গর্ভাবস্থায় শ্বাসকষ্ট । কারণ ও প্রতিকার

গর্ভাবস্থায় শ্বাসকষ্ট হওয়া কি স্বাভাবিক?

হ্যা,গর্ভাবস্থায় শ্বাসকষ্ট হওয়াটা অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। মনে করা হয় যে, তিন চতুর্থাংশ গর্ভবতী নারী যাদের আগে কখনই শ্বাস কষ্ট ছিলো না তাদের এই সময়ে দম ফুরিয়ে আসে বলে মনে হয়। শ্বাসকষ্ট প্রথম বা দ্বিতীয় তিনমাস-কাল থেকে শুরু হতে পারে। এটি আপনার শরীরের প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে ঘটে থাকে যেহেতু এই সময় আপনার শরীরের শিশুকে ধারণ করার জন্য অতিরিক্ত অক্সিজের দরকার হয়।

গর্ভাবস্থার হরমোন প্রোজেস্টরেন ফুসফুসের মাধ্যমে রক্তের মধ্যে অক্সিজেনকে শোষণ করার পদ্ধতির সাথে আপনার শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য তৈরী করে তোলে।যার ফলে, আপনার শরীর আপনার সিস্টেমে উপস্থিত কার্বন ডাই-অক্সাইড (যে গ্যাসটি আপনি নিঃশ্বাসের সাথে বের করে দেন) এর মাত্রার প্রতি অনেক বেশী সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

এই পরিবর্তনগুলোর মানে হলো অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড এর প্রক্রিয়াজাতকরণে আপনার শরীর ভালোভাবে কাজ করছে। আপনি ঠিক একই হারে শ্বাস নিচ্ছেন যেমনটা আপনি গর্ভধারণের পূর্বে নিতেন। কিন্তু এখন প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় আপনি অনেক গভীরভাবে শ্বাস নিচ্ছেন। এটিকে আপনার শ্বাসকষ্টের অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়।

আপনি হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে আপনার পাঁজরের খাঁচার চারপাশে আপনার আয়তন বৃদ্ধি পেয়েছে।এর কারণ গর্ভাবস্থায় আপনার পাঁজরের খাঁচা উর্ধ্ধমুখী ও বাইরের দিকে চলে আসে। আপনার ফুসফুসকে আরও বেশী ধারণ ক্ষমতা দেওয়ার জন্য এরকমটি হয়ে থাকে।

তৃতীয় তিন মাস-কালের শেষের দিকে আপনার ক্রমবর্ধমান শিশুর আকার আপনার শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে। এই পর্যায়ে, আপনার জরায়ু(গর্ভ) বাস্তবিকই উপরের দিকে মধ্যচ্ছদা (পেশীর পাতলা পর্দা যা পাঁজরের খাঁচার নিচে অবস্থিত)বরাবর ধাক্কা দেওয়া শুরু করে। পালাক্রমে আপনার মধ্যচ্ছদা ফুসফুসের উপর চাপ দেয়। আগে হয়ে না থাকলেও সম্ভবত এখন আপনার কিছুটা শ্বাসকষ্ট বোধ হবে বিশেষ করে যদি আপনি আপনার শিশু যদি উপরের দিকে থাকে।

সামান্য সিঁড়ি বেয়ে যখন আপনি হাস ফাঁস করতে থাকেন তখন যদিও আপনার নিজেকে কিছুটা ইঞ্জিনের মতো মনে হতে পারে, চিন্তা করবেন না। এই ধরণের শ্বাসকষ্ট হওয়াটা স্বাভাবিক ও ক্ষতিকর কিছু নয়।

তবে মায়ের যদি আগের কোন কন্ডিশন থাকে যেমন, অ্যাজমা, এনেমিয়া বা উচ্চ রক্তচাপ, তবে গর্ভাবস্থায় শ্বাস কষ্টের সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।

গর্ভাবস্থায় কতদিন শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকতে পারে?

গর্ভাবস্থায় শ্বাস কষ্টের সমস্যা প্রসবের আগ পর্যন্ত থাকতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনার বাচ্চা পেলভিসের নিচের দিকে নেমে না যায়। কারণ তখন আপনার ডায়াফ্রামের উপর থেকে বাচ্চার চাপ কমে যায়।

অধিকাংশ নারী যারা প্রথমবারের মতো গর্ভবতী হয়েছেন, গর্ভাবস্থার প্রায় ৩৬ সপ্তাহ থেকে লক্ষ্য করেন যে তাদের বাচ্চা শ্রোণীর মধ্যে নেমে যাচ্ছে বা জড়িয়ে যাচ্ছে।এতে করে শ্বাসকষ্ট কিছুটা লাঘব হতে পারে। যদি আপনার এর আগে একটি সন্তান হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে আপনার গর্ভাবস্থা একেবারে শেষ পর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত আপনার শিশু নিচের দিকে নাও নামতে পারে।

আপনার সন্তানের জন্মের পরে, আপনার শরীরের প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা খুব দ্রুতগতিতে নেমে যায়। ডায়াফ্রামের উপর আপনার শিশু ও জরায়ু দ্বারা সৃষ্ট চাপও অবিলম্বে উপশমিত হয়। অবশ্য, গর্ভাবস্থার আগের অবস্থায় আপনার পাঁজর ও শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যবস্থার ফিরে যেতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।

গর্ভাবস্থায় শ্বাসকষ্টের উপশমে কি করা যেতে পারে?

যদি এখনো আপনার গর্ভাবস্থার আরও কিছু সময় বাকি থেকে থাকে তাহলে কিছু হালকা ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন। যদি আপনি এর অনুপযুক্ত হন এবং আপনার শ্বাসকষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে সেক্ষেত্রে হালকা কাজকর্ম সহায়ক হতে পারে। মৃদু ব্যায়ামের মানে হলো আপনি এমন কোন কঠিন কাজ করবেন না যাতে করে দম ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে কথোপকথন চালিয়ে যেতে না পারেন। গর্ভাবস্থায় নিরাপদে শরীর চর্চা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানুন।

যতক্ষণ বসে থাকবেন, সোজা হয়ে বসে থাকার চেষ্টা করুন। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। গর্ভবতী মায়েরা সাধারণত ঝুঁকে থাকেন। যদি সোজা হয়ে দাঁড়ানোটা এসময় একটু কঠিন হবে তারপরও চেষ্টা করুন যাতে দাঁড়ানোর সময় ঘাড় যাতে পেছনের দিকে থাকে। এতে আপনার ভাল Posture বজায় থাকবে এবং শ্বাস প্রশ্বাসের সময় লাংস প্রসারিত হওয়ার জন্য আরেকটু বেশী জায়গা পাবে। এতে আপনি ব্যাক পেইন থেকেও মুক্তি পাবেন।

গর্ভাবস্থায় পাশ ফিরে শোওয়া বিশেষ করে বাম পাশ ফিরে শোওয়াটা সবচাইতে নিরাপদ।বাম কাত হয়ে শোয়াটা আপনার বাচ্চার জন্যও ভালো কারণ এতে করে পুষ্টি ও রক্ত প্ল্যাসেন্টা দিয়ে সহজেই বাচ্চার কাছে পৌঁছাতে পারে। আপনার কিডনিও বর্জ্য ও অতিরিক্ত ফ্লুইড আপনার শরীর থেকে বের করে দেয়ার জন্য কাজ করতে পারে। এর ফলে আপনার হাত-পা-গোড়ালি ফুলে যাবার (oedema) সম্ভাবনাও কম থাকে। গর্ভাবস্থায় কিভাবে শোওয়া নিরাপাদ তা বিস্তারতি জানুন

শ্বাসকষ্ট থেকে রেহাই পেতে আপনার বুকের পাশেও একটি বালিশ আলতো করে ধরে রাখতে পারেন।বই জাতীয় কিছু দিয়ে অথবা আপনার সুবিধামতো উপায়ে বিছানার মাথার দিকের অংশ কয়েক ইঞ্চি উঁচু করে দিন, এতে আপনার পাকস্থলী এসিডিটি থেকে মুক্ত থাকবে আর আপনার হার্ট এ জ্বালাপোড়াও কম অনুভব হবে।

রিলাক্স করার চেষ্টা করুন। মানুষ যখন দুশ্চিন্তা’ অথবা মানসিক চাপে থাকে তখন প্রায়ই দ্রুত এবং অগভীর শ্বাস নেয়। এতে শরীরে অক্সিজেন কম যায়। লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে শান্ত থাকার অভ্যাস করুন। শান্তভাবে শ্বাস প্রশ্বাস নিলে আপনার মাংসপেশিতে অক্সিজেনের সরবরাহ ভালোভাবে হবে।

কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?

গর্ভাবস্থায় কিছু শ্বাসকষ্ট সাধারণ এবং স্বাভাবিক। কিন্তু যদি অন্যকোন উদ্বেগজনক উপসর্গ দেখা যায় সেক্ষেত্রে আপনার অবিলম্বে ডাক্তার ডাকা উচিৎ, যেমন-

  • যদি মনে হয় যে আপনার হৃৎপিণ্ড দ্রুতগতিতে চলছে, অনিয়মিত ও হৃৎস্পন্দনের ছন্দ হারিয়ে ফেলছে, যা বুক ধড়ফড় করা নামে পরিচিত।
  • মারাত্মক শ্বাসকষ্ট বা কাজকর্ম আরম্ভ করার পরে নিস্তেজ অনুভব করা,
  • বুকে ব্যথা, বিশেষকরে আপনি কোন ভারী কাজ করার সময় এটি শুরু হলে,
  • শুয়ে থাকা অবস্থায় বা রাতের বেলায় শ্বাস নিতে কষ্ট হলে,

এছাড়া, আপনার রক্তে আয়রনের মাত্রা কম হলে (রক্তশূণ্যতা-anaemia), শ্বাসকষ্ট তার একটি লক্ষণও হতে পারে। আপনার ডাক্তারকে বলুন রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তা যাচাই করার জন্য, যদি এটি সম্প্রতি করা না হয়ে থাকে।

যদি আপনার হাঁপানি থাকে তাহলে আপনার সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করুন। হাঁপানি নিয়ন্ত্রণ না করার কারণে আপনি এবং আপনার শিশু যে পরিমাণ ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন তা গর্ভাবস্থায় হাঁপানির ঔষধ নেওয়ার ঝুঁকির চাইতে অনেক বেশী।

খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে শ্বাস কষ্ট গর্ভাবস্থার সাথে সম্পর্কিত না এমন কারণেও হতে পারে, যেমন- হার্টের সমস্যা বা রক্ত জমাট বাঁধা ( পালমোনারি এম্বোলিজম)।তাই আপনার যদি গর্ভধারণের আগে থেকেই এ ধরনের কোন সমস্যা থেকে তাকে তবে গর্ভধারণের পর সে সব নিয়ন্ত্রনের জন্য ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে থাকা জরুরী।

আমার শ্বাসকষ্ট কি আমার শিশুর ক্ষতি করবে?

যদি আপনার অন্য কোন উদ্বেগজনক উপসর্গ না থাকে সেক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় শ্বাসকষ্ট অনুভব করাটা স্বাভাবিক এবং এতে আপনার শিশুর কোন ক্ষতি হবেনা। আপনি বুঝতে না পারলেও  আপনি যথার্থই গভীর ও কার্যকরভাবে শ্বাস নিচ্ছেন যাতে করে আপনার শিশুর যে অক্সিজেন প্রয়োজন তা সে পায়।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment