প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা | গর্ভকালীন জটিলতা

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা কি?

প্লাসেন্টা জরায়ুর ভেতরে গঠিত হয় এবং আম্বলিকাল কর্ডের মাধ্যমে গর্ভের শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্লাসেন্টা জরায়ুর উপরের দিকে অবস্থান করে এবং প্রসব পর্যন্ত সেখানেই থাকে। প্রসবের শেষ পর্যায়ে এটি জরায়ুর দেয়াল থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং বাচ্চার পর পরই বেরিয়ে আসে যা আফটার বার্থ (after birth) নামেও পরিচিত।

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা এমন একটি কন্ডিশন যাতে প্লাসেন্টা জরায়ুর দেয়ালের অনেক গভীরে সংযুক্ত থাকে। প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা থাকলে তা প্রসবের সময় সহজে জরায়ু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়না এবং এতে অনেক রক্তক্ষরণ হতে পারে।

জরায়ুর দেয়ালের কতটা গভীরে বিস্তৃত তার উপর ভিত্তি করে এই কন্ডিশনকে তিন ধরনের নাম করন করা হয়েেছ-

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা- এ ক্ষেত্রে প্লাসেন্টা জরায়ুর দেয়ালের গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে কিন্তু জরায়ুর পেশী ভেদ করে যায়না।

প্লাসেন্টা ইনক্রিটা- এ ক্ষেত্রে প্লাসেন্টা জরায়ুর পেশী ভেদ করে যায়।

প্লাসেন্টা পারক্রিটা- এ ক্ষেত্রে প্লাসেন্টা জরায়ুর পেশী ভেদ করে বেড়িয়ে যেতে পারে এবং অন্য অঙ্গ যেমন ব্লাডার এর সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে।

তবে প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা সবচাইতে কমন এবং আনুমানিক প্রতি ২৫০০ মায়ের মধ্যে ১ জনের এ উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সবচাইতে উদ্বেগের বিষয় হোল এর হার দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং গবেষণায় সি-সেকশনের বৃদ্ধির হারকেই এর প্রধান কারণ বলা হচ্ছে।

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা কেন হয়?

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটার কোন নির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি কিন্তু এটি প্লাসেন্টা প্রিভিয়া বা পূর্ববর্তী সিজারিয়ান ডেলিভারির সাথে সম্পর্কিত মনে করা হয়। জরায়ুতে কোন অস্বাভাবিকতা থাকলে বা জরায়ুতে কোন ধরনের অপারেশন এর ইতিহাস থাকলে প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। জরায়ুতে তে কোন অপারেশন থাকলে প্লাসেন্টা জরায়ুর দেয়ালের গভীরে বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পায়। নিম্নলিখিত কারণে প্লাসেন্টা অ্যাকরিটার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে-

  • সি-সেকশন করা থাকলে বা জরায়ুতে কোন অপারেশন থাকলে- জরায়ুতে যত বেশী অপারেশন থাকবে প্লাসেন্টা অ্যাকরিটার ঝুঁকি তত বেশী থাকবে। এ কারনেই কোন মেডিক্যাল কন্ডিশন ছাড়া সি-সেকশন না করায় ভালো।
  • প্লাসেন্টার অবস্থান এর উপর- প্লাসেন্টা যদি জরায়ুমুখ আংশিক বা পুরপুরি ঢেকে রাখে বা তা জদি জরায়ুর নিচের দিকে অবস্থান করে তবে প্লাসেন্টা অ্যাকরিটার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • গর্ভধারণের সংখ্যার উপর।
  • ধূমপানের অভ্যাস থাকলে।
  • ৩৫ বা তার বেশী বয়সে গর্ভধারণ করলে।

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটার লক্ষন-

বেশীরভাগ ক্ষেত্রে প্লাসেন্টা অ্যাকরিটার কোন লক্ষন বা উপসর্গ দেখা দেয়না। আপনি হয়ত সন্তান প্রসবের আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু জানতেই পারবেন না। মাঝে মাঝে আলট্রাসাউন্ডে এর লক্ষন ধরা দিতে পারে। তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে যোনিপথে রক্তক্ষরণও এর লক্ষন হতে পারে। তাই তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে রক্তক্ষরণ হলে অতিসত্বর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

আপনার চিকিৎসক যদি প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা সন্দেহ করেন তবে এর অবস্থান এবং গভীরতা জানার জন্য আপনাকে আলট্রাসাউন্ড ও MRI  করার পরামর্শ দেয়া হবে। পরীক্ষাগুলো ব্যাথাহীন এবং গর্ভের শিশুর জন্য নিরাপদ।

রক্তে আলফা-ফেটোপ্রটিনের পরিমাণ দেখার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে। গর্ভস্থ শিশু এ প্রোটিন উৎপাদন করে এবং প্লাসেন্টা অ্যাকরিটার ক্ষেত্রে সাধারণত এর পরিমাণ বেড়ে যায়।

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা শিশু এবং মায়ের উপর কি প্রভাব ফেলতে পারে?

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটার ক্ষেত্রে বেশীরভাগ সময় নির্ধারিত সময়ের পূর্বে বাচ্চা প্রসবের প্রয়োজন হয়ে দাড়ায়। এছারাও আরও বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা হলে প্লাসেন্টা সন্তান প্রসবের পর সহজে জরায়ু থেকে আলাদা হয়না। এটি আলাদা করার সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে যাতে মৃত্যু ঝুঁকিও থাকে। এ সময় জরায়ু বা শরীরের অন্য অঙ্গের ক্ষতি হওয়ার ও সম্ভাবনা থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে  পুরো জরায়ু কেটে ফেলার প্রয়োজন পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে পরবর্তীতে আর কোন গর্ভধারণ করা সম্ভব হয়না।

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটার চিকিৎসা

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা প্রতিরোধ বা নিরাময়ের কোন উপায় নেই। প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা ধরা পড়লে আপনার গর্ভাবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। আপনার সি-সেকশনের সময় ঠিক করা হবে এবং জরায়ু আলাদা করে ফেলার প্রস্তুতি ও সেরে রাখা হবে। এর ফলে মারাত্মক রক্তক্ষরণ এর হাত থেকে আপনাকে রক্ষা করা সম্ভব  হবে।

অল্প কিছু ক্ষেত্রে জরায়ু না কেটে রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে। তাই আপনার যদি পরবর্তীতে আরও গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকে তাহলে সে ব্যাপারে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন।

প্লাসেন্টা অ্যাকরিটার ক্ষেত্রে সময়ের আগেই প্রসব যন্ত্রণা শুরু হতে পারে। তাই আগে ধরা পড়লে সাধারণত ৩৪ সপ্তাহের দিকে সি-সেকশনের পরামর্শ দেয়া হবে যাতে কোন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আগেই প্রসব করানো যায়।

যদি সন্তান প্রসবের আগে প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা ধরা না পড়ে। তবে সন্তান প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রক্ত দেয়ার পাশাপাশি জরায়ু পুরোপুরি কেটে ফেলা ছাড়া রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব নাও হতে পারে।

আমাদের দেশের অনেক মায়েরাই গর্ভাবস্থার এসব জটিলতা সম্পর্কে জানেন না। তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। একটুখানি সচেতনতায় অনেকগুলো জীবন রক্ষা পেতে পারে।

সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। সবার জন্য শুভ কামনা।

 

Related posts

One Thought to “প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা | গর্ভকালীন জটিলতা”

  1. ishrat jahan

    Thank you so much….

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.