নবজাতক শিশুর সাথে আপনার বন্ধন কখনো কখনো একদম শুরু থেকেই তৈরি হয় না কেন?

বন্ধন বলতে এখানে নবজাতক শিশুর এবং বাবা-মা’র মধ্যে যে অন্যরকম একটা বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়, ঠিক সেই সম্পর্কটাই বুঝানো হচ্ছে। আর এই বন্ধনের কারণেই বারবার শিশুর রুমে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে বাবা মা দের, বিশেষ করে মাঝরাতে সামান্য একটু কান্নার শব্দ শুনেও ঠিক থাকতে পারেন না অভিভাবকরা। এই বিশেষ সম্পর্কটির জন্যই কিন্তু নবজাতক শিশুর প্রতি একটু ভালোভাবে খেয়াল রাখা এবং পরিচর্যার অভ্যাস তৈরি হয় বাবা মাদের মধ্যে।

বেশিরভাগ সময় দেখা যায় যে ঠিক যখনই বাব-মা তাদের নবজাতক শিশুকে প্রথম দেখেন, সাথে সাথেই এই অন্যরকম ভালোবাসার সম্পর্কটি তৈরি হয়ে যায়। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটা তৈরি হতে অর্থাৎ বাবা-মা তাদের নবজাতক শিশুর প্রতি অন্যরকম এক ভালোবাসা ও আবেগ অনুভব করেন কিছুটা দেরিতে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে শতকরা বিশ ভাগ পিতা মাতা তাদের নবজাতক সন্তানের ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথেই সেই রকম সত্যিকারের আবেগ অনুভব করেন না। আর তাই যদি আপনার নবজাতক শিশুর প্রতি আপনি সাথে সাথেই অন্যরকম আবেগ অনুভব না করেন, তাহলে উদ্বিগ্ন হবেন না আবার নিজের মনে এই আবেগ না আসার জন্য কোন রকম অপরাধ-বোধ আনবেন না কেননা কিছু সময়ের মধ্যেই এই আবেগ তৈরি হয়ে যাবে।

বাবা-মা শিশুর প্রতি এমন ভালোবাসা এবং আবেগ অনুভব করেন কেন?

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির অনুসারেই একটি নবজাতক শিশুর প্রতি তার বাবা মায়ের আবেগ তৈরি হয়। এই অনুভূতিটা শিশুকে নিরাপত্তা দেয় এবং তার সাথে শিশুটির নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। বাবা-মা’র ক্ষেত্রেও তাদের পরিবারের নতুন এক সদস্যর সাথে বন্ধন তৈরি করতে এই অনুভূতি সাহায্য করে।

এই অনুভূতির শুরুটা কখনো কখনো শিশুর জন্মের আগের থেকেই তৈরি হতে থাকে। ঠিক যখন আপনি নিজের গর্ভে শিশুর নড়াচড়া অনুভব করেন অথবা আল্ট্রাসোনগ্রাফিতে শিশুর নড়াচড়া দেখতে পান, সেই সময়টাতেও এই অনুভূতির শুরু হতে পারে। আপনার গর্ভের শিশুটিও আপনার মুখের শব্দ অর্থাৎ কথার মাধ্যমে আপনার সাথে পরিচিত হতে থাকে।

বাবা-মা এবং শিশুর মাঝে এই সম্পর্ক ঠিক কীভাবে তৈরি হয়?

এই সম্পর্কটি অনেকভাবেই তৈরি হতে পারে। যখন আপনি আপনার নবজাতক সন্তানের দিকে তাকান অথবা তার শরীর স্পর্শ করেন, তার পরিচর্যা করেন এবং তাকে খাওয়ান তখন সম্পর্কটা তৈরি হতে থাকে। আপনি যখন সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর জন্য তাকে কোলে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করেন অথবা তার পিঠে আলতো চাপড় দিয়ে ঘুম পাড়ান, এভাবেই আপনি আপনার সন্তানের সাথে ভালোবাসার সম্পর্কটি তৈরি করছেন আর মনে রাখবেন এই সম্পর্কটা আপনার নবজাতক শিশুকে অনেক তৃপ্ত করে।

আবার কখনো আপনি যখন আপনার শিশুর দিকে তাকান এবং শিশুও আপনার দিকে তাকায় এছাড়া যারা বুকের দুধ খাওয়ায় তাদের জন্য সেই সময়টাতেও সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে এমনটাও দেখা যায় যে, বাচ্চার কান্না মায়ের বুকের দুধ উৎপন্ন হতে সাহায্য করে।

তবুও সম্পর্ক কেন তৈরি হচ্ছেনা, কেন আপনি আবেগ অনুভব করছেন না?

এই সম্পর্ক কারো কারো ক্ষেত্রে একদম সাথে সাথেই হয়ে যায় আবার কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা এমনটা অনুভব করেন যে, এই ছোট শিশুটাকে আমি হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসেছি, এ আসলে কে?

আর তাই আপনার শিশুর সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা যদি সাথে সাথেই তৈরি না হয়, নিজের প্রতি অপরাধ-বোধ আনবেন না। মনে রাখবেন, অনেকের ক্ষেত্রেই এই আবেগ তৈরি হতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। যখনই আপনি নবজাতক শিশুর পরিচর্যা শুরু করতে থাকেন, ধীরে ধীরে হয়তো দেখবেন আপনার সন্তানের প্রতি এই আবেগও বাড়তে থাকে। ব্যাপারটা আসলে এমনও হতে পারে যে, আপনার সন্তান আপনার দিকে তাকিয়ে একটা সুন্দর হাসি দিল আর আপনি সাথে সাথেই এই আবেগ অনুভব করতে শুরু করলেন।

বিশেষ করে আপনার শিশু যদি সিজার অর্থাৎ সার্জারির মাধ্যমে জন্ম নেয় অথবা জন্মের সাথে সাথেই কোন কারণে যদি নবজাতকের সাথে আপনার দেখা না হয়, তাহলে এই সম্পর্ক তৈরি হতে একটু সময় লাগতেই পারে। এছাড়াও যখন আপনার শিশু প্রিম্যাচিওর হয় এবং দীর্ঘদিন NICU তে থাকে তখনও আপনার আর নবজাতকের মাঝে সম্পর্কটা তৈরি হতে বেশ খানিকটা সময় নিতে পারে। তবে এতে চিন্তার কিছু নেই, একসময় এই সম্পর্কটা তৈরি হয়েই যায় কোন না কোনভাবে।

কখনো দেখা যায় যে জন্মের পর অনেক মায়েরা ডিপ্রেশনে (postpartum depression) ভোগেন যা সন্তানের সাথে পুরপুরি বন্ধন তৈরিতে বিশেষ অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।  আবার কিছু ক্ষেত্রে সন্তান জন্ম দেয়ার সময় মা যে ব্যথা অনুভব করেন সেজন্যও তার সাথে সম্পর্ক তৈরি হতে একটু সময় নিতে পারে।

কখনো স্বামী স্ত্রীর মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও তাদের সন্তানের সাথে সম্পর্কেও সেটা প্রভাব ফেলে। নিন্ম বর্ণিত এই কারণগুলো শিশু সন্তানের প্রতি আপনার সম্পর্ক তৈরির প্রচেষ্টায় বিঘ্ন ঘটায়ঃ 

  • আপনার শৈশবে পিতা মাতার ভূমিকা যদি ইতিবাচক না হয়
  • ডিপ্রেশন অথবা মানসিক কোন সমস্যায় যদি আপনি আক্রান্ত হন
  • ইতোপূর্বে যদি আপনার গর্ভপাত ঘটে অথবা আপনি কোন কারণে সন্তান হারা হন
  • আপনার মধ্যে যদি সামাজিক যোগাযোগের ঘাটতি থাকে
  • জীবনে যদি কোন কঠিন সময় পার করতে থাকেন, যেমন চাকরী জনিত সমস্যা অথবা আপনি যদি অর্থাভাবে ভোগেন।
  • বৈবাহিক জীবনে সমস্যা অথবা নিপীড়নের শিকার হন

নবজাতকের সাথে সম্পর্ক তৈরির জন্য কোন উপায় বা পরামর্শ আছে কি?

নিন্মে বর্ণিত কাজগুলোর মাধ্যমে নবজাতক শিশুর সাথে সম্পর্ক অনেক গাঁড় হতে পারেঃ

যদি আপনার শিশুটি প্রিম্যাচিউর হয়ে থাকে, তাহলে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে চেষ্টা করুন শিশুকে স্পর্শ করার অথবা তার কাছাকাছি থাকার। মাঝে মধ্যে নবজাতকের সাথে শুধু কথা বলার মধ্যেও সম্পর্ক প্রগাড় হয়। আর তাই নিয়মিত NICU তে যেতে থাকুন শিশুকে দেখার জন্য।

যখন নবজাতককে নিয়ে আপনি বাসায় চলে আসবেন, যতটা পারা যায় বেশি বেশি নবজাতকের সাথে সময় কাটাবেন। শিশুকে ঘুম পারাবেন, কোলে নিয়ে হাঁটবেন এমনকি চাইলে আপনি তাকে গানও শুনাতে পারেন। কেননা আপনার কণ্ঠ অথবা স্পর্শ নবজাতক শিশুকে অনেক তৃপ্তি এনে দিতে পারে।

আপনার শিশুকে আলতোভাবে মালিশ করে দিতে পারেন। একটা গবেষণায় দেখা গেছে এই ধরনের মালিশ আপনার শিশুর সাথে কেবল আপনার সম্পর্কই তৈরি করে না বরং মায়েদের ক্ষেত্রে প্রসব পরবর্তী ডিপ্রেশন কাটিয়ে তুলতেও এটা বেশ সাহায্য করে। আর তাই আপনার শিশুকে কীভাবে মালিশ করবেন এ সম্পর্কে ভিডিও পাওয়া যায় সেগুলো সংগ্রহ করতে পারেন অথবা প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। 

যত বেশি পারা যায় আপনার শরীরের সাথে নবজাতকের শরীরের স্পর্শ নিন। এভাবে শরীরের স্পর্শ দেয়াকে  “kangaroo care” বলা হয়ে থাকে।  এই ব্যাপারটি বেশীরভাগ সময় প্রিম্যাচিউর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে করা হয়ে থাকে তবে তা “ফুল টার্ম” বাচ্চাদের জন্যও সমান উপকারী। গবেষণায় দেখা গেছে, এভাবে স্পর্শ আপনার শিশুর মধ্যে প্রশান্তি এনে দেয়। এটা শুধুমাত্র আপনাদের মধ্যে সম্পর্কই তৈরি করে না বরং এটা শিশুর মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ার দক্ষতা তৈরি করে।

পিতাদের ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটা একটু ধীরেই তৈরি হতে পারে, কেননা মায়দের ক্ষেত্রে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় বাচ্চার সাথে তাদের যে বন্ধন তৈরি হয় সেটা বাবাদের ক্ষেত্রে হয়না। নিম্ন বর্ণিত কিছু উপায়ে পিতারা চাইলে শিশুর সাথে সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করতে পারেনঃ

শিশু জন্ম নেয়ার আগে থেকেই তার সাথে সম্পর্ক তৈরি করে নিতে চেষ্টা করুন। গর্ভাবস্থায় আপনার স্ত্রীর পেটের উপর হাত রেখে সন্তানের অস্তিত্ব অনুভব করুন। স্ত্রীর সাথে নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যেতে থাকুন এবং আপনি কেমন বাবা হতে চান সে ব্যাপারে তখন থেকেই চিন্তা ভাবনা শুরু করে দিন

সন্তান প্রসবের সময়ে একই রুমে স্ত্রীর পাশে থাকার চেষ্টা করুন এবং যতটা সম্ভব সাহায্য করুন

মাঝরাতে উঠে শিশুকে খাওয়ানোর কাজে সাহায্য করুন, শিশুকে গোসল করান, ডায়পার পরিবর্তন করান, শিশুকে ঘুম পাড়ান অর্থাৎ সন্তানের যত্ন এবং পরিচর্যায় যতটা সম্ভব অংশগ্রহণ করুন।

তবে যদি দেখা যায় যে বেশ কয়েক মাস পার হয়ে গেছে তবুও আপনার শিশুর সাথে আপনার এখনো সেই সম্পর্কটা তৈরি হয়ে উঠেনি তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। উনি আপনাকে পরামর্শ দিতে পারবেন যে আদতে কোন শারীরিক অথবা মানসিক সমস্যার কারণে এমনটা হচ্ছে কি না। 

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.