সপ্তাহ ২৫ । গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

এখন আপনার গর্ভাবস্থার প্রায় ছয় মাস। আপনার পেট আরও বেশী গোলাকার এবং প্রতি সপ্তাহে  আরো বেশী গরভধারন এর চিহ্ন ফুটে উঠছে। কোন সন্দেহ নেই যে আপনি শিশুর জন্য পরিকল্পনা শুরু করেছেন এবং আপনার কি প্রয়োজন হবে সে সম্পর্কে চিন্তা করছেন। যদি আপনার আরেকটি  বাচ্চা থাকে তবে ব্যাপারগুলো  আপনার কাছে তুলনামূলকভাবে সহজে মনে হবে, কিন্তু যদি এটি আপনার প্রথম সন্তান হয় তবে তা আপনাদের কাছে অনেক উত্তেজনাপূর্ণ।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনার গর্ভের শিশুটির আপাদমস্তক দৈর্ঘ্য এ সপ্তাহে হবে প্রায় সাড়ে ১৩ ইঞ্চি এবং তার ওজন হবে প্রায় দেড় পাউন্ড। তার আকার এ সপ্তাহে তুলনা করা যেতে পারে মাঝারি আকারের একটা শালগমের সাথে।

শিশুটি এখন শব্দ আর স্পর্শে সাড়া দেবে। তার কান শব্দের প্রতি খুবই সংবেদনশীল থাকবে। ফলে সে আপনার এবং আপনার আশেপাশের মানুষের কণ্ঠস্বরও স্পষ্ট শুনতে পারবে। সে এখন তার নড়াচড়ায় পূর্ন প্রাণশক্তি দেখিয়ে দেবে। জোরালো শব্দ শুনলেই সে লাথি মেরে বা লাফ দিয়ে সাড়া দেবে। পরিচিত কণ্ঠস্বর ( যেমন আপনার স্বামী, মা, বোন ) শুনলে শিশুটি নড়েচড়ে বুঝিয়ে দেবে যে সে তাদের কথা শুনছে!

শিশুটি এখন নিয়মিত ঢেকুর তুলবে এবং আপনিও হয়তো প্রতিটা ঢেঁকুরের সাথে সাথে ঝাঁকুনির শব্দটাও টের পাবেন।এতদিন যাবৎ বন্ধ থাকা নাসারন্ধ্রও (nostril) এ সপ্তাহে পুরোপুরি খুলে যাবে। তার মাথায় চুল গজাবে, যার নিজস্ব বর্ণ আর ধরণ থাকবে।আপনার চটপটে শিশু এখন তার পা স্পর্শ ও ধরে রাখতে, এবং হাত মুষ্টি করতে পারবে। আপনার সঙ্গী আপনার পেটে কান চেপে ধরলে হয়তো তার হৃদস্পন্দন ও শুনতে পারবেন। এ সময় আপনার শিশুর নিয়মিত ঘুমের সময়সূচী থাকবে কিন্তু সেটা হয়তো আপনি এখনই বুঝতে পারবেন না।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনি

এখন আপনার চুল আগের চাইতেও আরও ঘন হয়ে উঠবে। সেটা অবশ্য কারো জন্য আশীর্বাদ, আবার কারো জন্য অভিশাপ। আপনার চুল এত ঘন হয়ে বাড়ছে সেজন্য নয়, বরং এ জন্য যে অতিমাত্রার ইস্ট্রোজেন ( oestrogen) এর ক্ষরণ আপনার নতুন চুল গজানোর চক্রকে বিলম্বিত করে দিচ্ছে এবং চুল পড়া কমাচ্ছে। শিশুর জন্মের পর আপনার এসময় গজানো অতিরিক্ত চুল সব পড়ে যাবে, হয়তো বা গোছা ধরে!

আপনার রক্তশূন্যতা( Anemia) আছে কি না তা দেখার জন্য এ সপ্তাহে ডাক্তার রক্তপরীক্ষা করতে বলবে। এখন থেকে আপনাকে খাবারের সাথে বাড়তি লৌহ উপাদানের সাপ্লিমেন্ট ( Iron suppliment, ট্যাবলেট আকারে) নিতে হতে পারে। কোনো কোনো ডাক্তার গর্ভাবস্থার প্রথম থেকেই খাবারের পাশাপাশি বাড়তি আয়রন সাপ্লিমেন্ট চালিয়ে যেতে বলেন। বিশেষ করে বাংলাদেশে বেশীরভাগ নারীই গর্ভধারণ করার অনেক আগে থেকেই রক্তশূন্যতায় ভোগেন।

আপনার প্রসারিত জরায়ুকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য লিগামেন্ট ও পেশীগুলো কাজ করে যাচ্ছে। Progesterone এবং Relaxin হরমোন আপনার ফাইবার গুলোকে আলগা ও শিথিল করতে সাহায্য করে। এটা আপনার শরীরকে প্রসব এর জন্য তৈরি করে। এসময় গরম পানিতে গোসল বা ম্যাসাজ করলে আরাম বোধ হতে পারে।

অনেক গর্ভবতী হয়ত লক্ষ্য করেছেন দাঁত ব্রাশের সময় মাড়ি থেকে রক্ত বের হয়। এটা অস্বাভাবিক কোনো কিছু নয়। গর্ভাবস্থায় দেহ হরমোনের পরিবর্তন হয় এবং তার প্রতিক্রিয়া মাড়িতেও দেখা দিতে পারে।ই অবস্থাকে বলা হয় গর্ভাবস্থার মাড়ির প্রদাহ বা (pregnancy gingivitis)। এই অসুবিধা মোকাবিলা করার জন্য সর্বাগ্রে যা করণীয় তা হলো গর্ভাবস্থার শুরু থেকে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ বা পরিষ্কার করা নিশ্চিত করা যাতে ডেন্টাল প্লাক সৃষ্টি না হয়। এ ক্ষেত্রে দন্ত চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে গর্ভাবস্থার পুর্বেই দাঁত স্কেলিং করা এবং সঠিক ব্রাশ চালনা পদ্ধতি জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

এখন আপনার ‘গর্ভবতী পেট’ বেশ ভালোভাবেই দৃশ্যমান হবে। তবে, এটাও মনে রাখতে হবে কারো কারো পেট যেমন অনেক বড় হয়, তেমনি কারো কারো পেট আবার খুব বড় হয় না। সুতরাং, পরিচিত অন্য গর্ভবতী মায়েদের চাইতে আপনার পেট বড় বা ছোট হলো কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। এখন থেকে প্রতি সপ্তাহেই আপনার ওজন আধা পাউন্ড করে বাড়তে থাকবে। ভালো খাবার অবশ্যই খাবেন, কিন্তু এটাও সতর্ক থাকতে হবে যে খুব বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার যাতে খাওয়া না হয়। আপনার ক্যালরি মাপুন এবং এ সময় মিষ্টিজাতীয় খাবারের প্রতি তীব্র ক্ষুধাকে কীভাবে দমন করবেন সে সম্পর্কে জানুন।

বর্ধিষ্ণু শিশুটিকে জায়গা করে দিতে পেট বাড়ছে, চামড়াতেও টান পড়ছে। ফলে এখন থেকে চামড়ায় স্ট্রেচ মার্কও (Stretch mark) পড়তে শুরু করবে। আপনার পেট, স্তন এবং উরুতে এই দাগ বেশি দেখা যাবে। প্রথম প্রথম এই দাগগুলো লাল রেখার মতো থাকবে, তারপর আস্তে আস্তে রূপালী ছাই বর্ণ ধারণ করবে। অবশ্য এটা আপনার ত্বকের রঙের ওপরও নির্ভর করবে। যদিও অ্যান্টি-স্ট্রেচ মার্ক লোশন বা তেল পুরোপুরিভাবে কাজ করে এমন প্রমাণ নেই, তারপরও অনেকটা হলেও দাগ দূর হয় এবং চুলকানি থেকে আরাম পাওয়া যা

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে করনীয়

এ সপ্তাহ থেকে সক্রিয় চলাফেরা আপনার জন্য একটু কঠিন হয়ে যেতে পারে। তবে ডাক্তার নিষেধ না করা পর্যন্ত আপনি প্রতিদিনের ব্যায়াম চালিয়ে যেতে পারেন। তবে যে ব্যায়ামই করুন না কেন, তাতে যেন খুব বেশি নড়াচড়া করতে না হয়। এমন কোনো খেলায় অংশগ্রহণ করা যাবে না যেখানে সংঘর্ষের ঝুঁকি আছে বা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ সময় আপনাকে প্রচুর পানি পান করতে হবে। ব্যায়ামের আগে এবং পরে অবশ্যই বিশ্রাম নিন। পানিশূন্যতা যেন না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।

একটানা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাটা আপনার জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে। আপনি খেয়াল করে দেখবেন যে আপনার পায়ের শিরাগুলো বেশ স্পষ্ট বোঝা যাবে। শিশুটির আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে আপনার শরীরের ভর কেন্দ্রেও পরিবর্তন আসবে এবং আপনার বর্ধিত ওজনের ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা হবে। সমান তলা বিশিষ্ট জুতা পরার চেষ্টা করুন এবং যখনই মনে হবে কোনোভাবে দাঁড়ালে বা বসলে আপনি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে পারেন, তাহলে সেটা না করুন।

গর্ভাবস্থায় দাঁতের যত্ন নেয়া খুবই প্রয়োজন৷ এসময় দাঁত  পরিষ্কার রাখতে হবে৷ গর্ভাবস্থায় অনেক সময় মাড়ি ফুলে রক্তপাত হয়৷ তাই এ সময়ে মাড়ির যত্ন প্রথম থেকেই নেওয়া উচিত৷ প্রতিদিন সকালে ও রাতে শোয়ার আগে দাঁত ব্রাশ করা প্রয়োজন৷ দাঁত বা মাড়ির কোনও সমস্যা থাকলে দন্ত চিকিত্‌সকের পরামর্শ নিন৷

আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে আপনার ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাক। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদেরpregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

আপনারপ্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অন্য সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণে প্রোটিন, ফলিক এসিড ও অয়রন সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন।আপনার উদরে বেড়ে উঠা শিশুর বৃদ্ধির জন্য এই উপাদানগুলো অনেক বেশি প্রয়োজন। প্রচুর পরিমানে ভিটামিন- সি খাওয়ার চেষ্টা করুন।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজন কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

আমাদের পেটের ডান দিকে থাকে বৃহৎ শিরা ইনফিরিয়র ভেনাকাভা, যা শরীরের নিচের অংশ থেকে রক্ত হূৎপিণ্ডে চালান করে। গর্ভকালে ভারী পেট নিয়ে ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকলে এই শিরার ওপর চাপ পড়ে ও রক্ত সংবহন ব্যাহত হয়। তার চেয়ে বাঁ দিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকলে রক্ত সংবহন বাড়ে, ফলে শিশুর শরীরেও রক্ত বেশি সঞ্চালিত হতে পারে, তাছাড়া পায়ে পানি জমাটাও কমে। তাই পাঁচ মাসের পর থেকে মাকে অন্তত কয়েক ঘণ্টা বাঁ দিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকতে বলা হয়।

সময় কাটানোর অংশ হিসেবে বাচ্চার নাম এখন থেকেই খুজতে পারেন। বাচ্চার সুন্দর আরবি বা বাংলা নাম ও নামের অর্থ জানতেFairyland Baby Names Finder এর সাহায্য নিতে পারেন।

 

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২৪
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২৬>>

 

তথ্যসূত্রঃ

www.maya.com.bd/content/web/wp/1839/
babycenter.com
parenting.com

 

Related posts

Leave a Comment