বাচ্চার ঘুমের বিষয়ে যে সব ভুল বাবা মায়েরা করে থাকেন এবং তা শোধরানোর উপায়

মানসিক ও শারীরিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য শিশুদের দরকার পরিমিত ঘুম। তবে প্রথম তিন মাস খিদে, ডায়াপার বদলানো কিংবা শারীরিক কোনো অসুবিধার কারণে একনাগাড়ে অনেক শিশুই ঘুমায় না। কিছুক্ষণ পরপরই ঘুম ভেঙে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তিন মাস পর থেকে শিশুদের জন্য একটা নির্দিষ্ট ঘুমের সময় ঠিক করে ফেলা ভালো। কাজটি অবশ্যই কষ্টকর। কিন্তু একবার যদি শিশুর ঘুমের সময় ঠিক করে ফেলা যায়, তাহলে সেটা আপনার জন্য আনন্দের সংবাদ হবে।

ঝামেলা ছাড়া বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানো বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার এবং কখনো কখনো বাবা-মাই বিষয়টাকে আরও  জটিল করে তোলেন। জানুন এই ভুলগুলো আপনিও করছেন কিনা এবং এসবের প্রতিকার সম্পর্কে পড়ুন আমাদের আজকের আর্টিকেলে।

 

বাচ্চাকে অনেক রাত পর্যন্ত জাগিয়ে রাখা

আপনি হয়তো শিশুকে অনেক রাত পর্যন্ত খেলতে ব্যস্ত রাখেন, কারণ আপনি কাজের শেষে তাকে সময় দিতে পারেন না। বা আপনি আপনার রাতের কাজ শেষ করার আগে শিশুকে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস করাচ্ছেন না। এটি একটি সমস্যা, কারণ, দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাসের কারণে শিশুরা অতিরিক্ত  ক্লান্ত হয়ে পরে। এতে শিশুরা খিটখিটে হয়ে ওঠে এবং ঘুমাতে অনীহা প্রকাশ করে।

প্রতিকার: সুনির্দিষ্ট একটা ঘুমানোর সময় নির্ধারন করুন। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, শিশুর ক্লান্ত হওয়ার লক্ষণগুলোর দিকে নজর রাখা। শিশু শান্ত এবং ধীরস্থির হয়ে গেলে, চোখ কচলালে, হাই তুললে বা কান্না করলে বুঝতে হবে এগুলো ঘুমের ইঙ্গিত। ঘুমের এই ধরনের ইঙ্গিত পেলে শিশুদের ঘুম পাড়িয়ে দিন।বাচ্চার ঘুমের লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে তাকে বিছানায় শুয়ে দিলে সে নিজে নিজে ঘুমিয়ে পরা শিখবে।

বাচ্চা যখন বড় হয়ে ওঠে তখন ঘুমানোর সময়ের আগে করে তার খেলাধুলা বা অন্যান্য কাজ করতে দিন। এতে তার ঘুম ভালো হবে এবং সহজেই ঘুমিয়ে পড়বে।

 

বাচ্চাকে দুলিয়ে বা কোলে ঘুম পাড়ানো

শিশুকে দোলনায় দোল দিয়ে ঘুম পাড়ানোর ঐতিহ্য আমাদের দেশে বেশ পুরোনো।ঘুমানোর আগে আপনার বাচ্চাকে এপাশ ওপাশ দোলালে, শিশু স্বস্তিবোধ করে, এতে কোন সমস্যা নেই- শুধু নিশ্চিত হতে হবে যে এপাশ ওপাশ দুলিয়ে যেন ঘুম পাড়ানো না হয়। এতে সে এভাবেই ঘুমিয়ে পড়তে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে এবং রাতে প্রতিবার ঘুম থেকে জেগে গেলে, একি ভাবে ঘুম পাড়াতে হবে।

দুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর কারণে শিশুর ভাল ঘুমেরও ব্যাঘাত হতে পারে। মার্ক ওয়েসব্লুথ (শিশু বিশেষজ্ঞ) বলেন, “ শিশুকে যদি দুলিয়ে ঘুম পাড়ানো হয় বা সে যদি গাড়িতে বা স্ট্রলারে ঘুমায় তবে তার গভীর ঘুম হবেনা”।  তিনি শিশুর এভাবে ঘুমানোকে তুলনা করেছেন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্লেনে ঘুমানোর সাথে।

প্রতিকার: শিশুকে শান্ত করার জন্য দোল দিন, তন্দ্রা বা ঘুমানোর জন্য নয়। শিশু পুরোপুরি ঘুমিয়ে পরা পর্যন্ত দোলনা বা কোলে নিয়ে হাঁটার প্রয়োজন নেই। বাচ্চার যখনি চোখ মুদে আসবে তাকে  বিছানায় শুইয়ে দিন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

আরও পড়ুনঃ নবজাতকের ঘুম । কেমন হতে পারে ?

 

ঘুমানোর সময় ডিভাইস বা অন্যান্য কিছুর ব্যাবহার

আপনি হয়ত ভাবতে পারেন মোবাইল, রঙ্গিন আলো বা মোবাইলে শান্ত গান  শিশুকে ঘুম পাড়াতে সাহায্য করবে। প্রকৃতপক্ষে তা শিশুর মনোযোগ অন্যদিকে সরায় এবং শিশুকে জাগিয়ে রাখে।

প্রতিকার: আপনার শিশুর রুম অন্ধকার ও নিরব রাখুন। দুর থেকে শিশুর মনোযোগ কাড়ে এমন জিনিস বিছানার আশপাশ থেকে সরিয়ে ফেলুন। অন্ধকারে বাচ্চার ঘুম ভাল হয়। ফ্যান চালিয়ে রাখুন যাতে বাসা বা রাস্তার শব্দ তার রুমে না আসে  । সব ধরনের স্ক্রীন যেমন টিভি, র্স্মাটফোন এবং টেবলেট বেডরুম থেকে সরিয়ে ফেলুন। ইলেকট্রনিক স্ক্রীনের আলো শিশুর মস্তিস্কে সংকেত পাঠায় যে এখন দিনের বেলা এবং সেটা তাকে ঘুমাতে বাধা দেয়।

 

ঘুমানোর সময় নির্ধারন করতে ব্যর্থ হওয়া

বেশির ভাগ মানুষেরই দিনে শেষে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার একটা রুটিন থাকে। শিশুরাও এর ব্যাতিক্রম নয়। প্রতিরাতের ধারবাহিক রুটিন ছাড়া শিশুকে বিছানায় ঘুম পাড়াতে সমস্যা হবে এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে।

প্রতিকার: আরামদায়ক ঘুমানোর নিয়ম চালু করুন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছু কিছু কাজ নিয়ম মেনে করুন, যেমন বাচ্চাকে গোসল দেয়া, কাপড় পাল্টানো, আদর করা, গল্প বলা বা ঘুম পাড়ানি গান শোনান ইত্যাদি। ঘুমের আগে পরপর কয়েক দিন কাজগুলো করলে সে-ও বুঝতে পারবে এখন ঘুমের সময় হয়েছে এবং তাকে ঘুম পাড়ানো সহজ হবে। যে কোন বয়সের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই রুটিন প্রযোজ্য।

আপনার শিশু যদি ১২ মাস বয়েসী হয়, তবে ঘুমানোর সময়কে সহজ করার জন্য তাকে তার প্রিয় নমনীয় খেলনা, চাদর বা কাপড়ের তৈরী প্রাণীর পুতুল গুলো দিতে পারেন এবং রাতের বেলায় জেগে গেলে বাচ্চাকে আরাম দিতে হবে। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, পুতুলের মধ্যে যেন কোন ধাতু সদৃশ শক্ত কিছু বের হয়ে না থাকে এবং সে যে ধরনের খেলা হোক না কেন তাতে যেন রিবন, বোতাম বা অন্যান্য অংশ না থাকে যা শিশুর ক্ষতির কারণ হতে পারে।

 

শিশু কান্না করলে সাথে সাথে কোল তুলে নেয়া

আপনার বাচ্চা যখন রাতের বেলায় কান্না করতে শুরু করে, আপনি হয়ত তাড়াহুড়ো করতে পারেন এবং খাওয়াতে শুরু করেন বা ডাইপার পরিবর্তন করেন বা আদর করতে পারেন। এতে আপনি তাকে কিভাবে নিজে নিজে শান্ত হয়ে ঘুমে ফিরে যেতে হয়, তা শেখা  হতে বঞ্চিত করেন।

প্রতিকার: শিশুর কাছে যাওয়ার অগে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। প্রাপ্তবয়স্কদের মতন, স্বাভাবিক ভাবে শিশুদের রাতের বেলায় কয়েকবার ঘুম ভেঙ্গে যায়। যেহেতু জন্মের আগে থেকে তারা শিখে আসেনা, যে কি করে ঘুমে ফিরে যেতে হয়, সুতরাং তাদের শেখার সুযোগ দিতে হবে। যখন বাচ্চারা কেঁদে উঠে, তখণ তাকে নিজে থেকে শান্ত হওয়ার সময় দিন- উদাহরণ স্বরূপ, হাতের বৃদ্ধা আঙ্গুল বা আঙ্গুলের ঘাঁট চুষতে পারে। এবং এভাবে একদিন সে কোন কিছু ছাড়াই আবার ঘুমিয়ে পরা শিখে যাবে।

 

ফিডার বোতল দিয়ে শিশুকে শুইয়ে দেয়া

ঘুমানোর সময় ফিডার বা বোতল শিশুকে শান্তভাবে ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এতে কিছু ঝুঁকি থাকে। উদাহরণ স্বরূপ,

  • সে সব সময় ঘুমানোর জন্য ফিডার বোতলের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।
  • ফিডার বোতল থেকে পানি পানের অভ্যাস ছাড়ানো বেশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে
  • শুয়ে দুধ খেলে গলায় আটকে যেতে পারে।
  • তার কানের সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশী হতে পারে ।
  • তার দাঁত ক্ষয়ের উচ্চ ঝুঁকি থাকে।

প্রতিকার: খাওয়ানোর সময় বাচ্চাকে ফিডার বোতল দিন, তবে ঘুমানোর সময় না। ঘুমানোর জন্য ধারাবহিক রুটিনের উপর নির্ভর করুন বাচ্চা ধীরে ধীরে এতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। সাধারণত ছয় মাস পর থেকে শিশুরা রাতের বেলায় কিছুটা সময় ধরে ঘুমায়। রাতে বুকের দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানোর অভ্যাস থাকলে সেটা এ সময়ে ছেড়ে দেওয়া ভালো।

 

ঘুমানোর নির্দিষ্ট স্থান না থাকা

বাবা-মায়ের আরেকটি ভুল হলো যেখানেই জায়গা পাওয়া যায় সেখানেই শিশুকে শুইয়ে দেওয়া। এটি শিশুর জন্য ভালো কোন বাপার নয়। সবসময় একটি নির্দিষ্ট জায়গা রাখতে হবে।

প্রতিকার: কোথায় ঘুমাতে হবে তার দৃঢ় নির্দেশনা প্রস্তুত করুন।প্রতিদিন একই বিছানায় বা রুমে শোয়ানোর অভ্যাস করুন। যদি আপনি শিশুকে আলাদা বিছানায় রাখতে চান, বাচ্চাকে বুঝিয়ে বলুন কেন তাকে তার বিছানায় সারা রাত থাকতে হবে। উদাহরণ হিসাবে বলতে পারেন তাহলে সবাই ভালভাবে ঘুমাতে পারবে।

 

ঘুমানোর জন্য বাচ্চাকে জোর করা বকাঝকা করা

যদি আপনি নিজের বাচ্চাকে ঘুম পাড়াতে ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দেন (যখন বাচ্চা আরও গান বা গল্প সোনার আবদার করতে থাকে), সেক্ষেত্রে আপনি একা নন। বাচ্চারা যখন বাড়তে থাকে, প্রায়শ তারা ঘুমোতে যাওয়ার আগে চেষ্টা করে কতক্ষণ না ঘুমিয়ে থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে বাচ্চাকে বকা দিয়ে বা জোর করে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলে হিতে বিপরীতে হতে পারে।

প্রতিকার: শান্ত থাকুন এবং কৌশলী হোন।শিশুকে ঘুমানোর জন্য জোর করা উচিৎ নয়। শিশুর জন্য ঘুমের পরিবেশ তৈরি করুন, পাশে থেকে তার বুকে আলতো করে চাপড় দিতে থাকুন, সে এমনিতেই ঘুমিয়ে পড়বে। বাচ্চার প্রয়োজন বুঝে তার ঘুমানোর রুটিন ঠিক করুন এবং এ রুটিন তৈরিতে তাকে মতামত দেয়ার সুযোগ দিন। ঘুমাতে যাওয়ার আগেই তার প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে নিন যাতে সে বিছানা থেকে ওঠার কোন অজু্হাত দিতে না পারে । যেমন, শুতে যাওয়ার আগেই বাচ্চাকে পানি পান করিয়ে নিন বা বিছানায় তার নমনীয় খেলনা বা কাপড়ের তৈরী পুতুল গুলো সঙ্গে দিন।

ছোটবেলায় আমরা সবাই চাঁদ মামার ঘুমপাড়ানি গান শুনেছি। তেমন ঘুমপাড়ানি গান আপনার শিশুকে রাতে ঘুমানোর আগে শুনান। ঘুমপাড়ানোর সময় তার গালে চুমু দিয়ে গুডনাইট বলুন। বুকে ও পিঠে আলতো চাপড় দিন। এই সবকিছুই তার কাছে ঘুমের সিগন্যালের মত মনে হবে এবং এতে তার মাথায় একটা রুটিন ডুকে যাবে। তখন সে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পরবে।

আরেকটি পদ্ধতি আপনি অবলম্বন করতে পারেন যাতে বাচ্চা তার মতামত দিতে পারে। যেমন- আপনি তাকে বলতে পারেন যে ঘুমানোর আগে আপনি তাকে শুধু একটি গল্প বলবেন বা গান শোনাবেন এবং তাকে বলতে বলবেন কোন গল্পটা বা গান সে শুনতে চায়। এই পদ্ধতিতে গল্প বা গান শেষে সাধারণত বাচ্চা আর আবদার করেনা।

সবশেষে আবারো বলবো, আপনার শিশুর ঘুমের যথাসম্ভব একটি সময়সূচি অবলম্বন করুন। এধরনের রুটিন আপনার শিশুকে রাতে ভাল ঘুম যেতে সাহায্য করে এবং সে সতেজ অনুভূতি নিয়ে সকালে জেগে উঠে। ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই হচ্ছে লক্ষ্য। যদি আপনি আপনার শিশুকে একদিন ৩টায় ঘুম পাড়ান এবং পরের দিন ১ টায় ঘুম পাড়ান, তাহলে তার একটি নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়তে সমস্যা হবে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment