নবজাতককে দেখতে যাওয়ার সময় যে বিষয়গুলো মনে রাখা উচিত।

প্রিয় বন্ধু বা ভাই-বোনের অথবা কোন আত্মীয়ের পরিবারে নতুন অতিথি এসেছে। আপনি সদ্য খালা, ফুফু বা কাকা-মামা হয়েছেন। এই আনন্দ অনেকেই চেপে রাখতে পারেন না। অতি উত্সাহে দেখতে চলে যান সদ্যোজাতকে। খুশির চোটে এমন কিছু করে ফেলেন যা সদ্যোজাতদের সঙ্গে কখনওই করা উচিত নয়। চিকিত্সকেরা কিন্তু এই সব ব্যাপারে সাবধান থাকতে বলেন।

নবাগত শিশুর প্রতি ভালোবাসা দেখানো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আদর দেখাতে গিয়ে অপর পক্ষের (মা-বাবা) কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছি না তো? নবাগত শিশুকে দেখতে যাওয়ার আগে ও পরের কিছু নিয়মনীতি আছে। জেনে নেওয়া যাক এক ঝলকে।

হাসপাতালে যাবেন না

প্রিয় বন্ধু বা কাছের কারও সন্তান হয়েছে খবর পেয়েই হাসপাতালে দেখতে ছুটে যাবেন না। শিশুর জন্মের পর শিশুর কিছুটা সময় শুধু মায়ের সঙ্গে থাকা উচিত।

দ্বিতীয়ত, যত বেশি বাইরের লোক যাওয়া-আসা করবে ততই মা ও শিশুর ইনফেকশনের সম্ভাবনা বাড়বে।তার চেয়ে বরং নতুন বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করুন, তাদের কী প্রয়োজন। শিশু বাড়িতে এলে প্রয়োজনীয় জিনিস, খাবার বা উপহার নিয়ে দেখতে যান।

আমন্ত্রিত হয়ে যান

নতুন শিশু বাসায় আসার পর মা-বাবার ওপর দিয়ে বেশ বড় একটা ধকল যায়। রাত-দিনের কোনো হিসাব থাকে না তখন। ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় লাগে। এর মধ্যে হুট করে না জানিয়ে অতিথি হয়ে উপস্থিত না হওয়াই ভালো।

ফোন করে কোন সময়টিতে গেলে তাঁদের জন্য ভালো হয়, জিজ্ঞেস করে নিন। চেষ্টা করুন সে সময়েই যাওয়ার। কথাটা শুনে হয়তো একটু বিব্রত হচ্ছেন। নতুন শিশু দেখতে যাব, এতে আর ফোন করার কী আছে? তবে কোনো নবজাতকে দেখতে যাওয়ার আগে ফোন করে যাওয়াই ভালো কেননা,শিশুটির বাবা-মা হয়তো তাকে নিয়ে বেশ ব্যস্ত আছেন বা কোনো সমস্যায় আছেন। এমন সময় গেলে তাদের হয়তো বিরক্ত লাগতে পারে। তাই যাওয়ার আগে ফোন করুন। এতে তাঁরা প্রস্তুত থাকতে পারবেন আপনার জন্য।

কোলে নেবেন না

দেখতে গিয়েই শিশুকে কোলে তুলে নেবেন না। বিশেষ করে বাচ্চা যদি ঘুমিয়ে থাকে। ঘুমন্ত বাচ্চাকে কোলে নিতে গেলে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। এতে স্বাভাবিক ভাবেই শিশুর মা বিরক্ত হবেন। যদি একান্তই কোলে নিতে ইচ্ছা করে তা হলে মায়ের অনুমতি নিন।

কোনভাবেই নবজাতকের শরীরের কোন অংশেই চুমু দেবেন না। 

নবাগত শিশুকে কোলে নেওয়ার পরে কান্নাকাটি শুরু করলে মায়ের কোলে ফেরত দিয়ে দিন। জোর করে নিজের কোলে না রাখাই তখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে খেয়াল রাখুন

