কিভাবে আপনার বাচ্চাকে তার নতুন ভাই /বোনের আগমন উপলক্ষে তৈরি করবেন ?

পরিবারে নতুন বাচ্চা জন্মানোটা সব পরিবারের কাছেই একটা উৎসবের মত এবং নতুন একটা চ্যালেঞ্জও বটে। নতুন বাচ্চার আগমনে বাবা-মা উভয়ই খুব খুশি হলেও তাদের বড় বাচ্চারা নবজাতকের সাথে কেমন আচরণ করবে অনেক সময় তা নিয়ে বিচলিত হয়ে পরেন।

এ নিয়ে তাদের মাথায় নানা ধরণের প্রশ্ন জাগতে পারে যেমনঃ কিভাবে তাদের বুঝাবেন যে তারা তাদের নতুন ভাই/বোন পেতে যাচ্ছে? নবজাতকের প্রতি তারা ঈর্ষান্বিত হয় কি না? বা নবজাতকের সাথে মানিয়ে নিতে কিভাবে তাদের শিক্ষা দেওয়া উচিত ইতাদি।

স্বভাবতই এক এক বয়সের বাচ্চা নবজাতকের প্রতি এক এক ধরণের আচরণ করে। তাই কোন বয়সের বাচ্চারা নবজাতকের প্রতি কেমন আচরণ করতে পারে তা জানাটা খুবই জরুরী। সে অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া গেলে পরবর্তীতে তাদের ক্ষেত্রে হঠাৎ পারিবারিক পরিবর্তনটা মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়ে যায়।

আজকের আর্টিকেলে বয়স অনুযায়ী আপনার বাচ্চারা তাদের ভাই বোনের আগমন উপলক্ষে কেমন আচরণ করতে পারে এবং কিভাবে তাদের আগে থেকেই প্রস্তুত করতে পারেন সে বিষয়ে আলোচনা করবো।

১ থেকে ২ বছরের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে

এই বয়সের বাচ্চারা পরিবারে নতুন সদস্য আসার ব্যাপারে তেমন কিছু বুঝতে পারেনা। তবে তাদের সামনে সবসময় উৎসাহ নিয়ে তাদের নবাগত ভাই/বোনের ব্যাপারে আলোচনা করতে হবে ও সবসময় তা নিয়ে আনন্দিত থাকার চেষ্টা করুন। যদিও তারা বুঝবেনা যে আপনি কেন এতোটা উদ্দীপ্ত, তারপরেও আপনার হাসি খুশি দেখে তারাও উদ্দীপ্ত হবে।

মনে রাখবেন, সচরাচর উভয় বাচ্চার প্রতি একসাথে সমানভাবে যত্ন নেওয়া সম্ভব হয়ে উঠেনা। এমন পরিস্থিতিতে অনেক সময় আপনি ভেঙ্গেও পড়তে পারেন। সেক্ষেত্রে বাড়তি সহযোগিতার জন্য আপনার স্বামী, বন্ধু অথবা অন্য কোন নিকট আত্মীয় স্বজনের সাহায্য নিতে পারেন।

আরও কিছু বিষয়ের মাধ্যমে আপনার বাচ্চাকে পরিবারে তার নতুন ভাই/বোনের আসার ব্যাপারে শিক্ষা দিতে পারেন যেমনঃ

ছোট ছোট বাচ্চাদের ছবির বই নিজে দেখুন ও বাচ্চাকেও দেখান। একসময় তা বাচ্চাকে ‘ভাই’ ‘বোন’ শব্দগুলোর সাথে পরিচিতি করে তুলে এমন কি তাদের ভেতরে শিশু বাচ্চাদের প্রতি এক ধরণের আগ্রহ জন্মায়।

নবাগত বাচ্চা জন্মানোর পড় জ্যেষ্ঠ বাচ্চাদের জন্য বিশেষ কিছু করুন যেন তারা মনে করে যে আপনি এখনো তাদের অনেক বেশি ভালবাসেন। যেমন তাকে বিশেষ কিছু উপহার দেওয়া, তার সাথে মজার মজার গল্প করা, বাবা অথবা দাদা-দাদির সাথে সময় কাটানো বা কোথাও ঘুরতে পাঠানো ইত্যাদি।

২ থেকে ৪ বছরের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে

এই বয়সের বাচ্চারা সচরাচর মায়ের সঙ্গ ছাড়তে চায়না, এমন কি মায়ের কোলে অন্য কোন বাচ্চা থাকলে তাও সহ্য করতে পারেনা। পরিবারে নবাগত শিশু আসার ব্যাপারেও মানতে চায়না, অনেক সময় তার কাছে তা স্নেহ ভালোবাসার জন্য  হুমকির মত মনে হতে পারে।

তাই এই বয়সের বাচ্চাদের কিভাবে বড় ভাই/বোন হিসেবে তাদের প্রস্তুত করতে হয় নিচে এই ব্যাপারে কিছু দিক নির্দেশনা দেওয়া হলো-

বাচ্চাকে তার নবাগত ভাই/বোনের ব্যাপারে কিছু বলার আগে কিছুটা সময় নিন। আসন্ন শিশু বাচ্চার জন্য কাপড় ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র কেনার সময় অথবা বাচ্চা যদি নিজে থেকে গর্ভকালীন পেট বেড়ে উঠার কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করে তাহলে তাকে তার বোঝার মত ভাষায় পুরো ব্যাপারটা ভালো মত বুঝিয়ে বলুন। এই বয়সের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ছোট ছোট শিশু বাচ্চার ছবির বই দেখানোটা বেশ সাহায্য করে। নতুন ভাই/বোন হওয়ার ব্যাপারে অন্য কারো কাছ থেকে শোনার আগেই বাচ্চাকে আপনি নিজেই সুন্দর করে গল্পের ছলে ব্যাপারগুলোকে বুঝিয়ে বলুন।

বাচ্চাকে সব খুলে বলুনঃ বাচ্চাকে বুঝিয়ে বলুন যে তার আসন্ন সহোদর খুব সুন্দর ও ফুটফুটে দেখতে হবে কিন্তু সে অনেক কান্নাও করবে এবং বাচ্চা যখন কান্না করবে তখন আপনার হয়তো তাকে অনেকটুকু সময় দিতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে যে একসময় সে তার ছোট ভাই/বোনের সাথে খেলা ধুলা করতে পারবে। নতুন বেবি আসার উপলক্ষে তার মধ্যে আনন্দ জাগিয়ে তুলুন। তাকে বোঝান যে নতুন বেবি আসার পরেও তাকে এখনকার মতই ভালবাসবেন।

তাকে সহ আসন্ন বাচ্চারজন্য পূর্বপরিকল্পনা করুন। এটা তাকে ঈর্ষান্বিত হওয়া থেকে কিছুটা দূরে রাখবে পক্ষান্তরে সেও কিছুটা উৎসাহ পাবে। তাকে সহ আসন্ন বেবির জন্য কেনাকাটা করুন। তাকে তার নিজের ছোটবেলার ছবি দেখান। নবাগত বাচ্চার জন্য খেলনা কিনলে তা কিছুদিনের জন্য তাকে খেলতে দিন এতে সেও খুশি হবে। তাকেও খেলনা হিসেবে পুতুল কিনে দিতে পারেন, এতে করে সে খেলার ছলে ছোট বাচ্চার যত্ন নেওয়া শিখবে।

ধিরে ধিরে বাচ্চার রুটিনে পরিবর্তন আনতে হবে। যদি পারেন নতুন বেবি আসার আগেই বাচ্চাকে পটি ট্রেনিং দিয়ে দিন ও বিছানায় ঘুমাতে যাওয়ার প্রশিক্ষন দিন। আর যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে নতুন বাচ্চা বসতে না শেখা পর্যন্ত বাচ্চাকে এইসব প্রশিক্ষন দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় এইসব নতুন কিছু একসাথে আয়ত্ত করা তার পক্ষে কষ্টকর হয়ে যাবে এমন কি সে বিরক্তও হতে পারে।

বাচ্চার রপ্ত করা অভ্যাসের পরিবর্তন সম্পর্কে মানসিক প্রস্তুতি রাখুন। আপনার পটি ট্রেইন্ড বাচ্চা এ সময় আগের মত প্যান্ট ভেজানো শুরু করতে পারে বা আবার বোতলে দুধ খেতে চাইতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক এবং এটা তার নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা যে আপনি তাকে আগের মতই ভালবাসেন এবং তার প্রতি মনযোগী। এসবের জন্য তাকে বকাঝকা না করে তার প্রতি মনোযোগ দিন। এবং সে যখন বেড়ে ওঠার মত কাজ করে তখন তাকে উৎসাহ এবং বাহবা দিন।

আপনার হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ের জন্য তাকে প্রস্তুত করুন। হাসপাতালে থাকা কালিন আপনার অনুপস্থিতিতে বাচ্চা যেন বিচলিত হয়ে না পড়ে সেই প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাকে বুঝাতে হবে যে আপনি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নতুন বেবিকে নিয়ে বাসায় ফিরবেন এবং সে তার নতুন ভাই/বোন পাবে।

তার সাথে আলাদা ভাবে বিশেষ সময় কাটানো। যেমন- তার সাথে বসে গল্প করা, বই পড়া, গান শুনা ইত্যাদি। তাকে বুঝাতে হবে যে আপনি এখনো তাকে অনেক আদর করেন। নবজাতককে দুধ খাওয়ানোর সময় সে পাশে বসে আপনাকে জড়িয়েও ধরতে পারে।

পরিবারের অথবা আত্মীয় স্বজনদের কেউ নবজাতক কে দেখতে এলে তাদের বলুন যেন তার (জ্যেষ্ঠ বাচ্চার) সাথেও কিছুটা সময় কাটায়।এতে করে সে ভাববে সব আনন্দের সেও অংশীদার। নবজাতকের জন্য কোন উপহার আনলে তার জন্যেও ছোট কোন উপহার বা খেলনা দেওয়া উচিত। এতে সবার মত সেও আনন্দিত হবে।

বাচ্চাকে বাবার সাথে সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নবজাতকের কারনে মায়ের জন্য বাচ্চাকে যথেষ্ট সময় দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠেনা। সেদিক থেকে বাবা বাচ্চার এই একাকীত্ব সময়ে তাকে সঙ্গ দিলে বাচ্চার ভেতর একাকীত্ববোধটা চলে যাবে। এ ব্যাপারে বাবাকে সবসময় সজাগ থাকতে হবে।

স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদের ক্ষেত্রে

৫ বছরের উপড়ের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটা তেমন কোন বিষয় না, যেমনটা ২ থেকে ৪ বছরের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। তবে অনেক সময় নবজাতকের প্রতি অধিক মনোযোগ দেওয়ায় তাদের ভেতর এক ধরণের ক্ষোভ বা হিংসে জাগতে পারে। তাই, নবজাতকের জন্য আপনার স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাকে প্রস্তুত করতে নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে পারেন।

পরিবারে নতুন বাচ্চার আগমনের ব্যাপারে তার বোধগম্য ভাষায় তার সাথে কথা বলুন। তাকে বুঝাতে হবে যে পরিবারে নতুন বাচ্চা আসা মানে সে তার নতুন খেলার সাথি হতে পারে। এছাড়াও নবজাতকের কারনে তার কি কি ধরণের অসুবিধা হতে পারে সেটাও বলতে হবে।

নবজাতকের ঘড় পরিস্কার করা, তাকে কাপড় পরানো, তার জন্য ডায়পার কেনা ইত্যাদি কাজ বাচ্চাকে সাথে নিয়ে করুন। এভাবে তার ভেতরেও ছোট ভাই/বোনের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগবে।

যদি সম্ভব হয় ডেলিভারির পর পর বাচ্চাকেও হাসপাতালে নিয়ে যান যেন নবজাতকের আগমনের শুভক্ষন সেও উপভগ করতে পারে।

নবজাতককে  বাড়িতে নিয়ে আসার পর তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে নবজাতকের প্রতি তারও কিছু দায়িত্ব আছে। বলুন যে, সে মাঝে মাঝে নতুন বাচ্চাকে কোলে নিতে পারে কিন্তু সেটার জন্য অবশ্যই আপনার অনুমতি নিতে হবে। সে যখন নতুন বাচ্চার প্রতি যত্ন এবং মমতা দেখায় তখন তার প্রশংসা করতে হবে যাতে সে উৎসাহ নিয়ে আপনাকে সাহায্য করে।

 কখনই তাকে অবহেলা করা যাবেনা। তাকেও সময় দিতে হবে এবং তার চাওয়াগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। তার সাথে এমন আচরণ করতে হবে যেন সে মনে করে আপনি তাকেও অনেক আলবাসেন।

সবশেষে মনে রাখবেন, প্রথম কিছুদিন সমস্যা হলেও বাচ্চারা এক অপরের সাথে এবং পরস্পরের সময়ের সাথে ঠিকই মানিয়ে নেয়। তারা একে অপরকে ভালবাসতে এবং একসাথে থাকতে শিখে যায়। তারা একে অন্যের অনুরক্ত হয়ে যায়। এসব মাথায় রেখে বাবা মা হিসেবে দুজনের সাথেই সম্পৃক্ত থাকুন, তাদের প্রয়োজনে পাশে থাকুন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.