শিশুর খাবারে এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিডের প্রয়োজনীয়তা, পরিমাণ, উৎস এবং অন্যান্য

শিশুর সুস্বাস্থ্য আর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য ফ্যাটি এসিডের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার শিশুর জন্য কোন ধরনের এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড প্রয়োজন এবং কোন ধরনের খাবার থেকে সেটা সঠিক পরিমাণে পাওয়া যাবে জানতে এই আর্টিকেলটি পড়ুন। এছাড়া এই আর্টিকেলে আরো জানতে পারবেন কীভাবে খুব অল্প অথবা খুব বেশি পরিমাণে ফ্যাটি এসিড গ্রহণ না করে বরং সঠিক পরিমাণে ফ্যাটি এসিড গ্রহণ করা যাবে।

এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড ঠিক কি কারণে গুরুত্বপূর্ণ?

ফ্যাটি এসিড এমন এক ধরনের ফ্যাট যেটা শিশুর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমেই গ্রহণ করা অতীব জরুরী, কেননা শরীর এই ধরনের ফ্যাট উৎপন্ন করে না। এই ফ্যাটি এসিডের অনেক ধরনের উপকারিতা রয়েছে তার মধ্যে কোষ গঠন, নার্ভাস সিস্টেম পরিচালনা, হৃদযন্ত্র শক্তিশালী করন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শরীরের পুষ্টি গ্রহণে সহযোগিতা অন্যতম। এছাড়া মস্তিষ্কের কাজ এবং দৃষ্টি শক্তির উপর রয়েছে এই এসিডের উপকারী প্রভাব।

এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিডের মধ্যে রয়েছে ওমেগা-৬(linoleic acid) এবং ওমেগা-৩(linoleic acid)। দুই ধরনের এসিডই এমন এক ধরনের ফ্যাট (polyunsaturated acid) যেটা কোলেস্টরোল ও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া হৃদযন্ত্রকে সজীব স্বাস্থ্যকর রাখতে এই এসিডের জোরালো ভূমিকা রয়েছে।

বেশিরভাগ আমেরিকানরা ওমেগা-৩ ফ্যাট এর চাইতে বেশি পরিমাণে ওমেগা-৬ গ্রহণ করে। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে এই দুই ধরনের ফ্যাটি এসিডের অসামঞ্জস্যতা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শরীরের প্রদাহের উপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। এর ফলে  হৃদরোগ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

আবার আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশন সহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই ধরনের এসিডের সামঞ্জস্যতা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারা খাবারে বেশি পরিমাণে ওমেগা-৩ গ্রহণ করার উপদেশ দেন।

ওমেগা-৩ এর ধরন

মূলত ওমেগা-৩ তিন ধরনের হয়ে থাকেঃ alpha-linolenic acid (ALA), docosahexaenoic acid(DHA), এবং eicosapentaenoic acid (EPA)।

উদ্ভিদ ভিত্তিক alpha-linolenic acid (ALA) পাওয়া যায় flaxseeds, walnuts, kale এবং সয়াবিন তেলের মধ্যে। যখন খাবারের মাধ্যমে এই ALA গ্রহণ করা হয়, তখন শরীর ALA কে কিছুটা DHA এবং EPA তে পরিবর্তন করে নেয়। এছাড়া এই ধরনের এসিড এনিমেল ফ্যাটের মধ্যেও কিছু পরিমাণে পাওয়া যায়।

সমুদ্র ভিত্তিক DHA এবং EPA পাওয়া যায় বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ যেমন স্যামন, হ্যালিবাট, টুনা, সারডিন্যাস, মাকেরেল, হেরিং নামক মাছের মধ্যে।

শরীরের সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ওমেগা-৩ এর বেশ কয়েক ধরনের ভূমিকা রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, মস্তিষ্ক এবং দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে DHA এর বেশ জোরাল ভূমিকা রয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই নবজাতক শিশুদের জন্য ফরমুলা দুধের মধ্যে DHA দেয়া হয়, এছাড়াও গর্ভবতী এবং বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদেরকে তাদের খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে অথবা সাপলিমেন্টের মাধ্যমে DHA গ্রহণ করার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে সবজী এবং মাছ থেকে প্রাপ্ত ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড শরীরের জন্য খুবই উপকারী। তবে DHA এবং EPA এর সাথে ALA ফ্যাটি এসিডের সঠিক উপকারিতা সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত হতে পারেন নি। তবে যেহেতু উদ্ভিদ ভিত্তিক ওমেগা-৩ কিঞ্চিৎ ভাবে DHA এবং EPA তে পরিবর্তিত হয়ে যায় তাই স্যালমনের মত ফ্যাটি ফিশ খাওয়া খুবই জরুরী। শরীরের স্বাস্থ্যের জন্য সর্বোচ্চ উপকার পেতে হলে বিশেষজ্ঞদের মতে উদ্ভিদ ভিত্তিক এবং সামুদ্রিক দুই ধরনের ওমেগা-৩ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আপনার শিশুর জন্য ঠিক কতটুকু ওমেগা-৬ এবং ওমেগা-৩ প্রয়োজন?

১ থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুর জন্য

  • প্রতিদিন ৭ গ্রাম (৭০০০ মিলিগ্রাম) ওমেগা-৬ প্রয়োজন
  • প্রতিদিন ০.৭ গ্রাম (৭০০ মিলিগ্রাম) ওমেগা-৩ প্রয়োজন

৪ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুর জন্য

  • প্রতিদিন ১০ গ্রাম (১০০০০ মিলিগ্রাম) ওমেগা-৬ প্রয়োজন
  • প্রতিদিন ০.৯ গ্রাম (৯০০ মিলিগ্রাম) ওমেগা-৩ প্রয়োজন

সাধারণত স্বাস্থ্যকর খাবারের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৬ পাওয়া যায় এবং এজন্য আপনার শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-৩ পাচ্ছে কি না, তার প্রতি বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। (প্রস্তুতকৃত অনেক খাবারের মধ্যেই ওমেগা-৬ পাওয়া যায়, যেমন সয়াবিন তেল)

এটা মনে রাখতে হবে, আপনার শিশুকে প্রতিদিন হিসেব করে ফ্যাটি এসিড যুক্ত খাবার খাওয়াতে হবে না বরং প্রতি সপ্তাহের সমপরিমাণে সে ফ্যাটি এসিড গ্রহণ করছে কি না সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। অর্থাৎ এক সপ্তাহে শিশুর ঠিক যতটুকু ফ্যাটি এসিড গ্রহণ করা প্রয়োজন, সেটা সে প্রতি সপ্তাহে গ্রহণ করছে কি না সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিডের সবচাইতে সেরা উৎস

  • ১ টেবিল চামচ flaxseed oil (তিসি বীজ তেল) এ ২৩৯৬ মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ আছে। (রান্না করার জন্য নয় বরং খাবার প্রস্তুত করার জন্য এটা ব্যাবহার করা যেতে পারে)
  • ১ টেবিল চামচ গুড়ো flax seed (তিসি বীজ) এ ১৫৯৭ মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ আছে।
  • ১/৪ কাপ English Walnuts এ ২২৯৩ গ্রাম ওমেগা-৩ আছে।
  • এক টেবিল চামচ fortified peanut butter এ ৪৯৫০ মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ আছে।
  • এক টেবিল চামচ walnut oil এ ৪৬৬ মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ আছে।
  • এক টেবিল চামচ wheat germ oil এ ৩১০ মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ আছে।
  • এক টেবিল চামচ সয়াবিন তেলে ৩০০ গ্রাম ওমেগা-৩ আছে।
  • এক টেবিল চামচ canola oil এ ৪১১ মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ আছে।
  • একটি fortified ডিমে ১০০ মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ আছে।
  • ৪ আউন্স পরিমাণ টফুতে ৩০০ মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ আছে।
  • ১ আউন্স পরিমাণ স্যালমনে ৪২৫ মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ আছে।
  • ১/২ কাপ সয়াবিন (শুকনো এবং রান্না করা) এ ৫০০ মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ আছে।
  • ১/২ কাপ রান্না করা বাঁধাকপিতে (cooked kale) ১০০ মিলিগ্রাম ওমেগা-৩ আছে।

উদ্ভিজ্জ তেলে ওমেগা ৩ চর্বি আছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো হলো তিসির তেল ও ক্যানোলা তেল। যা আমাদের দেশে ব্যবহৃত হয় না। তবে সয়াবিন তেলেও আছে কিছুটা। তবে এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার করতে হবে।

সামুদ্রিক মাছের তেল ওমেগা ৩-এর চমৎকার উৎস। দেশীয় মাছের মধ্যে ইলিশ, রুপচাঁদা ইত্যাদি মাছের তেলে এর পরিমাণ বেশি।

বিভিন্ন ধরনের বাদামে বেশ ওমেগা ৩ আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আছে ওয়ালনাট বা আখরোট, পেস্তা ইত্যাদি বাদামে। প্রতিদিন একটু বাদাম ওমেগা ৩ জোগাবে।

মাছের ডিমে ক্ষতিকর চর্বির সঙ্গে ওমেগা ৩ উপকারী চর্বিও আছে বেশ ভালো পরিমাণে। ১ চামচ মাছের ডিমে প্রায় ৩৪২ মিলিগ্রাম পরিমাণ ওমেগা ৩ পাওয়া যায়।কিছু বীজজাতীয় খাবারেও ওমেগা ৩ আছে।

যে সকল খাবার ওমেগা-৩ দিয়ে ফরটিফাইড করা সেই ধরনের খাবারের দিকে লক্ষ্য রাখুন, যেমন পিনাট বাটার, দুধ, দই, কমলার জুস, মারগারিন এবং ডিম। তবে বিভিন্ন কোম্পানি ভেদে ওমেগা-৩ এর পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে, তাই কেনার পূর্বে লেবেল দেখে নিন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, ফরটিফাইড ডিমের মধ্যে আপনি কোম্পানি ভেদে ১০০ থেকে ২০০ মিলিগ্রাম অথবা তার থেকে বেশি ওমেগা-৩ পেতে পারেন।

এছাড়া আরেকটি ব্যাপার মনে রাখতে হবে, শিশুর বয়স এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে শিশু কম অথবা বেশি পরিমাণে ফ্যাটি এসিড গ্রহণ করে নিতে পারে। তাই খাবার গ্রহণের সময় খাবারের গুণগত মান এবং ভিটামিনের পরিমাণ হিসেব করে নিন।

সাধারণত ভেজিটেবল তেল থেকে আমরা প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৬ পেয়ে থাকি। তাই যে সকল খাবারে ওমেগা-৩ আছে সেগুলো নির্ধারণ করে নিন এবং শিশু যাতে সেই খাবারগুলোও খায় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, এক টেবিল চামচ Canola oil এর মধ্যে যে পরিমাণে ওমেগা-৩ পাওয়া যায়, সেটা শিশুর প্রতিদিনের ওমেগা-৩ চাহিদার অর্ধেক পূরণ করে দিতে সক্ষম।

(আরেকটি ব্যাপার মনে রাখবেন Nuts এবং Seed ছোট শিশুদের জন্য খুব একটা নিরাপদ নয়, কেননা এগুলো শিশুর শ্বাসনালীতে আটকে যেতে পারে )

আপনার শিশু প্রস্তুতকৃত খাবার যেগুলোতে safflower, sunflower, corn এবং সয়াবিন তেল আছে সেগুলো থেকেই প্রয়োজনীয় ওমেগা-৬ পেয়ে যেতে পারে।

  • এক টেবিল চামচ safflower oil এ ৩৩৬০ মিলিগ্রাম ওমেগা-৬ আছে
  • এক টেবিল চামচ sunflower oil এ ২৯৬৬ মিলিগ্রাম ওমেগা-৬ আছে
  • এক টেবিল চামচ corn oil এ ২৪০০ মিলিগ্রাম ওমেগা-৬ আছে
  • এক টেবিল চামচ সয়াবিন তেলে ২৩০০ মিলিগ্রাম ওমেগা-৬ আছে

Trans fat কি?

এটা হল “partially hydrogenated oil” এবং এগুলো ফ্রাই করা খাবারে এবং বেকড করা খাবারে বেশি পাওয়া যায় যেমন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, কুকি, প্যাস্ট্রি, পিজ্জা ইত্যাদি। এছাড়াও বেশ কিছু দুগ্ধ জাতীয় পণ্য এবং মাংসে এই ধরণের ফ্যাট পাওয়া যায়।

Trans fat সাধারণত খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) বাড়িয়ে দেয় এবং ভালো কোলেস্টেরল (HDL) কমিয়ে দেয়। এছাড়া এই ফ্যাট হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিকের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

এছাড়া saturated fats প্রাণী থেকে প্রাপ্ত ফ্যাটে পাওয়া যায় অর্থাৎ মাংস এবং দুগ্ধ জাতীয় খাবার। যেমন, চর্বিযুক্ত মাংস, lard, ক্রিম, বাটার এবং চিজ এবং যেগুলো সাধারণত রুমের তাপমাত্রায় শক্ত হয়ে যায়। এছাড়াও এটা পাম অয়েল, palm kernel oil এবং নারিকেলের তেলে পাওয়া যায়।

সবার জন্য শুভকামনা।      

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.