ট্রান্সভার্স লাই । গর্ভে বাচ্চার অবস্থান

ট্রান্সভার্স লাই বলতে কি বোঝায়?

বাচ্চা যখন গর্ভাবস্থার শেষের দিকে নীচের দিকে নামতে থাকে তখন মায়ের পেলভিসে অবস্থানের সবচাইতে ভালো পজিশন হোল বাচ্চার পিঠ মায়ের পেটের দিকে থাকা। বাচ্চা যখন এ পজিশনে থাকে তখন প্রসবের সময় তার থুতনি নীচের দিকে নামানো থাকে এবং তার মাথার সবচাইতে ছোট অংশ (মাথার উপরের ভাগ) আগে বেড়িয়ে আসে।

গর্ভধারণের প্রথম দিকে মায়ের জারয়ুর ভেতর বাচ্চার নড়াচড়ার যথেষ্ট জায়গা থাকে। সে সময় বাচ্চা নিয়মিত পজিশন পরিবর্তন করে। কিন্তু গর্ভাবস্থার শেষ দিকে শিশুর আকার বাড়ার সাথে সাথে জরায়ু তে তার নড়াচড়ার করার জায়গা কমতে থাকে। তাই এ সময় বাচ্চা তেমন অবস্থান পরিবর্তন করেনা। গর্ভাবস্থার ৩৬ সপ্তাহ নাগাদ বেশীর ভাগ শিশুই মায়ের উদরে এমন ভাবে অবস্থান করে যাতে তার মাথা নীচের দিকে জন্মনালীর দিকে থাকে। এটাই প্রসবের জন্য স্বাভাবিক এবং নিরাপদ পজিশন। এটাকে সেফালিক প্রেজেন্টেশান বলে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় শিশুর ঘাড়, পিঠ বা হাত জন্মনালীর দিকে ফিরানো থাকে। অর্থাৎ বাচ্চা জরায়ুতে লম্বালম্বি ভাবে না থেকে পাশাপাশি অবস্থান করে। এ ধরনের পজিশনকে বলা হয় ট্রান্সভার্স লাই। প্রতি ৪০০ টি গর্ভধারণের ১ টিতে বাচ্চা এই পজিশনে থাকতে পারে। যখন এমন হয় বাচ্চার পিঠ বা ঘাড় জরায়ু মুখ ঢেকে রাখে। এ ক্ষেত্রে বাচ্চা ও মায়ের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

ট্রান্সভার্স লাই কেন হয়?

বেশ কিছু কারণে গর্ভে বাচ্চার অবস্থান ট্রান্সভার্স লাই হতে পারে-

  • প্রথমবার গর্ভধারণের পরে মায়ের পেটে পেশীগুলো অনেক নমনীয় হয়ে যায়। যার কারণে বাচ্চার নড়াচড়া করা অনেক সহজ হয় এবং বাচ্চা নড়াচড়ার অনেক জায়গা পায়। ফলে বাচ্চা এই পজিশনে অবস্থান করতে পারে।
  • ৩৪ সপ্তাহের আগে বাচ্চার নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করা স্বাভাবিক। গর্ভধারণের শুরুর দিকের সময়গুলোতে বাচ্চা ট্রান্সভার্স লাই পজিশনে থাকাও স্বাভাবিক। তাই যদি বাচ্চা প্রি ম্যাচিউর হয় তবে বাচ্চা এ পজিশনে থাকতে পারে।
  • যদি বাচ্চার চারপাশে অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের পরিমান অনেক বেশী থাকে তবে বাচ্চা এ পজিশনে থাকতে পারে। জরায়ুতে কোন অস্বাভাবিকতা থাকলেও এমন হতে পারে।
  • গর্ভে যমজ সন্তান থাকলে এটা হতে পারে।
  • যদি জরায়ুতে টিউমার বা ওভারিয়ান সিস্ট থাকে
  • প্লাসেন্টা প্রিভিয়া বা জরায়ুতে সেপ্টাম থাকলে বাচ্চার নড়াচড়ায় সমস্যা হতে পারে। যার ফলে প্রসবের আগে বাচ্চা যথাযথ পজিশনে আসতে পারেনা। এ কারণে বাচ্চার জরায়ুতে ট্রান্সভার্স লাই পজিশনে থাকতে পারে।

বাচ্চা ট্রান্সভার্স লাই পজিশনে থাকলে কি কি সমস্যা হতে পারে?

গর্ভাবস্থার শুরু দিকে বাচ্চার ট্রান্সভার্স লাই পজিশনে থাকা খুবই স্বাভাবিক। শেষ ট্রাইমেস্টারের শেষের দিকে বেশীরভাগ বাচ্চাই প্রসবের জন্য উপযোগী অবস্থানে চলে আসে। তবে গর্ভাবস্থার শেষের দিকে যদি বাচ্চা এ পজিশনে থাকে তবে শেষ পর্যন্ত বাচ্চার এভাবে অবস্থান করার সম্ভবনা বেশী।

বাচ্চার যদি এ পজিশনে থাকে তবে পানি ভেঙ্গে গেলে বাচ্চার আম্বিলিকার কর্ড জন্মনালীর দিকে চলে আসে। এটা খুবই মারাত্মক হতে পারে কারণ বাচ্চার শরীর আম্বিলিকার কর্ডে চাপ প্রয়োগ করে যার ফলে কর্ডের মাধ্যমে বাচ্চার শরীরে রক্ত এবং অক্সিজেন প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়। একে প্রোলাপ্স (Prolapse) বলে। যদি এমন হয় তবে যত দ্রুত সম্ভব ডেলিভারি করতে হবে।

কর্ড প্রোলাপ্স খুবই মারাত্মক হতে পারে। তাই ট্রান্সভার্স লাই এর ক্ষেত্রে ৩৭ সপ্তাহ থেকেই হাসপাতালে অ্যাডমিশন নেয়ার পরামর্শ দেয়া হতে পারে যাতে কোন জটিলতা দেখা দিলেই দ্রুত ব্যাবস্থা নেয়া যেতে পারে। এ কারণে ট্রান্সভার্স লাই এর ক্ষেত্রে রুটিন সিজারিয়ান করার পরামর্শ দেয়া হয় যাতে এমন অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আগে বাচ্চা প্রসব করানো যায়।

যদি আপনার মনে হয় যে আপনার প্রোলাপ্স হয়েছে তবে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। যদি কোন কারণে যেতে দেরী হয় তবে এমন পজিশনে থাকার চেষ্টা করুন যাতে বাচ্চার শরীরে ওজন তার আম্বিলিকার কর্ডের উপর না পড়ে। এর জন্য সবচাইতে ভালো উপায় হলো কনুই ও হাঁটুর উপর ভর দিয়ে এমন ভাবে বসে পরা যাতে হাত ও মাথা মাটিতে থাকবে এবং নিতম্ব উপরের দিকে থাকবে।

ট্রান্সভার্স লাই এর ক্ষেত্রে কি নরমাল ডেলিভারি সম্ভব?

ট্রান্সভার্স লাই এর ক্ষেত্রে নরমাল ডেলিভারি সম্ভব হয় না। কারণ বাচ্চা স্বাভাবিক ভাবে প্রসবের সময় জন্মনালী দিয়ে বেড়িয়ে আসতে পারেনা। স্বাভাবিক প্রসব করতে চাইলে বাচ্চার হাত বা আম্বিলিকার কর্ড বেড়িয়ে আসতে পারে কিন্তু বাচ্চার ঘাড় বা পাঁজর শরীরের বাকি অংশ বেড়িয়ে আসতে বাঁধা দেবে।

৩৬ সপ্তাহের পরও বাচ্চা ট্রান্সভার্স লাই পজিশন এ থাকলে কি করনীয়? 

গর্ভধারণের শেষের দিকে যদি বাচ্চাট্রান্স ভার্স লাই পজিশনে থাকে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় আসার কোন লক্ষণ না থাকে তবে আপনার চিকিৎসক আপনার অবস্থার উপর নির্ভর করে কৃত্রিম উপায়ে বাচ্চাকে স্বাভাবিক অবস্থানে আনার চেষ্টা করার পরামর্শ দিতে পারে।

এই উপায়টিকে বলা হয় এক্সটারনাল সেফালিক ভার্শন (ECV).  এই উপায়ে আপনার পেটে চাপ প্রয়োগ করে কৃত্রিম উপায়ে বাচ্চার অবস্থান পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয়। এটি একটি নিরাপদ প্রক্রিয়া (কিছু কিছু ক্ষেত্রে জটিলতার সম্ভাবনা থাকে) তবে অবশ্যই তা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কারো মাদ্ধমে করাতে হবে।

ECV সাফল্যের হার ব্রীচ পজিশনের ক্ষেত্রে ৫৮% এবং ট্রান্সভার্স লাই এর ক্ষেত্রে প্রায় ৯০%। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়ার মাদ্ধমে শিশুর অবস্থান ঠিক করা গেলেও দেখা যায় শিশুটি আবার ব্রীচ পজিশনে চলে আসে। ECV সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে যদি এটা আপনার প্রথমবার গর্ভধারণ না হয়।

তবে মনে রাখতে হবে এ প্রক্রিয়াটি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যদি গর্ভে যমজ সন্তান থাকে, এমনিওটিক ফ্লুইড কম থাকে, প্লাসেন্টা প্রিভিয়া থাকে এবং পূর্বে সি-সেকশন করা থাকে তবে এ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়না।

যমজ বাচ্চার ক্ষেত্রে ট্রান্সভার্স লাই হলে কি হবে?

গর্ভে যদি যমজ বাচ্চা থাকে তবে দ্বিতীয় বাচ্চা ট্রান্সভার্স লাই পজিশনে থাকা স্বাভাবিক কারন প্রথম বাচ্চা মায়ের পেলভিস দখল করে থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রথম বাচ্চা প্রসবের পর দ্বিতীয় বাচ্চা যথাযথ পজিশনে চলে আসে। যদি তা স্বাভাবিকভাবে না হয় তবে ডাক্তার এক্সটারনাল বা ইন্টারনাল সেফালিক ভার্শনের মাধ্যমে বাচ্চার পজিশন ঠিক করতে পারেন। প্রথমে এক্সটার্নাল ভার্সন চেষ্টা করা হয়। যদি তাতে না হয় তবে ডাক্তার যোনিপথে হাত ঢুকিয়ে বাচ্চার পা ধরে থাকে ব্রীচ পজিশনে নিয়ে আসেন যাতে নরমাল ডেলিভারি করানো যায়। একে ইন্টারনাল ভার্সন বলা হয়।

বাচ্চার অবস্থান পরিবর্তনের জন্য আর কি কি করা যেতে পারে?

বাচ্চার অবস্থান পরিবর্তনের জন্য কিছু উপায়ের কথা আপনি শুনে থাকতে পারেন। তবে এগুলোর কোনটাই গবেষণায় প্রমানিত নয়। তাই কোন কিছু ট্রাই করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করুন। এ উপায়গুলো হোল-

হাঁটু ও বাহুর উপর ভড় দিয়ে উপুড় হয়ে থাকা পেলভিসের নীচে বালিশ দিয়ে উঁচু হয়ে শুয়ে থাকা- সোজা হয়ে চিত হয়ে শুয়ে থাকুন। পেলভিস এর নীচে বালিশ দিয়ে রাখুন যাতে পেলভিস মাটি থেকে ৯ থেকে ১২ ইঞ্ছি উপরে থাকে। অথবা হাঁটু এবং বাহুর উপর ভর দিয়ে অনেকটা বিড়ালের মত উপুড় হয়ে থাকুন যাতে আপনার নিম্নাগ উপড়ের দিকে থাকে। এভাবে প্রতিদিন দুবার ৫থেকে ১৫ মিনিট করুন। খালি পেটে করলে ভালো। যদি শরীরে কোন অস্বস্তি হয় তবে তা না করায় ভালো।

মেডিটেশন- ছোট্ট একটা গবেষণায় দেখা গেছে ৩৭-৪০ সপ্তাহের মধ্যে মেডিটেশন করলে বাচ্চার অবস্থান পরিবর্তনের কিছু সম্ভাবনা থাকে। এতে যেহেতু ক্ষতির কোন সম্ভাবনা নেয় তাই এটা ট্রাই করে দেখতে পারেন।

বাচ্চার অবস্থান ঠিক রাখার জন্য কি করা যেতে পারে?

আমরা সবাই জানি সারাক্ষন শুয়ে বসে থাকা স্বাস্থ্যকর গর্ভধারণের জন্য ক্ষতিকর। তাই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে গর্ভকালীন সময়ে হালকা ব্যায়াম করুন বা গৃহস্থালির হাল্কা কাজকর্ম করুন। তাছাড়াও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে-

যখন বসবেন পেলভিস সামনের দিকে রাখার চেষ্টা করবেন। ঝুঁকে বসবেন না যাতে পেলভিস পেছনের দিকে থাকে। সব সময় মনে রাখবেন বসার সময় যাতে হিপ আপনার হাঁটুর উপরে থাকে।মাঝে মাঝে হাত এবং হাঁটুর উপর ভর দিয়ে উপুড় হয়ে থাকুন( ঘর মোছার ভঙ্গিতে) । এর ফলে বাচ্চার মাথার পেছনের অংশ আপনার পেটের দিকে ঘুরে যেতে পারে।

যদি আপনি কর্মজীবী মহিলা হন এবং অনেক বেশী সময় ধরে বসে থাকতে হয় তবে কিছুক্ষন পর পর হাঁটার অভ্যাস করুন।গাড়িতে বসার সময় সীটে একটি কুশন দিয়ে রাখতে পারেন যাতে আপনার হিপ উপরের দিকে থাকে।আপনি যখন শুয়ে থাকবেন তখন বাচ্চার অবস্থান নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ এ সময় পেলভিসে বাচ্চার উপর কোন চাপ পড়েনা। তবে চিত হয়ে শোওয়ার চাইতে পাশ ফিরে শোওয়া গর্ভাবস্থার শেষের দিকে উপকারী।

সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment