থ্যালাসেমিয়া ও গর্ভধারণ । কিছু জরুরী বিষয়

থ্যালাসেমিয়া একধরণের রক্তের রোগ যা আমাদের শরীরে স্বাভাবিকের চাইতে কম লোহিত রক্তকণিকা এবং হিমোগ্লোবিন উৎপন্ন করে। থ্যালাসেমিয়ার কারণে শরীরে লোহিতকণিকার পরিমান কম থাকলে এবং এর আকার ছোট হলে এনেমিয়া হতে পারে।

অনেক থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগী সুস্থ জীবন যাপন করেন যদিও এর কারণে কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে যার চিকিৎসা দরকার হয়। মারাত্মক আকারের থ্যালাসেমিয়ার কারণে মৃত্যুও হতে পারে। দেশে প্রতিবছর প্রায় আট হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। সারাদেশে এ রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা সাড়ে তিন লাখেরও বেশি এবং দেশে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ এ রোগের জীবাণু বহন করছে।থ্যালাসেমিয়া বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই দেখ গেলেও মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব দিকের কিছু দেশ, ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশে থ্যালাসেমিয়ারপ্রকোপ বেশি।

থ্যালাসেমিয়া কেন হয়?

থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) একটি বংশগত রক্তের রোগ। হিমোগ্লোবিন রক্তের খুবই গুরত্বপূর্ণ উপাদান। হিমোগ্লোবিন লাল রংয়ের এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ একটি উপাদান যা লোহিত রক্ত কণিকায় বিদ্যামান থাকে। হিমোগ্লোবিন লোহিত রক্ত কণিকাকে ফুসফুস থেকে শরীরের সব অংশে অক্সিজেন সরবরাহে এবং শরীরের অন্যান্য অংশ থেকে ফুসফুসে কার্বন-ডাই- অক্সাইড সরবরাহে সাহায্য করে। থ্যালাসেমিয়া রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী এই হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়। হিমোগ্লোবিন তৈরী হয় দুটি আলফা প্রোটিন ও দুটি বিটা প্রোটিন দিয়ে। যদি এই প্রোটিন গুলোর উৎপাদন শরীরে কমে যায়, তবে শরীরের হিমোগ্লোবিনের উৎপাদনও কমে যায় এবং থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয়।

আলফা ও বিটা প্রোটিন তৈরী হয় জীন হতে। দুই গ্রুপের হিমোগ্লোবিন চেইনের সংশ্লেষণ মূলত জেনেটিক্যালি নিয়ন্ত্রিত হয়।কেউ যখন কোন ত্রুটিপূর্ণ জীন তার বাবা-মায়ের কাছ হতে বংশানুক্রমে পায়, তখনই মূলত থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয়। সুতরাং থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ।

কিভাবে জানা যাবে আপনি থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কিনা

থ্যালাসেমিয়া সক্রামক বা ছোঁয়াচে নয়। এটি পিতামাতার কাছ থেকে জন্মগতভাবে সন্তানের মধ্যে আসে।পরিবারে কেউ একজন রোগী বা বাহক হলে সেই পরিবারের সব সদস্য এবং অন্যান্য রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়ের থ্যালাসেমিয়া বাহক নির্ণয়ের পরীক্ষা করা অবশ্যই উচিত।

থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহকের কোনো লক্ষণ থাকে না। তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। তাদের শরীরে রক্তের হিমোগ্গ্নোবিনের মাত্রা সামান্য কম থাকে। তাদের সাধারণত রক্ত গ্রহণ করতে হয় না।যে কোনো মানুষের রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করে শনাক্ত করা যায় যে, সে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কি-না। এ পরীক্ষায় শনাক্ত হলে তখন হিমোগ্গ্নোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস নামের আর একটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় সে ব্যক্তি থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কি-না।

একটু সচেতন হলেই আমরা এ রোগ প্রতিরোধ করতে পারি। বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী বা বাচ্চা নেওয়ার আগে স্বামী-স্ত্রী থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কি-না, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশে যেমন- সাইপ্রাস ১৯৭৩ সালে, বাহরাইন ১৯৮৫, ইরান ২০০৪, সৌদি আরব ২০০৪ এবং সর্বশেষ পাকিস্তানে ২০১৩ সালে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর বা বাচ্চা নেওয়ার আগে স্বামী-স্ত্রীর থ্যালাসেমিয়া আছে কি-না তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে থ্যালাসেমিয়া রোগকে নিয়ন্ত্রণ করা গেছে।

বাবা-মা থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হলে তা সন্তানের মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

থ্যালাসেমিয়া রোগটি বংশানুক্রমিক, মানে রোগটা আসে মা ও বাবার জিন থেকে। মা ও বাবা উভয়কেই থ্যালাসেমিয়া বাহক হতে হবে, শুধু একজন বাহক হলে হবে না। বাহককে বলা হয় থ্যালাসেমিয়া মাইনর বা ট্রেইট। যদিও নাম হচ্ছে থ্যালাসেমিয়া মাইনর, আসলে এটা সত্যিকার অর্থে কোনো অসুস্থতাই নয়। টেনিসের কিংবদন্তি পিট সাম্প্রাস, ফুটবলের জাদুকর জিনেদিন জিদান আর চলচ্চিত্রের মহানায়ক অমিতাভ বচ্চন—তাঁরা সবাই থ্যালাসেমিয়ার বাহক। যারা বাহক তারা কোনো রোগী নয়। কিন্তু যেহেতু তাঁদের সহধর্মিণীদের কেউই বাহক (থ্যালাসেমিয়া মাইনর) নন, তাঁদের সন্তানেরা সবাই সম্পূর্ণ সুস্থ, থ্যালাসেমিয়া মুক্ত। দুজন বাহক যদি একে অন্যকে বিয়ে না করে তাহলে সন্তান থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নেয়া সম্ভব নয়।

যদি বাবা অথবা মা থ্যালাসেমিয়ার বাহক হয়ে থাকেন তবে সেক্ষেত্রে ৫০ ভাগ সম্ভাবনা থাকে বাচ্চাও মা বা বাবার মত থ্যালাসেমিয়ার বাহক হবে। কিন্তু এ রোগে আক্রান্ত হবেনা।

যদি বাবা এবং মা দু জনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন তবে-

  • শতকরা ২৫ ভাগ ক্ষেত্রে তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগ নিয়ে জন্মাতে পারে
  • শতকরা ৫০ ভাগ বাহক হিসেবে জন্ম নিতে পারে যাদের কোন লক্ষন প্রকাশ পাবেনা।
  • শতকরা  ২৫ ভাগ সুস্থ শিশু হিসেবে জন্ম নিতে পারে।

গর্ভের বাচ্চা থ্যালাসেমিয়াই আক্রান্ত কিনা তা কিভাবে নির্ণয় করা যায়?

বাবা মা দুজনই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন তবে গর্ভধারণের পর পরীক্ষা করা উচিত। পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যাবে যে শিশুটিও এই রোগের বাহক বা রোগী কিনা। রোগী হলে সে মেজর বা মাইনর থ্যালাসেমিয়া তে ভুগছে কিনা।  এই ক্ষেত্রে যে পরীক্ষা গুলো করা হয় সেগুলো হলো:

কোরিওনিক ভিলিয়াস স্যাম্পলিং (Chorionic villus sampling)

মায়ের গর্ভে বাচ্চা গর্ভফুল (Placenta) এর মাধ্যমে মায়ের শরীর থেকে দরকারী পুস্টি পেয়ে থাকে। আল্ট্রাসনো মেসিনের চলমান ছবি দেখে সুঁই বা নিডল এর মাধ্যমে গর্ভফুল হতে সামান্য কিছু কোষকলা নিয়ে আসা হয়। এই পদ্ধতিকে করিওনিক ভিলাস স্যাম্পলিং বলে।মায়ের গর্ভে বাচ্চার বয়স যখন ১১ হতে ১৪ সপ্তাহ তখন করিওনিক ভিলাস স্যাম্পলিং করা হয়।

এ্যামনিওসেনটিসিস (Amniocentesis)

মায়ের গর্ভে বাচ্চা একটা ব্যাগভর্তি তরল পদার্থের মধ্যে অবস্থান করে। এই তরল পদার্থকে এ্যামনিওটিক ফ্লুইড বলা হয়। প্রথমে আল্ট্রাসনো মেসিনের সাহায্যে জরায়ুর ভিতরে বাচ্চা ও গর্ভফুলের অবস্থান নির্নয় করা হয়। আল্ট্রাসনো মেসিনের চলমান ছবি দেখে অত্যন্ত সুক্ষ একটি সুঁই বা নিডল মায়ের পেটের উপর দিয়ে বাচ্চার চারপাশের তরল পদার্থের ব্যাগের ভিতরে প্রবেশ করানো হয়। এবার সিরিঞ্জের সাহয্যে ১৫ থেকে ২০ মিলি তরল পদার্থ টেনে আনা হয়। গর্ভাবস্থার ১৫ হতে ১৮ সপ্তাহে এ্যামনিওসেনটেসিস পরীক্ষা করা হয়।

ফিটাল ব্লাড স্যাম্পলিং (Fetal blood sampling)

এ পরীক্ষায় গর্ভাবস্থার ১৮-২১ সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চার আম্বিলিকাল কর্ড থেকে ব্লাড স্যাম্পল নেয়া হয়।

এই পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে সংগ্রহ করা তরল পদার্থ (Amniotic Fluid), গর্ভফুলের কোষকলা (Placental Tissue) বা ব্লাড স্যাম্পল  ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয় ডিএনএ টেস্ট এর মাধ্যমে গর্ভের বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া রোগ আছে কিনা তা নির্নয়ের জন্য। আলট্রাসনোগ্রাফী পরীক্ষা করে গর্ভে বাচ্চা ও গর্ভফুলের অবস্থান, বাচ্চার বয়স, জরায়ুর গঠন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক নির্ধারন করবেন কখন এবং কোন পরীক্ষাটি গর্ভবতী মায়ের জন্য প্রযোজ্য।

এ পরীক্ষাগুলোর ক্ষেত্রে ০.৫-২% পর্যন্ত গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকে, অর্থাৎ প্রতি ১০০ বা ২০০ পরীক্ষায় একটি গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ কারনেই এই পরীক্ষা করার আগে গর্ভপাতের ঝুঁকির বিষয়টি ভালভাবে চিন্তা করে দেখা উচিৎ।

এই পরীক্ষার রিপোর্ট প্রায় শতভাগ নির্ভরযোগ্য। তবে মনে রাখতে হবে, যে রোগের কারনে পরীক্ষাটি করানো হচ্ছে অর্থাৎ থ্যালাসেমিয়া নির্নয়ের জন্য করা হলে কেবল বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া রোগ আছে কিনা তা বোঝা যাবে অন্য রোগ নয়। ভিন্ন ভিন্ন রোগের জন্য পরীক্ষাও ভিন্ন। গর্ভের শিশুর অন্যান্য রোগ যেমন- জন্মগত ত্রুটি, ডাউন সিনড্রোম ইত্যাদি নির্ণয়ের জন্যও এ পদ্ধতিগুলো অনুসরন করা হয়।

মা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হলে গর্ভধারণে কি প্রভাব পরতে পারে?

যেসব মহিলারা থ্যালাসেমিয়াতে আক্রান্ত এবং ব্লাড ট্রান্সফিউশন এর প্রয়োজন পরে তাদের অনেকই গর্ভধারণ করতে পারেন না। তবে কেউ কেউ এ রোগে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও গর্ভধারণ করতে পারেন কিন্তু সে ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় তাদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয়।

গর্ভাবস্থায় মায়দের শরীর এমনিতে স্ট্রেস এ থাকে। মায়েদের থ্যালাসেমিয়া থাকলে এ সময় তাই এর উপসর্গগুলো আরও খারাপ হয়ে উঠতে পারে। মায়েদের হৃদপিণ্ড এবং লিভার গর্ভাবস্থায় খুবই সংবেদনশীল থাকে। তাই থ্যালাসেমিয়াই আক্রান্ত মায়েদের গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেকআপে থাকতে হয়।

গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে রক্তের পরিমান বেড়ে যায়। এ কারণে এ সময় হৃদপিণ্ডকেও আগের চাইতে অনেক বেশী কাজ করতে হয় শরীরের প্রতিটি কোষে রক্ত সরবরাহের জন্য। এ সময় যাতে হৃদপিণ্ডের উপর চাপ কম পরে তাই ব্লাড ট্রান্সফিউশন এর প্রয়োজন পরতে পারে। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত মায়েদের গর্ভধারণের আগেই হার্টের চেকআপ করানো জরুরী।

থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত মায়দের গর্ভাবস্থায় টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ও অনেক বেড়ে যায়। তাই গর্ভধারণের আগে থেকে এবং গর্ভধারণের পুরো সময় জুড়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে

মায়েরা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হলে গর্ভের বাচ্চার নিউরাল টিউব ডিফেক্টের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই এ সময় নিয়মিত প্রতিদিন ফলিক এসিড গ্রহন করা উচিত। এর ফলে বাচ্চার এ সব ত্রুটির ঝুঁকি কমে। ফলিক এসিড মায়ের শরীরের রক্তকে বিশুদ্ধ রাখতেও সাহায্য করে। এর ফলে এনেমিয়ার ঝুঁকি ও কমে।

মা যদি বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত হয় তবে তার হাড়ের গঠন স্বাভাবিক নাও থাকতে পারে যার ফলে নরমাল ডেলিভারি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত মায়েদের উচ্চ সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন হসপিটালে ডেলিভারি করানো উচিত।

পরিশিষ্ট

আমরা চাইলে আমাদের সমাজ হতে এই রোগ সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারি। প্রথমত বিয়ের আগে রক্তপরীক্ষা করে আমরা জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতে পারি, যাতে কোনভাবে দুজন বাহকের বিয়ে না হয়ে যায়। দ্বীতিয়ত, যদি বিয়ে হয়েই যায়, গর্ভস্থ সন্তান কে পরীক্ষা করে, তার জন্মের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই ভাবে একদম সবাই সচেতন হলে আমাদের সমাজ থেকে ত্রুটিপূর্ণ জীনের বিস্তার ঠেকানো এবং একসময় সম্পূর্ণ নির্মূল সম্ভব।

থ্যালাসেমিয়ার লক্ষন, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন। 

তথ্যসূত্রঃ 

https://www.marchofdimes.org/complications/thalassemia.aspx
https://www.babycentre.co.uk/a1026605/thalassaemia-in-pregnancy
http://www.aboutkidshealth.ca/En/ResourceCentres/PregnancyBabies/Pregnancy/MaternalConditionsPregnancy/Pages/Thalassemia-and-Pregnancy.aspx

Related posts

Leave a Comment