প্রসব পরবর্তী স্থূলতা ও এর প্রতিকার

প্রসব পরবর্তী স্থূলতা

গর্ভাবস্থায় ওজন বাড়বে, এটাই স্বাভবিক। তবে শিশু জন্মের পরও অনেক মাকেই দেখা যায় ওজন কমাতে পারেন না। এই বাড়তি ওজন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান অনেকে।সন্তান প্রসবের পরও প্রায় নারীদেরই পেটে মেদ জমে যায়। গর্ভাবস্থায় যেহেতু বাচ্চার পুষ্টির জন্য বেশি করে খাওয়া লাগে এ কারণে শরীরের বিভিন্ন অংশে বিশেষ করে পেটে মেদ জমে যায়।গর্ভকালীন যে ওজন বাড়ে, সন্তান জন্মের পর তার অনেকটাই ঝড়ে গেলেও যতটুকু থাকে তা বেঢপ বানানোর জন্য যথেষ্ট৷

গর্ভাবস্থার পর মেদ কমানো কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। যদি গর্ভধারণের সময় আপনার ওজন স্বাভাবিক থেকে থাকে এবং গর্ভাকালীন সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী আপনার ১১-১৫ কেজি ওজন বেড়ে যায় তাহলে গর্ভাবস্থার পর আপনার মেদ কমিয়ে আগের অবস্থায় যেতে ৪/৫ মাসের বেশি সময় লাগার কথা না যদি আপনি খাদ্যাভ্যাস ঠিক রাখেন ও নিয়মিত ব্যায়াম করেন। অন্য ক্ষেত্রে আপনার ওজন যদি গর্ভধারণের আগে থেকেই বেশি থাকে তাহলে ওজন কমিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় যেতে হলে আপনার ১ বছরের মত সময় লাগতে পারে।

অনেকেই ভাবতে পারেন বাচ্চা জন্ম দেয়ার সাথে সাথে গর্ভাবস্থায় ধারন করা ওজন অনেকটুকু কমে যায়। আসলে তেমনটা হয়না। প্রসবের সময় বাচ্চার ওজন থাকে ৫-১০ পাউন্ডের মধ্যে। এছারাও প্লাসেন্টা এবং অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের (যা বাচ্চার সাথে বের হয়ে যায়) ওজন মিলিয়ে প্রসবের সময় ১০-১২ পাউন্ড ওজন কমতে পারে। গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক ভাবে ওজন বাড়ে ২৫-৩৫ পাউন্ডের মত। এই বাকি ওজন গুলো হয় আপনার স্তনের, রক্তপ্রবাহের, বর্ধিত জরায়ুর এবং চর্বির। এই বাড়তি ওজনগুলো কমতে প্রসবের পর বেশ সময় লাগতে পারে। প্রকৃতপক্ষে বাচ্চা জন্মের পর ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত মায়ের পেট খুব একটা কমেনা যতক্ষণ পর্যন্ত মায়ের জরায়ু পুনরায় গরভাবস্থাপূর্ব অবস্থায় ফেরত না যায়।

প্রসবের পর কি কি কারনে ওজন বাড়তে পারে?

প্রসবের পর বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের সুষম খাবার খাওয়া উচিত। কিন্তু দেখা যায় অনেকেই ব্রেস্ট ফিডিংয়ের অজুহাতে  ডায়েটে ঘি-মাখনের বন্যা বইয়ে দেন অথবা ফিগার খারাপ হওয়ার ভয়ে ব্রেস্ট ফিডিং-এই রাশ টানেন৷দুটোই আপনার ওজন কমানোর জন্য প্রতিবন্ধকতা সরূপ। আপনার শরীর যতটুকু ক্যালোরি বার্ন করতে পারে যদি আপনি তার চাইতে বেশী ক্যালোরি গ্রহন করেন তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আপনার শরীরে মেদ জমতে থাকবে। আবার আপনি যদি বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখেন তাতে আপনার শরীরে কম ক্যালোরি বার্ন হবে এবং এর ফলে শরীর গর্ভাবস্থায় জমা অতিরিক্ত মেদ ঝরাতে পারবেনা।

সন্তান জন্মের পর মায়েদের ঘুমানো দুঃসাধ্য হয়ে দাড়ায়। ঘুম কমে যাওয়ার কারনে শরীরে কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে  যায় যার ফলে মায়ের শরীরের মেটাবলিজম কমে যায় এবং শরীরের ক্যালোরি বার্ন করার ক্ষমতা কমে যায়। কম ঘুমোলে শরীরে যে ক্লান্তি জমে তা সামলাতে খিদেও বেড়ে যায়৷ উদ্বৃত্ত খাবার চটজলদি ফ্যাটে পরিণত হয়৷

বিশেষ করে সিজারিয়ান হলে পেটের মেদ কমিয়ে পূর্বের অবস্থায় যেতে অনেক সময় লাগে। অনেকে সিজারের ঝড় সামলাতে শুয়ে-বসে জীবন কাটাতে শুরু করেন৷ অনেকে আবার ভুঁড়ি নিয়ে বিশেষ টেনশন করেন না৷ কারণ তাঁদের ধারণা, সিজার হলে কিছুটা ভুঁড়ি অনিবার্য৷ অনেকে আবার ধরেই নেন, জীবনের এই দ্বিতীয় পর্যায়ে আগের ফিগার থাকা সম্ভব না৷বেশির ভাগ নারীই তাদের এই পরিবর্তিত অবস্থা নিয়েই জীবন অতিবাহিত করেন কারণ তাঁরা বিশ্বাসই করতে পারেননা যে, এই সাময়িক পরিবর্ধিত উদর পুনরায় কমানো সম্ভব। যেকোন ধরণের পেটের মেদ কমানো খুব সহজ নয় এবং সিজারিয়ান করলে অবস্থাটা আরো বেশি কঠিন হয়ে যায় কারণ তখন স্ট্যান্ডার্ড অ্যাবডোমিনাল এক্সারসাইজ করা যায়না।

সন্তান প্রসবের পর অনেকেই অনেক মানসিক চাপে থাকেন। মানসিক চাপের মোকাবিলা করতে রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়ে৷ ব্যায়াম করে তাকে কমাতে না পারলে তা চর্বি হিসেবে জমা হয়৷ অনেকেই আবার ওজন দ্রুত কমানোর জন্য অতিরিক্ত ব্যায়াম করা শুরু করেন বা খাওয়া দাওয়া কমিয়ে দেন। এতেও কিন্তু উল্টো ফল হয়। অতিরক্ত এবং ভুল ব্যায়াম এবং স্ট্রিক্ট ডায়েট আপনাকে ক্লান্ত করে দেয়। মনে রাখবেন এর ফলে কিন্তু আপনার ওজন কমবে না। শুধু শক্তিই হারাবেন।

প্রসব পরবর্তী ওজন কমানোর জন্য কি করা যেতে পারে?

শুরু থেকে একটু সাবধান হলে আবারও আগের ছিপছিপে গড়ন ফিরে পাওয়া সম্ভব। চিন্তা করবেন না এবং তাড়াহুড়ো করবেন না৷ একটু ধৈর্য আপনাকে ধরতেই হবে। মনে রাখতে হবে এই অবস্থায় আসতে আপনার নয় মাস সময় লেগেছে তাই পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে সে সময়টুকু লাগতেই পারে।

ওজন কমানোর জন্য আপনার বাচ্চা হওয়ার ৬ মাস পর থেকেই প্ল্যান করা উচিত। অনেক মহিলার ক্ষেত্রে বাচ্চা হওয়ার ৬ সপ্তাহের মধ্যেই গর্ভাবস্থার অর্ধেক ওজন কমে যায়।বাকি টুকু নির্ভর করে আপনার উপর। তাই বাড়তি মেদ কমানোর জন্য আপনি যা করতে পারেনঃ

সময় দিন

প্রসবের পর আপনার শরীর রিকোভার করতে সময়ের প্রয়োজন। যদি খুব দ্রুত আপনার ওজন কমে যায় তবে পুরোপুরি রিকোভার করতেও আপনার সময় লাগবে। তাই প্রসবের পর ওজন কমানোর চিন্তা অন্তত পক্ষে ৬ সপ্তাহ পর থেকে শুরু করুন। যদি বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান তবে অন্তত পক্ষে বাচ্চার বয়স ২ মাস হওয়া পর্যন্ত এবং বুকের দুধের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সপ্তাহে ৬৫০ থেকে ৭০০ গ্রাম (১.৫ পাউন্ড) ওজন কমানোর লক্ষ্য রাখুন। এটি আপনার খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রন এবং ডাক্তারের অনুমতি পাওয়ার পর হাল্কা ব্যায়ামের মাধ্যমে করতে পারেন।

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান

আপনি যদি আপনার সন্তানকে বুকের দুধ পান করিয়ে থাকেন তাহলে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে বেশি জোর দিবেন না। দ্রুত মেদ কমানোর প্রচেষ্টায় থাকলে আপনার বাচ্চা কম দুধ পাবে। সপ্তাহে ৬৫০-৭০০ গ্রাম করে ওজন কমলে আপনার বুকের দুধের সরবরাহে তেমন কোন প্রভাব পরবেনা।

ওজন কমাতে বাচ্চাকে পুরোপুরি বুকের দুধ খাওয়ান৷ শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় শরীরের ক্যালরি পুড়তে থাকে। তাই এটি আপনার অতিরিক্ত মেদ কমাতে সাহায্য করবে। আপনি যদি ধৈর্য্য ধরতে পারেন তাহলে আশ্চর্য হয়ে যাবেন যে শুধু বুকের দুধ পান করিয়েই আপনি অনেক ওজন কমিয়ে ফেলেছেন। তবে দুধ খাওয়াচ্ছেন বলে যদি অতিরিক্ত দুধ-ঘি-মাখন বা হাই ক্যালোরি খাবার খান, ওজন বাড়বে৷ কাজেই খাওয়ার দিকেও নজর রাখুন৷

ক্র্যাশ ডায়েট একেবারেই মানা

ওজন কমানোর লক্ষ্যে ভুলেও ক্র্যাশ ডায়েটে (পরিমিত না খাওয়া) যাবেন না। এতে অল্প সময়ে আপনার ওজন অনেক খানি কমে গেলেও তা সাধারনত শরীরের তরলের ওজন এবং এগুলো দ্রুত ফিরে আসে। এছারাও ক্র্যাশ ডায়েটের কারনে শরীরের চর্বির চাইতে মাংসপেশি ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে। এ ধরনের ডায়টের ফলে যে য চর্বি ঝরে তা খাদ্যাভ্যাস আগের মত করলে আবার ফিরে আসে এবং শরীরেরও ক্ষতি করে।

গর্ভাবস্থার পর খাদ্যাভ্যাস

এই স্বাস্থ্যসম্মত টিপস গুলো আপনার স্বাস্থ্য ঠিক রেখে ওজন কমাতে আপনাকে সাহায্য করবে

প্রতিদিন ঠিক সময়ে খেয়ে নিবেন। নতুন মা রা অনেক সময় ঠিক সময়ে খেতে ভুলে যায়, এর ফলে দেখা যায় শরীরের শক্তি কমে যায়। মনে রাখবেন এর ফলে কিন্তু আপনার ওজন কমবে না। শুধু শক্তিই হারাবেন।

৩ বেলা বেশি করে না খেয়ে সারাদিনে ৫/৬ বার কম করে খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এর মাঝে হাল্কা নাস্তা করুন ক্ষুধা মেটানোর জন্য।যখন খাবার খাবেন তখন সময় নিয়ে খাবেন। পেট ভরতে কিন্তু সময় লাগে না। তাই আপনি যদি সময় একটু বেশি নিয়ে অল্প পরিমাণে খাবার খান তাহলে আপনি নিজেকে উপলব্ধি করাতে পারবেন যে আপনার পেট ভরে গেছে। এতে করে আপনার বেশি খাবার নেয়ার সুযোগ কমে যাবে।

সকালের নাস্তা কখনই বাদ দিবেন না। অনেকে মনে করে সকালের নাস্তা না করলে বাড়তি মেদ কমানো সম্ভব। তবে এটা ভুল। সকালে খাওয়া খাবার সারাদিনে শরীরের শক্তি যোগাতে সাহায্য করে। এছাড়া সকালে নাস্তা করলে আপনার দিনে ক্ষুধা পাবে কম তাই আপনি খেতেও পারবেন কম।

কম চর্বি সম্মত দুধ ও দুধের তৈরী খাবার খাবেন। পারলে চর্বি-মুক্ত দুধের তৈরী খাবার খাবেন। যখন আপনি নাস্তা খাবেন চেষ্টা করবেন সেখানে বেশি করে ফল ও সবজী রাখতে। আপেল, কমলালেবু, বেরী, কলা, গাজর এসব বেশি করে খাবেন নাস্তার জন্য। এগুলোতে ফ্যাট কম থাকে কিন্তু প্রচুর পরিমাণে ফাইবার ও ভিটামিন থাকে।

দিনে ৮-৯ কাপ তরল খাদ্য যেমনঃ ফলের রস, স্যুপ খান। পানি সবচেয়ে ভালো নির্বাচন এ ক্ষেত্রে। পানি ওজন কমানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মেদ ঝরাতে সাহায্য করে। সোডা, ঠান্ডা পানীয়, কেনা জ্যুস ও যেসব তরল  খাদ্যে চিনি আর ক্যালরি বেশি থাকে তা খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন। মসলা জাতীয় খাবার বাদ দিয়ে সেদ্ধ ও হাল্কা তেলে রান্না করা খাবার খাবেন। চিনি জাতীয় খাবার ও মিষ্টি খাওয়া যাবে না।

পানি শরীরের ফ্লুইড ব্যালেন্স রক্ষা করে। আপনি হয়তো অবাক হবেন এটা শুনে যে, পানি অন্ত্র থেকে অতিরিক্ত মেদ বের করে দিতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন, এতে ক্ষুধা কম লাগবে ও পেট ভরা থাকবে।

ব্যায়াম

স্বাস্থ্যকর খাদ্যের সাথে ঠিকমত ব্যায়াম করাই গর্ভাবস্থার পর দ্রুত ওজন ও মেদ কমানোর সবচেয়ে সঠিক পন্থা। প্রতিদিন একটু করে ব্যায়াম করুন। যখন দেখবেন আপনার মেদ কমা শুরু হয়েছে তখন থেকে প্রতিদিন একটু করে খাদ্যে ক্যালরির পরিমাণ কমিয়ে দিন ও একটু বেশি নড়াচড়া করা শুরু করুন। কঠোর রুটিনের মধ্যে ফেলাটা খুব কষ্টের হবে তবে একবার যদি এটি করতে পারেন তখন আর খারাপ লাগবে না রুটিনের মধ্যে থাকতে। আবার খেয়াল রাখবেন শরীরের প্রতি যেন বেশি কঠোরও হয়ে না যান। প্রতিদিন বাচ্চাকে ট্রলারে নিয়ে ২০-৩০ মিনিট হেঁটে আসলে আপনার ও আপনার বাচ্চার মন যেমন ভালো হবে আপনার স্বাস্থ্যও আরও ভালো হবে। ব্যায়ামের ফলে ঘুমের সমস্যাও মিটবে৷ এবং তাতে শরীর-মন ফ্রেশ হওয়ার পাশাপাশি ওজন কমার সুরাহা হবে৷ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পেটের পেশি মজবুত করার দু-একটা ব্যায়ামও অল্প করে শুরু করুন৷

যেকোনো ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ঘুম

ভালো ঘুমের সঙ্গেও ওজন কমার যোগসূত্র আছে৷ কম ঘুমোলে শরীরে যে ক্লান্তি জমে তা সামলাতে খিদে বেড়ে যায়৷ উদ্বৃত্ত খাবার চটজলদি ফ্যাটে পরিণত হয়৷ কাজেই বাচ্চা ঘুমোলে ঘরের কাজ বা আড্ডায় মন না দিয়ে আপনিও ঘুমোন৷ মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা করুন। এই জন্য গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা মেডিটেশন করতে পারেন।

বাস্তববাদী হউন 

অনেক চেষ্টা করার পরও দেখা যেতে পারে যে আপনি গর্ভাবস্থার পর খানিক ওজন কমাতে পারলেও আপনার শেপ আর আগের মত হয় নি। এর কারণে হতাশ হবেন না। কেননা অনেক মহিলার ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা শরীরে এমন কিছু বদল আনে যা আর ঠিক করা যায় না। আপনার পেটের চামড়া ঝুলে যেতে পারে, নিতম্ব চওড়া হতে পারে, কোমরের মাপ বেড়ে যেতে পারে। এরকম হলে এই অবস্থাতেই কিভাবে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলবেন সেটি নিয়ে ভাবুন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment