নতুন জন্মানো বাচ্চা: সাধারণ বৈশিষ্ট্য এবং সমস্যাসমূহ

নবজাতকের বৈশিষ্ট্য 

পরিবারের সবাইকে আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে আগমন ঘটে একটি শিশুর। ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকে প্রথম যে প্রশ্নটা সবাইকে তাড়া করে—নবজাতক কি সুস্থ স্বাভাবিক হয়েছে? একটি শিশুর জন্মের পর পরই কিছু পর্যবেক্ষণ করে তা বোঝা যেতে পারে। যেমন-

ওজন

স্বাভাবিকভাবে গর্ভকাল ৩৭ থেকে ৪২ সপ্তাহ পার করেই একটি সুস্থ শিশু জন্ম নেয়। জন্মের সময় তার স্বাভাবিক ওজন আড়াই থেকে চার কেজি হওয়ার কথা।

উচ্চতা

স্বাভাবিক শিশু জণ্মের সময় মোটামুটি ভাবে ৫০ সেন্টিমিটার বা ২০ ইঞ্চির মতো লম্বা হয়৷

শরীরের অনুপাত

শিশুর মাথা শরীর হাত-পা-এর অনুপাত বড়দের শরীরের তুলনার অন্যরকম হয়৷ নবজাতকের মাথার মাপ দেহের মাপের একচতুর্থাংশ হয়ে থাকে৷ দুবছরে সেটা গিয়ে দাঁড়ায় একপঞ্চমাংশ এবং আঠারো বছর লাগে বড়দের মতো মাথার মাপ দেহের একঅষ্টমাংশ হতে৷

মাথা

নবজাতকের মাথার মাপ দেহের তুলনায় বেশি হয়, এসময়ে মাথার মাপ ৩৫ সেন্টিমিটার এর মতো হয়৷ নবজাতকের মাথার গঠন নানান রকমের হতে পারে৷ কিছুকিছু গঠন একটু অস্বাভাবিক দেখালেও তা কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যায়৷ এনিয়ে চিন্তার কোন কারন নাই৷

চামড়া

জণ্মের সময়ে বাচ্চার সারা শরীর ভার্নিক্স বলে একধরণের মোমের মতো জিনিস দিয়ে ঢাকা থাকে৷ এটা স্বাভাবিক, কখনও তুলো বা অন্যকোনও জিনিস দিয়ে এটাকে তুলবার চেষ্টা করবেন না৷ এগুলো ধীরেধীরে উঠে যাবে৷ ভার্ণিক্স উঠে যাওয়ার কয়েক দিনপর দেখা যায় হাত পায়ের চামড়ার পাতলা খোসার মতো আবরন আলগা হয়ে উঠে উঠে যাচ্ছে৷ এতে ভয় পাওয়ার কিছু নাই৷ এটাও খুব স্বাভাবিক৷

চোখ

জণ্মের সময় চোখের পরিমাপ বড়দের একতৃতীয়াংশের মতো হয়৷ জণ্মের পরে অনেক শিশুরই চোখের পাতা একটু ফোলা লাগে৷ এটা সাধারনত জণ্মের সময়ে যে চাপ পড়ে তার ফলে হয়৷ কয়েক দিনের মধ্যে দেখবেন ফোলা একদম মিলিয়ে গেছে৷ নবজাতকের চোখে যদি পিচুটি দেখেন অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন৷ নিজে থেকে কোনও সময়েই চোখে মলম বা ড্রপ দেবেন না৷

কান

নবজাতকের কান নিয়ে চিন্তার কিছু নেই৷

মুখ

অনেক বাচ্চার জণ্মের সময়ই দাঁত দেখা যায়৷ এতে ঘাবড়ে যাবেন না৷ এই দাঁত কিছু দিনের মধ্যেই পড়ে যাবে৷ অতিরিক্ত দুধ টানার ফলে নবজাতকের ঠোঁটে ফোস্কার মতো ফুলে উঠতেপারে৷ এজন্য কখনো দুধ খাওয়ানো বন্ধ করবেন না৷ নবজাতকের গাল দুটো বেশ ফোলা-ফোলা হয়৷ এর কারন ওদের গালে প্রচুর পরিমাণে ফ্যাট বা চর্বি থাকে৷ যাকে আমরা বলি সাকিং প্যাড্স৷ এসময়ে যেহেতু শিশু প্রচুর পরিমাণে বুকের দুধ চুষে থাকে সেই জন্যেই এই সাকিং প্যাড বা চোষক গদির দরকার৷ পরে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই চর্বির পরিমান কমতে থাকে এবং গাল ফোলার ভাবটাও কমে আসে৷

গলা

নবজাতকের গলা প্রায় থাকেই না বলা যায়৷ ওদের গলা এতই ছোট থাকে যে মনে হতে পারে মাথাটা সরাসরি ঘাড়ের সঙ্গে লাগানো৷ পরে আস্তে আস্তে গলা লম্বা হতে থাকবে এবং বড়দের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে৷

বুক

বুকের ভিতরে ফুসফুস বা হার্ট নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নেই৷ এগুলোর চিন্তা ডাক্তারদের উপরেই ছেড়ে দিন৷ নবজাতকের শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রিয়া থাকে স্বতঃস্ফূর্ত, ছন্দময় এবং মিনিটে ৩০ থেকে ৬০ বার—এই হারে চলতে থাকে। হৃৎস্পন্দন প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১৬০ বার।

নাভি

আসলে মায়ের শরীর হতে খাদ্য এবং অক্সিজেন ইত্যাদি শিশুর শরীরে নিয়ে যায় একটা গোল ফিতের মতো লম্বা জিনিস দিয়ে৷ এটাকেই আমরা বলি আমবিলিকাল কর্ড বা সাধারন বাংলায় নাড়ি৷ জণ্মের পরে শিশুর এই নাড়ির আর কোনও প্রয়োজন থাকেনা৷ তাই জণ্মের সঙ্গেসঙ্গেই ডাক্তার বা নার্সরা নবজাতকের নাভি থেকে কয়েক ইঞ্চি উপরে থেকে এই নাড়ি কেটে দিয়ে ভালো করে বেঁধে দেন৷

প্রথমে আপনার বাচ্চার নাভীর নালী সাদা, মোটা এবং জেলীর মতো থাকে। জন্মের এক বা দুই ঘন্টার মধ্যে এটি শুকাতে শুরু করে এবং ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এটি পরে যায়। নাভীর নালীর কর্তিত অংশ সামান্য স্রাব ছাড়ে এবং যেদিন এটি পরে যায় সেদিন বা তারপরে এই স্রাব দেখা যায়। আপনি এই এলাকা (নাভীর গোড়া) ঠান্ডা ফুটানো পানিতে ভিজানো কটন বাড দিয়ে পরিষ্কার করতে পারেন এবং অন্য একটি কটন বাড দিয়ে শুকিয়ে নিন। যদি রক্তপাত চলতে থাকে, অথবা যদি নাভীর গোড়া লাল, ভেজা থাকে বা ফোলা হয় তাহলে আপনার ধাত্রী বা ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। মনে রাখবেন নাভিতে লাল-নীল ঔষধ লাগালে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি হয়৷

যৌনাঙ্গ

সারা শরীরের তুলনায় নবজাতকের যৌনাঙ্গ একটু বড়ই থাকে৷ সেটা স্বাভাবিক৷ কখনো, নতুন জন্মানো মেয়ে বাচ্চাদের অল্প পরিমাণ যোনীপথে স্রাব নির্গত হয় – একটি গাঢ়, সাদা শেষ্মা যার সাথে কখনো রক্ত মিশ্রিত থাকে। একে মিথ্যা মাসিক বলে এবং এটি ঘটে কারণ আপনার বাচ্চা আর গর্ভফুল/প্লাসেন্টা থেকে আপনার হরমোন পাচ্ছে না। এই অবস্থা সম্পূর্ণ ঠিক আছে। একটি সাদা পনির- জাতীয় উপাদান যাকে শেষ্মা বলে, প্রায়ই যোনী ঠোঁটের নীচে পাওয়া যায়। এটিও একটি স্বাভাবিক অবস্থা।

নবজাতকের কিছু সাধারন সমস্যা

চামড়া

টেলানজিট্যাটিক নেভি

টেলানজিট্যাটিক নেভি (Telangietatic nevi বা সারস পাখির কামড়ের মতো) হলো ফ্যাকাশে গোলাপী বা লাল দাগ যা চোখের পাতা, নাক বা ঘাড়ে পাওয়া যায়। যখন বাচ্চা কান্না করে তখন আপনি তা পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবেন। এগুলো কোন সমস্যা করে না এবং সময়ের সাথে সাথে বিবর্ণ হয়ে যাবে।

মঙ্গোলিয়ান দাগ’

মঙ্গোলিয়ান দাগ’ হলো নীলাভ কালো চামড়ার রং যা নিতম্বের চারপাশে পাওয়া যায়। এগুলো কালো চামড়ার শিশুদের জন্য স্বাভাবিক। এগুলো কোন সমস্যা করে না এবং প্রথম বা দ্বিতীয় জন্মদিনে এগুলো বিবর্ণ হয়ে যাবে।

নিভাস ফ্লামেয়াস

নিভাস ফ্লামেয়াস হলো তীব্রভাবে প্রতীয়মান লাল থেকে বেগুনী বর্ণের এলাকা যা মুখমন্ডলে সাধারণত দেখা যায়। এগুলো বাড়ে না এবং সময়ের সাথে বিবর্ণও হয় না।

নিভাস ভাসকোলোসাস

নিভাস ভাসকোলোসাস (স্ট্রবেরি দাগ) হলো পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান, উল্লেখযোগ্য, গাঢ় লাল এলাকা যা মাথায় সাধারণত দেখা যায়। এগুলো শুরুতে আকারে বড় হবে এবং সময়ের সাথে আস্তে আস্তে সংকোচিত হবে।

মিলিয়া

মিলিয়া হলো উল্লেখযোগ্য, সাদা দাগ যা বাচ্চার নাক এবং কখনো মুখমন্ডলে পাওয়া যায়। এগুলো হলো উন্মুক্ত মেদবহুল গ্রন্থি এবং স্বাভাবিক ধরা হয় এবং সময়ের সাথে বিবর্ণ হয়ে যাবে।

ইরাইথেমা টক্সিকাম

ইরাইথেমা টক্সিকাম (নতুন জন্মানো ফুসকুড়ি) হলো ছোট সাদা বা হলুদ ফুসকুড়ি যা হঠাৎ করে সাধারণত বাচ্চার বুক, উদর এবং ন্যাপী এলাকায় জন্মের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে দেখা যায়। এগুলোর কারণ জানা যায়নি এবং কোন চিকিৎসা দরকার নাই। এগুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে কিন্তু কিছু সময় নিবে।

জন্ডিস

জন্ডিস অনেক নতুন বাচ্চাকে প্রভাবিত করে। জন্মের পর প্রথম কিছুদিন বাচ্চার চামড়া কিছুটা হলুদাভ দেখা যায়। এটি সাধারণত মারাত্মক নয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চার রক্তে বিলিরুবিন বলে একটি উপাদান থাকে, এর পরিমাণ মাপার জন্য পরীক্ষা করার প্রয়োজন পরে। যদি বিলিরুবিন সাধারণ মাত্রার চেয়ে বেশী থাকে তাহলে বাচ্চাকে অধিক পরিমাণ দুধ পানের জন্য উৎসাহিত করা হয় এবং বিশেষ আলোর নীচে রাখা হয় বা জন্ডিস কমা পর্যন্ত পুরো সময় একটি বিলিবেড-এ রাখা হয়। যদি আপনি জন্ডিস সম্পর্কে আরো জানতে চান, আপনার ধাত্রী বা ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

চোখ

কিছু নতুন জন্মানো বাচ্চার জন্মের পর আগত দিন বা সপ্তাহে আঠালো চোখ থাকে। এটি মারাত্মক নয় এবং সাধারণত তা চলে যায়। বাচ্চার চোখ পরিষ্কার করতে ঠান্ডা ফুটানো পানি ব্যবহার করতে পারেন। যদি এই সমস্যা স্থায়ী হয়, আপনার ডাক্তার বা ধাত্রীর সাথে কথা বলুন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment