নবজাতকের চুল কাটা নিয়ে বিভ্রান্তি ?

নবজাতকের চুল কাটা সম্পর্কে নানান ধারণা প্রচলিত। কেউ মনে করেন, জন্মের সাত দিনের মধ্যে চুল ফেলে দিতেই হবে। কেউ আবার ভাবেন, ছোট বয়সে চুল লম্বা রাখলে পরবর্তী সময়ে চুল পাতলা হয়ে যায়। সন্তান জন্মের পর অনেকের এমন কথা ভাবনায় ফেলে দিতে পারে মা’কে। এসব ধারণা ভুল। নবজাতকের চুল কাটতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

নবজাতকের চুল কাটা নিয়ে প্রচলিত ধারনাঃ

জন্মের পর প্রথম চুল কাটা প্রকৃতপক্ষে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রথা। ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে, বাচ্চার জন্মগত চুল কেটে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে মায়ের জঠর থেকে নিয়ে আসা গর্ভফুলের রক্ত বা অন্য কোন জীবাণু থেকে মুক্তি পাওয়া। সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে, জন্মগত চুল কেটে দেওয়া মানে পূর্বজন্মের সব নেতিবাচকতা থেকে মুক্তি। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, প্রথম চুল কাটা মানেই দীর্ঘায়ু, একটি সুন্দর ভবিষ্যত প্রাপ্তি এবং কোনো দুষ্ট শক্তি থেকে শিশুটিকে রক্ষা। কিছু কিছু সম্প্রদায়ের কাছে বাচ্চার জন্মগত চুল হচ্ছে অপবিত্র। তাদের ধারণা, এই চুল কেটে ফেললেই শিশুর শরীর ও আত্মার মুক্তি ঘটে।

অনেকেই আবার বিশ্বাস করেন যে, নবজাতকের চুল কাটা হলে শিশুর শরীর থেকে অতিরিক্ত তাপ বেরিয়ে যায়, সেইসঙ্গে শিশুটির মাথাও ঠাণ্ডা রাখে। অনেকেই বলেন, এর ফলে শিশুর আর মাথা ব্যথা হয় না, তাছাড়া, দাঁত উঠার কারণে যে ব্যথা হয়, তা থেকেও অনেকখানি মুক্তি পায় শিশুটি। এটা খুব স্বাভাবিক একটা ধারণা যে, চুল কাটার ফলে কোষগুলোর স্বাভাবিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায়, রক্ত সঞ্চালনও ভাল হয়, যা কিনা পরবর্তীতে ভাল এবং ঘন চুল গজাতে সাহায্য করে। বাঙালী এবং ভারতীয়দের বাইরে চীন এবং মঙ্গোলিয়াতেও বেশ ঘটা করে আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শিশুর প্রথম চুল কাটা হয়।

নবজাতকের মাথা ন্যাড়া করলে কি চুল ঘন হয়ে উঠে?

অনেকে মনে করেন, ছোটবেলায় বারবার মাথার সব চুল গোড়া থেকে ফেলে দিলেই বুঝি চুল ঘন হবে। এমন ভাবনার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই কোনো। আসলে বারবার চুল ফেলে দিলে চুলের গোড়াটা একটু মোটা হবে ঠিকই, কিন্তু চুলের সংখ্যা বাড়বে না।

মানুষের চুলের উৎপত্তি হয় খুলির নীচে থাকা ফলিকল থেকে। মাথার উপরের চুল নিয়ে যা কিছুই করা হোক না কেন তাতে ফলিকল থেকে চুল তৈরি হওয়াতে কোন প্রভাব ফেলতে পারেনা। মানুষের মাথার ত্বকে চুলের (হেয়ার ফলিকল) সংখ্যা জন্মগতভাবে যা থাকে, তার চেয়ে কখনোই বৃদ্ধি পায় না। তাই ন্যাড়া করলেই চুল ঘন হবে, এটা ভাবা ভুল। চুলের ভালোমন্দ অনেকটা জিনগত এবং বাকিটা দৈহিক পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর করে।

চুল ন্যাড়া করার পর যখন চুল উঠে তখন তা দেখতে অনেক ঘন মনে হয় কারণ চুলের গোঁড়াগুলো সব একসাথে গজায় এবং একই দৈর্ঘ্যের থাকে। কিন্ত যখন চুল বাড়তে দেয়া হয় তখন সব চুল সমানভাবে এবং একইসাথে বাড়েনা। এছাড়াও চুলের বয়স যত বাড়তে থাকে ততই চুল পাতলা হতে থাকে কারণ চুলের আগার চাইতে চুলের গোঁড়ার ঘনত্ব সবসময় বেশি থাকে। এ কারনে চুল ছাঁটার পর আমাদের চুল অনেক ঘন মনে হয়।

এ ধরনের ধারনা হওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে, বাচ্চা জন্মের সময় যে চুল নিয়ে জন্মায় তা সাধারণত শিশুর চার মাসের দিকে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ঝরে যায়। এর পর শিশুর যে চুল গজায় তা জন্মের সময়কার চুল থেকে পুরোপুরি ভিন্ন হতে পারে। এমনও হতে পারে শিশুর জন্মের সময় পাতলা চুল  ছিল (যা বেশীরভাগ শিশুর ক্ষেত্রেই থাকে) কিন্ত এর পর যখন নতুন চুল গজায় তা অনেক ঘন হয়ে ওঠে। এতে অনেকের ধারনা হতে পারে চুল ন্যাড়া করার কারনেই হয়তো এমনটা হয়েছে।

প্রত্যেক মানুষ নির্দিষ্ট সংখ্যক ফলিকল নিয়ে জন্মায়। এই ফলিকলই নির্ধারণ করে আমাদের চুল কি পরিমান এবং কি ধরনের হবে। তাই মাথার চামড়ার উপরে আমরা যা কিছুই করিনা কেন তাতে আমাদের চুলার সংখ্যা কখনও বাড়বেনা।

তবে শিশুর চুল কতটা স্বাস্থ্যবান হবে, তা নির্ভর করে শিশুর পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের ওপর। তাকে দুধসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য দিতে হবে সময়মতো। অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি বিভিন্ন খনিজ উপাদান শিশু সঠিকভাবে পাচ্ছে কি না তা খেয়াল রাখতে হবে।

নবজাতকের চুল কখন কাটা যেতে পারে?  

নবজাতকের চুল কখন কাটতে হবে সে বিষয়ে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করবে প্রয়োজনের উপর। যদি নবজাতক গরমে কষ্ট পায় তো চুল কেটে ফেলা ভালো। আবার শীতে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো হবে। শীতে নবজাতককে ঠান্ডার হাত থেকে চুল অনেকখানিই বাঁচাবে। অনেকে বলেন, বাচ্চার চুল ফেলে দিলে তার মাথার স্মায়ুগুলোর ক্ষতি হবে। চুল ফেললে স্মায়ুর ক্ষতি হবে, এ রকম কোনো কথাই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত নয়। মনে রাখবেন কোন সমস্যা ছাড়াই পৃথিবীর কোটি কোটি বাচ্চাকে জন্মের পর অল্প সময়ের ব্যাবধানে চুল ন্যাড়া করা হয়েছিল এবং হচ্ছে ।

কেউ যদি ধর্মীয় কারনে ৭ দিনে বাচ্চার চুল ফেলতে চান, ফেলতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। চুল ন্যাড়া করার সময় দীর্ঘ সময় সাবান-পানির সংস্পর্শে রাখা হলে শিশুর নিউমোনিয়া হতে পারে। বাচ্চাদের মাথার তালু থাকে খুবই নরম, একটা জায়গায় শুধু চামড়া থাকে (স্কাল থাকেনা) কাজেই চুল ফেলার সময় যেকোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ক্ষুর বা রেজর এর ভুল ব্যাবহারে মাথায় আঘাত লাগতে পারে বা ইনফেকশন হতে পারে।

এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রফেশনাল লোকের সাহায্য নিতে হবে। চেষ্টা করুন যাতে দিনের বেলা, বিশেষ করে সকালে যাতে চুল কাটা হয়। কারণ এ সময় বাচ্চার মুড ভালো থাকে। নিশ্চিত করুন যে, আপনার শিশু যথেষ্ট বিশ্রাম নিয়েছে। কোন কারণে যদি আপনার শিশুর মেজাজ বিগড়ে গিয়ে থাকে, বা অস্থির/চঞ্চল থাকে, তবে তাকে সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

নিশ্চিত করুন যে, চুল কাটার যন্ত্রপাতি সব জীবাণুমুক্ত। বিশেষ করে আপনি যদি শিশুকে মসজিদ, মন্দির বা সেলুনে নিয়ে যান, তবে এটা নিশ্চিত করা আরও জরুরি। আর যদি আপনি বাড়িতেই চুল কাটার মনস্থ করে থাকেন, তবে যন্ত্রপাতিগুলো ভাল করে ধুয়ে জীবাণুমক্ত করে নিন। সবচেয়ে ভাল হয় কাচি, ব্লেড নতুন কিনে ফেলা। মনে রাখবেন, এতোটুকু অসতর্কতা সারা জীবনের জন্য কাল হয়ে উঠতে পারে।

নবজাতকের চুল কাটার আগে শিশুর মাথাটা ভাল করে ধুয়ে নিন। এজন্য আপনি ফিল্টার পানি বা আংশিক গরম পানি ব্যবহার করতে পারেন। তবে এজন্য আবহাওয়ার কথাটাও মাথায় রাখা জরুরি।শিশুর মাথায় কাটাছেঁড়া বা ক্ষত হলে সেখানে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম ব্যবহার করতে ভুলবেন না কিছুতেই।

তবে বেশীরভাগ বিশেষজ্ঞের মতে শিশুর বয়স অন্তত এক মাস হওয়ার পরে তার চুল ফেলা উচিত। কারণ এ সময়ের মধ্যে নবজাতকের মাথার খুলি একটু পরিপক্ক হয়।

নবজাতকের চুলের যত্ন

খুব বেশি গরম আবহাওয়ায় ন্যাড়া না করে, চুল কাঁচির সাহায্যে কেটে কিছুটা ছোট করে রাখা যেতে পারে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য শিশুর শরীর হালকা গরম পানি দিয়ে ধোয়ালেও মাথা ধোয়ানোর সময় অবশ্যই স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করতে হবে। বেবি-শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হবে সপ্তাহে দুই-এক দিন। তবে শিশুর চুলে খুশকি হলে তা ভালো হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত  ওর চুলে তেল দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। শ্যাম্পু করার সময় শিশুর মাথা আলতোভাবে মাসাজ করতে হবে। জোরে মাসাজ করলে শিশুর ফলিকল খতিগ্রস্থ হতে পারে।

বড়দের শ্যাম্পু ছোটদের চুলে লাগাতে গেলে শিশুর চোখে জ্বালাপোড়া হতে পারে, এছাড়া কেমিক্যাল যুক্ত শ্যাম্পু পরিহার করা আবশ্যক। তাই শিশুদের উপযোগী শ্যাম্পু কিনুন। ছোট-বড় সব শিশুর ক্ষেত্রেই খেয়াল রাখতে হবে, যেন মাথা ধোয়ানোর পর চুলের গোড়া ভালোভাবে মুছে শুকনো করে রাখা হয়। চুলের গোড়া ভেজা থাকলে শিশুর ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। আর বড়দের মতো শিশুদের চুলে কোনো ধরনের কন্ডিশনার লাগানোর প্রয়োজন নেই।

বাচ্চার চুল আঁচড়ানোর জন্য নরম ব্রিসলের ব্রাশ ব্যাবহার করুন। চিরুনি ব্যাবহার না করাই ভালো। এমনভাবে হেডব্যান্ড ব্যাবহার করবেন না যাতে বাচ্চার চুলে টান পড়ে।

অনেক সময় নবজাতকের মাথার চামড়া উঠে যেতে পারে। ফাঙ্গাস, অ্যালার্জি বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে এটা হয়। চামড়া ওঠা রোগ হওয়া মাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অনেকে এটা তুলতে সরিষার তেল ব্যবহার করেন। কিন্তু সরিষার তেল নবজাতকের মাথায় লাগানো উচিত নয়। বাচ্চাদের ব্যবহার উপযোগী অন্য যেসব তেল বাজারে পাওয়া যায়, সেগুলো লাগানো যেতে পারে।

অনেকের ধারণা, নবজাতকের মাথায় অনেক বেশি তেল দিলে মাথার তালুতে হলুদ বা বাদামি আঁশের মতো স্তর পড়ে। একে ‘ক্রেডল ক্যাপ’ বলে। আসলে ক্রেডল ক্যাপ হয় মূলত মাথার তালুতে অনেক বেশি সিবাম বা তেল উৎপন্ন হলে। এর জন্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অয়েন্টমেন্ট লাগাতে হবে।

 

Related posts

Leave a Comment