নির্ধারিত সময়ের পরেও প্রসব বেদনা শুরু না হওয়া বা পোস্ট টার্ম প্রেগন্যান্সি

বেশীরভাগ বাচ্চাই গর্ভাবস্থার ৩৭ থেকে ৪১ সপ্তাহের মধ্যে জন্ম নেয়। ডিউ ডেট হোল বাচ্চা জন্ম নেয়ার সম্ভাব্য তারিখ। শেষ মাসিকের প্রথম দিন থেকে ৪০ সপ্তাহ হিসেব করে এই ডেট গননা করা হয়। প্রথম ট্রাইমেস্টারে ডেটিং স্ক্যানের উপর ভিত্তি করে এই ডিউ ডেটের তারতম্য ঘটতে পারে। মতে রাখতে হবে ডিউ ডেট মানে বাচ্চা কখন জন্মাবে সেটা না বরং এটা হোল বাচ্চা কখন ৪০ সপ্তাহের হবে তার হিসেব। এই সময়ের আগে বা পরে বাচ্চা জন্মে নেয়াটা স্বাভাবিক। প্রসবের বা ডিউ ডেটের জন্য নির্ধারিত তারিখের দুই সপ্তাহ পরও যদি বাচ্চা প্রসব না হয় তবে তাকে পোস্ট টার্ম প্রেগন্যান্সি  বলা হয়। ৫-১০ ভাগ গর্ভাবস্থা এমন বিলম্বিত হতে পারে।

পোস্ট টার্ম প্রেগন্যান্সির সম্ভাবনা কখন বেশী থাকে?

পোস্ট টার্ম প্রেগন্যান্সি অনেক ভাবে হতে পারে। যেমন- মা যদি তার শেষ মাসিকের তারিখটি ঠিকমতো মনে না রেখে থাকেন বা তা নিয়ে কনফিউশনে থাকেন তবে ডিউ ডেটের হিসেবে ভুল হতে পারে, যদি দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের শেষের দিকে বা তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে করা আলট্রা সাউন্ডের মাধ্যমে ডিউ ডেট হিসেব করা হয় তবে তা সঠিক না হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে। এছারাও  বেশি বয়সে যদি প্রথম মা হন, পরিবারে বা তার নিজের যদি এর আগে পোস্ট টার্ম প্রেগন্যান্সির হিস্টোরি থাকে, বাচ্চাটির যদি জন্মগত কোনো ক্রটি থাকে, প্রথম বার গর্ভধারণে এবং মায়ের ওজন বেশী হলে প্রসব ব্যথা উঠতে দেরি হতে পারে।

পোস্ট টার্ম প্রেগন্যান্সির ঝুঁকি কি?

ডিউ ডেট বা নির্ধারিত তারিখের কয়েকদিন দেরী হলে সাধারণত তেমন কোন সমস্যা হয়না। বেশীর ভাগ ডাক্তারই এসময় ইন্ডাকশন বা কৃত্রিম উপায়ে প্রসব শুরু করার পরামর্শ দেবেন না। তবে যদি নির্ধারিত তারিখের ২ সপ্তাহ অতিক্রম করে যায় তবে তা গর্ভের শিশু এবং মায়ের জন্য ঝুঁকি পূর্ণ হতে পারে। কারণ ৪২ সপ্তাহের পরে কিছু কিছু বাচ্চা মায়ের গর্ভেই বা জন্মানোর অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যায়, যদিও এমনটা খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়।

সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় মায়ের ওজন আর না বেড়ে স্থির আছে বা কিছুটা কমেও যেতে পারে। জরায়ুর উচ্চতা এবং অ্যাম্নিওটিক ফ্লুইড বা পানির পরিমাণ কমে যেতে পারে এবং সবুজ হলুদ বর্ণ ধারণ করে নির্দেশ করে পেটের বাচ্চাটি হয়তো খারাপ আছে। এ ধরনের গর্ভাবস্থায় বাচ্চাটির দৈর্ঘ্য ও ওজন বেশি হয়। বাচ্চার মাথাটি তুলনামূলক শক্ত, চামড়া পাতলা, নখগুলো বড় থাকে। বাচ্চা জন্মানোর পর ইনফেকশনসহ শ্বসনতন্ত্রের জটিলতায় ভুগতে পারে, বাচ্চার শরীরে গ্লুকোজ এর পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। বাচ্চা জন্মের সময় মায়ের যোনি ছিঁড়ে যাওয়া, ইনফেকশন এবং অতিরিক্ত রক্তপাতের ঝুঁকিও থাকতে পারে।

প্রসবের নির্ধারিত তারিখ পেরিয়ে গেলে কি হবে?

প্রসবের নির্ধারিত তারিখ পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রসব শুরু না হলে ডাক্তার গর্ভের বাচ্চার সাইজ, হৃদস্পন্দন, অবস্থান পরীক্ষা করে দেখবেন এবং আপনার কাছে বাচ্চার নড়াচড়া সম্পর্কে জানতে চাইবেন। যদি একসপ্তাহ বেশী দেরী হয় তবে অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের পরিমান দেখা হবে এবং আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে বাচ্চার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এসময় কৃত্রিম উপায়ে প্রসব শুরু করার পরামর্শ দেয়া হতে পারে।

কৃত্রিম উপায়ে প্রসব শুর করা বা ইনডাকশন কি?

প্রাকৃতিকভাবে প্রসব প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে কৃত্রিমভাবে শুরু করা হয়। একটি বাচ্চাকে ইনডাকশন করার কারণগুলো হলো বহুগর্ভ বা গর্ভে যমজ বাচ্চা, বহুমূত্র রোগ বা ডায়াবেটিস, কিডনী সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ বা যখন গর্ভাবস্থা ৪১ সপ্তাহ অতিক্রম করে।

যদি আপনার প্রসব ইনডাকশন করা হয় তাহলে এটা আপনার ডাক্তার বা ধাত্রীর সাথে আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। ইনডাকশন করার সুবিধা অবশ্যই ঝুঁকির চেয়ে বেশী হতে হবে। প্রসব ইনডাকশনের কিছু ঝুঁকি থাকে, উদাহরণস্বরূপ – ফোরসেপ বা ভ্যাকুয়াম প্রসবের এবং সিজারিয়ান অপারেশনের উচ্চ ঝুঁকি থাকে।

প্রসব ইনডাকশন পন্থা এবং সংকোচন শুরু করা:

পর্দা ছিঁড়ে দেয়া একটি সাধারণ পদ্ধতি। যোনীপথে পরীক্ষা করার সময়, ধাত্রী বা ডাক্তার পর্দাকে প্রসব প্রক্রিয়ার জন্য তৈরী করতে আঙ্গুল দিয়ে বৃত্তাকারভাবে নড়াচড়া করায়। প্রমাণ পাওয়া গেছে যে পর্দার এই নড়াচড়া প্রসব শুরু হওয়াকে উন্নীত করে এবং অন্যান্য ইনডাকশন পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা কমায়।

প্রোষ্টাগ্লানডিন একটি হরমোন যা আপনার শরীর তৈরী করে। এটি আপনার জরায়ুর মুখ নরম হতে সাহায্য করে। Prostin ও Cirvidil হলো দুটি সিনথেটিক প্রোষ্টাগ্লানডিন। জরায়ুর মুখকে নরম করতে জরায়ুর মুখের কাছে যোনীপথে এগুলোকে প্রবেশ করানো হয়। এটি সংকোচন শুরু করতে পারে। প্রভাব শুরু করতে তারা ৬-১৮ ঘন্টা সময় নেয়। একটি ঝুঁকি হলো এই ইনডাকশন পদ্ধতি আপনার জরায়ুকে অধিক উদ্দীপনা দেয় এবং বাচ্চার জন্য সমস্যা তৈরী করে।

যান্ত্রিকভাবে জরায়ুর মুখ প্রস্তুত করানো প্রক্রিয়ায় একটি ছোট প্লাষ্টিক ক্যাথেটার ব্যবহার করা হয়, জরায়ুর মুখকে নরম এবং খোলার জন্য।

পানি ভাঙ্গানো (গর্ভবরণ কর্তন/ছেদন (অ্যামনিওটমি) বলে)- তে একজন ডাক্তার বা ধাত্রী যোনীপথে একটি যন্ত্র প্রবেশ করায় এবং জরায়ুর মুখের খোলা জায়গা দিয়ে গর্ভফুলের রস ধরে রাখা পর্দাতে মৃদুভাবে খোঁচা দেয়। এটি বাচ্চার মাথাকে জরায়ুর মুখের দিকে বেশী নামতে সাহায্য করে, হরমোন এবং সংকোচন বাড়ায়।

অক্সিটোসিন একটি হরমোন যা আপনার শরীর প্রসবের সময় প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদন করে। এটি জরায়ু সংকোচন করে। সিনথেটিক অক্সিটোসিন শিরাপথে ফোটায় ফোটায় দিলে তা সংকোচন শুরু করতে সাহায্য করে। অক্সিটোসিন- এর খারাপ দিক হলো এটি শক্তভাবে সংকোচন করে যা মানিয়ে নেয়া কষ্টকর। তার মানে আপনার ব্যাথা নিরামক লাগতে পারে। অক্সিটোসিনের ঝুঁকি প্রোস্টাগ্লান্ডিনের মতোই, শুধু এর প্রভাব সুস্পষ্ট এবং তাড়াতাড়ি হয়, কিন্তু প্রোষ্টাগ্লান্ডিনের চেয়ে আরো বেশী পরিবর্তন যোগ্য।

এই মেডিকেল হস্তক্ষেপগুলোর সমন্বয় প্রসব শুরু করার জন্য প্রয়োজন হতে পারে।

প্রসব বেদনা কি প্রাকৃতিক ভাবে শুরু করানো যায়?

শিশু জন্মদান বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসবের পক্ষে ততটা ভাল কোন প্রমান নেই। ‘প্রসব বেদনা তরান্বিত করার জন্য হোম মেইড কোন পদ্ধতি নেই যা শতভাগ নিশ্চয়তাসহ কাজ করে। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালে দেয়া ঔষধই বেশি কার্যকর ও নিরাপদ। বাদবাকি বেশিরভাগ টেকনিক-ই গুজব এবং কখনো কখনো মায়ের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ। নিচে বর্ণিত পদ্ধতিগুলোতে শিশুজন্মদান বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। এর কারণ হলো, হয় এসব পদ্ধতির পক্ষে ততটা শক্ত কোন প্রমাণ নেই, অথবা এগুলোতে ঝুঁকি জড়িত। যাই হোক না কেন, এ ধরনের কোন পদ্ধতি প্রয়োগ করার আগে অবশ্যই আপনার ডাক্তার বা মিডওয়াইফের সাথে পরামর্শ করতে ভুলবেন না।

আকুপাংচারের সাহায্য প্রসব বেদনা:

সম্ভবত আকুপাংচার প্রসব বেদনা তরান্বিত করে, তবে এখনই নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। আকুপাংচার হচ্ছে দেহের বিভিন্ন আকু-বিন্দুতে ইনেজকশনের সুচের চেয়েও বড় বিশেষ এক ধরনের পিন ভেদ করিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রেখে চিকিৎসা করা। শত শত বছর ধরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মুহুর্তেই প্রসববেদনা ওঠানোর জন্য এটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা’র একটা ছোট গবেষনায় দেখা গেছে যেসব মহিলা আকুপাংচার চিকিৎসা নেন তাদের ঔষধের সাহায্য ছাড়াই প্রসব বেদনা ওঠার সম্ভাবনা বেশি।গবেষকদের একজন বলেন, ‌’আকুপাংচার দেয়ার ফলে সিজারিয়ান হবার হার ৫০% পর্যন্ত কমে এসেছে, তবে এখনো ততটা নিশ্চয়তাসহ বলা যাচ্ছে না। বরং এ বিষয়ে আরো গবেষণা দরকার’।

দীর্ঘ হাটাহাটি:

হার্পার নামের একজন ডাক্তার বলেন, “লম্বা হাটাহাটি ভাল ব্যায়াম, তবে আমি মনে করি না এটা প্রসব বেদনায় কোন সাহায্য করে”। এলিজাবেথ স্টেইন অবশ্য বেশ কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন এবিষয়ে, “অল্প হাটাহাটি ভালো, তবে ক্লান্তিকর লম্বা হাটাহাটির ভক্ত আমি নই। ক্লান্ত হয়ে প্রসববেদনা আনা মনেহয় ভাল চিন্তা না”।

ঝাল খাবার:

খুব ঝাঝালো ঝাল খাবার খেয়ে প্রসব বেদনা আনা বেশ জনপ্রিয় ধারণা। তবে এটা জেনে রাখুন জরায়ু ও পাকস্থলির মাঝে সরাসরি কোন যোগসুত্র নেই। তাই এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে কোন বিশেষ খাবার পেটে সংকোচন ( contraction) নিয়ে আসবে। হার্পার জানান এধরনের কোন ঘটনা বা প্রমান তিনি কখনো দেখেন নি।

ক্যাস্টর অয়েল

ড. স্টেইন অনেকটা অনিচ্ছুকভাবেই এই তেলের কথা বলেন। ৩৮ সপ্তাহ পর দৈনিক খুব অল্প পরিমানে এই তেল গ্রহণ করা যেতে পারে। ‘রেড়ীর তেল সরাসরি জরায়ুতে কোন প্রভাব ফেলে না, বরং এটা অন্ত্রে উদ্দীপনা যোগায় যা জরায়ুতে প্রভাব ফেলে’। তবে এটা তখনই হয় যখন শরীর প্রসবের জন্য তৈরি হয়। ড. হার্পার অবশ্য এটা কোনভাবেই সমর্থন করেন না, ‘ক্যাস্টর তেলে বরং মারাত্নক ডায়রিয়া হয় এবং এর ফলে মা’র শরীরে পানির অভাব হতে পারে। তাই আমি এর পক্ষে নেই”।

সহবাস কি প্রসব বেদনা তরান্বিত করে?

কিছু ডাক্তার, ধাত্রী ও গর্ভবতী নারীও এটা বলে এসেছেন যে, গর্ভাবস্থার শেষ দিকে সহবাস প্রসব বেদনা তরান্বিত করে। তাদের এই বক্তব্যের পেছনের যুক্তি হিসেবে উঠে এসেছে বীর্যে বিদ্যমান একধরনের হরমোনের কথা। এছাড়া অর্গাজমের (কামোত্তেজনা)সময়কালীন তলপেটে যে টান পড়ে তার ফলে সারভিক্স-এ(গলদেশ) অনুরনন হয়। কিন্তু গবেষনায় এমন কোন কার্যকর সম্পর্ক খুজে পাওয়া যায় নি।

প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন গবেষনায় দেখা গেছে গর্ভাবস্থার শেষ সপ্তাহে সহবাস না করা গর্ভবতীর তুলনায় সহবাস করা গর্ভবতীর প্রসব বেদনা দেরিতে উঠে। তবে এই গবেষনা এটা বুঝাচ্ছে না যে সহবাস প্রসব বেদনাকে বিলম্বিত করে বরং এই দুয়ের মাঝে কোন সম্পর্ক না থাকার কথাই গবেষকরা দৃঢতার সাথে ব্যক্ত করেছেন।

যেসব মহিলার গর্ভাবস্থায় কোন জটিলতা নেই এবং যাদের স্বাস্থ্য ভাল, পানি ভাঙার আগ পর্যন্ত গর্ভাবস্থায় সহবাসে তাদের কোন সমস্যা নেই। তবে এর ফলে এমনটা আশা করবেন না যে, এ সময় সহবাসের ফলে মুহুর্তেই আপনার  প্রসব বেদনা উঠে যাবে।

সবার জন্য শুভকামনা

Related posts

Leave a Comment