প্রি-টার্ম লেবার ও প্রি-টার্ম বার্থ । সময়ের আগেই প্রসব

প্রি-টার্ম লেবার কি?

স্বাভাবিক গর্ভাবস্থা সাধারণত ৪০ সপ্তাহ স্থায়ী হয়। এর সময় শুরু হয় শেষ মাসিকের প্রথম দিন হতে। লেবার বা প্রসব যন্ত্রণা গর্ভাবস্থার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যাতে জরায়ুর সঙ্কোচনের ফলে Cervix বা জারায়ু মুখ পাতলা হয়ে যায় এবং খুলে যায় যার ফলে বাচ্চা বেড়িয়ে আসতে পারে। এ প্রক্রিয়া টি স্বাভাবিক অবস্থায় গর্ভাবস্থার ৩৭-৪২ সপ্তাহের মধ্যে হয়।যদি কোন কারণে ৩৭ সপ্তাহের আগেই গর্ভবতী মায়ের নিয়মিত জরায়ু সংকোচন হতে থাকে এবং তার ফলে জরায়ু মুখ খুলে যায় তবে তাকে প্রি-টার্ম লেবার বলে। এটি প্রি-ম্যাচিউর লেবার নামেও পরিচিত।

প্রি-টার্ম লেবার এর ফলে প্রি-টার্ম বার্থ হতে পারে। যদি গর্ভাবস্থার ২০-৩৭ সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা প্রসব হয় তবে তাকে প্রি-টার্ম বার্থ বলে এবং সেই বাচ্চাকে প্রি-ম্যাচিউর বলা হয়।

প্রি-টার্ম লেবার মানেই এটা নয় যে বাচ্চা প্রি-ম্যাচিউর হবে। প্রায় অর্ধেক মায়েদের ক্ষেত্রেই যাদের প্রি-টার্ম লেবার হয় তাদের বাচ্চা ৩৭ সপ্তাহ বা তার পরে ভূমিষ্ঠ হয়।

প্রায় চার ভাগের এক ভাগ প্রি-টার্ম বার্থ পরিকল্পিত। গর্ভাবস্থায় মায়ের বা গর্ভের শিশুর কোন জটিলতা থাকলে ( মারাত্মক প্রি-এক্লাম্পশিয়া বা গর্ভের শিশুর ঠিক ভাবে বেড়ে না ওঠা ইত্যাদি)  ডাক্তাররা সময়ের আগেই কৃত্রিমভাবে প্রসব যন্ত্রণা শুরুর বা সিজারিয়ানের মাধ্যমে ৩৭ সপ্তাহের আগের বাচ্চা প্রসবের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

প্রি-টার্ম লেবার এর লক্ষন গুলো কি কি?

নিচের লক্ষন গুলো দেখা দিলে দেরী না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে-

  • যোনিপথে নির্গত স্রাবের পরিমান বেড়ে গেলে বা স্রাব পানির মত, শ্লেষ্মা জাতীয় বা রক্ত মিশ্রিত থাকলে।
  • যোনিপথে রক্ত বা স্পটিং দেখা গেলে।
  • প্রতি ১০ মিনিট অন্তর বা প্রতি ঘণ্টায় চারবার বা তার বেশি জরায়ুর সঙ্কোচনের ফলে তলপেটে ব্যথা অনুভূত হলে, পাশাপাশি কোমরে ব্যথা বা খিল ধরা অনুভুতি হলে। জরায়ু সঙ্কোচনের ফলে ব্যাথা অনুভব না হলেও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
  • পেলভিক এরিয়াতে বেশী চাপ অনুভব করলে। (যদি মনে হয় বাচ্চা নিচের দিকে চাপ দিচ্ছে)
  • অনবরত চাপা বা কিছুক্ষন পর পর পিঠে ব্যাথা করলে।
  • যদি মনে হয় আপনার পানি ভেঙ্গে গেছে এবং যোনিপথে অতিরিক্ত তরল নির্গত হলে।
  • ডায়রিয়ার কারণে বা ডায়রিয়া ছাড়াই পেটে খিলধরা অনুভুতি থাকলে।

এই লক্ষনগুলো অনেক সময় বিভ্রান্তিকর কারণ কিছু কিছু লক্ষন গর্ভাবস্থায় হওয়াটা স্বাভাবিক যেমন- পেলভিকে চাপ বা লো ব্যাক্ পেইন। এছাড়াও অনিয়মিত সংকোচন ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশনের কারনেও হতে পারে। তাই আপনার যদি মনে সামান্যতম সন্দেহ হয় যে সবকিছু ঠিক নেয় তাহলে দেরী না করে দ্রুত ডাক্তারের সাথে দেখা করুন। ফলস লেবার কিনা সেটা নিয়ে ভাববেন না। নিজের মনে অনেক কিছু ভাবার চাইতে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিশ্চিত হওয়াটা সবসময়ই উপকারী।

প্রি-টার্ম লেবার কেন হয়?

প্রি-টার্ম লেবার কেন হয় তা নির্দিষ্ট ভাবে বলা যায়না। অনেক মায়েদের ক্ষেত্রেই কোন ঝুঁকিপূর্ণ কারণ ছাড়ায় প্রি-টার্ম লেবার হতে দেখা গেছে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে কিছু কিছু বিষয় প্রি-টার্ম লেবারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়-

  • এর আগে প্রি-টার্ম ডেলিভারি হয়ে থাকলে। (গর্ভাবস্থার যত আগে প্রি-টার্ম ডেলিভারি হবে এবং যত বেশিবার হবে তত বেশী ঝুঁকি থাকবে)
  • গর্ভে যদি যমজ বা এর বেশী সন্তান থাকে বা এমনিওটিক ফ্লুইড এর পরিমান বেশী থাকলে।
  • বয়স ১৭ বছরের নীচে বা ৩৫ এর উপরে হলে।
  • আফ্রিকান আমেরিকানদের মধ্যে এর ঝুঁকি বেশী থাকে।
  • গর্ভাবস্থার পূর্বে ওজন কম থাকলে  এবং গর্ভকালীন সময় ওজন যথেষ্ট পরিমানে না বাড়লে।
  • প্রথম বা দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে যোনিপথে রক্ত গেলে।
  • গর্ভাবস্থার শুরুতে এনেমিয়া থাকলে।
  • ধূমপান, মদ্যপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্যে আসক্তি থাকলে।
  • একবার সন্তান প্রসবের ১৮ মাসের মধ্যে আবার প্রসব করলে বা সন্তান প্রসবের ৬ মাসের মধ্যে আবার গর্ভধারণ করলে।
  • প্রি-ন্যাটাল কেয়ার বা গর্ভকালীন পরিচর্যা না হলে।

যৌনাঙ্গের ইনফেকশনের কারণে প্রি-টার্ম লেবার হতে পারে। ইনফেকশন সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো এমনিওটিক থলীর মেমব্রেনগুলোকে পাতলা করে ফেলে ফলে এমনিওটিক থলি সহজে ফেতে যেতে পারে। এছাড়াও ব্যাকটেরিয়া জরায়ুতে সংক্রমণ এবং প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে যার ফলে প্রি-টার্ম লেবারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এগুলো ছাড়াও গবেষণায় দেখা গেছে স্ট্রেস এর সাথে প্রি-টার্ম লেবারের সম্পর্ক আছে। অনেক বেশী স্ট্রেস থাকলে শরীরে একধরনের হরমোন নিঃসরণ হয় যার ফলে জরায়ুতে সংকোচন (Contraction) হয় এবং এর ফলে প্রি-টার্ম লেবার হতে পারে। এ কারণে পারিবারিকভাবে নির্যাতিত নারীদের ক্ষেত্রে প্রি-টার্ম লেবারের ঘটনা বেশী ঘটে। এছাড়াও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলে বিশেষ করে পেটে কোন আঘাত পেলে প্রি-টার্ম লেবারের আশঙ্কা অনেক গুনে বেড়ে যায়।

প্রি-টার্ম লেবার জেনেটিক কারণে হয় নাকি সে সম্পর্কেও গবেষণা হচ্ছে কারণ কিছু কিছু পরিবারে বংশানুক্রমিক প্রি-টার্ম লেবার এর ঘটনা বেশী দেখা যায়।

প্রি-টার্ম ডেলিভারি হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা তা বোঝার কোন উপায় আছে?

যাদের প্রি-টার্ম লেবারের লক্ষন দেখা দিয়েছে বা যারা এর উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন তাদের জন দু ধরনের স্ক্রীনিং টেস্ট করা হয়ে থাকে। এ টেস্ট গুলো গর্ভাবস্থায় নিয়মিত করা হয়না কারণ গবেষণায় দেখা গেছে যাদের প্রি-টার্ম লেবারের ঝুঁকি থাকেনা বা যাদের কোন লক্ষন দেখা যায়না তাদের ক্ষেত্রে এ টেস্টগুলো তেমন ফলপ্রসূ হয়না।

টেস্টগুলো হোল-

আলট্রাসাউন্ড

আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে সারভিক্স এর দৈর্ঘ্য মাপা- সাধারণত প্রথম প্রি-ন্যাটাল ভিসিটেই সারভিক্স এর দৈর্ঘ্য মাপা হয়। যদি তাতে কোন সমস্যা থাকে তাহলে তা আরও নিখুঁতভাবে মাপার জন্য এবং তা পরিবর্তিত হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য আলট্রাসাউন্ডের পরামর্শ দেয়া হয়। যদি তা পাতলা হতে থাকে বা খুলে যায় তাহলে প্রি-টার্ম ডেলিভারির সম্ভাবনা বেশী।

Fetal fibronectin  স্ক্রীনিং – 

এই টেস্টটি সাধারনত তাদের ক্ষেত্রেই করা হয় যাদের জরায়ু সংকোচন বা প্রি-টার্ম লেবারের অন্যান্য লক্ষন দেখা দেয়। Fetal fibronectin এক ধরনের প্রোটিন যা ফেটাল মেমব্রেন থেকে উৎপন্ন হয়। ২৪-৩৪ সপ্তাহের পরীক্ষায় যদি এর পরিমান বেশী পাওয়া যায় তবে প্রি-টার্ম ডেলিভারির সম্ভাবনা বেশী।

প্রি-টার্ম লেবারের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকলে কি করা উচিত?

নিজের যত্ন নিন। খাবার দাবারের দিকে নজর দিন, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহনের চেষ্টা করুন। প্রচুর বিস্রাম নিন, গর্ভধারণে শুরু থেকে নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নিন, বাজে স্বভাব থাকলে তা পরিহার করুন (জেমন- ধূমপান) এবং আপনার স্ট্রেস লেভেল নিয়ন্ত্রনে রাখার চেষ্টা করুন।

গর্ভধারণের বয়স বাড়ার সাথে সাথে যেসব পরিবর্তন আসে তার সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করুন। নিজের জন্য কিছুটা সময় ব্যয় করুন যাতে আপনার গর্ভের শিশুর নড়াচড়া বা কোন উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কিনা তাতে মনোযোগ দিতে পারেন।

প্রি-টার্ম লেবারের লক্ষন গুলো সম্পর্কে ভালো ভাবে জেনে নিন। কোন লক্ষন দেখা দিলেই এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রি টার্ম লেবার ব্যাবস্থাপনার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হোল corticosteroids এর ব্যাবহার। এটি ব্যাবহারের ফলে গর্ভের বাচ্চার লাংসের বৃদ্ধি তরান্বিত হয়। ফলে বাচ্চা যদি প্রি-ম্যাচিউরও হয় তাহলে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই যত তারাতারি প্রি-টার্ম এর লক্ষন বোঝা যাবে তত তাড়াতাড়ি এ প্রক্রিয়া শুরু করা যায় এবং বাচ্চার জন্য তা তত উপকারী।

বাচ্চা প্রি-ম্যাচিউর হলে কি কি হতে পারে?

প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চার অনেক ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা হতে পারে। বাচ্চা যত আগে জন্মগ্রহন করবে তত বেশী ঝুঁকিতে থাকবে। প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চারা শ্বাসপ্রশ্বাস জনিত জটিলতায় ভুগতে পারে। এছাড়াও ব্রেন হেমারেজের সম্ভাবনা ও থাকে। স্নায়ুতন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চাদের ইনফেকশন এবং জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ও বেশী থাকে। এ ধরনের বাচ্চাদের পরবর্তীতেও অনেক সমস্যা দেখা দিতে পারে যেমন- লাংসের সমস্যা, শ্রবণ ও দৃষ্টি সমস্যা, cerebral palsy ইত্যাদি।

যদি ৩৪ সপ্তাহের আগেই আপনার প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয় কিন্তু সাথে সাথে ডেলিভারির করার প্রয়োজন না পড়ে তাহলে ডাক্তার আপনার ডেলিভারি আরও কিছুদিন দেরীতে করার চেষ্টা করবেন। এর সময় আপনাকে corticosteroids দেয়া হবে যাতে বাচ্চার লাংস এবং অন্যান্য অঙ্গ প্রত্তঙ্গের গঠন দ্রুত হয় এবং প্রসবের পর তার বেঁচে থাকে সম্ভাবনা বেশী থাকে।

প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চাদের জন্য অনেক উন্নত চিকিৎসা সেবা এখন পাওয়া যায়। তাই এ ধরনের বাচ্চাদের জন্মের পর অন্তত কয়েক সপ্তাহ হসপিটালের NICU তে রাখা হয়।

প্রিম্যাচিউর বেবিদের ব্যাপারে সবসময়ই খুব সচেতন থাকতে হয়। কারণ তাদের শরীর এতটাই সংবেদনশীল হয় যে, যে কোন কিছুতেই বড় কিছু সমস্যা হয়ে যেতে পারে। এছাড়া এইসময় শিশুদের ইনফেকশনের প্রচন্ড ভয় থাকে। তাই চিকিৎসকেরা সাধারণত এই সময়টা শিশুদের বেশ কিছুটা সময় নিবিড় পর্যবেক্ষনের মধ্যে রাখেন। চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করেই তাই এসব শিশুকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে হয়।

আরও পড়ুনঃ প্রি-ম্যাচিওর বাচ্চার যত্ন 

সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts

2 Thoughts to “প্রি-টার্ম লেবার ও প্রি-টার্ম বার্থ । সময়ের আগেই প্রসব”

  1. […] দেখা গেছে এসব অভ্যাসের ফলে গর্ভপাত, সময়ের আগেই প্রসব, বাচ্চার ওজন কম থাকা ইত্যাদির […]

  2. […] দেখা গেছে এসব অভ্যাসের ফলে গর্ভপাত, সময়ের আগেই প্রসব, বাচ্চার ওজন কম থাকা ইত্যাদির […]

Leave a Comment