সপ্তাহ অনুযায়ী গর্ভধারন । সপ্তাহ – ১৮

এ সপ্তাহে আপনি অফিসিয়ালি চার মাসের গর্ভবতী। গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারন সাধারণত এ সময়টাতে আপনি বাচ্চার নড়াচড়া টের পেতে পারেন। এ সপ্তাহে গর্ভের শিশুর আকার হবে মোটামুটি একটা মিষ্টি আলুর মতো। শিশুটি এখন ৫.৫ ইঞ্ছির মত লম্বা এবং ওজন প্রায় ২০০ গ্রাম এর মত।এ সপ্তাহে এসে শিশুটির চেহারা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং তার ভ্রু আর চোখের পাতার লোমও পুরোপুরি সুগঠিত হয়ে যাবে। ইতিমধ্যেই তার হাত ও পায়ের লোমও গজিয়ে যাবে এবং তার হাতের মুঠ আরো শক্ত হবে। এ সময় আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় দেখা যেতে পারে শিশুটি তার হাতের বুড়ো আঙ্গুল চুষছে।

শরীরের বাকি অংশ থেকে মস্তিষ্কে এবং মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বাকি অংশে সিগন্যাল পরিবহনও এখন অনেক জোরালো হবে। তার মস্তিষ্কের স্নায়ুসমূহের ওপর মাইলিন সিথ (Myelin Sheath) নামক একটি আচ্ছাদন পড়বে। আপনার গর্ভের শিশুটি এখন আলো আর শব্দের প্রতি আরো জোরালোভাবে সাড়া দেবে। সুতরাং, ঘুমপাড়ানি গান চালিয়ে যান।

শিশুটি এখন আপনার পেটের ভেতর যেটুকু জায়গা পাবে তার মধ্যেই গড়াগড়ি দেবে, ঘুরে যাবে, লাথি মারবে, ঘুষি মারবে। কিন্তু, এতে শিশুটির কোনো ক্ষতি হতে পারে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ অ্যামনিওটিক তরল, প্ল্যাসেন্টা আর নাভিরজ্জু থাকার পরও আপনার জরায়ুতে শিশুটির জন্য এখনো যথেষ্ট জায়গা রয়েছে যেখানে সে আরাম করে থাকতে পারবে।

শিশুটি মেয়ে শিশু হলে তার ফেলপিয়ান টিউব এবং জরায়ু তাদের নির্দিষ্ট স্থানে গঠিত হয়ে গেছে আর শিশুটি ছেলে হলে তার যৌনাঙ্গ পুরোপুরি বিকশিত এবং তা আলট্রাসাউন্ড এ দেখা যেতে পারে।

গর্ভধারণের এ সপ্তাহে আপনি

আপনার নাভিদেশ ও শ্রোণীচক্রের মাঝামাঝি জায়গায় জরায়ুটি বাড়ছে। ইতিমধ্যেই আগের চাইতে আপনার ওজন নিশ্চয়ই প্রায় ৫/১০ পাউন্ড (২ থেকে ৫ কেজি) বেড়ে গেছে। কি কি খাচ্ছেন সে ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে আপনার ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাক। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

এখন হয়তো আপনি অনেকটাই সতেজ অনুভব করছেন, কিন্তু আপনার ঘুমের সমস্যা এখনো পুরোপুরি না-ও সমাধান হতে পারে। এর একটা বড় কারণ হবে আপনার বাড়ন্ত পেট। আপনি যদি চিৎ হয়ে শোন, আপনার ভারী হয়ে ওঠা জরায়ু পেছনের দিকে চাপ দেবে। আরো নির্দিষ্ট করে বললে চাপটা পড়বে সায়াটিক নার্ভে (Sciatic Nerve) এবং সেখানে তীব্র ব্যথা অনুভব হবে। বাম কাতে শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। হাঁটু ভাঁজ করে, সেই ভাঁজে একটা বা দুইটা বালিশ দিয়ে নিলে আরাম পাবেন। এতে করে আপনার শ্রোণীচক্র আর নিতম্বের আশেপাশের পেশীতে চাপ কম পড়বে। পেটের নিচে লম্বা বালিশ রেখে ঘুমালে পিঠে টান পড়ার সমস্যা থেকে আরাম পাবেন। জেনে নিন কীভাবে আরো আরাম করে শুতে পারেন। হাঁটুর পেছন দিকে বালিশ না রাখাই ভালো কারণ এতে একদিকে রক্ত প্রবাহিত হয়ে রক্ত জমাট বেধে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।

আপনি যদি ভাগ্যবতী হন তাহলে হয়তো আপনার মাথা ব্যথার সমস্যা থাকবে না, কিন্তু অনেক গর্ভবতী নারীই এসময় পর্যন্তও প্রচণ্ড মাথা ব্যথা অনুভব করেন। গর্ভাবস্থায় মাথা ব্যথা করা এমনিতে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা কিন্তু যদি এর তীব্রতা অসহনীয় হয় তাহলে ধরে নিতে হবে এটা বড় কোনো সমস্যার উপসর্গ। সেক্ষেত্রে অতি সত্বর ডাক্তারের সাথে কথা বলতে হবে। যদি আপনার মাথা ব্যথার কারণ কেবল হরমোনের পরিবর্তনই হয়ে থাকে তাহলে কিছু প্রাকৃতিক নিয়াময়ের মাধ্যমেই আপনি মাথা ব্যথা থেকে আরাম পেতে পারেন।

গর্ভধারণের এ সপ্তাহে করনীয়

গর্ভাবস্থায় শিশুর বৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করে মায়ে ওপর৷ অর্থাত্‌ সুস্থ মা মানেই সুস্থ শিশু৷ শিশুর পরিপূর্ণ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রকার খাদ্যের যোগান দিতে হয় মাকে৷ মা যে খাবার খাবেন শিশুও সেই খাবার খেয়ে পুষ্টি লাভ করে৷ এ কারণে স্বাভাবিক মহিলাদের তুলনায় একজন গর্ভবতী মায়ের খাবারের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি৷ সঠিক পরিমাণে খাবার গ্রহণ না করলে সন্তান ঠিকমত বৃদ্ধি পাবে না৷ ফলে সন্তান অপুষ্টি নিয়ে জণ্মাবে৷ গর্ভবতী অবস্থায় কী খাবেন এবং কোন খাবার গর্ভের সন্তান এবং মায়ের জন্য প্রয়োজন তা জেনে নিন।

যেহেতু এখন ক্রমাগত বড় হতে থাকা জরায়ুকে জায়গা করে দেয়ার জন্য আপনার পেশী এবং লিগামেন্টগুলোতে টান বাড়বে, আপনি সামান্য ব্যথা অনুভব করতে পারেন। যদি আপনি এখনো ব্যায়াম শুরু না করেন, তাহলে এ পর্যায়ে এসে এক-আধটু ব্যায়াম করতে পারেন। এতে করে আপনার পেশী সবল থাকবে। তবে হ্যাঁ, সক্রিয় থাকতে পারা যেমন ভালো, তেমনি আপনাকে এটাও জানতে হবে যে কতটুকু পর্যন্ত আপনি শরীরকে পরিশ্রম করাতে পারবেন। জেনে নিন, কোন ব্যয়ামগুলো আপনাকে সবল রাখবে, আর কোন ব্যয়ামগুলো গর্ভাবস্থায় বাদ দিতে হবে।

গর্ভাবস্থার শুরু থেকে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ বা পরিস্কার করা নিশ্চিত করতে হবে যাতে ডেন্টাল প্লাক সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে দন্ত চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে গর্ভাবস্থার পুর্বেই দাঁত স্কেলিং করা এবং সঠিক ব্রাশ চালনা পদ্ধতি জেনে নেওয়া প্রয়োজন। ডাক্তার পরামর্শ অনুযায়ী বলা যায় খাবারের মধ্যবর্তী সময়গুলোতে শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্রহন বন্ধ রাখা প্রয়োজন। এতে যেমন দেহের বাড়তি ওজন কমানো সম্ভব তেমনি দাঁতের ক্ষয়রোগ রোধ করা সহজ। তবে প্রয়োজনীয় পরিমাণ শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্রহন একান্ত প্রয়োজন।

সুস্থ পরিবেশ ই শুধু একটা সুস্থ বাচ্চার জন্ম দিতে পারে । এ সময় ধর্মীয় বই পুস্তক পাঠ করলে , সুন্দর সন্তানের স্বপ্ন দেখলে বাস্তবেও সুন্দর, সুস্থ বাচ্চার জন্ম দেয়া সম্ভব । এটা বর্তমানে বৈজ্ঞানিক ভাবেও প্রমানিত যে মায়ের সাথে সন্তানের আত্তিক সম্পর্ক থাকে । কাজেই মাকে আনন্দে থাকতে হবে, পরিবারকেও মাকে সাপোর্ট দিতে হবে ।

আপনার জন্য যদি গর্ভধারণের অভিজ্ঞতা নতুন হয় তাহলে জেনে রাখুন যে এসময় গর্ভের শিশুর নড়াচড়ার কারণে আপনার পেটের মধ্যে বুদবুদ ওঠার মতো বা ভেতরে কোনো কিছু ওড়ার মতো অনুভূতি হতে পারে, গ্যাস বা বদহজমের কারণে কখনো কখনো যেমনটা হয়। আপনার মনে হতে পারে যে পেটের ভেতর হয়তো একটা প্রজাপতি ঢুকে গেছে আর ক্রমাগত উড়ছে। ১৭-১৮ সপ্তাহ নাগাদই সাধারণত গর্ভের শিশুর নড়াচড়া টের পাওয়া যায়।

সময় কাটানোর অংশ হিসেবে বাচ্চার নাম এখন থেকেই খুজতে পারেন। বাচ্চার সুন্দর আরবি বা বাংলা নাম ও নামের অর্থ জানতে Fairyland Baby Names Finder এর সাহায্য নিতে পারেন।

 

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ১৭
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ১৯>>

 

তথ্যসূত্রঃ
maya.com.bd/content/web/language/bn/1887/
babycenter.com
parenting.com

 

Related posts

Leave a Comment