গর্ভাবস্থায় মায়ের সর্দি কাশি । কারণ, লক্ষন ও প্রতিকার

গর্ভকালীন সময়টি মা ও অনাগত সন্তান উভয়ের জন্যই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় মায়ের বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ সন্তানের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।সাধারণত সর্দি লাগলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিলেই তা সেরে যায়। কিন্তু ভাইরাসজনিত সর্দি লাগলে গর্ভবতী মায়ের জ্বর হতে পারে। এমনকি ফুসফুসে প্রদাহও হতে পারে। এছাড়া মায়ের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ হলে শিশুর শারীরিক গঠনেরও ক্ষতি হতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সর্দি-কাশি এক সপ্তাহের মধ্যেই কোনো ওষুধ ছাড়াই নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। বাচ্চার শরীরের উপর এর কোনো প্রভাব পড়ে না।

গর্ভাবস্থায় সর্দির কারণ

প্রকৃতপক্ষে ২০০ এর চাইতে বেশী ধরনের ভাইরাস সাধারন সর্দি কাশির কারণ। গর্ভাবস্থায় বেশীরভাগ মায়েরাই অন্তত একবার এধরনের সর্দি কাশির শিকার হতে পারেন কারণ গর্ভাবস্থায় মায়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে। এ সময় এসব সর্দি কাশি বেশীদিন স্থায়ী ও হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে মা খুব সহজেই নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে শীতকালীন সর্দি-কাশিতে অনেক মাই ভুগে থাকেন। শীতকালে এমনিতেই প্রায় সবারই সর্দি কাশি হয়। বায়ুবাহিত বলে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে গর্ভবতী মাও সহজেই সংক্রমিত হতে পারে।

ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর শরীর থেকে সুস্থ লোকের দেহে ভাইরাস ছড়াতে পারে খুব দ্রুত। রোগীরা যখন হাঁচি-কাশি দেয়, নাক ঝাড়ে, ভাইরাসগুলো তখন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণিকারূপে। এগুলো শ্বাসের মাধ্যমে সুস্থ মানুষের শরীরে ঢুকে যেতে পারে। আবার রোগী যখন তার হাত দিয়ে নাক ঝাড়ে, হাত বা রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে হাঁচি-কাশি দেয়, তখন হাত বা রুমালে ভাইরাস লেগে যায়। হাত ও রুমালে লেগে থাকা ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে কয়েক ঘণ্টা। ভাইরাস লেগে থাকা হাত দিয়ে রোগী যখন সুস্থ কাউকে স্পর্শ করে বা হ্যান্ডশেক করে, তখন সুস্থ লোকটি সংক্রমিত হয়। রুমাল বা এ-জাতীয় বস্তু থেকেও সুস্থ মানুষ ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে।

যেহেতু সর্দি ভাইরাসের কারণে হয়, ব্যাক্টেরিয়ার কারণে নয় তাই অ্যান্টিবায়োটিক সর্দি সারাতে পারেনা। তবে মাঝে মাঝে গলা, সাইনাস, কান বা বুকে ভাইরাল বা ব্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশন হলে সর্দি হতে পারে। সে সময় ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক এর পরামর্শ দিতে পারেন। তাই যদি সর্দির উপসর্গ বাড়তে থাকে তবে তা ডাক্তারকে জানাতে হবে।

গর্ভাবস্থায় সাধারন সর্দি কাশিতে কি গর্ভের বাচ্চার ক্ষতি হয়?

গর্ভাবস্থায় সাধারন সর্দি কাশিতে মায়ের অসুবিধা হলেও তা বাচ্চার জন্য তেমন কোন ভয়ের কারণ নয়। তারপরও এ সময় মা যাতে সর্দি কাশিতে আক্রান্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত এবং ঠাণ্ডা যদি লেগেই যায় তবে তা নিরাময়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

সাধারন সর্দি কাশির লক্ষন কি?

