সপ্তাহ অনুযায়ী গর্ভধারণ । সপ্তাহ -২০

অভিনন্দন! গরভধারনের অর্ধেক পথ আপনি পাড়ি দিয়ে এসেছেন। ২০ তম সপ্তাহে আপনার গর্ভের শিশুটি দৈর্ঘ্যে এখন একটি কলার সমান। শিশুটি এখন ২০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ওজন প্রায় ৩৪০ গ্রাম। এ সময় শিশুটির চোয়ালে দাঁতের গঠন শুরু হবে। শিশুটি এখন থেকে দ্রুত বাড়তে থাকবে এবং তার মাথা আকারে ধীরে ধীরে শরীরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে থাকবে। এ সপ্তাহ নাগাদ শিশুটির স্বাদ গ্রন্থিগুলো সুগঠিত হয়ে যাবে। এখন আপনার শিশুটি মুখ দিয়ে অ্যামনিওটিক তরল গিলবে এবং বৃক্কের মাধ্যমে তা আবার পরিশোধিত হয়ে দেহ থেকে বেরও হয়ে যাবে। ত্বকের পাতলা স্তরের পাশাপাশি এই অ্যামনিওটিক তরলও শিশুটির দেহ উষ্ণ রাখবে।

এর মধ্যেই যেহেতু শিশুটির বহিকর্ণ গঠিত হয়ে যাবে, সে এখন অন্তকর্ণের মধ্য দিয়ে বাইরে থেকে আসা শব্দ সংকেত মস্তিষ্কে প্রেরণ করতে পারবে। এখন আপনি শিশুটির জন্য যেই ঘুম পাড়ানি গানটা গাইবেন, জন্মের পরও সেই গান শুনেই সে ঘুমাবে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে শিশুটি অনেক একটিভ থাকবে এবং আপনি তার নড়াচড়া টের পাবেন। যদি এখনও নড়াচড়া বুঝতে না পারেন তাহলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই কারন সব একেকজন মা একেক সময় বাচ্চার নড়াচড়া বুঝতে পারেন।

গর্ভধারণের এ সপ্তাহে আপনি

এ সপ্তাহ শেষে গর্ভাবস্থার অর্ধেক সময় পার করে ফেলবেন আপনি। খুশি হবার মতোই বিষয়! এতদিনে যদি আপনার ওজন ১০ পাউন্ডও বাড়ে, এখন থেকে প্রতি সপ্তাহেই ১/২ পাউন্ড করে বাড়তে থাকবে। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

শরীরে রক্ত প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার কারনে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে। দুজনের পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের জন্য আপনার হৃদপিণ্ড আগের চাইতে দ্রুত কাজ করছে। এটা পুষিয়ে দিতে চেষ্টা করুন সুষম খাবার খাওয়ার।

এ সময় গরমে আপনার র‍্যাশ হতে পারে। যেহেতু আপনার শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক এর চাইতে কয়েক ডিগ্রি বেশী থাকবে তাই বেশী ঘাম হতে পারে। চেষ্টা করুন কটন এর এবং আরামদায়ক অন্তর্বাস পরার।

আপনার পেট ও বুকের মাঝামাঝি এসময় থেকে কালো দাগ দেখা দিতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক, কারণ আপনার ক্রমবর্ধিষ্ণু শিশুকে জায়গা করে দেয়ার জন্যই আপনার পেটও বিস্তৃত হচ্ছে। পেট বড় হয়ে যাবার কারণে চামড়ায় টান পড়বে আর কিঞ্চিত চুলকানোর মতো অনুভূতিও হতে পারে।

এ সময় যোনিপথের স্রাবের নিঃসরণ আরও বেড়ে যেতে পারে। স্বাভাবিক স্রাব দুধ সাদা আর স্বচ্ছ হবে। যদি স্রাব গন্ধযুক্ত না হয় আর যোনিপথে না চুলকায় তাহলে স্রাবের পরিমাণ বা প্রকার নিয়ে চিন্তিত হবার কিছু নেই।

চেয়ারে বসা অবস্থা থেকে আপনি যদি খুব দ্রুত উঠে দাঁড়াতে যান, কিংবা যখন আপনি গোসল করে বের হন তার পর পর আপনার জ্ঞান হারানোর মতো অনুভূতি হতে পারে। চেয়ার থেকে আস্তে ধীরে উঠুন। আর যদি কখনো জ্ঞান হারানোর মতো অনুভূতি হয় তাহলে হাতের কাছে যা আছে তা শক্ত করে ধরুন এবং আস্তে আস্তে হাঁটুন।

খাওয়ার পর পরই বুক জ্বালা-পোড়া করা বা বদহজমের সমস্যা হতে পারে এবং পেট ফুলে যেতে পারে। এসময় অনেকের মাড়ি ফুলে যাওয়ার সমস্যাও হয়ে থাকে, ফলে দাঁত ও মাড়ির যত্ন নেয়া জরুরি।

গর্ভধারণের এ সপ্তাহে করনীয়

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চালন হয় বলে এ সময় রক্তে লৌহ উপাদানের চাহিদা বেড়ে যায়। প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি তো খেতে হবেই, সেই সাথে লৌহ উপাদানে ভরপুর আরও অনেক রকম খাবারও আপনার খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে।

খুব সাধারণ কিছু কারণ থেকে এ সময় আপনার প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগবে, আবার ঘুমেরও সমস্যা হবে। এ সময় ঘুম না হওয়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা, আবার কারণ অনুযায়ী এর যথাযথ সমাধানও কম নয়। যেমন, যদি শোয়ার ভঙ্গির জন্য আপনার ঘুমের সমস্যা হয়, তাহলে পেটের নিচে নরম বালিশ রেখে শোয়া একটা সমাধান হতে পারে। গর্ভের শিশুটিকে ভালো রাখার জন্য আপনার শরীরের তো অতিরিক্ত খাটনি যাচ্ছেই। আপনি যদি সহজেই ক্লান্ত হয়ে যান তাহলে যখনই সম্ভব হয় একটু বিশ্রাম নিন, আর ক্লান্তিটাকেও সহজভাবে গ্রহণ করুন।

পেটে আর কোমরে যে দাগ পড়ছে সেটা নিয়ে কি করবেন? চামড়ায় টান পড়ার কারণে ত্বকে যেই দাগ হয়, সেটা দূর করার জন্য অনেক ধরণের ক্রিমই পাওয়া যায়। কিন্তু, এটা কখনোই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে সব ক্রিম একইভাবে কাজ করে কি না। যদি কোনো একটি বিশেষ ক্রিম গর্ভাবস্থায় ব্যবহারে কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে গর্ভাবস্থার প্রথম থেকেই সেই ক্রিম ব্যবহার করা শুরু করতে পারেন।

এখন থেকে একটানা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাটা আপনার জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে। আপনি খেয়াল করে দেখবেন যে আপনার পায়ের শিরাগুলো বেশ স্পষ্ট বোঝা যাবে। শিশুটির আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে আপনার শরীরের ভর কেন্দ্রেও পরিবর্তন আসবে এবং আপনার বর্ধিত ওজনের ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা হবে। সমান তলা বিশিষ্ট জুতা পরার চেষ্টা করুন এবং যখনই মনে হবে কোনোভাবে দাঁড়ালে বা বসলে আপনি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে পারেন, তাহলে সেটা না করুন।

যেহেতু এখন ক্রমাগত বড় হতে থাকা জরায়ুকে জায়গা করে দেয়ার জন্য আপনার পেশী এবং লিগামেন্টগুলোতে টান বাড়বে, আপনি সামান্য ব্যথা অনুভব করতে পারেন। যদি আপনি এখনো ব্যায়াম শুরু না করেন, তাহলে এ পর্যায়ে এসে এক-আধটু ব্যায়াম করতে পারেন। এতে করে আপনার পেশী সবল থাকবে। তবে হ্যাঁ, সক্রিয় থাকতে পারা যেমন ভালো, তেমনি আপনাকে এটাও জানতে হবে যে কতটুকু পর্যন্ত আপনি শরীরকে পরিশ্রম করাতে পারবেন। জেনে নিন, কোন ব্যয়ামগুলো আপনাকে সবল রাখবে, আর কোন ব্যয়ামগুলো গর্ভাবস্থায় বাদ দিতে হবে।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ১৯
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২১>>

 

তথ্যসূত্রঃ
maya.com.bd/content/web/language/bn/1895/
babycenter.com
parenting.com

 

Related posts

Leave a Comment