গর্ভাবস্থায় মাথা ঘোরা বা জ্ঞান হারানো অনুভূতি হওয়া

গর্ভাবস্থায় মাথা ঘোরা বা জ্ঞান হারানোর অনুভূতি কেন হয়? 

গর্ভবতী অনেক নারী মাঝে মাঝেই জ্ঞান হারানোর মতো অনুভব করেন। গর্ভাবস্থায় শরীরের হরমোনের পরিবর্তনের কারণেই এমন বোধ হয়। আপনার মস্তিষ্ক যদি যথেষ্ট পরিমাণ রক্ত (যার মধ্যে অক্সিজেন থাকে) না পায়, তাহলেই অজ্ঞান হবার মতো অবস্থা তৈরি হয়। যদি আপনার শরীরে সার্বিকভাবে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় তাহলেও আপনি জ্ঞান হারাতে পারেন বা অচেতন অনুভব করতে পারেন।

যদি মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেন এর প্রবাহ কমে যায় তাহলে মস্তিষ্ক সাথে সাথে শরীরের অন্যান্য অংশ থেকে প্রয়োজনীয় রক্ত মস্তিষ্কে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে।যখন মস্তিষ্ক অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করে তখন শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা বেড়ে যায় (hyperventilation)। শরীরের বাকি অংশ থেকে মস্তিষ্কে দ্রুত রক্ত পাম্প করতে হয় বলে হৃৎপিণ্ডের গতিও বেড়ে যায়।

হৃদপিণ্ডের গতি বৃদ্ধির ফলে এবং শরীরের অন্যান্য অংশ থেকে রক্ত মস্তিষ্কে প্রবাহিত হয়ে যাওয়ার ফলে শরীরের অন্যান্য অংশে রক্তচাপ কমে যায় (Hypotension)। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং শরীরের অন্যান্য অংশে রক্তচাপ কমে যাওয়া এই দুইয়ের সমন্বয়ে সাময়িকভাবে অবচেতন অবস্থা, পেশীর দূর্বলভাব এবং জ্ঞান হারানোর অবস্থা তৈরি করতে পারে।

গর্ভাবস্থায় হার্ট রেট বেড়ে যায়, হৃদপিণ্ডকে প্রতি মিনিটে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী রক্ত পাম্প করতে হয় এবং শরীরে রক্তের পরিমান ৩০-৫০ ভাগ বেড়ে যায়। বেশিরভাগ গর্ভাবস্থায় প্রজেস্টেরন হরমোনের কারনে রক্তনালীগুলো স্ফীত হয়ে যায় যার কারনে রক্ত চাপ কমে যায়। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে এটি আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে আসে।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে বর্ধিত জরায়ু ও বাচ্চা শরীরের নিম্নাংশের রক্তনালীর উপর চাপ ফেলতে থাকে যার কারনে ব্লাড প্রেসার কমে যেতে পারে। আমাদের শরীর এই পরিবর্তনগুলোর সাথে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা রাখে। তবে মাঝে মাঝে খুব দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেনা। তখন মায়দের মাথা ঘুরে ওঠা, অচেতন অনুভব হওয়া বা কিছু সময়ের জন্য জ্ঞান হারানোর অনুভুতি হতে পারে। হঠাৎ বসা বা দাঁড়ানো বা গর্ভাবস্থার শেষের দিকে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকার কারনে মায়ের ব্লাড প্রেসার কমে যেতে পারে এবং এ ধরনের অনুভুতি হতে পারে।

অতিরিক্ত গরমের কারণেও এ উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় এমনিতেই মায়ের গরম বেশী লাগে কারণ এ সময় হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে ত্বকে রক্ত চলাচল বেশী থাকে। গর্ভাবস্থায় আপনার রক্তে শর্করার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে উঠানামা করে এবং রক্তে কম শর্করা আপনাকে অচেতন করতে পারে।

এনেমিয়া বা রক্তশূন্যতার কারণেও জ্ঞান হারানোর অনুভুতি হতে পারে কারণ এ ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে এবং মায়ের শরীরের অন্যান্য অংশে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত লোহিত রক্ত কণিকা থাকেনা। স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তার কারণে মায়েদের শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেলেও এমনটা হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় জ্ঞান হারানোর অনুভূতি হলে কি করা যেতে পারে?

যদি দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় আপনার জ্ঞান হারানোর মতো ভাব হয় তাহলে তাড়াতাড়ি কোথাও বসে পড়ুন,  যদি সম্ভব হয় দুই হাটুর মাঝখানে মাথা দিয়ে বসার চেষ্টা করুন (গর্ভাবস্থার শেষ দিকে যদিও এভাবে বসাটা সম্ভব নাও হতে পারে)। কিছুক্ষণের মধ্যে জ্ঞান হারানোর ভাব কেটে যাবে।

যদি তা না হয় তাহলে একপাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ুন। এতে শরীরে এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে এবং অচেতন অনুভূতি আস্তে আস্তে কেটে যাবে। যদি চিৎ হয়ে শোয়া অবস্থায় অজ্ঞান হবার মতো অনুভব করেন তাহলে পাশ ফিরে শোন। গর্ভাবস্থার শেষ সময়ে কিংবা প্রসব- বেদনার সময় পিঠ সোজা করে চিৎ হয়ে না শোয়াই ভালো।

ছবিঃ গুগল

গর্ভাবস্থায় কিভাবে শোওয়া নিরাপদ তা জানতে বিস্তারিত পড়ুন।

গভীরভাবে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করুন। কাপড় চোপড় আলগা করে দিন। কাউকে বলুন ঘরের দরজা জানালা খুলে দিতে। কপালে ভেজা কাপড় রাখলেও সাহায্য হতে পারে।

মাথা ঘোরা বা অচেতন হওয়া প্রতিরোধে কি করা যেতে পারে?

কখনো কখনো শোয়া অথবা বসা থেকে খুব দ্রুত উঠে দাঁড়ালে হঠাৎ করে রক্তচাপ কমে যায়। এ অবস্থায় অনেকে জ্ঞান হারানোর মতো অনুভব করতে পারেন। শোয়া বা বসা থেকে যখন আপনি উঠে বসেন তখন মধ্যাকর্ষণ জনিত ভরের কারণে শরীরের রক্তপ্রবাহ পায়ের দিকে নেমে যায়, ফলে সাময়িকভাবে রক্তচাপও কমে যায়। এ অবস্থাকে সামাল দেয়ার জন্য স্নায়ুতন্ত্র হৃদপিণ্ডের গতি বাড়িয়ে দেয় এবং রক্তনালীগুলোকে সরু করে দেয় যার ফলে রক্তচাপ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

শোয়া অথবা বসা থেকে খুব দ্রুত উঠে দাঁড়ানোর সময় রক্তচাপ কমে যাওয়ার (Orthostatic Hypotension) ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার প্রক্রিয়াটি বাধা পায়। অর্থাৎ আপনি যখন হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ান তখন আপনার মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয় এবং আপনি কিছু সময়ের জন্য অজ্ঞান হয়ে যান।তাই শোয়া বা বসা থেকে দ্রুত না ওঠার চেষ্টা করুন। শুতে যাওয়ার সময় বা ওঠার সময় আগে কিছুক্ষন বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে থাকুন। তারপর আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ুন বা উঠে যান।

যদি আপনি ভীষণভাবে পানিশূন্য হয়ে পড়েন ( অর্থাৎ আপনার শরীরের পানির মাত্রা যদি তীব্রভাবে হ্রাস পায়) তাহলে রক্তচাপ কমে যাবার সাথে সাথে আপনার শরীরের অন্যান্য তরলও কমে যাবে। ফলে স্নায়ুতন্ত্রের জন্য রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখাটা কঠিন হয়ে পরে এবং আপনার জ্ঞান হারানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তপাত, বমি কিংবা ডায়ারিয়ার ফলেও এমন হতে পারে।রোজ প্রচুর পরিমানে পানি পান করতে হবে। পানি শরীরে রক্ত তৈরিতেও সাহায্য করে।

পর্যাপ্ত পরিমানে খাওয়া দাওয়া না হলে রক্তের সুগার লেভেল কমে যেতে পারে যার কারণে জ্ঞান হারানোর অনুভূতি হতে পারে। গর্ভাবস্থায় এটি আরও খুব সহজে হতে পারে। তাই ব্লাড সুগারের পরিমান ঠিক রাখতে অল্প অল্প খাবার ঘন ঘন খাওয়ার চেষ্টা করুন। বাইরে যাওয়ার সময় ব্যাগে কিছু খাবার নিতে ভুলবেন না।

অতিরিক্ত গরম আপনার রক্তনালীগুলোকে স্ফীত করে দিতে পারে যার ফলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। তাই অতিরিক্ত গরমে বেশী না থাকার চেষ্টা করুন। গোসলের সময় পানি যাতে বেশী গরম না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। ব্যায়াম করার সময় খেয়াল রাখবেন যাতে অতিরিক্ত করা নাহয় যাতে আপনার শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বেশি বেড়ে না যায়। যদি ব্যায়াম করার সময় জ্ঞান হারানোর অনুভূতি হয় তবে চট করে ব্যায়াম না থামিয়ে আস্তে আস্তে থামানোর চেষ্টা করুন। গরমের সময় হাত এবং মুখ ঠাণ্ডা পানি দিয়ে মাঝে মাঝে স্পঞ্জ করে নিন।

গর্ভাবস্থার ১৫ থেকে ২০ সপ্তাহের মধ্যে মায়ের জরায়ু অনেক বড় হয়ে যায়। এর ফলে মা যদি চিৎ হয়ে শোয় তবে তা রক্ত প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি করে। এভাবে শোয়ার ফলে জরায়ুর চাপে ইনফেরিয়র ভেনা কাভা সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। এই শিরাটি শরীরের মধ্যভাগ ও নিম্নভাগ থেকে রক্ত হৃদপিণ্ডে প্রবাহিত করে।এর কারণে মায়ের হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচল কমে যেতে পারে, দম বন্ধ অনুভুতি হয়ে মায়ের ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে এবং হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যেতে পারে। গর্ভাবস্থার ১৬ সপ্তাহ পার হয়ে যাবার পর অনেকক্ষণ চিত হয়ে শুয়ে থাকলে আপনার জ্ঞান হারানোর মতো অনুভূতি হতে পারে, কারণ গর্ভস্থ শিশুটির সকল চাপ তখন রক্তনালীগুলোর ওপর পড়ে।

ছবিঃ গুগল

গর্ভাবস্থায় পাশ ফিরে শোওয়া বিশেষ করে বাম পাশ ফিরে শোওয়াটা সবচাইতে নিরাপদ।বাম কাত হয়ে শোয়াটা আপনার বাচ্চার জন্যও ভালো কারণ এতে করে পুষ্টি ও রক্ত প্ল্যাসেন্টা দিয়ে সহজেই বাচ্চার কাছে পৌঁছাতে পারে। আপনার কিডনিও বর্জ্য ও অতিরিক্ত ফ্লুইড আপনার শরীর থেকে বের করে দেয়ার জন্য কাজ করতে পারে। এর ফলে আপনার হাত-পা-গোড়ালি ফুলে যাবার (oedema) সম্ভাবনাও কম থাকে।গবেষণায় দেখা গেছে যেসব নারীরা গর্ভাবস্থায় বাম কাতে শোয়, তাদের মৃত সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা কম থাকে; অন্তত যারা অন্য পজিশনে শোয় তাদের চাইতে।

বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে বা পা নিচের দিকে মাটিতে রেখে বসে থাকলে শরীরের শিরার উপর চাপ পরে। তাই বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে না থেকে কিছুক্ষন পর পর কিছু সময় বসে থাকুন। বসার সময় পা কিছুর উপর তুলে রাখতে পারেন। কাজের জন্য বেশীক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে হলে কিছুক্ষণ পর পর পায়ের উপর ভর পরিবর্তন করুন বা বসে থাকতে হলে কিছুক্ষন পর পর একটু হেঁটে নিন।

কখন ভয়ের কারণ

গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে ঘনঘন মাথা ঝিমঝিম করা বা অচেতন হওয়া (বিশেষ করে যদি যোনীর রক্তপাত বা পেট ব্যাথা থাকে) মানে জরায়ুর বাইরে গর্ভাবস্থা (একটোপিক গর্ভাবস্থা)। এসব উপসর্গ দেখা দিলে সরাসরি আপনার ডাক্তারের সাথে দেখা করুন।

যদি আপনার মাথা ঘোরানো ভাব চলতেই থাকে বা এর সাথে সাথে অস্পষ্ট দৃষ্টি, মাথা ব্যাথা, পাল্পিটিশন থাকে, সে ক্ষেত্রেও ডাক্তারকে জানাতে হবে কারণ এগুলো এনেমিয়ার লক্ষন হতে পারে।

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ( যে অবস্থায় আপনার রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ অনেক বেশি) এর কারণে যদি আপনার ঘন ঘন প্রস্রাব হয়, তাহলেও শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে। রক্তে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত পরিমাণ গ্লুকোজ থাকার ফলে, যে স্নায়ু রক্তচাপকে স্থিতিশীল করে তার কর্মক্ষমতা কমে যায় ফলে স্নায়ুতন্ত্রের দুর্বলতা জনিত কারনে জ্ঞান হারানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস আপনার আগে থেকেই থাকতে পারে বা গর্ভাবস্থার এই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যদি মনে হয় ডায়াবেটিসের কারণে এমনটা হচ্ছে তবে ডাক্তারকে জানান।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment