খাওয়ানোর জন্য নবজাতককে ঘুম থেকে জাগানো কি উচিত ?

“আমার শিশু রোগবিশেষজ্ঞ আমাকে বলেছিলেন, আমার পাঁচদিন বয়সী শিশুকে প্রতিঘন্টায় দু থেকে তিনবার স্তন্যপান করাতে। কিন্তু মাঝে মাঝে সে চারঘন্টার মত একটানা ঘুমিয়ে থাকে।আ্মি চাইনা আমার সোনামনিকে বিরক্ত করে ঘুম থেকে তুলে দিতে যখন সে ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু আমার কি আসলেই তাকে খাওয়ানোর জন্য ঘুম থেকে তুলে দিতে হবে?”

আপনার ঘুমন্ত শিশুকে ঘুম থেকে জাগাতে না চাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ন বোধগম্য। কেননা, আপনার সোনামনিকে অত্যন্ত আদুরে আর প্রশান্ত লাগে যখন সে ঘুমিয়ে থাকে। বিশেষ করে আপনি যখন তার জেগে থাকার সময়ের কান্নাকাটির কথা ভাবেন, আপনার মনে হতে পারে আপনার শিশুকে ঘুম থেকে তুলে দিলে সেটা তার প্রতি অপরাধ করার চাইতে কোন অংশে কম নয়।

আপনার  নবজাতকের খাওয়ানোর সময়সূচি কখনও কখনও অসহ্য মনে হলেও, এইমুহূর্তে, এটি তার স্বাস্থ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ— এবং আপনার বুকের দুধের সরবরাহ ঠিক রাখতেও তা জরুরী । এতে যদি আপনার এবং আপনার সোনামনির ঘুমের স্বপ্নে বাঁধা পরে, তবু ও।

 

কেন আপনার নবজাতক শিশুকে খাওয়ানোর জন্য ঘুম থেকে জাগাবেন?

The American Academy of Pediatrics (AAP) এর পরামর্শ মতে , আপনার শিশু যদি ৪ ঘণ্টার বেশি ঘুমিয়ে থাকে তবে জন্মের প্রথম দুই সপ্তাহ পর্যন্ত তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে খাওয়াতে হবে। (অথবা জন্মের পর তার হারিয়ে ফেলা ওজন আবার পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত)।  কিন্তু কেন আপনি আপনার নবজাতকে ঘন ঘন খাওয়াবেন?

শিশুদের পাকস্থলী খুব তাড়াতাড়ি খালি হয়ে যায়।

শিশুরা বুকের দুধ খুব তাড়াতাড়ি এবং সহজে হজম করে ফেলে (ফর্মুলার চাইতে দ্রুত)।আপনার দুই সপ্তাহের ছোট শিশুর পাকস্থলী পিং-পং বল এর চেয়ে সামান্য বড় থাকে তাই খুব তাড়াতাড়ি(২-৩ ঘন্টা পরপরই) তার ক্ষুধা লাগে। ( শিশুদের ফর্মুলা খাওয়ালে তুলনামূলকভাবে হজম হতে প্রথম মাসে চারঘণ্টা অথবা পাঁচঘণ্টা বা তারচেয়ে বেশি সময় লাগে, কারণ ফর্মুলা হজমে অনেক সময় লাগে ব্রেস্ট মিল্কের চেয়ে। )

আপনার সোনামনি খাওয়ার সময়টা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে পারে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুরা ক্ষুধা লাগলে ঠোঁটকামড়িয়ে ,আঙ্গুল চুষে অথবা জোরে কান্না করে আপনাকে বুঝাতে চেষ্টা করে যে তারা ক্ষুধার্থ। কিন্তুর জন্মের প্রথম সপ্তাহের সময়গুলোতে,  শিশুরা কখনও তাদের খাওয়ার সময়টি ঘুমের ভেতরেই পার করে দেয়। এতে তার শরীরের পুষ্টি ব্যাহত হতে পারে।

আপনার শিশুর সঠিক ওজন বৃদ্ধি  অত্যন্ত জরুরী।

পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার না খেলে শিশুদের ওজন বৃদ্ধি স্তিমিত হয়ে যেতে পারে। জন্মগ্রহণের পর প্রসবপদ্ধতির উপর নির্ভর করে নবজাতক শিশু তাদের শরীরের সাধারণত ৫ এবং ১০ শতাংশ ওজন হারিয়ে ফেলে, ।এটি পুন:রুদ্ধার করতেই তাদের প্রথম কয়েক সপ্তাহ চলে যায়। এছাড়াও জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহ পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার না খেলে শিশু জন্ডিস এবং লো ব্লাড শুগারের মত রোগে আক্রান্ত  হয়ে পড়তে পারে।

[ আরও পড়ুনঃ বয়স অনুযায়ী শিশুর ওজন ও উচ্চতা বৃদ্ধির চার্ট । ০-১২ মাস ]

আপনার বুকের দুধের সরবরাহ বাড়াতে

আপনার শিশুকে আপনি ঘন ঘন দুধ না খাওয়ালে আপনার ব্রেস্টমিল্ক কমে যেতে পারে। কেননা মায়ের বুকে দুধ তৈরি হওয়া একটা ‘ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই সিস্টেম’ অনুসরণ করে। অর্থাৎ শিশু যত দুধ টানবে, তত মায়ের মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি উদ্দীপ্ত হয়ে বেশি বেশি প্রলেকটিন হরমোন তৈরি করবে। তত বেশি দুধ উৎপাদিত হবে। বুকের দুধ তৈরির একমাত্র উদ্দীপক বা স্টিমুলাস হলো শিশুর দুধ টানা।  আপনি যদি দীর্ঘ সময় আপনার শিশুকে বুকের দুধ না খাইয়ে রাখেন তবে আপনার দুধের সরবরাহ কমে যেতে পারে।

[ আরও পড়ুনঃ মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধি করার কিছু সহজ উপায় ]

এ সকল কারণে, আপনার ঘুমন্ত শিশুকে আলতোভাবে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করুন যখন সে দীর্ঘ সময় না খেয়ে ঘুমিয়ে থাকে।

আপনার শিশুকে কিভাবে দুধ খাওয়াতে ঘুম থেকে তুলবেন?

যদি আপনার শিশু ঘুমিয়ে থাকে,তবে তাকে ঘুম থেকে তুলতে নীচের চেষ্টাগুলো করে দেখতে পারেনঃ

আপনার শিশুকে তখন খাওয়াতে চেষ্টা করুন যখন সে সক্রিয় ঘুম অথবা REM (Rapid Eye Movement চোখ নড়া চড়ার মুহূর্ত) থাকে। আপনার শিশু যদি গভীর ঘুমে থাকে, তবে বাকি প্ৰচেষ্টাগুলো বৃথা যেতে পারে। আপনি REM sleep বুঝতে পারবেন, কারণ তখন আপনার শিশু তার হাত এবং পা নাড়বে অথবা তার মুখাবয়ব পরিবর্তন করবে এবং চোখের পাতা পিটপিট করবে।

ধীরে ধীরে তার গায়ে জড়ানো কাঁথা বা কম্বল খুলতে থাকুন। যদি এটা কাজ না করে তবে তাকে কাপড়-চোপড় খুলে অনাবৃত করুন।

আপনার শিশুর ডায়পার পরিবর্তন করে দিন। এসময় গান করুন অথবা তার হাতের তালু এবং পায়ের পাতায় আলতো সুড়সুড়ি দিন।

আপনার শিশুকে খাড়াভাবে ধরুন। এভাবে ধরলে নবজাতক শিশুরা সাধারণে চোখে খুলে।

আলো ক্ষীণ করে দিন। যদিও আপনার মনে হতে পারে যে কেন এমন অদ্ভুত উপদেশ! এটার কারণ, আপনার রুম যদি অনেক আলোকিত হয়ে থাকে, তবে আপনার শিশুর হয়ত চোখ খুলতে অসুবিধা হবে এবং সে চোখ বন্ধ করে রাখতে পারে।

আপনার শিশুর সাথে কথা বলুন,তাকে গান শোনান এবং, যখন সে চোখ খুলে তাকাবে তখন তার চোখে চোখে রেখে কথা বলুন।

আপনার শিশুর হাত,পা , পিঠ এবং কাঁধ মালিশ করে দিন। আপনার স্পর্শ আপনার সোনামনিকে জাগাতে সাহায্য করবে।

 

রাতে আপনার শিশুকে কত সময় ধরে দুধ পান করাবেন?

যখন আপনার শিশু জেগে ওঠে এবং দুধ মুখে নেয়, তবে তাকে ততক্ষন পর্যন্ত খাওয়ান যতক্ষন পর্যন্ত আপনার একটা ব্রেস্ট খালি না হয় কেননা এতে করে সে তার বেড়ে উঠার জন্য চর্বি-সমৃদ্ধ দুধ বা হাইন্ড মিল্ক (Hind Milk)  পাবে।

[ আরও পড়ুনঃ নবজাতককে কত ঘন ঘন এবং কতক্ষণ ধরে দুধ খাওয়াতে হবে? ]

দুই স্তন থেকে অল্প অল্প খাওয়াবেন না। একবারে একটা স্তন খাওয়া শেষ হলে অন্য স্তনে দিন। কারণ দুধের প্রথম অংশ যাকে আমরা foremilk বলি তাতে কার্বোহাইড্রেট ও পানি থাকে। পরের অংশে hind milk এ fat থাকে। দুই স্তন থেকে অল্প অল্প খেলে সে প্রতিবারই পানি আর কারবোহাইড্রেট পাবে।

বাচ্চার প্রসাবের সাথে পানি বের হয়ে যাবে আর এই কার্বোহাইড্রেট হল ল্যাকটোজ, যেটা বেশি খেলে ওর ল্যাকটেজ এনজাইমটা অপর্যাপ্ত হবে। ফলে বেশি বেশি বা ফেনা ফেনা বা সবুজ পায়খানা হবে, মনেহবে ল্যকটোজ ইনটলারেনস হচ্ছে। বাচ্চা বারেবারে ক্ষুধার্ত হবে। একটি স্তন অনেকক্ষণ ধরে খাওয়ালে hind milk টাও পাবে তাতে fat বেশি বলে এটা ভাঙতে সময় নেয়। ফলে বাচ্চা দেরিতে ক্ষুধার্ত হবে। ওজনও দ্রুত বাড়বে।

তবে প্রতিবারে দু’দিকের স্তন থেকে দুধ  খাওয়ানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। একদিকের স্তন থেকে শিশুর পেট ভরে গেলে অপরটি পরবর্তী সময়ে খাওয়াতে হয়। শিশুর পেট ভরেছে কিনা বোঝার উপায় হলো : পেট ভরে গেলে শিশু আপনা আপনি দুধ খাওয়া ছেড়ে দেয়, তাছাড়া অপর বুকে দেয়ার পরেও শিশু আর খেতে চায় না।

কিছু শিশুর ৪৫ মিনিট বা তারও কিছু বেশি সময় লাগতে পারে একটি স্তন খালি করতে, যখন বাকিরা কাজটি ১০ মিনিট এ করতে পারে। এটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। পেট ভরে গেলে শিশু আপনা আপনি দুধ খাওয়া ছেড়ে দেয়, তাছাড়া অপর বুকে দেয়ার পরেও শিশু আর খেতে চায় না।

 

শিশুকে দুধ পান করাতে জাগিয়ে রাখুন

দুধ পান করা শিশুদের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক তাই খেয়াল রাখবেন যাতে আপনার সোনামনি  দুধ পান করতে করতেই ঘুমিয়ে না পড়ে।। যদি সে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ,তবে তাকে ঢেকুর তোলান, অবস্থান পরিবর্তন করুন, তার ঠোটে কয়েক ফোটা বুকের দুধ ফেলুন বা তার মুখে স্তন নাড়াচাড়া করুন। এতে সে আবার দুধ চোষা শুরু করবে।

ছয় সপ্তাহের মধ্যেই, আপনাদের দুইজনেরই নিয়মিত খাওয়া এবং ঘুমের একটি ছন্দ তৈরী হয়ে যাবে। যদিও এটা সম্পূর্ণরূপে আপনার শিশুর চাহিদার ওপর নির্ভর করবে। যেমন কিছু শিশু প্রতি দুঘন্টায় দুধ পান করতে চায়, যেখানে অনেক শিশুরা ঘুমের ভেতরেই তিন থেকে চারঘণ্টা আনন্দের সাথে কাটিয়ে দেয়।

মনে রাখবেন যে, আপনার শিশুর বৃদ্ধির সাথে সাথে খাওয়ার মধ্যবর্তী সময় ও বাড়তে থাকবে।  (এবং ছয়মাস বয়সে, আপনার শিশু পুরোরাত জুড়ে অথবা অন্তত লম্বা সময়জুড়ে ঘুমাতে শুরু করতে পারে।)

কিন্তু আপনি যদি তারপরও উদ্বিগ্ন থাকেন যে আপনার শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার পাচ্ছে কিনা অথবা তাকে ঘুম থেকে তুলতে আপনার যদি সমস্যা হয় এবং দিনে অন্তত আটবার সে দুধ পান করাতে না পারেন, তবে আপনার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে এই ব্যাপারে কথা বলুন যে তার ওজনবৃদ্ধি স্বাস্থ্যকর এবং সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা। তার মল মূত্র ত্যাগের দিকেও নজর রাখুন। নবজাতকদের দিনে অন্তত ৬-৮ বার পস্রাব করা স্বাভাবিক।

সবার জন্য শুভ কামনা।

Related posts

Leave a Comment