গৃহপরিচারিকা নিয়োগ । আমাদের দায়বদ্ধতা

সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আমাদের সমাজেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারন এই বৈষম্যের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে কর্মদাতা এবং কর্মজীবী কিংবা শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক। গভীরে ভেবে দেখলে আমরা বুঝতে পারি, এই দুটি সম্প্রদায়েরই একে অন্যকে প্রয়োজন। এবং এ বৈষম্য অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও, মানবাধিকারের মাপদন্ডে সকল শ্রেণীভুক্ত মানুষের অধিকার সমান। সকল স্তরের মানুষের জন্যই কথাটির মর্মার্থ বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । আমাদের দেশে বেশীরভাগ মধ্যবিত্ত্ব, উচ্চ-মধ্যবিত্ত্ব ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে এখন বেশ বড় একটি আলোচনার  বিষয় হোলঃ ‘বাসার কাজে   সাহায্যকারী/  বাচ্চা দেখাশোনা করার লোক/ মেইড’।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ যুগে দাস প্রথা আইনত চালু না থাকলেও, দাস প্রথার কিছুটা রেশ আমাদের  ব্যাবহারে এখন রয়ে গেছে। এদেশে আমরা আজও গৃহকর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত সুগঠিত কোন আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারিনি। ফলশ্রুতিতে বাড়ছে কর্মী ও গৃহকর্তার মধ্যকার বিদ্বেষ, যা  চূড়ান্ত পর্যায়ের কিছু অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের জন্ম দিয়ে আসছে। এই সমস্যার সামগ্রিক চিত্রটিতে শুধু যে গৃহকর্মীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে কিংবা তারাই নির্যাতিত হচ্ছে তাও না, অনেক ক্ষেত্রে গৃহকর্তা ও সেই পরিবারটিকে পড়তে হচ্ছে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মধ্যে যেমনঃ খুন, ডাকাতি , খাবারের সাথে ঘুমের ওষুধ কিংবা বিষ প্রয়োগ, মিথ্যা মামলা, শিশু হত্যা বা অপহরনের মতো ভয়ংকর কিছু অপরাধ ঘটছে গৃহকর্মীর সহয়তায়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কর্তা বা কর্মচারীর যেকোনো একটি পক্ষ অন্যায় করলে, ঢালাওভাবে অপরাধী ব্যাক্তি কিংবা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর সমালোচনা করা হয়, এবং অপরাধটি সংগঠিত হবার নিগূঢ় কারণগুলো এবং সমাজের মূল থেকে কিভাবে অন্যায়ের বীজ উপড়ে ফেলা যায়, তা আলোচনার বাইরেই থেকে যায়।

আমাদের ভাবতে হবে, আমাদের দেশে এখনো পাশ্চাত্যে ধাঁচের সমাজ বা শ্রম-ব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, আমাদের আইন এবং আইনের প্রয়োগও পুরোপুরি সুগঠিত ও নির্ভরযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছুতে পারেনি। আমাদের জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশ  দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে যাদের অধিকাংশই এখনও নিরক্ষরতার অভিশাপে  নিমজ্জিত। গৃহকর্মী বাছাই করার সময় যেহেতু বেশীরভাগ মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা গৃহস্থালির কাজ বা শিশুদের দেখাশোনা করার প্রশিক্ষণ থাকাকে আবশ্যক মনে করেন না, দারিদ্র্য বিমোচন কিংবা বেঁচে থাকার জন্য অনেকেই গৃহকর্মী হিসেবে যে কোনো একটি সচ্ছল পরিবারে চাকরী নেয়, কিংবা নিজেদের শিশু সন্তানকে পাঠিয়ে এ গুরুদায়িত্ব অর্পণ করে।

অপরপক্ষে, আমরা শহরের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের বেশ বড় একটি অংশ এ মানুষগুলো  থেকেই ভাষা, সুসভ্য আচরণ, পরিচ্ছন্নতা, পারিপাট্য , দ্রুত খাপ খাওয়ানো, সততা কিংবা আনুগত্য-প্রদর্শন সংক্রান্ত বেশ কিছু আচরণ প্রত্যাশা করে থাকি। স্বভাবতই, যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে পদে পদে তারা আমাদের এসব প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, এবং আমরাও ধীরে ধীরে তাদের আচরণে অসহিসষ্ণূ হয়ে পড়ি। আমাদের মানসিকতা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ব্যাস্ততার কারণে প্রায়ই আমরা ভুলে যাই, গৃহকর্মী ব্যাক্তিটি সম্পূর্ণ অন্য একটি পরিবার ও পরিবেশে  বেড়ে উঠেছে, যাদের অনেকেরই জীবনের প্রধান মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণেরই কোন নিশ্চয়তা ছিলো না। কর্মদক্ষতা কিংবা মূল্যবোধ ও অন্যান্য সুকুমার বৃত্তিগুলো বিকশিত হবার সুযোগই হয়তো সে পায়নি। আমাদের একার পক্ষে সমাজের এ চিত্র পরিবর্তন করা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু সামগ্রিক প্রেক্ষিতে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং গৃহকর্মীদের কাছ থেকে কতখানি প্রত্যাশা করা উচিৎ তার নিয়ন্ত্রণ হয়তো সম্ভব।

এই লেখাটি কিছু পরামর্শের সাথে ছোট্ট একটি আহ্বান সবার প্রতি, বিশেষ করে শহুরে যেসব পরিবার তাদের গৃহকর্ম কিংবা শিশুর দেখাশোনা করার জন্য গৃহপরিচারিকা নিয়োগ করেনঃ

আত্মনির্ভরশীলতা ও উভয় পক্ষের অধিকার সংরক্ষণঃ

  • গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে ভুলটি বেশীরভাগ মানুষ করে থাকেন, তা হোল ‘অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা’। কর্মচারী নির্ভর করার যোগ্য কিনা, আগ্রহী কিনা কিংবা মানসিক ও শারিরিকভাবে সক্ষম কিনা তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গৌণ হয়ে যায়। অন্যের সততা কিংবা সাহায্যের উপর এই নির্ভরশীলতা গৃহকর্মী  নিয়োগের সময় আমাদের মনে এক ধরণের ভীতি তৈরি করে, বেশীরভাগসময় যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে শর্তারোপ কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে। যেহেতু এটি একটি চাকরী – তাই শর্ত থাকা বাঞ্ছনীয় । কিন্তু, কিছু প্র্যাকটিসঃ যেমন, পরিচয়পত্র কিংবা মূল্যবান কিছু আটকে রাখা, বেতন আটকে রাখা, তার অতীত কিংবা বর্তমানের কোন দুর্বলতা কিংবা গোপনীয়তা প্রকাশ করে দেয়ার ভয় কিংবা অন্যান্য কিছু অন্যায্য ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তাকে চাকরী করতে বাধ্য করা ইত্যাদি আমাদের সমাজে অসংখ্য পরিবারে দেখা যায়।চাকুরিদাতা অবশ্যই চাকুরীর শর্ত প্রয়োগ করবেন, তবে সে শর্ত যেন কোনভাবেই মানবাধিকারের সাথে সাঙ্ঘর্ষিক না হয়। এতে শুরু থেকেই গৃহকর্মীর মনে ঐ পরিবারের প্রতি অনীহা কিংবা ক্ষোভের জন্ম হতে পারে। গৃহকর্মীর নিজের পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করার ও সেক্ষেত্রে কিছুটা প্রাইভিসির সুযোগ থাকা বাঞ্ছনীয়। এর ফলশ্রুতিতে যদি কোন বিপদের আশঙ্কা থাকে, সেক্ষেত্রে নিজেকেই নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যের অধিকার হরণ করে নিজের নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা নিতান্তই বোকামি।মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার এবং কোন মুল্যের বিনিময়েই একজন মানুষের স্বাধীনতা কেনা যায় না। এ ধরণের আচরণের ফলে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয়া চাপা আক্রোশের শিকার হতে পারে আপনারই পরিবারের কোন নিরীহ সদস্য কিংবা শিশুরা।

গৃহকর্মীর সঠিক পরিচয়, মধ্যবর্তী ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ নেয়াঃ

  • গৃহকর্মী নিয়োগের আগে অবশ্যই ভালোভাবে খোঁজখবর নিন, যতই পরিচিত সোর্স থেকেই হোক না কেন, নিজেরাই কিছুটা ইনভেস্টিগেইট করে নিন। জাতীয়তা পরিচয়পত্রের কপি এবং ছবি নিয়ে প্রফেশানাল-ভাবে বায়ডাটা সংরক্ষন করুন। প্রয়োজনের প্রদান করা পরিচয় ও ঠিকানার সত্যতা নিজেরাই যাচাই করে নিন। অবশ্যই এক বা একাধিক প্রয়োজনীয় রেফারেন্স এবং মিউচুয়ালী পরিচিত কোন ব্যক্তি/মাধ্যম রাখুন। কোন এজেন্সির মাধ্যমে লোক নিয়োগ করলেও এজেন্সি সম্পর্কেও যথেষ্ট খোঁজ খবর নিন।

নির্ধারিত কাজের সময় এবং বিশ্রাম ও ছুটিঃ

  • গৃহকর্মীর কাজের একটি নির্দিষ্ট সময় রাখুন। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে শোবার আগে পর্যন্ত তাকে দিয়ে ফুটফরমাশ খাটালে , প্রকৃতিগতভাবেই সে ব্যাক্তির কাজের প্রতি অনীহা এবং অন্যমনস্কতা দেখা যাবে। কারো আচরনে সেটি ফুটে উঠবে, আবার কেউ কেউ ভেতরে ভেতরে ক্ষুদ্ধ হতে শুরু করবে। তার জন্য কয়েক ঘণ্টা কর্মবিরতির ব্যাবস্থা রাখা উচিত, যে সময়টা শুধুমাত্র সে নিজের জন্য ব্যয় করবেঃ যেমনঃ তার পরিবারের সাথে ফোনে কথা বলা, কিংবা আপনার বাড়ীর সদস্যদের সাথে টিভি দেখা, পড়াশোনা ,প্রার্থনা, রুপচর্চা কিংবা যেকোনো কিছু যা সে করতে পছন্দ করে। গৃহকর্মী শিশু কিংবা কিশোরী হলে, অবসরের কর্মকাণ্ড কিছুটা তদারকই করুন, এবং তাকে গঠনমূলকভাবে সে সময়টি উপভোগ করতে উৎসাহী করুন। মাঝে মাঝে তাদের সাথে আন্তরিকভাবে গল্প-গুজব করুন, পরিবারের খবর নিন এবং বেড়াতে নিয়ে যান। বাইরে থেকে কোন খাবার আনা হলে তা তাদের সাথে শেয়ার করুন।

প্রশিক্ষন প্রদান ও ধৈর্য্য ধারণঃ 

  • গৃহকর্মীর আচার ব্যাবহার এবং কাজে ট্রেন-আপ করার জন্য কিছুদিন সময় নিন। তাকে পর্যবেক্ষণ করুন, ভালো কাজের প্রশংসা করুন, কোন দোষ করলে বুঝিয়ে বলুন, এবং কোন কাজ শিখতে দেরি হলে নিজেই করে দেখান বেশ কয়েকবার। মনে রাখবেন, সবার আই-কিউ এবং শেখার প্রবণতা সমান হয় না। পরিবারের লোকজন কাজে হাত লাগালে এবং তাদেরও পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে ভাবার চেষ্টা করলে অপর দিক থেকেও আশাব্যঞ্জক সাড়া পাওয়া যায়। তবে, চেষ্টা করার পরও আশানুরূপ ব্যাবহার ও সাড়া পাওয়া না গেলে, বিকল্প চিন্তা করতে হবে। এসময় আপনাকেই প্রায়োরিটি ঠিক করতে হবে, ঠিক কোন কাজটির জন্য আপনার বিশেষভাবে সাহায্য প্রয়োজন। যেমনঃ একজন গৃহকর্মী রান্নায় বিশেষ পারদর্শি, কিন্তু শিশুর দেখাশনায় অমনো্যোগী, কিংবা একজন খুব বিশ্বাসী কিন্তু কাজে একেবারেই অপটু- এসময় আপনাকেই ঠিক করতে হবে, ঠিক কোন কাজটার জন্য আপনি বিশেষভাবে নির্ভর করতে চাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে সে ব্যাক্তি বিশেষ কিছু কাজে অপটু হলে, সে কাজ থেকে তাকে অব্যহতি দেয়াই শ্রেয়।

    শিশুশ্রমিক নিয়োগঃ

    শিশুকিশোর পর্যায়ের কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ও শিক্ষার চাহিদা পুরন করা আমাদেরই কর্তব্য। অন্যথায় তাদের নিয়োগ না করাই বাঞ্ছনীয়। মনে রাখবেন, আপনি যদি তাকে লেখাপড়া শেখার গুরুত্ব, মিথ্যা/চুরি/পরনিন্দা থেকে বেঁচে থাকা এবং ভালো ব্যবহারের গুরুত্ব ইত্যাদি সম্পর্কে উপদেশ দেন, এবং সুন্দর মানসিক বিকাশের সুযোগ দেন, তাহলে তারা কোন অন্যায় কাজের জন্য করা আপনার শাসনকেও পসিটিভলী নিতে শিখবে। এমনকি তাদের অভিভাকগনও নিশ্চিন্ত হতে পারবে। তবে, শাসন করতে গিয়ে কোন অবস্থাতেই কারো গায়ে হাত তোলা কিংবা আজেবাজে ভাষায় গালিগালাজ করা যুক্তিসঙ্গত নয়। এতে আপনার নিজের আত্মা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় ঘটে। আপনার সন্তানের মুল্যবোধ গড়ে ওঠায় আপনার আচরণ বিশেষ ভুমিকা রাখে, সুতরাং কাজের লোকের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ কিংবা নিষ্ঠুরতা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের জন্য বিষাদময় ফলাফল বয়ে আনে। আপনি নিতান্তই অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মীর অভিভাকত্ব পালনে অক্ষম হলে সে দায়িত্ব না নেয়া তথা অপ্রাপ্তবয়স্ক কাউকে নিয়োগ না করাই শ্রেয়।

    মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধ কিংবা মানসিক অসুস্থতা থাকলে সচেতন হোনঃ

    আপনি যদি OCD (Obsessive Compulsion Disorder) , মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধ, ডিপ্রেশান কিংবা অন্য যেকোনো ধরণের আচরণজনিত কিংবা মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকেন, এর জন্য পরিবারের সদস্য এবং কাছের বন্ধুদের সাথে আলোচনা করুন এবং প্রয়োজনে একজন ভালো কাউন্সেলরের বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। আমাদের বিভিন্ন সংস্কারের কারণে আমরা নিজেদের কিংবা  পরিবারের কারো স্বাভাবিক কিংবা বিকৃত আচরণকে লুকিয়ে রেখে কিংবা সমালোচনা কিংবা শাসন করে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করি। অনেক ক্ষেত্রেই এসব চেষ্টা অবস্থার আরো অবনতি ঘটায়। সুতরাং, আপনি নিজের অথবা পরিবারের কাউকে গৃহকর্মীর সাথে অন্যায় আচরণ করতে দেখলে রাগ পরে যাওয়ার পর ব্যাপারটি নিয়ে ভেবে দেখুন, কথা বলুন এবং নিজের স্বার্থেই প্রয়োজনীয়  ব্যাবস্থা নিন। অনেক সময় নবজাতকের জন্মের পর মা বাবী ব্লু এবং কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতা দেখা যায়। শুনতে খারাপ লাগলেও, এ সমস্যায় আক্রান্ত মা অনেক সময় নিজের নবজাতক বাচ্চার প্রতিই নিষ্ঠুরতা দেখাতে পারে, সুতরাং অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মীরা শিকার হতে পারে অনায়াসেই। মানসিক সমস্যা অন্য তরফ থেকে মানে, কাজের লোকের ক্ষেত্রেও হতে পারে, এসব ক্ষেত্রে তার আচরণজনিত সমস্যা চিহ্নিত হলে, সম্ভবপর পদক্ষেপ নিন।

       নিজের শিশুর নিরাপত্তা 

  • কর্মজীবী মায়েদের জন্য বাচ্চা বাসায় রেখে কাজে যাওয়া খুবই চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ, বিশেষ করে যারা একক পরিবারে থাকেন। আজকাল অনেক জায়গায় ডে-কেয়ার গড়ে উঠছে, অনেক কর্মস্থলেও কর্মচারীদের বাচ্চাদের জন্য ডে-কেয়ারের সুব্যাবস্থা থাকে। আজকাল গৃহপরিচারিকা দ্বারা বিভিন্নভাবে শিশুরা নির্যাতিত, অবহেলিত এমনকি অপহৃতও হচ্ছে।      নিতান্তই বাসায় বাচ্চা শুধুমাত্র কাজের লোকের কাছে রেখে যেতেই হলে, চেষ্টা করুন, পরিবারের কেউ/আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে সাহায্য নিতে, যিনি বাচ্চার মা-বাবা বাইরে থাকার সময়টিতে কয়েক ঘণ্টার জন্য আপনার বাসায় অবস্থান করবেন। স্টুডেন্ট, সক্ষম অবসরপ্রাপ্ত কেউ কিংবা চাকরী খুঁজছেন এমন কোনো আত্মিয়া থাকলে, তাকে অফার করে দেখতে পারেন ভালো কোনো পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বেবী সিটিং করবেন কিনা। মনে রাখবেন, শুধু মাত্র একজন ব্যাক্তি বাসায় থাকলে, এমনকি তিনি যদি বিশ্বাসীও হন, ব্যাপারটা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ ।কারণ, ওই ব্যক্তির নিজের প্রয়োজনীয় কাজ যেমন ওয়াশরুমে যাওয়া কিংবা অন্যান্য যেকোনো জরুরী মুহূর্তে ছোট বাচ্চা unattended অবস্থায় থাকে। আজকাল সিসিটিভি ব্যবহার করছেন অনেকেই বাসায় রেখে যাওয়া বাচ্চা ও পরিচারিকাকে নিরীক্ষণ করার জন্য।

      গৃহকর্মীর নিরাপত্তা

  • গৃহকর্মীর সামগ্রিক নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হয়, অন্ততপক্ষে সে যতক্ষণ আমাদের অধীনস্থ অবস্থায় থাকে। তাদের যেকোনো অসুস্থতা ও মানবিক প্রয়োজনে ছুটি ও চিকিৎসার ব্যাবস্থা করা, কাজ করাকালীন কোন দুর্ঘটনায় পতিত হলে সে খরচ বহন করা , অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনায় মারা গেলে, পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করা এবং সর্বপরি নিজের কাছে , আইনের কাছে ও গৃহকর্মীর পরিজনের কাছে সচ্ছ থাকা। ঘরে শিশু কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মী থাকলে তার থাকা এবং শোবার যায়গা যথাযথ ও নিরাপদ থাকা আবশ্যক। বাইরে গেলে অনেকেই পরিচারিকাকে তালা বন্ধ ঘরে রেখে যান, এমতাবস্থায় তার দ্বারা ডাকাতি বা চুরির ভয় থাকলে, বেডরুম অথবা পরিচারিকার যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না এমন রুমগুলো তালা দিয়ে যেতে পারেন। যেকোনো ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কিংবা কোন দুর্ঘটনায় ঘটে যেতে পারে মর্মান্তিক কোন ব্যাপার। কোন অবস্থাতেই শিশু অথবা কিশোরী গৃহপরিচারিকাকে একা অবস্থায় কোন পুরুষ আত্মীয় এমনকি কিশোর বা তরুন সন্তানের সাথে রেখে বাইরে যাবেন না। আপনার বেড়ে উঠতে থাকা সন্তানকে যথাসম্ভব স্বাবলম্বী এবং গৃহস্থালির যেকোনো কাজে পরমুখাপেক্ষী করে তুলবেন না। এতে তারই বেশী ক্ষতি হবে।

সবশেষে বলতে চাই, মানুষের জীবন কখনো অন্য কারো অনুপস্থিতিতে থেমে থাকে না। গৃহপরিচারিকাহীন জীবন কখনই অর্থহীন হয়ে যায় না, বরং জীবন যুদ্ধে একলা বেঁচে থাকতে শেখায়। সুতরাং অযাচিত আশা করা কিংবা অন্যের উপর অতিরক্ত নির্ভরশীলতার কারণে হতাশ না হয়ে, জীবনের বাস্তবতা কে মেনে নেয়া, এবং নিজের সমস্যার সমধানে নিজেই উদ্যামী হতে পারাই একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষের পরিচায়ক। আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের মানসিকতারও পরিবর্তন বিশেষভাবে জরুরী। যদিও এ পরিবর্তন আনা খুব সহজ কাজ নয়, তবে যেকোনো সমস্যার গভিরে তলিয়ে দেখে সমস্যার মূল উৎপাটন করার চেষ্টা করাই যুক্তিসঙ্গত ভুমিকা রাখতে পারে।

Related posts

Leave a Comment