প্রি-ম্যাচিওর বা সময়ের আগেই জন্ম নেয়া বাচ্চার যত্ন

বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা, মা কিংবা শিশুর কোন ধরণের সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণেই শিশু নির্ধারিত সময়ের আগেই পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখতে পারে। কিন্তু যেহেতু তারা নির্ধারিত সময়ের আগেই পৃথিবীতে আসে তাই তাদের যত্ন-আত্তি, তাদের দেখাশোনা সবকিছুই একটু অন্যরকম হয়। সাধারনত এদের প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চা বলা হয়ে থাকে।

গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ আগে জন্ম নেয়া শিশুকে প্রিম্যাচিউর বাচ্চা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত গর্ভকাল ৪০ সপ্তাহ হলে জরায়ুতে ভ্রুণ যথেষ্ট বিকাশ লাভ করে। এসময় ভ্রুণ শিশুর ফুসফুস ও অন্যান্য অঙ্গ পরিপূর্ণতা লাভ করে। ফলে সন্তান প্রসবের পর মাতৃজঠর থেকে বেরিয়ে এসে শিশু যে পরিবেশ পায় তার সাথে মানিয়ে নিতে  সক্ষম হয়। কিন্ত একজন প্রিম্যাচিউর নবজাতক শিশুর শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সঠিকভাবে বিকশিত না হওয়ায় বাইরের পরিবেশের সাথে সহজে খাপ খাওয়াতে পারে না।

চলুন জেনে নেওয়া যাক প্রি-ম্যাচিউর বেবির বিভিন্ন রকমের অবস্থাঃ

শিশুর জন্ম যখন ২৮ তম সপ্তাহেরও আগেঃ

শিশুর জন্মের সময় তার বয়স ২৮ সপ্তাহের কম হওয়াটা খুব কম ক্ষেত্রেই হয়। এই ধরণের শিশুরা সাধারনত খুব কম ওজন (দুই পাউন্ডের কম) নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য এদের আলাদা অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। এমনকি এই সময় শিশুরা চোখ খোলাও শেখে না এবং চোখের পাতাও তৈরি হয় না। কান্না করতেও এই সময়ের শিশুরা শেখে না। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটেই এ ধরণের শিশুদের রাখা হয় যতদিন না তারা ঠিক হয়ে উঠে। খাওয়ানোর ব্যপারে সাহায্য নিতে হয় টিউবের। তবে দুঃখের বিষয় হলো এসব শিশুরা অনেক সময়ই কিছুটা শারীরিক বা মানসিক অপ্রাপ্তি নিয়ে বেড়ে উঠে।

শিশুর জন্ম যখন ২৮ থেকে ৩১ তম সপ্তাহের মধ্যেঃ

আগের চেয়ে কিছুটা বেশি ওজন নিয়ে এই সময়ের মধ্যের শিশুরা জন্মগ্রহণ করে তবে সমস্যাগুলো সাধারণত একই রকম থাকে। এদেরও আলাদা অক্সিজেন প্রয়োজন হয় এবং বেশিরভাগ শিশুরই মায়ের দুধ টেনে খাওয়ার শক্তি থাকে না বলে টিউবের মাধ্যমে খাওয়াতে হয়। কিছু কিছু শিশু এই সময় কান্না করতে শেখে। জন্মের পর অনেক সময় নিয়ে এই শিশুরা নড়া চড়া ও অন্যান্য কাজ শিখে থাকে।

শিশুর জন্ম যখন ৩২ থেকে ৩৬ তম সপ্তাহের মধ্যেঃ

এই সময়ের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী শিশুরা বেশিরভাগ সময়েই স্বাভাবিক শিশুদের মতই থাকে যদিও তাদের ওজন অনেকটাই কম থাকে। খাওয়ানো ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা এদের মাঝেও দেখা যায় তবে কিছুটা কম পরিমাণে। এবং এসব শিশুরা খুব দ্রুতই স্বাভাবিক হতে পারে। তারা খুব দ্রুতই নিজে খেতে পারে এবং ওজনও বেশ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তবে তাদেরও আলাদা বিশেষ যত্নের প্রয়োজন এবং উপযুক্ত যত্নের ফলে এসব শিশুরা ভালোভাবেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

প্রি-টার্ম বার্থ সম্পর্কে জেনে নিন।

প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চার কি কি সমস্যা হতে পারে?

আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে বলা যায় যে জন্মের সময় শিশুর ওজন আড়াই কেজির (২৫০ গ্রাম বা ৫.৫ পাউন্ড) কম হলে এসব বাচ্চাদের লো-বার্থ তালিকায় ফেলা যায়। আমাদের দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ বাচ্চা এই তালিকায় পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব লো-বার্থ বাচ্চা স্বাভাবিক সময়ের কিছুটা আগে জন্মায় অর্থাৎ প্রিটার্ম বা প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চা হয়। আবার অনেকেই নির্ধারিত সময়ে ৩৭-৪০ সপ্তাহে জন্মালেও বিভিন্ন কারনে মাতৃগর্ভে এদের বৃদ্ধি ঠিকমত হয় না। ফলে শিশুর ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ কম হয়। এ সমস্ত প্রিটার্ম লো-ওয়েট বা প্রি-ম্যাচিউর শিশুর অনেক সময় বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।

প্রথমত, প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চাদের ফুসফুসের গঠন ঠিকঠাক মত না হবার ফলে জন্মের পর এদের শ্বাস কষ্ট দেখা দিতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় এমন হয় যে, বাচ্চা ঠিক মত শ্বাস নেবার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। তখন এদের কৃত্রিম শ্বাস যন্ত্র অর্থাৎ ভেন্টিলেটরের সাহায্যে সাময়িক ভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখা হয়। ঢাকা শহরের কিছু কিছু হাসপাতালে যেমন ঢাকা মেডিকেল কলেজ, শিশু হাসপাতাল, বারডেম এবং কিছু বেসরকারী হাসপাতালে এই কৃত্রিম শ্বাস যন্ত্র আছে।

দ্বিতীয়ত, কম ওজনের বাচ্চাদের শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে না, কিন্তু তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকা খুবই জরুরী। তাই মা তার বাচ্চার তাপমাত্রা ক্যাঙ্গারু কেয়ার পদ্ধতি অর্থাৎ বুকের মাঝে রেখে স্বাভাবিক রাখতে পারে। এর সাথে হাতে পায়ে মোজা, মাথায় ক্যাপ এবং গায়ে কম্বল জড়িয়ে রাখা যেতে পারে। রুমের তাপমাত্রা অবশ্যই ২৮° থেকে ৩০° সেন্টিগ্রেডের মধ্যে রাখতে হবে। রুমের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে ২০ ওয়াট বৈদ্যুতিক বাতির সাহায্য নেয়া যেতে পারে। এ ছাড়াও বিকল্প উপায় আছে, তা হল ইনকিউবেটর অথবা রেডিয়্যান্ট ওয়ার্মার। এসব যন্ত্র নবজাতক শিশুর শরীরে আরামদায়ক উষ্ণতা বজায় রাখে।

তৃতীয়ত, জন্মের পর বেশির ভাগ শিশুর বিলিরুবিন বেশি থাকে এবং এই বিলিরুবিনের মাত্রা আরও বেশী থাকে  প্রি-ম্যাচিউর ও লো বার্থ ওয়েট বেবীর ক্ষেত্রে। এই বিলিরুবিনের মাত্রাই জন্ডিসের নির্দেশক। শিশুদের এ ধরনের জন্ডিস ফটোথেরাপী অর্থাৎ আলোর নিচে রেখে চিকিৎসা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ফটোথেরাপীর মাধ্যমে না কমলে রক্ত পরিবর্তন অর্থাৎ এক্সচেঞ্জ ট্রান্সফিউশনের (Exchange Transfusion) মাধ্যমে জন্ডিস কমানো হয়।

চতুর্থত, লো-বার্থ ওয়েট ও প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চাদের পুষ্টি তথা নিউট্রিশনের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হয়। বাচ্চার ওজন যদি দেড় কেজির (১৫০০ গ্রাম) বা তার কম হয় তাহলে অবশ্যই নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার প্রয়োজন। তবে অন্যান্য লো-বার্থ ওয়েট বেবীদেরও তা প্রয়োজন হতে পারে। যেখানে শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমান পুষ্টি দিয়ে স্বাভাবিক ওজন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। এদের ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড বা স্যালাইন লাগিয়ে নতুবা নাকের সাহায্যে প্রাথমিক ভাবে দুধ দেয়া হয়। ক্রমশই এসব বাচ্চা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে এবং অন্যান্য শিশুর মত মায়ের বুকের দুধ খেতে শিখে। এ কথা জেনে রাখা প্রয়োজন যে লো-বার্থ ওয়েট বেবীদের ওজন প্রথম সপ্তাহে কমতে থাকে এবং তৃতীয় সপ্তাহ থেকে বাড়তে থাকে। প্রতিদিন সাধারনত ১৫-২০ গ্রাম পর্যন্ত ওজন বাড়তে পারে। লো-বার্থ ওয়েট শিশুর জন্য অবশ্যই অতিরিক্ত হিসাবে ভিটামিন এ, ডি, ই এবং ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস প্রয়োজন।

প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যান্য বাচ্চাদের তুলনায় অনেক কম থাকে।তাই তারা ঘন ঘন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এ কারণে বাবা মায়েদের অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

কেন প্রি-ম্যাচিওরড বাচ্চার বিশেষ যত্ন নিতে হয়? 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শতকার ৭৫ ভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ সেবা নিশ্চিত করা গেলেই অপরিণত নবজাতক শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব । একজন প্রিম্যাচিওর বাচ্চার ফুসফুস, পরিপাকতন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিণত না হ্ওয়ার পূর্বেই জন্মলাভ করে, কাজেই এই পৃথিবীর আলো বাতাসের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য ওকে একজন পরিণত নবজাতকের চেয়েও বেশী সংগ্রাম করতে হয়। এজন্য তার বিশেষ যত্ন প্রয়োজন ।

হাসপাতালে প্রিম্যাচিওর বেবির যত্ন

সাধারণত প্রিম্যাচিওর  বেবি জন্মের পর থেকে নানা জটিলতায় ভুগতে থাকে। ক্ষণে ক্ষণে তার শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে জন্মের পরপরই অপরিণত নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যার জন্য হাসপাতালে আইসিইউ কেয়ারের প্রয়োজন হয় । সেখাতে তাকে কিছুদিন লাইফ সাপোর্টেও রাখতে হতে পারে। এসময় বেবিকে সার্বক্ষণিক ডাক্তারের পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধের ব্যবস্থাপনা, অক্সিজেনের প্রয়োজন হলে প্রয়োজনমত  অক্সিজেনের ব্যবস্থা রাখা,  টিউবের মাধ্যমে বাচ্চাকে পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা, শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক আছে কিনা তা প্রতিনিয়ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রিম্যাচিওর  বেবির সুস্থতা নিশ্চিত করতে হয়। শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য নবজাতকের জন্য প্রয়োজনমত উত্তাপের ব্যবস্থা রাখতে হয় । এসব ব্যবস্থাপনা হাপাতাল ছাড়া অন্য  কোথাও সম্ভবপর নয় বলে একজন প্রিম্যাচিওর  বেবিকে হাসপাতালে বেশ কিছুদিন ডাক্তার ও নার্সের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।

বাড়িতে আনার পূর্বের সতর্কতা

প্রিম্যাচিওর  বেবি যদি হাসপাতালে স্বাভাবিক অবস্থায় আসে, তখনই তাকে হাসপাতাল হতে বাড়িতে নিয়ে আসার কথা ভাবতে পারেন। বাড়িতে আনার আগে যেসব বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে:

  • শিশু কি ইনকিউবেটরের বাইরে ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে পারছে কিনা?
  • ইনকিউবেটরের বাইরে শিশুর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকছে কিনা?
  • বেবি কি টিউবের পরিবর্তে বোতলে কিংবা স্বাভাবিকভাবে মায়ের দুধ পান করতে পারছে কিনা?
  • শিশুর ওজন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে কিনা?

এসব বিষয়ে  নিশ্চিত হলেই ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে শিশুকে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারেন। অধিকাংশ প্রিম্যাচিওর  বেবি ২-৪ সপ্তাহের মধ্যেই  স্বাভাবিক অবস্থায় এসে পড়ে । শিশুকে যথাযথ পরীক্ষা নিরীক্ষার পরেই বাসায় আনার সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

বাড়ির পরিবেশে প্রিম্যাচিওর  নবজাতকের যত্ন

শিশুকে বাড়িতে নিয়ে আসার পর মা বাবাসহ পরিবারের সবারই  দায়িত্ব বেড়ে যায় । শিশুর কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা সেদিকে পরিবারের সবাইকে সার্বক্ষণিক নজরে রাখতে হয় । স্বাভাবিক নবজাতক শিশুর চেয়ে প্রিম্যাচিওর  বেবির জীবন নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্য করার জন্য অতিরিক্ত কিছু ব্যবস্থাপনা করতেই হয়।

নবজাতকের শরীরের তাপমাত্রা :

অপরিনত নবজাতক শিশুর দেহ সবসময়  উষ্ণ, শুষ্ক রাখতে হবে।  তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে শিশুর জন্য হালকা গরম গ্যাঞ্জি, নরম স্লিপিং স্যুট বা স্লিপিং ব্যাগ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে ।  পরিবেশের ঠান্ডা ও উষ্ণতার উপর নির্ভর করে শিশুর উপযুক্ত জামা কাপড়ের ব্যবস্থা করতে হবে । শিশুর তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য পরিস্কার তোয়ালে কুসুম কুসুম গরম জলে ভিজিয়ে এবং পরবর্তীতে তোয়ালে থেকে পানি ঝরিয়ে শিশুর সারা শরীর মুছে দিলে সে আরাম পাবে ।  ভিজে তোয়ালে দিয়ে মুছার পর অবশ্যই  শিশুর শরীর শুকনো কাপড় দিয়ে মুছিয়ে পরিস্কার জামা কাপড় পড়িয়ে দিতে হবে। কোন অবস্থায় শিশুর শরীর খালি রাখা যাবে না।  তা না হলে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। গরমকালে কিছুক্ষণ পর পর কাপড়, শিশুর বিছানা পাল্টিয়ে দেয়া উচিত। এতে শিশু স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে। শীতকালে গরম জামা কাপড় বা পরিস্কার নরম তোয়ালে দিয়ে জড়িয়ে রাখলে, মায়ের বুকে শিশু জড়িয়ে থাকলে শিশুর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকবে এবং ঠান্ডা লাগার ভয় থাকবে না।

নবজাতকের জন্য পুষ্টিকর খাবার

শিশুকে পর্যাপ্ত মায়ের দুধ খাওয়ানো উচিত।  মায়ের দুধে যথেষ্ট পরিমান পুষ্টি গুণাগুন আছে যা শিশুর বেড়ে উঠার জন্য খুবই দরকার।  শিশু স্বাভাবিক অবস্থায় না আসা পর্যন্ত অপরিনত নবজাতক শিশুর মায়ের বুকের দুধ সহজে বন্ধ করা উচিত নয়। স্বাভাবিক নবজাতকের চেয়ে  অপরিণত নবজাতককে বেশিদিন মায়ের দুধ খাওয়ানো উচিত। এত শিশু নানা সংক্রমণের হাত থেকে যেমন রক্ষা পায় , তেমনি সবধরণের পুষ্টি গুণ সে মায়ের দুধ থেকে পেয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মনে রাখা উচিত প্রি-ম্যাচিওর বাচ্চারা প্রথম দিকে মায়ের বুকের দুধ টেনে খেতে পারেনা। তাই যাতে বুকের দুধ কমে না যায় সেজন্য নিয়মিত বুকের দুধ পাম্প করা উচিত। দিনে অন্তত ৮-১০ বার দুধ পাম্প করতে হবে। এতে বুকের দুধের প্রবাহ ঠিক থাকবে এবং বাচ্চা যখন নিজে নিজে দুধ টানতে পারবে তখন তার অসুবিধা হবেনা।

শিশুর যথাযথ ঘুমের ব্যবস্থা করা :

শিশু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, রাতে শিশু যে পরিমান ঘুমানোর কথা তার চেয়ে কম ঘুমাচ্ছে এবং রাতে বেশী কান্না করছে। ক্ষিধের কারণেও অনেকসময় এটি হয়ে থাকে। নবজাতক অপরিণত শিশুর প্রথম মাসে ঘন ঘন খাবারের প্রয়োজন হয়। শিশুর খাবারের যথাযথ ব্যবস্থা করা এবং রাতে শিশুর নিরাপদে, নিরুপদ্রবে ঘুমাতে সাহায্য করার জন্য  ঘরের পরিবেশ শান্ত রাখা , ঘরে কম আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে।

সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম :

সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম কি কারণে হয় তা এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া না গেলেও সাধারণত শিশুর প্রথম ছয়মাস এধরনের উপসর্গে ভুগতে পারে। অনেক হেলদি বেবিও এধরণের সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। প্রিম্যাচিওর  বেবির ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরো বেশি। কিছু গাইডলাইন অনুসরণ করলে এই ঝুঁকি থেকে শিশুকে সহজে রক্ষা করা যায়।

  • শিশু উপুড় হয়ে যাতে না ঘুমায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা।
  •  ঘরে কেউ যেন ধুমপান না করে
  • শিশুর গায়ের কম্বল বা অন্য কাপড় যাতে তার মুখে না এসে পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখা
  • শিশুকে জড়িয়ে ধরে মা বাবা কেউ যেন বিছানায় বা সোফায় ঘুমিয়ে না পড়ে।
  • ঘরের তাপমাত্রা ১৬-২০ ডিগ্রির মধ্যে রাখতে চেষ্টা করা
  •  শিশুর আশেপাশে উনুন, হীটার  এ জাতীয় কিছু যেন না থাকে।
  • শিশুর সামনে এলকোহল, ড্রাগ জাতীয় কোন পদার্থ সেবন না করা।

সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।

শিশুকে কোলে নেয়ার পূর্বের সতর্কতা

শিশুকে কোলে নেয়ার পূর্বে অবশ্যই অবশ্যই হাত ধুয়ে নিতে হবে। অধিকাংশ রোগ জীবানু হাত দিয়ে বয়ে আসে।  প্রিম্যাচিওর  বেবির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেহেতু কম ,  তাই বাইরে থেকে কেউ এসে শিশুকে কোলে নিতে চাইলে  জীবাণুনাশক হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে তাপরপর শিশুকে কোলে নেয়া উচিত। এতে শিশু নানা সংক্রমণ হতে রক্ষা পাবে। সবচেয়ে ভালো হয় প্রিম্যাচিওর  বেবিকে অতিথিদের থেকে দূরে রাখা।

রুমের পরিবেশ

প্রিম্যাচিওর  বেবির সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য তার রুমের পরিবেশ আদর্শ হওয়া উচিত। যথেষ্ট আলো বাতাস চলাচল করে এধরনের পরিবেশে শিশুকে রাখতে হবে। রুমের তাপমাত্রা  স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণত প্রিম্যাচিওর  বেবির রুম  মা-বাবার রুমের সাথেই হওয়া উচিত।

মায়ের সান্নিধ্য

প্রিম্যাচিওর  বেবিকে সবসময় মায়ের সান্নিধ্যে রাখা উচিত। সার্বক্ষণিক মায়ের বুকে রাখা গেলে শিশু উষ্ণ থাকে, পর্যাপ্ত বুকের দুধ পায় এবং শিশু নানা সংক্রমণ থেকেও রক্ষা পায়। মায়ের পরিচিত গন্ধ শিশু নিরাপদ মনে করে যা শিশু নিশ্চিন্তে এবং স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।

পরিশিষ্ট:

মা বাবার হাজারো স্বপ্ন নিয়ে জন্ম নেয় একটি শিশু। কিন্তু সে যদি প্রিম্যাচিওর  বেবি হয় তাহলে মা বাবা সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকেন। অনেকেরই প্রশ্ন থাকে কেন একজন নবজাতক শিশু প্রিম্যাচিওর  হয়? কিভাবে তার যত্ন নিতে হবে? কিভাবে সে বেড়ে উঠবে? এসব চিন্তায় মা বাবা সারাক্ষণ উদ্বেগে থাকেন। এটি সত্যি যে প্রিম্যাচিওর  বেবির ক্ষেত্রে মৃত্যু ঝুঁকি থাকে বেশি। তবে ডাক্তারের সঠিক পরামর্শ, পরিবারের সবার সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং শিশুর যথাযথ পুষ্টির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এধরনের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা যায়। তবে যেসব কারনে একটি নবজাতক প্রিম্যাচিওর  হয় তা  পূর্বেই নিয়ন্ত্রন করার জন্য লক্ষ্য রাখা উচিত। আপনার নবজাতকের সুন্দর আগামী নিশ্চিত করার জন্য মা বাবা উভয়কেই এবিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত।

অপরিণত ও কম ওজনের শিশু জন্ম  প্রতিকারের জন্য গর্ভধারণের আগেগর্ভকালীন সময়ে মায়ের সুস্বাস্থ্য রক্ষার দিকে নজর রাখতে হবে৷ এ ব্যাপারে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকমীর পরামর্শ নেওয়া উচিত৷ বিশেষ করে গর্ভকালীন সময়ে মায়ের খাবারের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে৷ যেহেতু মায়ের খাবারেরই একটি অংশ বাচ্চা গ্রহণ করে থাকে৷ একসময় একটা ভুল ধারণা চালু ছিল যে, মা পর্যাপ্ত খাবার খেলে পেটের বাচ্চা আকারে বড় হবে, এতে বাচ্চা প্রসবে অসুবিধা হবে৷ ধারণাটা মোটেই ঠিক নয়৷ গর্ভকালীন সময়ে অন্য সময়ের তুলনায় মায়ের ২০%-২৫% খাবার বেশি খাওয়ার প্রয়োজন হয়৷ এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে ফলমূল, শাক-সবজি ও পানিসহ পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে৷ কম আয়ের লোকদের জন্য এরকম একটা সাধারণ হিসাবে হতে পারে যে- বাচ্চা পেটে এলে মাকে প্রতিদিন এক মুঠ চাল, এক মুঠ ডাল, কিছু শাক-সবজি, অর্ধেক কলা ও এক চামচ তেল বাড়তি খেতে হবে৷

তাছাড়া কিছু রোগ আছে যাতে পূর্ণ মেয়াদের আগেই বাচ্চা প্রসব হয়ে যেতে পারে৷ সেক্ষেত্রেও বাচ্চা কম ওজনের হতে পারে৷ এক্লামশিয়া, প্রস্রাব ইনফেকশন, প্রজননতন্ত্রের ইনফেকশন, জন্ম নালি থেকে রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন কারণে পূর্ণতা প্রাপ্তির আগেই বাচ্চা প্রসব হয়ে যেতে পারে৷ এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শাধীন থাকতে হবে৷

সবার জন্য শুভকামনা।

 

তথ্যসূত্রঃ

supermombd
hatihatipa
babycenter
mayoclinic

Related posts

Leave a Comment