সাধারন সর্দি কাশি এবং ফ্লু এর মধ্যে পার্থক্য বোঝাটা সব সময় খুব একটা সহজ নয়। সাধারন সর্দি কাশিতে যেসব লক্ষন দেখা দিতে পারে তা হলো-
শুরুতে আপনার শরীর ম্যাজ ম্যাজ করবে । কোনকিছু করতে একদম ভালো লাগবে না । এরপর গলাব্যথা, নাক বন্ধ থাকা, নাক দিয়ে পানি পড়া, সময় সময় জ্বর জ্বর ভাবও মনে হতে পারে । ক্ষেত্র বিশেষে মাথা ব্যথা,হালকা জ্বর, মাংসপেশীতে ব্যথা, রুচি কমে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে ।

ইনফ্লুয়েঞ্জার বা ফ্লুয়ের লক্ষণগুলোর মধ্যে আছে  জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, খুসখুসে কাশি, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য, বমি, দুর্বলতা ইত্যাদি। সাধারণ সর্দি-কাশির চেয়ে ইনফ্লুয়েঞ্জার লক্ষণগুলো গুরুতর। যদি ফ্লু বলে সন্দেহ হয় বা লক্ষণগুলো ঠিকভাবে বুঝতে না পারেন তবে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে কারণ গর্ভাবস্থায় ফ্লু মা এবং বাচ্চা উভয়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা সম্পর্কে জেনে নিন।

গর্ভাবস্থায় সর্দি হলে কি করবেন? 

যদি ঠাণ্ডা লেগেই যায় তাহলে মাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। পাশাপাশি বেশি বেশি পানি পান করতে হবে এবং পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। খুব কম ওষুধই গর্ভাবস্থায় নিরাপদ। তাই যেকোন ধরনের ওষুধ গ্রহণের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিতে হবে। অবশ্য অনেক সময় ওষুধ ছাড়াই ঘরোয়া উপায়ে সর্দি-কাশি নিরাময় সম্ভব।

ফুটন্ত পানির ভাপ নিন : একটি গামলায় ফুটন্ত পানি নিন। তারপর গামলার উপরে মুখ নিয়ে গরম পানির ভাপ টেনে নিন। নাক বন্ধ থাকলে এটি প্রাকৃতিকভাবে সমাধান করবে। পানিতে কোন ওষুধ মেলাবেন না। যেকোনো ধরনের ওষুধ ব্যবহারের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিন।

গার্গল করুন : গলা খুসখুস করলে গার্গল করুন। এটি খুসখুসে কাশি দূর করার জন্য খুবই কার্যকর পদ্ধতি। হালকা গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে গার্গল করুন। প্রতিদিন কমপক্ষে তিনবার করলে গলা ব্যথা ও খুসখুসে ভাব কমে যাবে। চাইলে গার্গলের পানিতে লবঙ্গ অথবা আদা কুচি মিশিয়ে নিতে পারেন।

পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন : ঠাণ্ডা লাগা থেকে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সর্দি-কাশিকে অবহেলা করবেন না একেবারেই। প্রতিদিন পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া জরুরি। আপনি কর্মজীবী নারী হলে সময় বের করে বিশ্রাম নিন।

আদা চা পান করুন : ঠাণ্ডা লাগা অথবা গলা ব্যথায় আদা চা পান করতে পারেন। ভেষজ এ চা ঠাণ্ডা লাগার অস্বস্তি থেকে আপনাকে দ্রুত মুক্তি দেবে।

মধু : ঠাণ্ডা লাগলে মধু খেলে উপকার পাবেন। এক চামচ মধু সরাসরি খেয়ে ফেলুন। চাইলে চায়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন মধু। লেবু এবং মধু একসঙ্গেও খেতে পারেন। এটি চটজলদি উপশম করবে সর্দি-কাশির।

গর্ভাবস্থায় সাধারন স্যালাইন পানির নাকের স্প্রে ব্যাবহার করা যেতে পারে। তবে ভেপর রাব ব্যাবহার করার ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে কারণ তা গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর হতে পারে। যেকোনো ধরনের ডি কনজেসট্যান্ট গর্ভাবস্থায় ক্ষতিকর তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া সেগুলো কখনোই ব্যাবহার করা উচিত নয়।

গর্ভাবস্থায় সর্দি কাশি প্রতিরোধে কি করবেন?

পুরোপুরি ভাবে সর্দি প্রতিরোধ করা হয়তোবা সম্ভব না। তবে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করে আপনি এর ঝুঁকি কমাতে পারেন-

কাশি ও সর্দিতে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরে থাকুন। কাশি কিংবা সর্দি থেকে জীবাণুগুলো বাতাসে ভর করে ছোটে। যদি তার একটি আপনার চোখে কিংবা নাকে এসে পড়ে, তাহলে কয়েকদিনের মধ্যেই আপনি আক্রান্ত হবেন কাশি কিংবা সর্দিতে।

বারবার আপনার হাত দুটি ধুয়ে নিন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঠান্ডা ছড়ায় পরোক্ষ শারীরিক সংস্পর্শে অর্থাৎ একজন অসুস্থ ব্যক্তির ঠান্ডার জীবাণু নাক থেকে হাতে স্থানান্তরিত হয়। সে যখন কোনো বস্তু স্পর্শ করে তখন হাত থেকে জীবাণু সেই বস্তুতে লেগে যায়। ঠান্ডার জীবাণু জড়বস্তুতে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।

বদ্ধ জায়গায় সতর্ক থাকুন। অফিসঘরগুলোতে বায়ু সঞ্চালন দুর্বল থাকে বলে সেখান থেকে ঠান্ডার ভাইরাসগুলো মিলিয়ে যেতে পারে না। অল্প আর্দ্রতায় শ্লেষ্মাঝিল্লি শুকিয়ে যায়, স্বাভাবিকভাবে সেখানে ভাইরাস এসে জুড়ে বসে। তাই অফিসঘরে কিংবা বদ্ধ স্থানে ঠান্ডার ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হলো লবণ-পানির নেসাল স্প্রে ব্যবহার করা।

বেশি করে তরল পান করুন। আপনি যদি বেশি করে তরল পান করেন, তাহলে শরীর থেকে জীবাণু দূরীভূত হবে এবং শরীরে জীবাণু আক্রান্ত হওয়ার জন্য যে পানিশূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল তাও পূরণ হবে। এ সময় দৈনিক কমপক্ষে আট গ্লাস পানি, ফলের রস কিংবা অন্যান্য ক্যাফেইনমুক্ত তরল খাওয়া উচিত।

নাক ও চোখ বেশি বেশি ঘষবেন না। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ প্রতি এক ঘণ্টায় তার নাখ ও চোখ অন্তত তিনবার স্পর্শ করে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন,যদি আপনার এ রকম করতেই হয়,তাহলে আঙুলের মাথা দিয়ে চোখ ও নাক না ঘষে হাতের তালু না উল্টো পিঠ দিয়ে ঘষুন।

প্রতিদিন নিয়মিত গর্ভাবস্থায় নিরাপদ কিছু শরীরচর্চার অভ্যাস করুন। মনে রাখতে হবে সব ধরনের ব্যায়াম গর্ভাবস্থায় নিরাপদ নয়। তাই এ ধরনের ব্যায়াম করার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত।  মুক্ত বাতাসে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হালকা ব্যায়াম যেমন হাঁটা, আপনার শ্বাসতন্ত্রের উপরিভাগের সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে।

আপনার রান্নাঘরের সামগ্রী জীবাণুমুক্ত রাখুন। রান্নাঘরের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো স্পঞ্জ ও ডিশব্যাগ। এগুলো ভেজা থাকে বলে এখানে ঠান্ডার জীবাণু বংশ বৃদ্ধি করে। এই জীবাণুকে দূর করার উৎকৃষ্ট উপায় হলো সপ্তাহে দু-তিনবার ডিশওয়াশার দিয়ে এগুলো পরিষ্কার করা।

ভিটামিন ই ও সি খান। এখন বিশ্বাস করা হয় যে, ভিটামিন ই দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু চর্বি ও তেলজাতীয় খাবারে এটা বেশি থাকে বলে যাঁরা স্বল্প চর্বিযুক্ত খাবারে অভ্যস্ত, তাঁরা খাবার থেকে ভিটামিন ই খুব একটা বেশি পান না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এ সময় সাপ্লিমেন্ট গ্রহন করতে পারেন।

কখন ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিৎ

গর্ভাবস্থায় যদি সর্দি বা কাশি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এর সাথে অনেক জ্বর থাকে তবে ডাক্তারকে জানানো উচিত। এগুলো ইনফেকশনের লক্ষন হতে পারে। যদি সর্দির কারণে আপনার খাওয়া এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং দুতিন দিনের মধ্যে যদি অবস্থার উন্নতি না হয় তবে ডাক্তারকে জানানো জরুরী। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবশ্যয় ডাক্তারের কাছে যেতে হবে-

১. যদি জ্বর ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি থাকে।

২. কাশির সাথে যদি রক্ত যায়।

৩. যদি সবুজাভ বা হলুদ রংয়ের কফ থাকে।

৪. যদি কাশির সাথে শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা থাকে।

৫. নিঃশ্বাসের সাথে যদি শোঁ শোঁ শব্দ হয়।

৬. সর্দি-কাশি যদি এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়

৭. গর্ভবতী মা যদি শারীরিকভাবে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে

 

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment