গর্ভাবস্থায় শরীরচর্চা

মাতৃত্ব একজন নারীর পরিপূর্ণতার সময়। তাই এসময় আপনাকে থাকতে হবে আরো বেশি বেশি সচেতন। সঠিক খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম আর মানসিক স্বস্তিতো থাকতে হবেই। এসময় নিয়ম মেনে অল্প খানিকটা ব্যায়ামও বেশ উপকারী। গর্ভকালীন সময়ে নিজের জন্যতো বটেই অনাগত সন্তানের কথা ভেবে হলেও আপনার ব্যায়াম করা দরকার। তবে এসময় ব্যায়াম কিন্তু অন্যান্য সময়ের মতো হবে না। এসময় ব্যায়ামও করতে হবে বুঝে শুনে।  প্রেগনেন্সির প্রথম কয়েক মাস আপনি সব ধরনের ব্যায়ামই করতে পারেন। তবে এসময় হাঁটাটাই সব থেকে ভালো ব্যায়াম। আর যেটাই করুন না কেন অবশ্যই কোনো ভালো ইন্সট্রাকটরের পরামর্শ মেনে চলা উচিত। যেন কোনো সমস্যা না দেখা দেয়।

গর্ভাবস্থায় শরীরচর্চা কেন করবেন ? 

গর্ভাবস্থা একজন মহিলার জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। পরিবর্তন আসে তার শরীরে-মনে। শরীরের পরিবর্তন, ফিটনেসের সমস্যা অনেক নারীকে বিষাদে ফেলে দেয়। অবসাদে ভোগেন অনেকে। তবে ব্যালান্স ওয়ার্ক আউট সেক্ষেত্রে আপনাকে এই সকল সমস্যা থেকে মুক্তি দিবে। খানিকটা ভারসাম্যপূর্ণ ব্যায়াম মা ও গর্ভের শিশু উভয়ের জন্যই ভীষণ উপকারী। আরো এমন বেশ কিছু উপকার আছে যা একজন গর্ভবতী নারীকে এই সময় ব্যায়াম করতে অনুপ্রেরণা জাগাবে।

স্বাভাবিক প্রসবঃ সুস্থ স্বাভাবিক প্রসবের জন্য আপনার ফিট থাকা খুবই প্রয়োজন। লেবারের সময় অনেকখানি শক্তি, সহনশীলতা, ফিটনেস প্রয়োজন হয়। আর পর্যাপ্ত ব্যায়াম আপনাকে এই সময়ে খুব সাহায্য করবে।

ওজনের সমস্যার সমাধানঃ গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই হরমোনাল প্রক্রিয়ায় প্রভাবে ওজন বৃদ্ধি পায়। প্রতিদিনের খানিকটা ব্যায়াম আপনাকে সুস্থ এবং স্বাস্থ্যবান রাখবে তবে অনাকাঙ্ক্ষিত ওজন বৃদ্ধি থেকে সুরক্ষা দিবে।

মর্নিং সিকনেস কমাতে: অনেক গর্ভবতী মহিলা, বিশেষ করে প্রথম সন্তান গর্ভে ধারণকারী মহিলারা মর্নিং সিকনেসের সমস্যায় ভুগেন। এই সমস্যার কারনে গর্ভবতী মহিলাদের ঘন ঘন বমি হয়। শরীর অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ে। খাবারে রুচি কমে আসে। খেতে পারেন না। প্রতিদিন যদি ৩০ মিনিট ব্যায়াম করলে এই সমস্যা অনেক কমে যায়।

কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূরীকরণে: গর্ভাবস্থায় অনেক গর্ভবতী মহিলারই কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দেখা দেয়। একজন গর্ভবতী মহিলা দৈনিক যদি ৩০ মিনিট হাঁটতে পারেন, তাহলে এই সমস্যা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

গর্ভস্থ শিশুর রক্ত সঞ্চালন, হার্ট ও মস্তিস্ক বিকশিত হয়:  গর্ভবতী মায়ের নিয়মিত ব্যায়ামে তার গর্ভস্থ শিশুর রক্ত স্বাভাবিক থাকে। হার্টের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এমনকি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়ামের কারণে সন্তানের মস্তিস্ক অনেক উন্নত হয় এবং স্মৃতি শক্তিতে প্রখর হয়। স্মার্ট সন্তান হিসেবে পরবর্তীতে বেড়ে উঠে।

স্ট্রেস থেকে মুক্তিঃ গর্ভাবস্থায় স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তার পরিমাণ খুব বেড়ে যায়। মহিলারা খুব অবিসাদ আর বিষণ্ণতায় ভোগেন। তবে আপনাকে মনে রাখতে হবে যে এই স্ট্রেসের প্রভাব গিয়ে পড়বে আপনার অনাগত সন্তানের উপর। তাই নিজেকে স্ট্রেস থেকে মুক্ত রাখতে হবে। আর ব্যায়াম এই ব্যাপারে খুব সাহায্য করে। এছাড়া প্রতিদিনের ৩০ মিনিটের হাঁটাহাঁটি আপনাকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ থেকে দূর রাখবে এবং দেহের সঠিক মেটাবলিজমে সাহায্য করবে।

ঘুমের সমস্যা দূর করেঃ গর্ভাবস্থার এই সময়ে ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়। যার ফলে অস্থিরতা, অবসাদ বৃদ্ধি পায়। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই।

নিজের জন্য কিছু সময়ঃ প্রতিদিন কিছুক্ষণ ব্যায়ামের মাধ্যমে আপনি নিজের জন্য কিছুক্ষণ সময় পাবেন। এই সময় শরীর ও মনের মধ্যে একটা যোগসুত্র তৈরি হয় যা আপনার মন ভালো রাখবে, স্নায়ু শীতল রাখবে। আর এর ফলস্বরূপ আপনার নিজের মধ্যে একধরণের ফুরফুরে ভাব আর ভালো লাগা তৈরি হবে।

আত্মবিশ্বাসঃ নিজেকে ভালো দেখাক, দেখতে একটু ফিট লাগুক এটা কে না চায়? আর নিয়মিত ব্যায়ামের ফলে যখন দেখবেন গর্ভাবস্থার এই সময়ও আপনি স্বাস্থ্যবান আছেন, ফিট আছেন, সুস্থ আছেন; তখন আপনার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যাবে।

ফিটনেস দ্রুত ফিরে পাওয়াঃ ডেলিভারির পর দেখা যায় আপনার প্রিয় জামাটা আর আপনার গায়ে লাগছে না , টাইট হচ্ছে বা ওইসময় যেসব ঢিলে-ঢালা জামাগুলো পড়ছিলেন সেটাও আর গায়ে লাগছে না। অনেক বেশি ঢিলে-ঢালা হয়ে গেছে! এই সমস্যাটা নারীরের মধ্যে অনেক বেশি হতাশা তৈরি করে থাকে। কিন্তু ডেলিভারির আগেই অর্থাৎ গর্ভাবস্থার সময় থেকেই যদি আপনি ব্যায়াম করে থেকে থাকেন তাহলে এই বাড়তি ওজন ঝরিয়ে ফিটনেট আপনি খুব দ্রুতই ফিরে পেতে পারবেন

গর্ভবতী নারীর শরীরকে প্রসবের জন্য প্রস্তুত করে ব্যায়ামঃ ব্যায়াম ঊরু, পিঠ ও শরীরের নিম্নাংশের মাসল টোন করে। প্রসবের সময় লেবার পেইন কমায়। আপনার শরীরকে প্রসবের জন্য প্রস্তুত করে। স্বাভাবিক প্রসবে সাহায্য করে।

ব্যায়াম শুরুর আগে করনীয়:

ব্যায়াম শুরুর আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনার গর্ভাবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ নয়। গর্ভবতী মায়ের শারীরিক অবস্থানুযায়ী প্রয়োজন, বয়স, পরিবেশগত সুবিধা, সময়ের সীমাবদ্ধতা ও মানসিক প্রবণতার কথা ভেবে ব্যায়াম বেছে নেয়া ভাল।তবে যে কোনো ব্যায়ামের আগে অবশ্যই অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্ট বা প্রসূতিবিদ্যায় অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নিয়ে শুরু করা উচিত।

ব্যায়ামের সময় হালকা ও ঢিলেঢালা আরামদায়ক সুতির পোশাক পরুন। পায়ের জুতা নরম ও মাপমতো হওয়া চাই।

প্রথমে খানিকটা হালকা ধরনের ব্যায়াম দিয়ে শুরু করুন। প্রয়োজনে গতি কমান। অস্বস্তি, খারাপ লাগা থাকলে ব্যায়াম বন্ধ করুন।ব্যায়ামের দুই ঘণ্টা আগে ও ১৫ মিনিট পর পর্যাপ্ত পরিমান পানি পান করবেন। যদি কেউ শরীর চর্চার পাশাপাশী যথেষ্ট পরিমাণ  ক্যালরিযুক্ত খাবার  যেমন শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ না করে তাহলে শরীর খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে।

গর্ভাবস্থায় কোনো মতেই তাড়াহুড়ো করে ব্যায়াম করা উচিত নয়। প্রতিটি ব্যায়াম করার পর ২০/৩০ সেকেন্ড বিশ্রাম নিয়ে তবে অন্য একটি ব্যায়াম করতে হবে। ধীরে অবস্থান পরিবর্তন করুন, যেন ভারসাম্য না হারায়। শেষে হালকা হাঁটাহাঁটি করুন, তারপর কিছুটা বিশ্রাম নিন।

গর্ভাবস্থায় হালকা যেসব ব্যায়াম করা যেতে পারে

হাঁটা- সম্পূর্ণ গর্ভকালীন সময়েই হাঁটাহাঁটি করা যায়। এসময়ে এটি সবচেয়ে নিরাপদ ব্যায়াম।গর্ভাবস্থার পুরো নয় মাস আপনি হাঁটাকে আপনার প্রতিদিনকার রুটিনে রাখতে পারেন। দিনে অন্তত আধা ঘণ্টা হাঁটতে পারেন।আপনি চাইলে দিনে ১৫ মিনিট জগিংও করতে পারেন। বেশি হয়রান লাগলে ধীরে হাঁটুন।

সাঁতার কাটা- সাঁতার কাটা সব থেকে ভালো ও নিরাপদ ব্যায়াম। সাঁতার কাটলে হাত ও পায়ের মাসলের ওয়ার্কআউট হয়। এছাড়া কারডিওভাস্কুলার ওয়ার্কআউটও হয়। বাড়তি ওজন থাকা সত্ত্বেও নিজেকে হালকা মনে হয়। রিলাক্সড লাগে।

যোগাসন- গর্ভাবস্থার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী কিছু যোগব্যায়াম রয়েছে যা শরীরের ক্লান্তি,অবসাদ দূর করতে সাহায্য করে।মাসল টোন ভালো রাখতে সাহায্য করে। ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়ায় কিন্তু জয়েন্টের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে না। যোগাসন মন-মেজাজ ভালো রাখে।

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস সাধারণত চিকিৎসকেরা সোজা হয়ে শুতে হয় এরকম ব্যায়াম করতে বারণ করেন। এমন কোনো ব্যায়াম করবেন না যাতে লাফাতে হয় কিংবা পেটে আঘাত লাগে। ব্যায়াম করার সময় আপনাকে সচেতন থাকতে হবে। তবে যে ধরনের ব্যায়ামই করুন না কেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজ থেকে কোনো ব্যায়াম শুরু করবেন না।

যেসব গর্ভবতী মহিলাদের ব্যায়াম করা নিষেধ:

  • যেসব গর্ভবতী মহিলার উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে,
  • রক্তশূন্যতাও অপুষ্টি জনিত সমস্যায় ভুগছেন,
  • যাদের হূৎপিণ্ড ও ফুসফুসের রোগ রয়েছে,
  • গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ হলে
  • ফুল নিচের দিকে থাকা বা প্লাসেন্টা প্রিভিয়া যাদের রয়েছে,
  • আগে গর্ভপাত হওয়ার ইতিহাস থাকলে,

 

পরিশিষ্ট:

ভাবছেন গর্ভকালীন সময়ে ব্যায়াম করলে আপনার সন্তানের কোন ক্ষতি হবে কিনা?

যদি আপনার কোন শারীরিক সমস্যা না থাকে তাহলে হালকা কিছু ব্যায়াম আপনি সহজেই করতে পারেন। যদিও গর্ভাবস্থায় ভারি কাজ করতে নিষেধ করা হয় তবে হালকা কিছু ব্যায়াম এই সময় আপনাকে অনেক সমস্যা থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।

সবার জন্য শুভ কামনা।

তথ্যসূত্রঃ

physionews24.com
supermombd.com
blog.grameen.market

Related posts

Leave a Comment