নবজতকের হেঁচকি ওঠা নিয়ে যে বিষয়গুলো জানা জরুরী

নবজাতকের হেঁচকি কেন হয়?

আমাদের বুক আর পেটের মাঝখানে মাংসপেশি দিয়ে তৈরি একটি দেয়াল বা পার্টিশন রয়েছে। এই মাংসপেশিকে ডায়াফ্রাম বলে। এই ডায়াফ্রাম অবিরত এক নির্দিষ্ট ছন্দে প্রসারিত ও সংকুচিত হয়। কোন কারনে স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়ে ডায়াফ্রাম যদি হঠাত বেশি করে সংকুচিত ও প্রসারিত হতে থাকে তবেই হেঁচকি উঠে।

ডায়াফ্রামের সংকোচন-প্রসারনের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করে “ফ্রেনিক নার্ভ” নামক এক বিশেষ ধরনের স্নায়ু। গলা বেশি শুকিয়ে গেলে বা ঝাল খেলে অনেকের ফ্রেনিক নার্ভ উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং তার ফলে ডায়াফ্রামের সংকোচন-প্রসারণ এর মাত্রা বেড়ে যায়। ডায়াফ্রামের এই সংকোচনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে, শ্বাসনালীর ভেতরের স্বররন্ধ্র থেকে খানিকটা বাতাস হঠাত করে বেরিয়ে যাওয়ার কারনে গলা দিয়ে এক অদ্ভুত শব্দ বেরুতে থাকে। একেই আমরা বলি- হেঁচকি উঠা।

ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এই হঠাৎ সংকোচন বা হেঁচকি ওঠার (Hiccup) প্রধান কারণ হলো খাওয়ার সময় বেশি বাতাস পেটে ঢুকে যাওয়া। বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুর এটা হতে পারে। আবার একটু বেশি খেয়ে ফেলা, অতিরিক্ত উত্তেজনা বা উদ্বেগও শিশুদের হেঁচকির কারণ হতে পারে। যে কারণেই হোক, এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই, এটা বাচ্চার স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠার একটি চিহ্ন বিশেষ।

মজার ব্যাপার হলো, গর্ভস্থ শিশুও মায়ের গর্ভে বসে হেঁচকি তোলে। অনেক সময় প্রেগ্ন্যন্সির শেষের দিকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করলে দেখা যায় বাচ্চা  হেঁচকি দিচ্ছে। এটা অনুভব করা একটু মুস্কিল এবং এটা লাথি নাকি হেঁচকি এটা বুঝা আরও জটিল, কারন দুটাই কাছাকাছি। যদি দুটাকে আলাদা করতে চান, তাহলে এরকম নরচরা হলে আপনি আপনার অবস্থান পরিবর্তন করবেন, একটু হাটাচলা করবেন। যদি দেখেন আপনার নরচরায় বাচ্চার নরচরা কমে গেছে অথবা বন্ধ হয়ে গেছে তাহলে এটা বাচ্চার লাথি ছিল, আর না কমলে মনে করবেন এটা হেচকি।

কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে

বেশীরভাগ শিশুরই দিনে বেশ কয়েকবার হেঁচকি ওঠে, কিন্তু অন্যান্য আরো কিছু উপসর্গের সাথে যখন বমি হয় তখন তা এসিড রিফ্লাক্সের কারণে হতে পারে যাকে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (Gastroesophageal reflux disease – GERD) ও বলে।হ্যাঁ GERD শুধু বয়স্কদেরই হয়না নবজাতক এবং শিশুদের ও হতে পারে।

বাচ্চার যদি হেচকি ওঠার সাথে সাথে নীচের লক্ষণ গুলো দেখা যায় তবে ডাক্তারকে তা জানানো উচিৎ-

  • প্রায়ই বমি করা
  • কাশি হয় যা সহজে যায়না
  • কন্ঠরোধ হয়ে আসে বলে খেতে চায়না
  • খাওয়ার সময় বা খাওয়ার পড়ে কাঁদে
  • খাওয়ার সময় বা খাওয়ার পরে পিঠ বাঁকা করে ফেলা

দিনে বেশ কয়েকবার বাচ্চার হেচকি হতে পারে যা ১০ মিনিট বা তার বেশি সময় ধরে থাকতে পারে। স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা যদি খুশি থাকে এবং তার মধ্য যদি অস্বস্তির কোন চিহ্ন না থাকে তবে হেঁচকি নিয়ে ভয়ের কিছুই নেই।

বাচ্চার হেঁচকি বন্ধে কি করা যেতে পারে

হিক্কা বা হেঁচকি কোনো গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা না হলেও এটি যথেষ্ট বিরক্তিকর। হিক্কার সঠিক কারণ সম্বন্ধে কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। এতে এর প্রশমনের উপায় সম্বন্ধেও বৈজ্ঞানিকভাবে রয়েছে মতপার্থক্য। একেকজন একেক পদ্ধতির কথা বলেন। তার এর মধ্যে অনেকগুলো কাজেও আসে। সে রকম কিছু পদ্ধতির কথা এখানে উল্লেখ করা হলো :

ছোট বাচ্চাদের পেট একটি আখরোটের সমান হয়। তাই বাচ্চারা একসঙ্গে বেশী খেতে পারে না। বুকের দুধ খাওয়ানোর পর তাই বাচ্চাদের পাকস্থলীতে থাকা বাতাস বের করে নিতে হয়। এজন্যে বাচ্চাকে খাওয়ানোর পর ২০ মিনিট কাঁধে রাখুন। এসময় বাচ্চা ঢেকুর তোলার মত করতে পারে। কখনও কখনও সামান্য দুধ বেরিয়ে আসতে পারে। এনিয়ে ঘাবড়াবার কিছু নেই। তবে বাচ্চার হেঁচকি না ঠিক হলে বা এরপর বমি করে ফেললে ওকে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান।

ছবিঃ গুগল থেকে

শিশুর জন্মের প্রথম কয়েক মাস যদি দেখা যায়, প্রতিবার খাওয়ানোর পরপরই শিশুর হিক্কা ওঠে, তাহলে বোঝা যাবে অতিরিক্ত খাওয়ানোই শিশুর হিক্কার কারণ। তাই এ অবস্থায় শিশুকে একেবারে বেশি না খাইয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ানো ভালো। শিশু যখন আর খেতে চাইবে না, তখন জোর না করে খাওয়ানো বন্ধ করে দিতে হবে।

বাচ্চার এক স্তন খাওয়ার পড় অন্য স্তনে দেয়ার আগে একবার ঢেকুর তুলুন। যদি মনে হয় দুধ খাওয়ার সময় বাচ্চার পেটে গ্যাস বেশি যাচ্ছে তাহলে বাচ্চার স্তন মুখে নেয়া ঠিক আছে কিনা দেখুন। এ বিষয়ে আরও জানতে আমাদের নীচের আর্টিকেলটি পড়ুন।

বাচ্চা যদি ফর্মুলা খায় তবে খাওয়ানো ফাঁকে ফাঁকে ৫-১০ মিনিট অন্তর একবার ঢেকুর তুলুন। বাচ্চার মুখে বোতল এমন ভাবে ধরুন যাতে বোতলের নিপলে বা টীটে বাতাস না থাকে।

ছবিঃ গুগল থেকে

ফিডারের নিপলের ছিদ্র যদি বেশি বড় বা ছোট হয়, তাহলেও শিশু বেশি বাতাস গিলে ফেলে হেঁচকির শিকার হয়। নিপলের ছিদ্র এমন হওয়া উচিত যেন বোতল উপুড় করে ধরলে ফোঁটা ফোঁটা করে দুধ পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে পড়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি তার বদলে বোতল থেকে একনাগাড়ে দুধ পড়তে থাকে অথবা একেবারেই না পড়ে, তাহলেই সমস্যা। এ জন্য বোতল ও নিপল বদলে দেখা যেতে পারে কোনটি শিশুর প্রযোজ্য।

ছোট্ট শিশুর হিক্কা শুরু হলে তাকে কাঁধের ওপর খাড়া করে নিয়ে পিঠ আস্তে আস্তে চাপড়ে দিতে হবে। শিশুরা দুধ খাওয়ার সময়, বিশেষ করে বোতলের দুধ খাওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে প্রচুর বাতাস গিলে ফেলে। এতে তাদের পাকস্থলী বাতাসে ফুলে যায়। এতে হিক্কা শুরু হয়। এ সময় শিশুকে খাড়া করে ধীরে ধীরে মৃদু পিঠ চাপড়ালে বা মাসাজ করলে বাতাস ওপরে উঠে আসে এবং হিক্কা থেমে যায়।

যে সব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে

কিছু জিনিস করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকবেন। অনেকে না জেনে নিচের জিনিসগুলো করে থাকেন যা অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে ব্যথা দিতে পারে। যেমন –

  • আপনার শিশুকে চমকে দেয়ার চেষ্টা করবেন না। এটি প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হয়তো অনেক সময় কাজ করে কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হতে পারে।
  • শিশু মুখের ভেতর আঙ্গুল ঢুকাবেন না।
  • শিশুকে ঝাঁকাবেন না। এতে শিশুর বমি হতে পারে।
  • মাথায় বা গলায় অযথা চাপড় দেবেন না।
  • পিঠে ম্যাসাজের বদলে জোরে চাপড় মারবেন না।
  • বাচ্চার নাক চেপে ধরে নিশ্বাস বন্ধ করে হেঁচকি থামানোর চেষ্টা করবেন না। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটা খুবই বিপদজনক।
  • অনেকে আবার বাচ্চার জিহ্বা টেনে ধরে, কপালে চাপ দিয়ে বা মাথার নরম অংশে চাপ দিয়ে হেঁচকি থামানোর চেষ্টা করেন। এগুলো কখনোই করবেন না। এতে বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে।

আগেই বলেছি হেঁচকি খুবই সাধারণ একটি বিষয়। তবে শিশুর বেশি অস্বস্তি হলে উপরের টিপস গুলো মেনে চলে শিশুর হেঁচকি কমানো সম্ভব।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment