শিশুকে পেটের উপর ভর দিয়ে শোয়ানো বা টামি টাইম (Tummy Time) দেয়া কেন জরুরী?

Updated on

টামি টাইম (Tummy Time) কি? 

আপনার ছোট্ট শিশুটি যে কিনা নিজে থেকে দাঁড়াতে পারেনা এমনকি উঠে বসতেও পারে না ঠিকমত, সে প্রায়ই উপুড় হয়ে পেটের উপর ভর দিয়ে সবকিছু দেখার চেষ্টা করে এবং খেলাধুলা করে। আর এই পেটের উপর ভর দিয়ে উপুড় হয়ে থাকাকেই টামি টাইম (Tummy Time) বলা হয়।

টামি টাইম আদতে শিশুদেরকে তাদের দুরন্ত শৈশবের দিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় এবং এর সাথে যে পেশিগুলোর মাধ্যমে শিশু তার মাথাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং যে পেশীগুলো শিশুকে গড়াতে এবং হামাগুড়ি দিতে সাহায্য করে, টামি টাইম শরীরের উপরের অংশের সেই পেশিগুলোর শক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

এছাড়া শিশুকে আপনার বুকের উপরে নিয়ে তার সাথে চমৎকার সময় কাটানোর পাশাপাশি এই টামি টাইম শিশুর সাথে আপনার সম্পর্ককে আরো সুন্দর করে তুলবে। এভাবে শিশুর সাথে টামি টাইম অতিবাহিত করাটা একে অপরকে জড়িয়ে ধরা এবং আদরের চমৎকার সুযোগ তৈরি করে দেয়।

শিশু যদি জেগে থাকা অবস্থায় অনেক টামি টাইম অতিবাহিত করে তবে এটা তার শারীরিক দক্ষতা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এইসব শারীরিক দক্ষতা শিশুর ভবিষ্যৎ চলাফেরার জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। এছাড়া টামি টাইম শিশুকে খেলা এবং খেলার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শেখার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়। 

টামি টাইম বা উপুড় হয়ে থাকা আপনার শিশুকে কীভাবে সাহায্য করবে?

আপনার বাড়ন্ত শিশুর জন্য টামি টাইমের উপকারিতা অপরিসীম। এভাবে পেটের উপর ভর দিয়ে থাকলে শিশুর মেরুদণ্ড, ঘাড় এবং কাঁধ আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। এভাবে শিশু যখন বড় হতে থাকতে তখন সে এই অবস্থা থেকে উপরের দিকে উঠার জন্য হাত দিয়ে নিচের দিকে ধাক্কা দিবে এবং তার হাত সোজা করার চেষ্টা করবে। আর এভাবেই শিশু গড়ানো শিখে যায় এবং ধীরে ধীরে হামাগুড়িও দেয়া শিখে যায়।

টামি টাইম শিশুর ঘাড়ের পেশীকে শক্তিশালী করে এবং মাথা ঘুরিয়ে চারপাশে তাকাতে সাহায্য করে। এভাবে এই টামি টাইমের মাধ্যমে শিশু উপরে এবং তার চারপাশের সবকিছু দেখতে শুরু করে। আর শিশু যখন চারপাশের সবকিছু দেখা শুরু করে তখন তার শরীরের সমন্বয়ের পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি দিয়ে কোন কিছুকে অনুসরণ করার ক্ষমতাও বিকশিত হয়।

আপনার শিশু যদি দীর্ঘ সময় ধরে চিত হয়ে শুয়ে থাকে তাহলে তার মাথার একপাশ কিছুটা সমান হয়ে উঠতে পারে। আর এই টামি টাইম এই ধরনের সমস্যার সমাধান করে দেয় এবং শিশুর মাথা থেকে চাপ সরিয়ে নিয়ে শিশুর মাথার সমতল অংশটুকু ঠিক হয়ে যেতে সাহায্য করে। এভাবে টামি টাইমের মাধ্যমে শিশুর মাথার সমতল অংশটুকু আবার আগের মত গোলাকার ধারণ করে।

এছাড়া টামি টাইম শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে এবং তার Downs’s syndrome এর মত কিছু জন্মগত ক্রুটি সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে। একটা গবেষণায় উঠে এসেছে যে সকল শিশুর Down’s syndrome আছে তারা অন্যদের তুলনায় খুব দ্রুত শরীরের পেশীগুলোর ব্যবহার করা শিখে যায়, যদি সেই শিশু যথেষ্ট পরিমাণে টামি টাইম অতিবাহিত করে।    

শিশুকে কখন থেকে উপুড় করে রাখতে পারবেন

শিশুর জন্মের পরপরই অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও সে টামি টাইম শুরু করতে পারবেন । আর ঠিক যত দ্রুত আপনি এটা শুরু করবেন, আপনার শিশুও তত দ্রুত টামি টাইমের সাথে মানিয়ে যাবে।

শিশু আম্বিলিকাল কর্ড ঝরে গিয়ে সেটা ঠিক হওয়া পর্যন্ত আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে না, তার আগেই আপনি টাইম টাইম শুরু করতে পারেন। তবে আপনি যদি শিশুকে মেঝের মধ্যে এই টামি টাইম শুরু করেন তাহলে তার নিচে অবশ্যই একটা নরম কম্বল দিয়ে রাখবেন।

আপনি যখন জেগে থাকবেন তখন শিশুকে আপনার পেটের উপর বা বুকের উপর রেখে আপনি বিছানায় বা মাটিতে শুয়ে তাকে টামি টাইম দিতে পারেন। এসময় বাচ্চার সাথে প্রচুর কথা বলুন এবং তার সাথে আই কন্টাক্ট করুন।

প্রতিদিনই শিশুকে এই টামি টাইমে দিন। তবে শিশুকে টামি টাইমের সাথে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলার জন্য প্রাথমিক অবস্থায় তাকে দৈনিক বেশ কয়েকবার অল্প কয়েক মিনিটের জন্য উপুড় করে শুইয়ে রাখুন। ধীরে ধীরে এই টামি টাইমের সময় বাড়াবেন যাতে করে শিশু এই টামি টাইমের সাথে নিজেকে খাপ খাইতে নিতে পারে।

সবচাইতে ভালো হয় প্রতি দুই অথবা তিনদিন পরপর এক মিনিট করে সময় বাড়ানো। তবে আপনি যদি দেখেন যে শিশু ক্লান্ত হয়ে গেছে এবং টামি টাইমটা সে আনন্দের সাথে উপভোগ করছে না তাহলে আপাতত এটা বন্ধ রাখুন এবং পরবর্তী দিন আবার চেষ্টা করতে পারেন।

শিশুকে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৬০ মিনিটের জন্য টামি টাইম অতিবাহিত করতে দিন। তবে এর মানে এই না যে একেবারে সেই চল্লিশ মিনিটের জন্য শিশুকে উপুড় করে শুয়ে রাখবেন বরং দৈনিক ১০ মিনিট করে ছয়বার এমনটা করতে পারেন আপনি।

আর আপনার শিশু যদি এভাবে উপুড় হয়ে শুয়ে খেলতে অনেক বেশি পছন্দ করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে খেলতে চায় তাহলে প্রতি ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরপর তার শোয়ার অবস্থাটা পরিবর্তন করে দিন।

একটা ব্যাপার সবসময় খেয়াল রাখবেন, শিশুর টামি টাইমের সময় অবশ্যই সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন এবং কখনই শিশুকে ঘুমের মধ্যে উপুড় করে রাখবেন না , এমনকি অল্প সময়ের ঘুমের জন্য হলেও শিশুকে কোন অবস্থাতেই উপুড় করে রাখবেন না।

শিশু যদি এভাবে উপুড় হয়ে ঘুমায় তাহলে সেটা তার জন্য প্রাণঘাতী হয়ে যেতে পারে, কেননা এর মাধ্যমে Sudden infant death syndrome (নবজাতক শিশুর আকস্মিক মৃত্যু) এর ঝুঁকি বাড়ায়, যদিও এটা খুবই বিরল ঘটনা। তাই শিশুকে ঘুমানোর জন্য অবশ্যই চিত করে শোয়াবেন।

আপনার শিশু যদি টামি টাইমটা একদমই পছন্দ না করে, তখন কি করবেন?

প্রথম প্রথম অনেক শিশুকেই দেখা যায় যে সে টামি টাইম একদমই পছন্দ করছেনা। নতুন এই অবস্থায় সময় পার করা তার জন্য খুবই আকস্মিক অভিজ্ঞতা হতে পারে। যদি দেখন যে আপনার শিশু টামি টাইমে অস্বস্তি বোধ করছে তাহলে নিম্ন বর্ণিত উপায়গুলো অবলম্বন করতে পারেনঃ  

  • টামি টাইমে শিশুর সাথে আপনিও অংশগ্রহণ করুন। শিশুকে আপনার বুকের উপরে নিয়ে উপুড় করে রাখুন এবং শিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে একে অপরের হৃৎস্পন্দন শোনার চেষ্টা করুন।
  • শিশুকে তার পেটের উপর ভর দিয়ে আপনার কোলে শোয়াতে পারেন। অথবা শিশুকে কোলে নেয়ার “রাগবি হোল্ড” নামক কৌশলটি অবলম্বন করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে শিশুকে উপুড় করে আপনার এক হাতের উপর শুইয়ে দিন এবং ওপর হাত দিয়ে তাকে ধরে রাখুন।
  • একটা ছোট্ট বালিশ, টাওয়েল অথবা কম্বল শিশুর বুকের নিচে রেখে দিতে পারেন যাতে করে শিশু খুব সহজেই তার মাথা তুলে তাকাতে পারে সামনের দিকে। আবার আপনি টামি টাইমের জন্য বিশেষভাবে তৈরি নরম ম্যাট্রেস কিনে নিতে পারেন। এই ধরনের পদ্ধতি ব্যাবহার করলে শিশু তার আশেপাশে সবকিছুর দিকে ভালো করে লক্ষ্য রাখতে পারে এবং এতে করে তার কৌতূহল বজায় থাকবে আর শিশু দীর্ঘ সময় টামি টাইমের মধ্যে পার করে দিতে তেমন একটা আপত্তি করবে না।
  • কিছু খেলনা শিশুর হাতের নাগালের মধ্যে এনে রেখে দিন। শব্দ করে এমন খেলনা হলে বেশি ভালো হয়, তাই এমন শব্দ করা ঝুনঝুনি ধরনের খেলনা এনে শিশুর হাতের নাগালে রেখে দিন যাতে করে শিশু টামি টাইমে খেলনা দিয়ে খেলতে পারে।
  • শিশু যখন টামি টাইমের মধ্যে থাকবে তখন তার সাথে কথা বলুন, গান শোনান অথবা খেলা করুন। আপনি যখন মজার মজার ভঙ্গী করে তার সাথে কথা বলবেন, তখন শিশু খুবই মজা পাবে।
  • যদি আবহাওয়া বেশ গরম হয় তাহলে শিশুকে কোন কাপড় ছারাই অথবা একটা ন্যাপি পড়িয়ে উপুড় করে খেলতে দিন। বিভিন্ন রঙের বাহারি চাদর শিশুর নিচে দিন, অনেক রঙিন চাদর যখন শিশুর নিচে রাখা হয় তখন শিশু সেটা খুবই পছন্দ করে।
  • অন্যান্য কাজের মধ্যেও অল্প অল্প করে শিশুকে টামি টাইমে দিন। যেমন শিশুর কাপড় পাল্টানো, অথবা গোসলের পর শিশুর শরীর শুকানোর সময় অথবা ন্যাপি পাল্টানোর সময়েও অল্প অল্প করে তার শিশুকে টামি টাইমের মধ্যে রাখুন।
  • একটা প্লাস্টিকের আয়না এনে শিশুর সামনে রেখে দিন, যাতে করে শিশু নিজেকে দেখতে পারে। এতে করে শিশু উপুড় হওয়া অবস্থায় মাথা তুলতে এবং হাত বাড়াতে উৎসাহী হবে।

টামি টাইমের সময় নড়াচড়া করার ব্যাপারে শিশুকে কীভাবে উৎসাহী করবেন?

প্রাথমিক পর্যায়ে শিশু উপুড় হয়ে থাকা অবস্থায় তেমন একটা নড়াচড়া করতে পারবে না। তবে সে যাতে করে মাথা তুলে তাকানোর সাথে সাথে তার হাত, বাহু, পা এর ব্যবহার করা শুরু করে এজন্য তাকে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিন।

যখন শিশু উপুড় হয়ে থাকবে তখন তার কাছাকাছি থাকুন এবং একটু ঝুঁকে তার দৃষ্টি সীমার মধ্যে থাকুন যাতে করে সে বুঝতে পারে আপনি আশেপাশেই আছেন। পেটের উপর ভর দিয়ে উপুড় হয়ে থাকার সময় শিশুর সাথে কথা বলুন, গান শুনান এবং মজার মজার শব্দ করে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করুন। এগুলোর মাধ্যমে শিশু মাথা তুলে আপনার দিকে তাকাতে উৎসাহী হয়ে উঠবে। আর দেখবেন যে, আপনি যখন মজার মজার শব্দ করবেন তখন আনন্দে সেও তার হাত পা নাড়ানো শুরু করবে।  

শিশুর বয়স যখন তিন মাসের মত হবে তখন আপনার ছোট্ট শিশুটি তার ছোট্ট দুই হাতের উপর ভর দিয়ে একটু উপরের দিকে মাথা তুলে তাকাবে। এমন সময় তাকে আরো উৎসাহী করে তোলার জন্য তার মাথার ঠিক উপরের দিকেই তার প্রিয় একটা খেলনা নাড়তে থাকুন। সে তখন উপরের দিকে তাকিয়ে তার খেলনা দেখবে এবং হাতের উপর ভর করে আরেকটু উপরে উঠে তার খেলনার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করবে।

আপনার ছোট্ট শিশু যখন ছয় মাসে উপনীত হবে, তখন তার হাত, কাঁধ এবং মেরুদণ্ড আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এমন সময় চোখের সমান উচ্চতায় আপনি শিশুর প্রিয় কোন খেলনা ধরে রাখতে পারেন, তবে সেটা শিশুর নাগালের একটু বাইরে ধরুন। খেয়াল রাখবেন আপনি যদি অনেক দূরে খেলনা ধরেন তাহলে শিশুর মধ্যে আগ্রহ না এসে বরং হতাশা চলে আসবে দূরত্বের কারণে।

টামি টাইমের জন্য এমন একটা সময় নির্বাচন করুন যখন শিশুর পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়া হয়েছে এবং সে বেশ হাসিখুশি অবস্থায় আছে। শিশু যখন ক্ষুধার্ত থাকে অথবা তার মন মেজাজ খুব ভালো থাকে না তখন এই নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা নিতে সে আগ্রহী হবে না।

শিশুর রিফ্লাক্সের সমস্যা আছে, এমতাবস্থায় কি শিশুকে উপুড় করে তার পেটের উপর ভর দিয়ে শোয়ানো উচিৎ হবে?

আপনার শিশুর যদি reflux নামক পাকস্থলী থেকে খাবার মুখে চলে আসার সমস্যা থাকে তাহলে এই টামি টাইম শিশুর জন্য অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। তাই শিশুর টামি টাইমটা আরো বেশি আরামদায়ক করতে শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে নিতে পারেন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts