখবেন এমন কাজের জন্য তাকে পুরষ্কার বা বাহবা দেবেন যেগুলো সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। রাতে বিছানায় প্রস্রাব করা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে তাই সরাসরি বিছানা না ভেজানোর জন্য পুরস্খার দেয়াটা কোন বুদ্ধিমানের কাজ হবেনা। উল্টো সে যেদিন বিছানা ভিজিয়ে ফেলবে সেদিন তার মনটাই খারাপ হয়ে যাবে, অথচ তা সে ইচ্ছে করে করেনি। এর পরিবর্তে আপনি তার ভালো কাজ গুলোর জন্য পুরস্কৃত করতে পারেন, যেমন-

  • দিনের বেলা পানি বেশী খাওয়া এবং রাতে কম খাওয়ার জন্য।
  • দিনের বেলা নিয়মিত বাথরুমে যাওয়ার জন্য।
  • ঘুমানোর আগে বাথরুম সারার জন্য।

কখন বাচ্চার বিছানা ভেজানো স্বাভাবিক

আসলে এই জিনিসটি স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে মা-বাবাও চিন্তিত হয়ে যেতে পারেন। সাধারণত ছয় বছর বয়সের মধ্যে একটি মেয়ের বিষয়টি ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে আসে। তাদের আর বেড ওয়েটিংটা হয় না। আর সাত বছর বয়সের মধ্যে ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ ছেলেদের বিষয়টি ঠিক হয়ে যায়। তবে কিছু বাচ্চার এটা থেকে যেতে পারে। সাত বছর এখানে চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

তবে সাত বছর পর যদি কিছু হয়, এটা একটু অস্বাভাবিক। বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হয়তো ওই শিশুর এই মুহূর্তে কম আছে। তবে অবশ্যই এটি আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। বাচ্চার যদি বিছানা ভেজানোর সমস্যার সাথে সাথে নীচের উপসর্গ গুলো না থাকে তবে তেমন একটা চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই।

কখন ডাক্তারকে জানাতে হবে?

বিছানায় প্রস্রাব করা কখনো কখনো কোন শারীরিক সমস্যার কারণে হতে পারে। নীচের লক্ষণগুলো দেখলে ডাক্তারকে তা জানানো উচিত-

  • যদি অনেকদিন বিছনায় প্রস্রাব না করার পর হঠাৎ করে আবার শুরু হয়।
  • যদি দিনের বেলায়ও বিছানা ভেজানো শুরু করে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ দেখা দেয়।
  • ঘন ঘন প্রস্রাব করে।
  • প্রস্রাবের সময় ব্যাথা বা জ্বালা করে।
  • গোলাপি বর্ণের বা রক্ত মিশ্রিত প্রস্রাব দেখা গেলে।
  • প্রস্রাবে দুর্গন্ধ হলে।
  • ১০০.৪ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা তার বেশী জ্বর হলে।
  • যৌনাঙ্গের আশেপাশে র‍্যাশ বা চুলকানি হলে।

সবশেষে বলব নিজের ইন্দ্রিয়ের উপর ভরসা রাখুন। যদি মনে হয় বাচ্চার বিছানা ভেজানোর পেছনে কোন শারীরিক সমস্যা আছে তবে তা অবশ্যই ডাক্তারকে জানান।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment