নবজাতকের গোসল । কখন এবং কিভাবে

যারা নতুন নতুন মা হয়েছেন, বা হতে যাচ্ছেন, তাদের বাচ্চাদের বিষয়ে চিন্তার শেষ নেই। কখন কি করতে হবে, কিভাবে করতে ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তার অন্ত নেই। তার মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নবজাতকের গোসল ।

শিশুদের গোসল করানো নিয়ে আমাদের দেশে প্রচলিত আছে নানা ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার। নানা নিয়মকানুনও চালু আছে সমাজে। এগুলো সব সময় স্বাস্থ্যসম্মত কি না, জন্মের কত দিন পর কীভাবে গোসল করানো উচিত ইত্যাদি জেনে নেওয়াই ভালো।

জন্মের কতদিন পর নবজাতকের গোসল করানো উচিত?

জন্মের ঠিক কতদিন পর থেকে বাচ্চাকে গোসল করানো যাবে সে বিষয়ে মতভেদ আছে। কিছু কিছু বিশেষজ্ঞের মতে বাচ্চা যদি ফুল টার্ম হয় এবং সুস্থ সবল থাকে তবে জন্মের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর থেকেই বাচ্চাকে গোসল করানো যাবে। তারা বলেন এসব ক্ষেত্রে গোসলের কারনে বাচ্চার আম্বিলিকার কর্ডের স্থান শুকানো তেমন বাধাগ্রস্থ হয়না। তবে প্রতিবার গোসলের পর আম্বিলিকার কর্ড বাঁ নাভিরজ্জুর স্থানটি ভালভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। কম ওজনের অসুস্থ দুর্বল শিশুর অনেক সময় দেহের তাপমাত্রা বেশি কমে যেতে পারে বলে আরও দেরি করা যেতে পারে, তা না হলে স্বাভাবিকভাবে একটি নবজাতক শিশুকে পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত করতে তিন দিনের বেশি দেরি করার কোনো অর্থ হয় না।

আবার অনেকের মতে বাচ্চার নাভি পড়ে যাওয়ার পর ক্ষতটি শুকিয়ে গেলে গোসল শুরু করা উচিত। অনেক বাচ্চার জন্মের পর পর সারকামসাইজ করা হয়। সে খেত্রেও ক্ষতস্থান শুকানোর পর গোসল শুরু করতে বলা হয়।

তবে একটি বিষয়ে সবাই একমত যে জন্মের পর থেকে বাচ্চার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে বাচ্চার মাথা থেকে পা পর্যন্ত পরিস্কার ভেজা নরম কাপড় দিয়ে বা স্পঞ্জ করে মুছে দেয়া যাবে।

আপনার নবজাতককে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে সপ্তাহে ২/৩ বার গোসল করানোই যথেষ্ট। অবশ্য আপনি চাইলে আপনার বেবিকে প্রতিদিনই গোসল করাতে পারেন, তাতেও কোনো সমস্যা নাই । গোসলের সময়, আপনার শিশুর মুখমন্ডল নিয়মিত ধুয়ে দিবেন, তার প্রাইভেট পার্ট ভালো করে পরিষ্কার করবেন( প্রতিবার ন্যাপি পরিবর্তনের পরও)।

আপনার এলাকার পানি যদি খরপানি হয়, তবে মনে রাখবেন প্রথম মাসে বা তার পরেও সেই পানি আপনার শিশুর ত্বক শুষ্ক করে দিতে পারে এবং ত্বকের অন্যান্য ক্ষতিও করতে পারে। আপনার বাচ্চার ত্বককে রক্ষা করার জন্য এক্ষেত্রে পানির সাথে অল্প পরিমানে বাচ্চাদের ব্যবহার উপযোগী তরল ক্লিনজার বা গোসলের ময়েশ্চারাইজার মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন।

তবে সাবধান! ময়েশ্চারাইজার ব্যাবহারে আপনার শিশুর শরীর অনেকটা পিচ্ছিল থাকবে, খুব সতর্কতার সাথে বাচ্চাকে ধরবেন যেন পরে না যায়।

বাচ্চাকে কিভাবে স্পঞ্জ করাবেন

প্রথমেই রুমের তাপমাত্রা যাতে সামান্য উষ্ণ থাকে সে ব্যাবস্থা করুন। রুমের ফ্যান অফ করুন। দরজা জানালা বন্ধ করে দিন। একটি পাত্রে হালকা গরম পানি নিন। বাচ্চার ন্যাপি এবং পরিষ্কার কাপড় হাতের কাছে রাখুন। এরপর বাচ্চার কাপড় খুলে তাকে একটি পরিষ্কার টাওয়েল এর উপর শুইয়ে দিন যাতে স্পঞ্জ করার সাথে সাথে বাচ্চার গা শুকিয়ে নেয়া যায়।

প্রথমেই বাচ্চার চোখ পরিষ্কার করুন। এজন্য নরম তুলা বা কাপড় পানিতে ভিজিয়ে চিপে পানি ফেলে দিন। বাচ্চার নাকের দিক থেকে শুরু করে আলতোভাবে বাচ্চার চোখ দুটো মুছে দিন। দুটো চোখ মোছার জন্য আলাদা আলাদা তুলা বা কাপড় ব্যাবহার করার চেষ্টা করুন যাতে এক চোখের ময়লা অন্য চোখে না লাগে।

এরপর কাপড় বা তুলা আবার পানিতে ভিজিয়ে বাচ্চার কান এবং কানের পেছনের অংশ পরিষ্কার করুন। কানের ভেতর পরিষ্কার করার চেষ্টা না করায় ভালো। এরপর বাচ্চার মুখ, গলা এবং হাত পরিষ্কার করুন। একটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরী- যদি বাচ্চার শরীরে সাদা এবং তেলতেলে ভারনিক্স এর স্তর দেখেন তবে তা ধুয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করবেন না। ভারনিক্স বাচ্চার ত্বকের জন্য খুবই উপকারী এবং কিছু দিন পর এটি আপনা আপনি চলে যায়।

এরপর একইভাবে বাচ্চার নিম্নাঙ্গ পরিষ্কার করুন।  পরিষ্কার করা শেষ হলে বাচ্চার গা আলতো করে মুছে শুকিয়ে নিন। এর পর বাচ্চাকে টাওয়েল এ জড়িয়ে কিছুক্ষন বুকে জড়িয়ে ধরে রাখুন যাতে বাচ্চা উষ্ণতা পায়।

বাচ্চাকে কিভাবে টাবে গোসল করাবেন

গোসল করানোর আগে খেয়াল রাখতে হবে ঘর বা বাথরুমের তাপমাত্রা যেন সামান্য উষ্ণ থাকে। ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে দিন। ফ্যান অফ করে দিন।

যিনি গোসল করাবেন তাঁর হাত ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। আগে থেকেই বাথটাবে কুসুম গরম পানি তৈরি রাখুন।নবজাতকের গোসলে কখনোই স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করবেন না। কুসুম গরম পানিই উত্তম। এতে বাচ্চার ঠাণ্ডা লেগে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না।

শিশুর গা মোছানো ছাড়াও ভেজা শরীর ধরার জন্য বাড়তি কাপড় বা তোয়ালে ও পরিধেয় কাপড় সঙ্গে রাখুন। গোসলের আগে কাপড় খুলে মলমূত্র থাকলে তা পরিষ্কার করে তারপর শিশুকে বাথটাবে নামাতে হবে।

গোসলের জন্য আগে থেকেই বাথটাবে বা একটি বোলে হালকা গরম পানি তৈরি রাখুন। আরেকবার দেখে নিন পানি যেন বেশি গরম না থাকে। যদি থার্মোমিটার থাকে তবে পানির তাপমাত্রা ৩৭ বা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মদ্ধে আছে কিনা দেখে নিন। যদি থার্মোমিটার না থাকে তবে হাতের কনুই দিয়ে পানি গরম কিনা তা পরীক্ষা করুন। বাথ টাবে খুব বেশী পানি নেয়ার প্রয়োজন নেই। টাবটি পাঁচ ইঞ্ছি মত ভর্তি করলেই যথেষ্ট।

নবজাতককে গোসল এর আগে প্রথমে তার শরীরে কোন ময়লা লেগে থাকলে তা পরিষ্কার করুন। তাই প্রথমে তুলা দিয়ে বাচ্চার মুখ, চোখ মুছে নিন। তারপএ তুলা ভিজিয়ে তুলার পানি চিপে ফেলে দিন। ভিজে তুলো দিয়ে পুনরায় মুখ, গাল, চোখ, কান, গলা মুছে দিন। শিশুদের শরীর খুব নরম ও কোমল হয়। তাই খুব জোরে ঘষবেন না। আপনার কাছে যে ঘষাটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে তা ছোট্ট বাচ্চাটির জন্য জোরালোও মনে হতে পারে। শিশুকে যতটা সম্ভব আলতো করে স্পর্শ করুন।

এরপর শিশুটিকে কোলে নিয়ে তার মাথাটি বাথ টাব এর উপর নিন। আপনার হাতের তালুলে পানি নিয়ে দুই থেকে তিনবার তার মাথাটি ভিজিয়ে দিন। এরপর সাথে সাথে মাথাটি আলতো করে মুছে টিস্যু বা তোয়ালে দিয়ে মুছে দিন।

এরপর শিশুর শরীরে কোন কাপড় বা তোয়ালে থাকলে তা খুলে নিন। দুই হাত দিয়ে একটু বাকা করে ধরুন যাতে মাথা ও গলা পানির উপরে থাকে। এভাবে আস্তে আস্তে শিশুকে পানিতে নামান।অল্প অল্প পানির ঝাপ্টা দিয়ে গলার নিচ থেকে সারা শরীর মুছে দিন। শিশুটিকে ৪০-৫০ সেকেন্ডের বেশি পানিতে না রাখাই ভাল।

এবার গোসল শেষ করে, আস্তে করে শিশুকে পানি থেকে তুলে, তোয়ালে দিয়ে তার শরীর জড়িয়ে দিতে হবে। যেন, বাচ্চার শরীরের পানি তোয়ালে শুষে নেয়। এবং শরীর সহজেই শুকিয়ে যায়। টাওয়াল বা পোশাক আগে থেকে বাথটাবের পাশে রাখবেন। গোসল করানোর পর এসব খুঁজতে যাবেন না। তাহলে বাচ্চার ঠান্ডা লেগে যাবে। সে সঙ্গে শিশুর পরিধেয় বস্ত্রও আগে থেকে তৈরি রাখতে হবে। গোসল করানো শেষে বাচ্চাকে বাথটাব থেকে উঠিয়ে নেওয়ার সময় খুব সাবধান থাকতে হবে। এ সময় আপনার হাতে সাবান বা শ্যাম্পু লেগে থাকলে হাত পিছলে বাচ্চা পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

শিশুর শৌচকার্যজনিত দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে একটি পরিস্কার ডায়াপার পরিয়ে দিন।

আসলে গোসল করানোর পুরো প্রক্রিয়াটাতেই নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ প্রয়োজন। তাই অনেকে মিলে হৈচৈ না করে, যেকোনো একজন গোসল করানোর দায়িত্ব পালন করুন। মনে রাখবেন, বাচ্চাকে প্রথমবার পানির সংস্পর্শে আনছেন, তাই সে কিছুটা অসুবিধা বোধ করতেই পারে। অনেক নবজাতকই এ সময় কেঁদে ওঠে। বাচ্চাকে তাই ধীরে ধীরে পানির সংস্পর্শে আনুন। কিছুক্ষণ পরেই বাচ্চা পানির সঙ্গে মানিয়ে নেবে। তবে বেশি কান্না করলে পানি থেকে উঠিয়ে নিন।

নবজাতককে গোসল এর পর নবজাতকের ঘাড়, পিঠ আলতো করে ম্যাসাজ করে দিতে পারেন। বেশীরভাগ শিশুই এতে খুব আরাম পায়।

গোসলের পানিতে অ্যান্টিসেপটিকের ব্যবহার

ছোট বা বড় কারোরই গোসলের পানিতে সব সময় ডেটল, স্যাভলন, সেনিটাইজার বা অ্যান্টিসেপটিক দ্রবণ ব্যবহার করা উচিত নয়। অ্যান্টিসেপটিক দ্রবণ বা সাবান ত্বকের উপকারী জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়াকেও ধ্বংস করে। ফলে ত্বকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাহত হয় ও ক্ষতিকর জীবাণুর সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়ে। তা ছাড়া এগুলো বেশ কড়া রাসায়নিক ও ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। এমনিতে নবজাতক শিশুরা যেহেতু বাইরের ধুলা-ময়লার সংস্পর্শে তেমন আসে না, তাই রোজ সাবান দেওয়ারও দরকার নেই। সপ্তাহে এক দিন সাবান ও শ্যাম্পু সহযোগে গোসল করাতে পারেন।

বেশি গোসল করালে ঠান্ডা লাগে?

নিয়মিত ফোটানো কুসুম গরম পানিতে গোসল করালে শিশুর ঠান্ডা লাগার কথা নয়। বরং আমাদের এই উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় গোসল না করালেই বরং শিশু অস্বস্তি বোধ করে, বারবার ঘেমে যায়। ঘাম বসে গিয়ে ঠান্ডা লাগতে পারে। এ ছাড়া অপরিচ্ছন্ন থাকলে চর্মরোগ বা ছত্রাক সংক্রমণ ইত্যাদিও হতে পারে। যেকোনো আবহাওয়ায় ছোট-বড় শিশুকে প্রতিদিন হালকা গরম পানিতে গোসল করানো উচিত। কেননা শিশুরা সাধারণত বেশি ঘামে। বৃষ্টির দিন, মেঘলা দিন বা আবহাওয়া ঠান্ডা থাকলে গোসল করাতে না চাইলে হালকা গরম পানিতে আরামদায়ক সুতি কাপড় ভিজিয়ে শরীর মুছে দিন। গোসলের সময় ও পরপরই ফ্যান বন্ধ রাখুন। গোসল শেষে দ্রুত শুকনা কাপড় বা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে জামাকাপড় পরিয়ে দিন। এতে ঠান্ডা লাগার সম্ভাবনা থাকবে না। মাথা ও চুলে যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকেও লক্ষ রাখুন।

একটা বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখবেন। নবজাতকের গোসল এর সময় বাচ্চাকে একা টাবে রেখে এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও যাবেন না। টাবের এক ইঞ্ছি পানিতেও বাচ্চা ডুবে যেতে পারে এবং খুব অল্প সময়েই তা হতে পারে।

Related posts

Leave a Comment