সপ্তাহ ২৪ । গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার ২৪ তম সপ্তাহে আপনার শিশুটির ওজন ১০০ গ্রাম বৃদ্ধি পাবে। এখন তার ওজন হবে প্রায় ৪৫০ গ্রাম। দৈর্ঘ্যে সে এখন প্রায় ১২ ইঞ্চি।আপনার শিশুর রক্তের শ্বেতকণিকা, যা রোগ এবং সংক্রমণ বন্ধ করতে সাহায্য করে,তার গঠন এই সপ্তাহে শুরু হয়ে যাবে।তার ত্বকের ভাঁজগুলোতে এখন চর্বি জমতে থাকবে, সে কারণে তার মাংসল চেহারা দেখতে এখন বেশ ভালও লাগবে । এ সপ্তাহে দেহযন্ত্রের যে অংশগুলোর দ্রুত বিকাশ হবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফুসফুস আর মস্তিষ্ক ।

শ্বাসযন্ত্রের ( respiratory tree ) ভেতর ব্রঙ্কিওল ( bronchioles ) এবং ব্রঙ্কি ( bronchi ) বিকশিত হবে এই  সপ্তাহে । সেই সাথে surfactant ( এক ধরণের তরল পদার্থ যা শ্বাসক্রিয়ায় সাহায্য করে) উৎপাদনকারী কোষেরও বিকাশ ঘটবে । এর মানে হচ্ছে জন্মের পর শিশুটি যখন প্রথমবারের মতো নিঃশ্বাস নেয়ার চেষ্টা করবে, তখন surfactant নামক এই তরল উপাদান ফুসফুসকে বিস্তৃত হতে সাহায্য করবে ।

যেসব উন্নত দেশে যুগোপযোগী চিকিৎসা ব্যবস্থা ও নবজাতকের জরুরী সেবা প্রদানের সকল ব্যবস্থা আছে, একমাত্র সেখানেই এই সপ্তাহ নাগাদ জন্ম নেয়া একটি শিশু বাঁচতে পারবে। সাধারণত গর্ভধারণের ২৪ সপ্তাহ নাগাদ জন্ম নেয়া কোনো শিশুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা একবারেই কম কারণ এখনো তার ফুসফুস এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের পূর্ণ বিকাশ সাধন হয়নি । আর যদি কোনো শিশু এ সময় জন্মের পর বেঁচেও যায় , তার প্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনি

এ সপ্তাহে হয়তো আপনার ডাক্তার রক্তে শর্করার ( blood sugar) পরিমাণ দেখার জন্য রক্ত পরীক্ষা করতে বলবে । এ ব্যাপারে একেকজন ডাক্তারের দৃষ্টিভঙ্গি একেকরকম । কেউ হয়তো আপনাকে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ব্লাড সুগার টেস্ট করতে বলবে, কেউ হয়তো ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট ( oral glucose tolerance test ) দেবে । রক্ত পরিক্ষার জন্য আপনাকে সকালবেলা খালি পেটে হাসপাতালে যেতে হবে এবং রক্তের নমুনা দিতে হবে। তারপর আপনাকে গ্লকোজ মিশ্রিত পানি খেতে দেয়া হবে কিংবা সকালের নাস্তা করতে বলা হবে। এর দুই ঘণ্টা পর আবার আপনার রক্তের নমুনা নেয়া হবে । ডায়াবেটিস এর জন্য এইটাই সবচেয়ে সঠিক পরীক্ষা এবং গর্ভবতী মায়ের ডায়াবেটিস আছে কিনা তা দেখার জন্য ২৪তম সপ্তাহ নাগাদ এই পরীক্ষা করতে বলা হয় । অনেক মহিলারই গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। যদি এর আগে তারা সুস্থও থাকেন , গর্ভাবস্থায় হরমোনের কারণে অনেকের শরীরে ডায়াবেটিস বিকাশ লাভ করতে পারে ।

যদিও গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস মানেই বড়ো কোনো বিপদ নয়, তারপরও এর ফলে সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে, এবং গর্ভের শিশুর উপরও ক্ষতিকর প্রভাব পরতে পারে। যেসব মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ( Gestational Diabetes ) থাকে তাদের গর্ভের শিশু আকারে বড় হয় এবং সিজারিয়ান সেকশনের ( Caesarean section) মাধ্যমে সন্তান প্রসব করাতে হয় । জন্মের পর পরই সেই শিশুর রক্তে গ্লুকজের পরিমাণ কমে যাবার সম্ভাবনা থাকে। ফলে ডায়াবেটিক মা কে তখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করতে হয়। কখনো কখনো সেটা জন্মের আধা ঘণ্টার মধ্যেও হতে পারে ।

এখন থেকে আপনার বুকে অল্প অল্প দুধ তৈরি হওয়া শুরু হবে । কখনো কখনো স্তনবৃন্ত দিয়ে সামান্য তরল নিঃসরন হতে পারে।এটা নিয়ে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।স্তনবৃন্ত দিয়ে তরল নিঃসরন হলে কি করবেন সে ব্যাপারে জেনে নিন।আপনার জরায়ুর অবস্থান এখন আপনার নাভিদেশ (Umbilicus) বরাবর থাকবে।

শিশু যখন মায়ের পেটে বৃদ্ধি পায় আর তখন মায়ের পেটের বৃদ্ধিটাও স্বাভাবিক। তখন একজন মায়ের হাঁটা চলা কিংবা বিভিন্ন কাজের সময়ে ‘কোমর ব্যাথা’ আর ‘হাঁটু ব্যাথা’ অনুভুত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এসময় হাড়ের জয়েন্টের সমস্যাও কোমরে ব্যাথার কারন হিসেবে গণ্য হতে পারে। আবার গর্ভাবস্থায় লিগামেন্ট ঢিলে হয়ে যাবার কারনে পায়েও ব্যাথা অনুভুত হতে পারে। আর এ জন্য দায়ী গর্ভকালীন সময়ের কিছু হরমোন। তাছাড়াও অতিরিক্ত ওজনের কারনেও এমনটা হতে পারে।

খাওয়ার পর পরই বুক জ্বালা-পোড়া করা বা বদহজমের সমস্যা হতে পারে এবং পেট ফুলে যেতে পারে। এসময় অনেকের মাড়ি ফুলে যাওয়ার সমস্যাও হয়ে থাকে, ফলে দাঁত ও মাড়ির যত্ন নেয়া জরুরি।

আপনার কোষ্ঠকাঠিন্যের ভাব এখনই দূর হয়ে যাবে না। এ সময় প্রচুর পানি খাওয়া আপনার জন্য উপকারী হবে। এতে করে মূত্রনালির কোনো সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে তাও কমে যাবে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহের কিছু টিপস

কোষ্ঠকাঠিন্য যেন না হয় সে জন্য প্রচুর পানি পান করতে হবে। দিনে অন্তত আট গ্লাস পানি পান করতে হবে। আঁশ আছে এ রকম খাবার, যেমন- শাকসবজি, ফলমূল, বিচিজাতীয় খাবার, ডাল, আটা ইত্যাদি খেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করার জন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না।

গর্ভাবস্থায় দঁাতের যত্ন নেয়া খুবই প্রয়োজন৷ এসময় দঁাত পরিষ্কার রাখতে হবে৷ গর্ভাবস্থায় অনেক সময় মাড়ি ফুলে রক্তপাত হয়৷ তাই এ সময়ে মাড়ির যত্ন প্রথম থেকেই নেওয়া উচিত৷ প্রতিদিন সকালে ও রাতে শোয়ার আগে দঁাত ব্রাশ করা প্রয়োজন৷ দঁাত বা মাড়ির কোনও সমস্যা থাকলে দন্ত চিকিত্‌সকের পরামর্শ নিন৷

হালকা ব্যায়াম করতে হবে কিন্তু ভারি কাজ করা যাবে না । ঝুকে বা নুয়ে কাজ না করাই উচিত । হাঁটা চলায় সাবধান হতে হবে । এগুলো আমরা সবাই জানি কিন্তু ঠিক মত পালন করিনা। কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সচেতন থাকতে হবে ।

নিজের শরীরের প্রতি বাড়তি একটুই যত্ন নিন। খেয়াল করুন কাজের সময় যেন পেটের উপর তেমন কোনও চাপ না পরে। মেরুদন্ড সোজা রেখে হাঁটা এবং বসার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়াও খেয়াল করুন আপনি যে খাদ্য গ্রহন করছেন তা যেন স্বাস্থ্য সম্মত হয়। তাতেই আপনার সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে অনায়াসে।

অন্যদিকে পায়ে ব্যথা থাকলে এসময় একটি বিশেষ ধরনের জুতা আছে, যা ব্যাথা কমাতে কার্যকর। দিনের বিভিন্ন সময়ে কাজের ফাঁকে পায়ের বিশ্রাম দিন। কিছুক্ষন পর পর পায়ের উপর চাপ কমাতে, পা ঝুলিয়ে বসুন। তবে কখনোই খুব বেশী শুয়ে বা বসে থাকা যাবে না, এতে করে পায়ে পানি চলে আসতে পারে।

আপনার যদি আরেকটি সন্তান থাকে, তাহলে নতুন অতিথির জন্য তাকে এখন থেকেই মানসিকভাবে তৈরি করতে শুরু করুন। অনেক বাচ্চাই সহজে তাদের নতুন ভাই/বোনের সাথে তাদের ঘর, খেলনা, কাপড়চোপড়, সর্বোপরি মা-বাবাকেও শেয়ার করতে চায় না। কীভাবে প্রথম সন্তানকে নতুন শিশুটির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করবেন সে ব্যাপারে আরো জানুন।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

ডাক্তারের কাছে যাবার সময় আপনার সঙ্গীকেও সম্ভব হলে সঙ্গে নিয়ে যান। তাহলে গর্ভাবস্থার বিভিন্ন খুটিনাটি বিষয় সম্পর্কে দু’জনে একসাথেই জানতে পারবেন।

সময় কাটানোর অংশ হিসেবে বাচ্চার নাম এখন থেকেই খুজতে পারেন। বাচ্চার সুন্দর আরবি বা বাংলা নাম ও নামের অর্থ জানতে Fairyland Baby Names Finder এর সাহায্য নিতে পারেন।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২৩
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২৫>>

তথ্যসূত্রঃ
www.maya.com.bd/content/web/wp/1843/
babycenter.com
parenting.com 

Related posts

Leave a Comment