প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন বা প্লাসেন্টা ছিঁড়ে যাওয়া

প্লাসেন্টা (গর্ভফুল) হলো মাতৃগর্ভে শিশুর সুরক্ষা বা সাপোর্ট সিস্টেম। প্লাসেন্টা কোনো কারনে ঠিকভাবে কাজ না করলে শিশুর  স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির সম্ভাবনা বেড়ে যায়।  প্লাসেন্টা  গর্ভের সন্তানকে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর উপাদান সরবরাহ করে এবং শিশুর রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। এটি জরায়ুর দেয়াল সংলগ্ন একটি চ্যাপ্টা ও কিছুটা গোলাকৃতির অঙ্গ যা  শিশুর নাড়ী (আম্বিলিক্যাল কর্ড) এর মাধ্যমে ভ্রুনের সাথে সংযুক্ত থাকে।

প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন বলতে কি বোঝায় ?    

প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন একটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা যেটি সম্পর্কে গর্ভবতী মায়েদের জেনে রাখা ভালো।  গর্ভকালীন বা সন্তান প্রসবের পূর্বে অনেক সময় প্লাসেন্টা পুরোপুরি বা আংশিকভাবে জরায়ুর দেয়াল থেকে আলাদা হয়ে যায় বা ছিঁড়ে যেতে পারে।  এ অবস্থার সৃষ্টি হলে শিশুর শরীরে অক্সিজেন ও পুষ্টির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। এর কারণে অতিরিক্ত রক্তপাত ঘটতে পারে যা মা ও শিশু দুজনের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশনের কারণে বাচ্চার বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি এর মাত্রা বেশী হয় তবে প্রি-ম্যাচিউর (অপরিনত)  সন্তান প্রসব এমনকি গর্ভে সন্তানের মৃত্যু ও ঘটতে পারে।

প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন

প্রতি ১৫০ জন গর্ভবতী মহিলার মধ্যে একজনের এ সমস্যা হতে পারে।  যদিও তৃতীয় ট্রাইমেস্টার বা গর্ভাবস্থার শেষের দিকে এ সমস্যাটি ঘটার আশঙ্কা বেশী থাকে। তবে ২০ সপ্তাহের পরে যেকোনো সময় তা হতে পারে।

কাদের প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন এর ঝুঁকি বেশী ?

প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন এর কোন নির্দিষ্ট কারণ এখনো নির্ণয় করা যায়নি। কিন্তু গবেষণায় কিছু কিছু মায়দের ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা বেশী দেখা যায়-

 প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশনের লক্ষন

প্রতি ১০টি  অ্যাবরাপশনের ৮ টির ক্ষেত্রেই যোনিপথে রক্তক্ষরণ হতে পারে। রক্তক্ষরণের পরিমাণ অল্পও হতে পারে বা প্রকট আকারেও দেখা দিতে পারে। রক্ত কখনো উজ্জ্বল লাল আবার কখনো গাঁড় বর্ণের হতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে যোনিপথে রক্তক্ষরণ নাও দেখা যেতে পারে। সেসব ক্ষেত্রে রক্ত প্লাসেন্টার পেছনে জরায়ুতেই রয়ে যায়। এমনটা হলে আপনি কোমরের পেছনে এবং পেটে ব্যাথা অনুভব করবেন। ১০ টির মধ্যে ৭ টির ক্ষেত্রেই জরায়ু স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে  এবং ব্যাথা অনুভূত হয়  ।

প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন

যেহেতু প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন আপনার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় তাই নিম্নলিখিত কোন উপসর্গ দেখা দিলেই ভালভাবে চেক-আপের জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন-

  • যোনিপথে স্পটিং বা রক্তক্ষরণ দেখা দিলে।
  • যদি আপনার পানি ভেঙ্গে যায় এবং তাতে রক্তের ছাপ থাকে।
  • পেটে ব্যাথা হওয়া বা স্পর্শকাতর হয়ে ওঠা।
  • ব্যাক পেইন
  • জরায়ুতে ঘন ঘন এবং একটানা সংকোচন অনুভব করা।
  • বাচ্চার নড়াচড়া লক্ষনীয়ভাবে  কমে গেলে।

প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশনের চিকিৎসা কি?

প্রথমেই ডাক্তাররা প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করবেন। গর্ভাবস্থায় আরও অন্যান্য কারনেও রক্তক্ষরণ হতে পারে। ডাক্তাররা সেগুলো সব পরীক্ষা করে দেখবেন। আলট্রাসাউন্ড করার ও প্রয়োজন হতে পারে। যদিও এতে ছোটখাটো অ্যাবরাপশন ধরা পরেনা কিন্তু এতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্লাসেন্টা প্রিভিয়ার কারণে রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিনা।

ডাক্তারদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে আপনি গর্ভধারণের কোন পর্যায়ে আছেন, রক্তক্ষরণের মাত্রা এবং আপনার গর্ভের শিশুর অবস্থার উপর।

প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশনের মাত্রা যদি কম হয় বা প্লাসেন্টা যদি সামান্য ছিড়ে যায় তবে ডাক্তার আপনাকে পর্যবেক্ষণে রাখবেন। যদি মায়ের ও শিশুর শারীরিক অবস্থা ভালো থাকে তাহলে তারা চেষ্টা করবেন যত বেশীদিন সম্ভব শিশুকে গর্ভে রাখার। আপনাকে হয়তো হাসপাতালে থাকার পরামর্শ দেয়া হবে বা যদি অবস্থার উন্নতি হয় এবং রক্তক্ষরণ বন্ধ হয় তবে আপনাকে বাসায় যাওয়ার অনুমতি দেয়া হতে পারে। কিন্তু কোন সমস্যা দেখা দেয়ার সাথে সাথে অতি দ্রুত আবার হাসপাতালে আসতে হবে।

যদি গর্ভাবস্থার শেষদিকে মৃদু প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন দেখা দেয় তবে ডাক্তার আপনাকে প্রসব প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বা সি-সেকশনের পরামর্শ দিবেন। যদি রক্তক্ষরণের মাত্রা বাড়তে থাকে এবং বাচ্চার কোন অসুবিধা দেখা যায় তবে তৎক্ষণাৎ প্রসবের পরামর্শ দেয়া হবে।

যদি প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশনের মাত্রা বেশী হয় বা প্লাসেন্টা পুরোপুরি ছিরে যায় তাহলে সাধারণত সাথে সাথেই বাচ্চা প্রসব করানো হয়। এমনকি বাচ্চা যদি প্রি-ম্যাচিউর ও থাকে। যদি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয় তবে আপনাকে অক্সিজেন এবং রক্ত দেয়া হতে পারে।

 

প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন প্রতিরোধের উপায় কি?

প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন সরাসরি প্রতিরোধের কোন উপায় নেই। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করে এবং নিয়মের মধ্যে থেকে আপনি এর ঝুঁকি কমাতে পারেন। যেমন- ধূমপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহন থেকে বিরত থাকুন। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন এবং তা নিয়ন্ত্রনে রাখার চেষ্টা করুন।

গর্ভাবস্থায় এমন সব কাজকর্ম করা থেকে বিরত থাকুন যাতে শরীরে আঘাত লাগার সম্ভাবনা থাকে। যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে এবং আগে প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন হয়েছে তার গর্ভধারণের পরিকল্পনা করলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করবেন এবং নিয়মিত চেক আপে থাকবেন।

সঠিক জীবন যাপন পদ্ধতি এবং ডায়েট মেনটেইন করে প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশনের ঝুঁকি কমিয়ে আনা যায়। যেমন নিয়মিত ফলিক এসিড গ্রহন করা, নিয়মিত ঘুম ইত্যাদি।

আমাদের দেশের অনেক মায়েরাই গর্ভাবস্থার এসব জটিলতা সম্পর্কে জানেন না। তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। একটুখানি সচেতনতায় অনেকগুলো জীবন রক্ষা পেতে পারে।

সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। সবার জন্য শুভ কামনা।

Related posts

Leave a Comment