গর্ভাবস্থায় ভেরিকোস ভেইন বা স্ফীত শিরা

ভেরিকোস ভেইন কি?

ভেরিকোস ভেইন হোল অস্বাভাবিকভাবে স্ফীত হয়ে যাওয়া শিরা যা চামড়ার উপর দিয়ে দেখা যায়। নীল বা বেগুনি রঙের আঁকাবাঁকা শিরাগুল সাধারণত পায়ে দেখা যায়। তবে গর্ভাবস্থায়  ভেরিকোস ভেইন নিতম্বে বা ভ্যাজিনাল এরিয়াতেও দেখা যেতে পারে। অর্শরোগ বা Hemorrhoids একধরনের ভেরিকোস ভেইন যা গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে হয়ে থাকে।

অনেকেরই গর্ভাবস্থায় প্রথমবারের মত ভেরিকোস ভেইন দেখা দিতে পারে। ভেরিকোস ভেইনের ফলে কোন ব্যাথা অনুভূত নাও হতে পারে আবার হাল্কা বা বেশী ব্যথাও হতে পারে আবার পা ভারী লাগতে পারে। ভেরিকোস ভেইনের আশেপাশে চুলকানি বা জ্বলুনি হতে পারে বা স্পন্দিত হতে পারে। এসব সমস্যা রাতের দিকে বেড়ে যেতে পারে বিশেষ করে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলে।

 

গর্ভাবস্থায় ভেরিকোস ভেইন কেন হয়?

গর্ভাবস্থায় যখন মায়ের জরায়ুর আকার বাড়তে থাকে তখন তা মায়ের শরীরের ডান পাশে থাকা বড় শিরার (ইনফেরিয়র ভেনা কাভা)উপর চাপ সৃষ্টি করে যার ফলে পায়ের শিরাগুলোর উপর ও চাপ পড়ে।

শিরার মাধ্যমে মানুষের শরীরে রক্ত হৃদপিণ্ডে প্রবাহিত হয়। তাই পায়ের শিরা গুলো নিচ থেকে উপরের দিকে অর্থাৎ মধ্যাকর্ষণের বিপরীতে রক্ত পরিবহন করে। গর্ভাবস্থায় যখন রক্ত প্রবাহ বেড়ে যায় তখন শরীরের শিরাগুলোর উপর চাপ আরও বেড়ে যায়। এছাড়াও প্রোজেস্টেরন বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে শিরার দেয়ালও নরম হয়ে যায়। এই অতিরিক্ত চাপের কারণে গর্ভাবস্থায় ভেরিকোস ভেইন দেখা দেয়।

যদি পরিবারের অন্য কারও ভেরিকোস ভেইন এর ইতিহাস থাকে তাহলে এর ঝুঁকি বেশী থাকে। ভেরিকোস ভেইন একবার হলে তা পরের বারের গর্ভধারণে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে। ওজন বেশী হলে, গর্ভে যমজ সন্তান থাকলে বা অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলেও এর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

সুসংবাদ হোল ভেরিকোস ভেইন বাচ্চা জন্মের পর ভালো হয়ে যায় যদি গর্ভধারণের আগে থেকেই তা থেকে না থাকে। মাঝে মাঝে চামড়াতে বিশেষ করে পায়ের গোড়ালি, পায়ে বা মুখে হালকা ফোলা শিরা দেখা যায়। এগুলোকে স্পাইডার ভেইন বলে কারণ সেগুলো দেখতে অনেকটা মাকড়শার মত থাকে। স্পাইডার ভেইনের কারণে কোন ব্যাথা হয়না এবং এগুলো সাধারণত ডেলিভারির পর ঠিক হয়ে যায়।

 

গর্ভাবস্থায় ভেরিকোস ভেইন কি ঝুঁকির কারণ হতে পারে?

ভেরিকোস ভেইনের কারণে চুলকানি বা ব্যাথা হতে পারে কিন্তু এগুলো সাধারণত তেমন ঝুঁকির কারণ নয়। এর যদি কোন চিকিৎসার প্রয়োজন হয় তবে তার জন্য সন্তান জন্মদান পর্যন্ত অপেক্ষা করা যায়। তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে ভেরিকোস ভেইনের কারণে শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে যেতে পারে (superficial venous thrombosis)। এমনটা হলে শিরা শক্ত হয়ে যায় এবং দড়ির মত দেখায় এবং এর আশপাশের জায়গা লাল ও গরম হয়ে যায় এবং ব্যাথা অনুভুত হয়।

যদি এ ধরনের লক্ষন দেখা দেয় তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে রক্ত জমাট বাঁধা স্থানের চারপাশে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। এ সময় মায়ের জ্বর আসতে পারে বা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যেতে পারে। তাই দ্রুত এর চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। এছাড়াও নিচের উপসর্গ গুলো দেখলেই দ্রুত ডাক্তারকে জানাতে হবে-

  • পা অনেক বেশী ফুলে গেলে।
  • পায়ে ঘা সৃষ্টি হলে।
  • শিরার আশপাশের জায়গা রং পরিবর্তিত হয়ে গেলে।

এছাড়াও আরও একধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে যাকে deep venous thrombosis (DVT) বলা হয়। যদিও তা খুবই বিরল। এ ক্ষেত্রেও শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এটি হলে কোন লক্ষন দেখা নাও যেতে পারে বা হঠাৎ করে পা, পায়ের গোড়ালি এবং উরু ফুলে যেতে পারে। পা বাঁকানো থাকলে বা দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যাথা বেশী অনুভুত হতে পারে। হালকা জ্বর ও হতে পারে। এসব লক্ষন দেখা দিলেই দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

দ্রুত এর চিকিৎসা করা না হলে জমাট বাঁধা রক্ত ভেঙ্গে লাংসে চলে যেতে পারে। যা মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

গর্ভাবস্থায় কিভাবে এর প্রতিকার করা যায়?

কিছু কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করে গর্ভাবস্থায় ভেরিকোস ভেইনের প্রতিকার করা যায় বা কমানো যায়-

পায়ের উপর ভর দিয়ে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে না থাকার চেষ্টা করুন

বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে বা পা নিচের দিকে মাটিতে রেখে বসে থাকলে শরীরের শিরার উপর চাপ পরে যার ফলে ফোলা আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে না থেকে কিছুক্ষন পর পর কিছু সময় বসে থাকুন। বসার সময় পা কিছুর উপর তুলে রাখতে পারেন। আরামদায়ক জুতা ব্যাবহার করুন।

বিশ্রাম নেয়ার সময় পা উপরের দিকে তুলে রাখুন

যখন বিশ্রাম নেবেন বা শুয়ে থাকবেন তখন পায়ের নীচে বালিশ বা আর কিছু দিয়ে পা উপরের দিকে তুলে রাখুন। এতে যেমন আপনার রিলাক্স হবে তেমনি এতে শরীরে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হবেনা। সবচাইতে ভালো হয় যদি শুয়ে থাকা অবস্থায় পা আপনার হার্টের চাইতে উপরে রাখা যায়। তবে যেটা আপনার জন্য আরামদায়ক সেটাই করুন।

ব্যায়াম

শারীরিকভাবে শক্তিশালী থাকলে রক্ত চলাচল ভালোভাবে হয় যা ভেরিকোস ভেইন নিরাময়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পায়ের কাফ মাসলের নড়াচড়া হওয়া প্রয়োজন। অলসভাবে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।ওজন কম রাখার চেষ্টা করুন।

খাবার লবনের পরিমান কম রাখুনঃ

অতিরিক্ত লবন শরীরে পানি ধরে রাখে। তাই খাবারে অতিরিক্ত লবন পরিহার করুন। সোডিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন প্যাকেটজাত খাবার না খাওয়ার চেষ্টা করুন। অতিরিক্ত সোডিয়াম কমানোর আরেকটি উপায় হোল পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, যেমন- কলা, অ্যাপ্রিকট, কমলা, মিষ্টি আলু, বিট ইত্যাদি।

আক্রান্ত স্থানে মাসাজ করা যেতে পারেঃ

আক্রান্ত স্থানটি যতোটা সম্ভব উপরের দিকে উঠিয়ে রাখুন, এতে রক্ত চলাচলে সুবিধা হবে। যদিও এটি করা সব সময় সম্ভব হয়না। তাই আক্রান্ত স্থানে ম্যাসাজ করা আপনাকে সাহায্য করবে রক্তকে সঠিক পথে প্রবাহিত করতে এবং রক্তনালীতে স্থান তৈরি করতে।

ঘুম

বাম পাশ ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। এতে শরীরের ডান পাশে থাকা শিরায় চাপ কম পরে যা শরীরের নিম্নাংশ থেকে হৃদপিণ্ডে রক্ত প্রবাহ করে।

ঢোলা, আরামদায়ক এবং সুতির কাপর পরার চেষ্টা করুনঃ

গর্ভাবস্থায় ঢোলা এবং আরামদায়ক কাপড় পরার চেষ্টা করুন যাতে শরীর কোন চাপ না পরে। এ ছাড়াও সুতির কাপড় পড়লে অতিরিক্ত গরম লাগার হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে।

এছাড়াও গর্ভাবস্থায় উপযোগী কিছু কমপ্রেশন স্টকিংস, টাইটস এবং মোজা পাওয়া যায়। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে সেগুলো ব্যাবহার করতে পারেন।

সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts

Leave a Comment