চিকুনগুনিয়া : লক্ষণ ও প্রতিকার

চিকুনগুনিয়া রোগটির কথা আমরা এখন অনেকেই জানি, বড়দের মতো শিশুদেরও কিন্তু এ রোগ হতে পারে। তাই এ রোগ সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। খুব ছোট শিশু এমনকি দুই বছরের কম বয়সী শিশুদেরও এটি হতে পারে। অন্যদিকে মা এ রোগে আক্রান্ত হলে গর্ভের শিশুর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও শিশুর জন্মানোর আগে এক সপ্তাহের মধ্যে যদি মা আক্রান্ত হন তবে নবজাতকও চিকুনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ব্রেইনের বিভিন্ন অসুবিধা যা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা হিসেবে দেখা দিতে পারে।

চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। জীবনের জন্য এ রোগ সরাসরি হুমকি নয়; কিন্তু আক্রান্ত হলে নানা শারীরিক অসঙ্গতি দেখা দেয়। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মাথা ব্যথা, সর্দি, বমি বমি ভাব, হাত ও পায়ের গিঁটে এবং আঙুলের গিঁটে ব্যথা, ফোসকা পড়া এবং শরীর বেঁকে যেতে পারে। এ জন্য স্থানীয়ভাবে এটিকে ‘ল্যাংড়া জ্বর’ বলেও অভিহিত করা হয়। চিকুনগুনিয়া নামটি এসেছে পূর্ব আফ্রিকার ম্যাকওনেড ভাষা থেকে। এর মানে ‘যা বাঁকিয়ে দেয়’। এ জ্বরে এত বেশি শরীরে ব্যথা হয় যে, রোগী ব্যথায় কুঁকড়ে যায়। এ ভাইরাস মশা থেকে মানুষের শরীরে আসে, আবার আক্রান্ত মানুষকে কামড় দিলে মশাও আক্রান্ত হয় এবং বাহক হিসেবে আবার মানবদেহে রোগ ছড়ায়। তবে এ ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না।

শুধু নারী এডিস মশার কামড়েই এ রোগ হতে পারে। সাধারণত কামড় খাওয়ার ৫ দিন পর থেকে শরীরে লক্ষণগুলো ফুটে ওঠে। তবে এ রোগে আক্রান্তদের এক-চতুর্থাংশই তাদের রোগ সম্পর্কে বুঝতে পারে না। ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব একই সময় দেখা দেয় এবং লক্ষণও প্রায় একই রকম।

রোগের লক্ষণ

এ রোগের লক্ষণ হলো জ্বর, মাথাব্যথা, হাড় ব্যথা, চোখের কোটরে ব্যথা প্রভৃতি। ৩ থেকে ৫ দিনে যখন জ্বর কমতে শুরু করে তখন চুলকানি এবং লাল লাল দানা দেখা যেতে থাকে। এই র‌্যাশ ২ থেকে ৩ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে অনেকের দানা থাকে না। এর পরিবর্তে কালচে বাদামি বা ধূসর রঙের দানা থাকে। আবার বড়দের মতো হাড়ে ব্যথা কম সংখ্যক শিশুরই থাকে। তবে যেসব শিশুর হাড়ে ব্যথা হয় তাদের ক্ষেত্রে ব্যথার মাত্রা তীব্র হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে আরেকটি ব্যতিক্রম হলো মগজ বা স্নায়ুর বিভিন্ন সমস্যা, যাকে আমরা নিউরোলজিকাল লক্ষণ বলে থাকি সেগুলো শিশুদের বেশি হয়। যেমন খিচুনি, এনকেফালাইটিস। সাধারণত যে কোনো ভাইরাস জ্বর ধীরে ধীরে বাড়ে; কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত অনেক শিশুর হঠাৎ তীব্র জ্বর নিয়ে আসতে পারে।

ডেঙ্গুর মতো এ রোগটিও এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ালেও ডেঙ্গুর সঙ্গে এর কিছুটা পার্থক্য আছে। ডেঙ্গুতে যেমন হাড়ে ব্যথা হলেও প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হয় না, কিন্তু এ রোগে হাড়ে প্রদাহ হয়। তাই চিকুনগুনিয়ায় হাড় ও গিরায় তীব্র ব্যথা হয়। আবার ডেঙ্গুতে যেমন রক্তের অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট কমে গিয়ে রক্ত পড়ার আশঙ্কা থাকে; কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় সেই আশঙ্ক কম থাকে। আবার ডেঙ্গুতে রক্তনালির অভ্যন্তরীণ তরল বা ইন্ট্রা ভাস্কুলার ফ্লুয়িড কমে গিয়ে রক্তচাপ কমে যেতে পারে, এমনকি শিশু শকেও চলে যেতে পারে; কিন্তু চিকুনগুনিয়াতে প্লাজমা লিকেজ ও শকের আশঙ্কা কম ।

কী করবেন?
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা প্রায় একই রকমের। ডেঙ্গু এন এস ওয়ান অ্যান্টিজেন বা ডেঙ্গু আইজিএম অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে রোগনির্ণয় করতে হয়। তার আগ পর্যন্ত চিকিৎসার কোনো হেরফের নেই। সমস্যা তীব্র না হলে বাড়িতেই থাকুন। প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল পান করুন (দিনে দুই লিটার, সঙ্গে লবণ-জল, ডাবের পানি, স্যালাইন ইত্যাদি)। জ্বর ও ব্যথা কমাতে প্যারাসিটামল খেতে পারেন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। সন্ধি ব্যথা কমাতে ঠান্ডা ছ্যাঁক নিতে পারেন, হালকা ব্যায়াম করা যায়। রোগনির্ণয়ের আগেই অ্যাসপিরিন বা ব্যথানাশক সেবন করা যাবে না।

কখন হাসপাতালে যাবেন?
এমনিতে চিকুনগুনিয়া ডেঙ্গুর মতো জটিল না হলেও ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি বা ছোট শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং কিডনি, যকৃৎ বা হৃদ্যন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ঝুঁকি থাকে। রক্তচাপ কমে গেলে বা প্রস্রাবের পরিমাণ দিনে ৫০০ মিলিলিটারের কম হলে, তিন দিন বাড়িতে চিকিৎসার পরও ব্যথা তীব্র রয়ে গেলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শিরায় স্যালাইন দিতে হতে পারে। চিকুনগুনিয়া রোগ শনাক্ত করতে পিসিআর, কালচার বা অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা যেতে পারে। উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এ রোগে গিরার কোনো স্থায়ী ক্ষতি হয় না, এটি বাতরোগও নয়।

চিকুনগুনিয়া থেকে বাঁচতে সতর্কতা

যেহেতু মশার কারণে রোগটি ছড়িয়ে থাকে, তাই মূল সতর্কতা হিসাবে মশার কামড় থেকে বাঁচার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন ঘরের বারান্দা, আঙ্গিনা বা ছাদ পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে পানি পাঁচদিনের বেশি জমে না থাকে। এসি বা ফ্রিজের নীচেও যেন পানি না থাকে, তাও নিশ্চিত করতে হবে ।

যেহেতু এই মশাটি দিনের বেলায় কামড়ায়, তাই দিনের বেলায় কেউ ঘুমালে অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। মশা মারার জন্য স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ছোট বাচ্চাদের হাফপ্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট পড়াতে হবে, আর সবার খেয়াল রাখতে হবে যেন মশা ডিম পাড়ার সুযোগ না পায়।

সবাই সুস্থ থাকুন, সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts

Leave a Comment