হাসপাতাল বা বাসা যেখানেই হোক না কেন অবশ্যই রুমের বাইরে জুতা খুলে প্রবেশ করাটাই সমীচীন। এতে করে বাইরে থেকে কোন জীবানু ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে মা এবং নবজাতক দুজনই সুস্থ থাকবে।

শিশুর বাড়িতে পৌঁছানোর পর বা হাসপাতালে যাওয়ার পর অবশ্যই হাত-পা ভালোভাবে ধোবেন। এতে শিশু সংক্রমণের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবে।

শিশুকে কোলে নেওয়ার আগে অবশ্যই হাত ধুয়ে নেবেন। কারণ শিশুরা অনেক দ্রুত জীবাণুতে আক্রান্ত হয়ে যায়। অনেক সময় মা-বাবা লজ্জার কারণে বলতে পারেন না। ভাবেন, অতিথি মন খারাপ করবেন। এটা আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে,হাত-মুখ পরিষ্কার করে নিয়ে বাচ্চা কোলে নেবেন। হাত পরিষ্কারের জন্য বাজারে অনেক ধরনের জীবাণুরোধী লিকুইড ওষুধ পাওয়া যায়, সেগুলোও ব্যবহার করতে পারেন। 

ছোট বাচ্চা বা স্কুলে যাওয়া বাচ্চাদের শরীরে অনেক জীবাণু থাকতে পারে। তাই ছোট বাচ্চাদের নিয়ে নবজাতককে দেখতে না যাওয়াই ভালো।

বেশি মাত্রায় পারফিউমের ব্যবহার করে নবজাতককে দেখতে যাবেন না। এটি শিশুর অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশনের কারণ হতে পারে। সবচেয়ে ভালো হয় পারফিউম না ব্যবহার করতে পারলে।

সিগারেটের ধোঁয়া শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এ কারণে অ্যালার্জি হতে পারে। তাই নবজাতককে দেখতে গেলে বা যাওয়ার আগে অবশ্যই ধূমপান এড়িয়ে যাবেন।

অসুস্থ হলে যাবেন না

আপনি অসুস্থ থাকলে নবজাতককে দেখতে যাবেন না। কারণ শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা একটু কম থাকে।তাই আপনার সংক্রমণ শিশুর গায়ে ছড়িয়ে তাকেও অসুস্থ করে তুলতে পারে। নিজে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পরই নবজাতক ও নতুন মাকে দেখতে যাবেন। শিশুর মা কখনই চাইবেননা তার সন্তানের সামনে বসে আপনি হাঁচি বা কাশি দিয়ে বসেন। তাই এই অসংবেদনশীল আচরণ করবেন না।

আস্তে আস্তে কথা বলুন

নবজাতককে দেখতে গেলে বেশি চিৎকার-চেঁচামেচি করবেন না। আস্তে আস্তে কথা বলুন। হয়তো শিশুটি ঘুমিয়ে আছে, আপনার চেঁচামেচিতে তার ঘুম ভেঙে যেতে পারে।

উপহার যেন কাজে লাগে

সচরাচর নতুন শিশুকে দেখতে গেলে আমরা উপহার দিই। তাই উপহার দিলে এমন কিছু নির্বাচন করুন,যেটি শিশুর কাজে লাগে।

বেড়াতে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় খাবার নিয়ে যেতে পারেন। বাড়িতে সাহায্যকারী না থাকলে নতুন মায়ের জন্য এটাই বোধ হয় সবচেয়ে বড় উপহার। প্রথম কয়েক সপ্তাহ বাড়িতে খাবার থাকলে মাকে রান্নাবান্না নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।

শিশুকে উপহার হিসেবে লোমযুক্ত খেলনা দেবেন না। এতে শিশুর শ্বাসকষ্টের সমস্যা হতে পারে। নবজাতকের ক্ষেত্রে খেলনার চেয়ে পোশাককেই আদর্শ উপহার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফুল নিয়ে নবজাতককে দেখতে যাওয়া ঠিক নয়, কারন ফুলে অনেক সময় অনেক ধরনের জীবানু থাকতে পারে যা নতুন আসা অতিথির জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর। যদিও কেউবা ফুল নিয়েও আসে তবে অবশ্যই মা এবং নবজাতকের থেকে দূরে রাখতে হবে।

অযাচিত উপদেশ বা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন

আপনার সন্তান হওয়ার যে অভিজ্ঞতা, আরেকজনের বেলায় তেমনটা না-ও হতে পারে।নতুন মা-বাবা জানতে না চাইলে কোনো ধরনের উপদেশ দেবেন না। এতে অনেক সময় বিরক্ত লাগতে পারে।

ছেলে হলে ভালো হতো না মেয়ে হলে ভালো হতো, গায়ের রং কালো না ফরসা, চুল কম না বেশি—এসব বিষয় নিয়ে কোনো রকম নেতিবাচক আলোচনা করবেন না। নাম পছন্দ না হলেও বলুন,নামটা সুন্দর। অনেক মা আছেন,যাঁরা সন্তান হওয়ার সময় বেশ মোটা হয়ে যান। অতিথি যতই কাছের লোক হোন না কেন, এ বিষয়টি মাকে মনে করিয়ে না দিলেও হবে।ভালো কথা বলুন, মা-বাবার মনখারাপ হয়ে যাবে, এমন কোনো কথানা বলাই ভালো।

আরাম করতে দিন

নবাগত শিশুকে দেখতে গিয়ে বেশিক্ষণ না থাকাই ভালো। মা ও সন্তানকে বিশ্রাম করতে দিন। আপনি যত নিকটাত্মীয়ই হোন না কেন, মা যখন সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াবেন, সেখান থেকে সরে আসুন। মা অনুমতি দিলে থাকতে পারেন। তবে বুকের দুধ কীভাবে খাওয়াবেন,বাচ্চা পাচ্ছে কি না—এ নিয়ে বেশি কথা না বলাই ভালো।

যদি নতুন মা আপনার খুব কাছের লোক হয়, তাহলে কোনো সাহায্য লাগবে কি না, তাঁকে জিজ্ঞেস করুন। হয়তো রান্নাঘরে কিছুটা কাজ করে দিলেন বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে এনে দিলেন। বাচ্চার দেখভাল করতে গিয়ে অনেক কাজই করার সময় পাওয়া যায় না।যতটা সম্ভব সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করার চেষ্টা করুন।

ছবি তুলবেন না

সদ্যোজাত শিশুদের ছবি তোলা উচিত নয়। অযথা ছবি তুলবেন না বা ছবি তোলার জন্য বাবা,মায়ের অনুমতি চাইবেন না। ফ্লাশের আলো শিশুদের জন্য ভাল নয়। অনেক মাস গর্ভে থাকার পর বাইরে এসে এমনিতেই অনেক আলোর মধ্যে পড়তে হয় ওদের।

বাবা মাকে জিজ্ঞাসা না করে কোন ভাবেই শিশুর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট করবেন না।

সবশেষে মনে রাখবেন, বাচ্চার জন্মের পর পর অনেক আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব মা কে ঘিরে রাখেন যে সময়টা মায়ের এবং বাচ্চার নিজের মত থাকাটা জরুরী। কিন্তু কিছুদিন পরেই সব খবারাখবর নেয়া বন্ধ হয়ে যায় যে সময়টাতে মায়ের বিভিন্ন মানসিক কারণে অন্যদের সঙ্গটা বেশী দরকার হতে পারে। তাই এই সময়টাতে মাঝেমাঝে মায়ের এবং বাচ্চার খবর নেয়ার চেষ্টা করুন। তাদের সুবিধা অসুবিধার কথা জিজ্ঞেস করুন। কিভাবে সাহায্য করতে পারবেন তা জানুন। এগুলোই হবে মা এবং নবজাতকের প্রতি প্রকৃত সাহায্য করা।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.