গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতা । অবহেলা নয়, প্রতিকার জরুরী

গর্ভাবস্থাকে একটি অনেক আনন্দের ও সুন্দর সময় বলা হয়। তবে, কাঙ্খিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত যেভাবেই হোক, যখন নিশ্চিত হন যে গর্ভধারণ করেছেন তখন স্বাভাবিকভাবেই আরও নানা পরিবর্তনের সাথে সাথে হবু বাবা ও মা, বিশেষ করে মায়ের মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বেড়ে যায়। আবার অনেকে বিষয়টিকে খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেন।  নারীর গর্ভকালীন সময়ের মানসিক চাপ ও উদ্বেগের পরিমান যদি স্বাভাবিকের থেকে বেশী হয়, তবে তা গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতা ও অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সূচনা করতে পারে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রায় ৩৩ শতাংশ নারীরাই গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতায় (depression during pregnancy) ভুগে থাকেন। এর বেশীরভাগই কোনরূপ চিকিৎসা বা সঠিক দেখাশোনা ছাড়াই সন্তান জন্ম দেন। যার প্রভাব পড়ে সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতকটির উপর। বিষণ্ণতা বা মানসিক অস্থিরতায় ভোগা মায়ের সন্তান পরবর্তীতে নানা ধরণের মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হয় তাই প্রথম থেকেই গর্ভবতী নারীর বিষণ্ণতায় ভোগার লক্ষণ শনাক্ত করে তার প্রতিকারে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

 

গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতা বলতে কি বোঝায়?

বিষণ্ণতা একধরনের আচরণগত সমস্যা যার ফলে মানুষের মন খারাপ থাকে বা নিজেকে অকর্মণ্য মনে হতে থাকে। মাঝে মাঝে এ ধরনের অনুভুতি সব মানুষেরই হয় তবে বিষণ্ণতার ক্ষেত্রে এসব অনুভুতি অনেকদিন ধরে এমনকি সপ্তাহ বা মাস ধরেও থাকতে পারে। বিষণ্ণতা মানুষের দৈনন্দিন সব কাজের উপরই প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন- আপনার চিন্তাভাবনা, কাজকর্ম, খাওয়া, ঘুম ইত্যাদি।

গর্ভধারণের আগে এবং গর্ভাবস্থায় যে বিষণ্ণতা দেখা দেয় তা কিন্তু প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতা (postpartum depression ) থেকে ভিন্ন। postpartum depression সাধারণত বাচ্চা প্রসবের পর দেখা যায়। বিষণ্ণতার সাথে মানিয়ে চলা সবসময়ই কঠিন, কিন্তু গর্ভাবস্থায় তা আরও বেশী কঠিন হয়ে ওঠে। সবারই এক্সপেকটেশন থাকে গর্ভাবস্থা অনেক আনন্দের হবে কিন্তু যখন তার বিপরীত দেখা যায় তখন সেটা গ্রহন করা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

মনে রাখতে হবে বিষণ্ণতা একটি রোগ এটি কারো ইচ্ছাতে হয়না। আরও আশ্চর্যজনক হোল এতে গর্ভাবস্থায় অনেক মা ই আক্রান্ত হন। প্রতি দশজনের মধ্যে ১ জন গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতার শিকার হতে পারেন। তবে এর পরিমান আরও অনেক বেশী কারণ অনেক বিষণ্ণতায় আক্রান্ত মা ই তা শিকার করতে চান না বা জানাতে চান না।

এ ধরনের বিষণ্ণতা চিকিৎসা ছাড়া আপনা আপনি ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে চিকিৎসা নিলে বেশীর ভাগ মানুষই কয়েক মাস বা বছরের মধ্যেই আবার স্বাভাবিক বোধ করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মহিলারা নিজেদের এ ধরণের সমস্যার ব্যাপারে উদাসীন থাকেন। কিন্তু এমনটা যেন না হয়। মনে রাখতে হবে, আপনার দৈহিক সুস্থতার মতোই আপনার মানসিক সুস্থতাও একটি সুস্থ শিশুর জন্মলাভের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই গর্ভাবস্থায় আপনার যদি মনে হয় যে আপনি বিষণ্ণতায় ভুগছেন, দেরী না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

 

গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতা কেন হয়?

গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতা কেন হয় তা নির্দিষ্ট করে বলা যায়না। এর বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যেমন- হরমোন। গর্ভাবস্থায় মায়েদের শরীরে হরমোন উৎপাদন বেড়ে যায়। এসব হরমোন মায়দের মস্তিষ্কের সেসব অংশকে প্রাভাবিত করতে পারে যা মানুষের অনুভুতি নিয়ন্ত্রন করে।

অন্যান্য কারণেও মায়ের বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা বা অবসাদ্গ্রস্ততা দেখা দিতে পারে। নীচের কারণগুলো থাকলে গর্ভাবস্থায় মায়েদের বিষণ্ণতায় ভোগার ঝুঁকি বাড়তে পারে-

যদি ইতিমধ্যে আপনি  অতীতে বিষণ্ণতায় ভুগে থাকেন বা আপনার পরিবারের কারো এই সমস্যা থেকে থাকে। পূর্বে বিষণ্ণতা না থেকে থাকলেও আপনার পুরোপুরি সম্ভাবনা থাকে গর্ভাবস্থায় এই রোগে আক্রান্ত হবার।

যদি আগেরবার গর্ভধারণের সময় বা প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকে তবে পরবর্তী গর্ভধারণের সময় বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

গর্ভাবস্থায় মার বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় যেমনঃ মর্নিং সিকনেস,অ্যানেমিয়া, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ইত্যাদি কারনে মায়ের দেহ স্বাভাবিক ভাবে দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যারফলে অনেক সময়ে হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে হয়। এই সময়ে হবু মা তার দুর্বলতা ও ক্লান্তির কারনে তার স্বাভাবিক কাজ কর্ম সহজে করতে পারে না। যেটি তার মনে হতাশা ও বিষণ্ণতা তৈরি করে।

এই সময়ে সঙ্গীর কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায় অনেক। ভবিষ্যৎ শিশু ও মায়ের কথা ভেবে তিনি যদি স্নেহ-মমতা-ভালবাসা দিয়ে আশানুরূপ সহযোগিতা করতে না পারেন, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের থেকে সহযোগিতা না পান অথবা সদস্যদের মধ্যে ভাল সম্পর্ক না থাকে; অথবা ঐ সময়ে হবু মা-কে যদি একা থাকতে হয় তাহলে উভয়ের দিক থেকেই চাওয়া পাওয়ার টানাপোরেন সহ সম্পর্কে অস্থিরতা তৈরি হয় যা হবু মা’কে বিষণ্ণ করে তুলতে পারে।

পরিবারের আসন্ন নতুন সদস্যটির জন্য সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে কোন বাবা-মা না চায়! তাই বর্তমান যুগের গতিময়তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলতে আর্থিক বিষয়ক উদ্বেগে হবু বাবামায়েরা ভুগে থাকেন, এবং সন্তানের ভবিষ্যত কি হবে না হবে ভেবে অনেকে বিষণ্ণ হয়ে পরেন।

মায়ের বয়স যদি কম হয়, যদি আগে গর্ভধারণে সমস্যা হয়ে থাকে, গর্ভপাত অথবা মৃত শিশু প্রসবের ইতিহাস থাকলে, বর্তমান গর্ভাবস্থায় নারীটি এক ধরনের আশঙ্কায় ভুগতে থাকেন, যা থেকে বিষণ্ণতা তৈরি হতে পারে।

যদি অক্ষমতাজনিত কারণে গর্ভধারণ করতে সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে গর্ভাবস্থায় মায়েরা এক প্রকারের আতঙ্কে ভোগেন এবং এ থেকেও বিষণ্ণতা সৃষ্টি হতে পারে। কাজেই চেষ্টা করবেন যতটুকু সম্ভব দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকার।

বিষণ্ণতার লক্ষনগুলো কি কি ?

গর্ভাবস্থায় এবং প্রসব পরবর্তী সময়ে ঠিক কতজন মহিলা বিষণ্ণতায় ভোগেন তা আমাদের দেশে জানা যায়না। গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই মহিলাদের ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, মানসিক বিক্ষিপ্ততা এবং মেজাজের তারতম্য দেখা যায়, যেটা বিষণ্ণতাকে চিহ্নিত করতে আড়াল করতে পারে। তবে এগুলোর সাথে যদি নিচের যেকোনো ৫ বা তার বেশি বৈশিষ্ট্য আপনার মধ্যে ২ সপ্তাহের বেশি অপরিবর্তনীয় অবস্থায় থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনি বিষণ্ণতায় ভুগছেন এবং আপনার সাহায্য দরকার।

  • কারণ ছাড়া কোন কিছুতে আগ্রহ ও আনন্দ না পাওয়া। খুব পছন্দের কোন কাজ বা ঘটনাতেও আনন্দ লাভ না করা।
  • গভীর দুঃখবোধ এবং হতাশা
  • সবসময় কান্না আসা।
  • অকারণে বেশি অস্থির লাগা
  • খুব বিরক্ত বোধ করা, অল্পতেই রাগ উঠে যাওয়া
  • কোন কিছুতে মনোযোগ দিতে না পারা, নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করা
  • খাদ্যাভ্যাসে হঠাৎ পরিবর্তন আসা। হতে পারে অতি ভোজন বা খাবারের রুচি নষ্ট হওয়া উভয়ই।
  • খুব বেশী ঘুম অথবা সম্পূর্ণ ঘুমহীন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাওয়া।
  • অপরাধ বোধে ভোগা,গ্লানি বোধ হওয়া, নিজেকে খুব খারাপ মা মনে হওয়া। নিজেকে যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ ছাড়াই দোষী ভাবা, মূল্যহীন ভাবা।
  • নিজেকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা
  • সবসময় কোন কারণ ছাড়াই ক্লান্ত লাগা।

এসব লক্ষন দেখে আপনার যদি মনে হয় আপনি বিষণ্ণতায় ভুগছেন তবে দেরী না করে বিশেশজ্ঞের পরামর্শ নিন। গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতা মারাত্মক আকার ধারন করলে আপনি আপনার নিজের ক্ষতি করে ফেলতে পারেন।

গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতা বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে কি?

গর্ভাবস্থায় মা বিষণ্নতায় ভুগলে সেটা সন্তানের ওপর  বিরূপ প্রভাব ফেলে। মা বিষণ্নতায় ভুগলে পরবর্তী সময়ে সন্তান জন্মলাভের পর ওই সন্তানের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে এবং একপর্যায়ে সেও বিষণ্নতার শিকার হতে পারে। ফলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এছাড়াও গর্ভাবস্থায় বিষণ্নতার শিকার মায়েদের সন্তানের মস্তিষ্ক বিকাশ সঠিকরূপে হতে পারে না। বিষণ্ণতা গর্ভের শিশুর মস্তিস্ক বিকাশে বাধা প্রদান করে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এ বিষয়ে গবেষণা করে জানান, বিষাদগ্রস্ত মায়েদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের পরিমান বেশি থাকে। এই  হরমোন কর্টিসল গর্ভফুল বা প্লোসেন্টা পার করতে সক্ষম হয়। যারফলে গর্ভের ভ্রূণের উন্নয়নশীল মস্তিষ্ক বিকাশে বাধার সৃষ্টি হয়।

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিষণ্ণতায় ভুক্তভোগী মা নিজের ঠিকমত যত্ন নিতে পারে না, যেমন- পুষ্টিকর খাবার গ্রহন, নিয়মিত ঘুম, প্রি-ন্যাটাল চেকআপ ইত্যাদি। ফলে শিশুর বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্থ হয়। বিষণ্ণতায় ভোগা মায়েদের শিশুরা সাধারণত জন্মের পরে অন্যান্য শিশুর চেয়ে কম প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ হয়। তারা অন্য স্বাভাবিক শিশুর মতো কথাবার্তা, নড়াচড়ায় দেরী করে।

এছাড়াও গর্ভাবস্থায় মায়েরা যদি বিষণ্ণতায় ভোগেন এবং তার প্রতিকার করা না হলে আরও কিছু সমস্যা হতে পারে যেমন-

  • বাচ্চা প্রি-ম্যাচিউর হতে পারে অর্থাৎ ৩৭ সপ্তাহের আগেই বাচ্চার জন্ম হতে পারে।
  • জন্মের সময় বাচ্চার ওজন কম হতে পারে।
  • গর্ভকালীন বিষণ্ণতার নিরাময় করা না হলে মায়েরা প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতে পারেন। প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলে মায়েরা বাচ্চা যত্ন ঠিকভাবে নিতে পারেন না যা বাচ্চার উপর প্রভাব ফেলে।

এ ব্যাপারগুলো আপাতদৃষ্টিতে অনেক সাধারণ মনে হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। কাজেই সকলেরই উচিৎ এ বিষয়ে সচেতন হওয়া।

গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতা রোধে কি করা যেতে পারে?

গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতা আপনাকে অসহায় অবস্থায় পতিত করতে পারে।  বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন ধরণের থেরাপি ও চিকিৎসার পাশাপাশি নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। নিজের চেষ্টা না থাকলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। নিজের প্রতিদিনের কাজকর্ম, খাওয়া-দাওয়া, জীবনপ্রণালী এমনকি চিন্তা-ভাবনায় ও পরিবর্তন আনতে হবে ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির জন্য।

বিষণ্ণতায় ভুগলে তা বিশেশজ্ঞকে জানানো খুব প্রয়োজনীয়। তিনি বিষণ্ণতার মাত্রা জেনে আপনার করনীয় সম্পর্কে আপনাকে পরামর্শ দিবেন। এক্ষেত্রে আপনাকে সাইক্রিয়াট্রিস্ট বা কাউন্সেলর এর সাথে আলোচনা করার পরামর্শ দেয়া হতে পারে। বিষণ্ণতার ওষুধ হিসেবে আপনাকে গর্ভাবস্থায় নিরাপদ antidepressants দেয়া হতে পারে। তবে এসবের জন্য অবশ্যয় বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করতে হবে।

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির জন্য নিচের পয়েন্টগুলো সহায়ক হতে পারে-

আপনার শারীরিক সুস্থতার সাথে মানসিক সুস্থতাও জরুরি। আপনি সুস্থ থাকলেই আপনার শিশুর সুস্থ বিকাশ হবে। নিজের ভাল লাগার কাজগুলো বাড়িয়ে দিন। আরামদায়ক গোসল, নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখা, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, গান শোনা, ভাল  বই পড়া, প্রার্থনা করা ইত্যাদি আপনার মনে প্রশান্তি এনে দিবে।

গর্ভাবস্থায় ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে হাটাহাটি বা হালকা ব্যায়াম করতে পারেন। গর্ভাবস্থায় হালকা যোগ ব্যায়াম আপনার শক্তির মাত্রা বৃদ্ধি করে এবং মন ভাল করার ডোপামাইন হরমোনের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।যা আপনাকে ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।

গর্ভাবস্থায় কাজ মানসিক চাপের মাত্রা বাড়াতে পারে, তাই আপনার গর্ভাবস্থা নিয়ে বসের সাথে এই সময় ফিল্ড ভিজিট,কাজের হালকা চাপ নেয়া ও প্রয়োজন মত যেন বিশ্রাম নিতে পারেন ইত্যাদি সংক্রান্ত খোলামেলা আলোচনা করে নেয়া ভাল।

একটানা বসে না থেকে পরিবারের ছোট খাটো দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন, কম পরিশ্রমের কাজগুলো করতে পারেন যেমন নিজে রান্না না করে রান্নাঘরে কি রান্না হবে আর কোনটা হবে না সেটা ঠিক করে দিতে পারেন। এতে করে আপনার মন এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হবে না।

গর্ভাবস্থায় পরিবারের বাড়তি দায়িত্ব নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। এই সময়টায় আপনি স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ জটিল একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান। ফলে যে কোন ধরণের কাজ আপনাকে দ্রুত ক্লান্ত করে তোলে। দেখা যাবে বাড়তি কাজের দায়িত্ব আপনি সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন না আর এর ফলে বিষণ্ণতায় ভুগবেন।

একজন নারীর গর্ভাবস্থায় তাকে বিষণ্ণতা থেকে দূরে রাখতে পরিবারের মানুষগুলোর দায়িত্ব বাড়ির পরিবেশ শান্ত রাখা, এমন কোন পরিস্থিতি বা আলোচনা সন্তান সম্ভবা মায়ের সামনে করা উচিৎ নয় যাতে করে তিনি বিষণ্ণতা বা মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন।

গর্ভাবস্থায় একজন নারীর সবচেয়ে ভালো আর কাছের মানুষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তার জীবন সঙ্গী। তাই গর্ভাবস্থায় তাকে সুস্থ ও খুশী রাখতে আপনাকে তার মধ্যে ইতিবাচক চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে। তাকে হাসি খুশী রাখতে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতে পারেন অথবা পরিবারে যে নতুন সদস্য আসছে তাকে নিয়ে আগামী দিনের পরিকল্পনা করতে পারেন। এতো কিছুর ভিড়ে দেখবেন সে আর বিষণ্ণ হওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না।

এই সাহায্য আপনার সঙ্গি, কলিগ, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশি, প্রেগনেন্সি গ্রুপ, কাউন্সেলর, ডাক্তার থেকে আসতে পারে। সাহায্য চাওয়া কোন দুর্বলতা নয়, বরং এটি আপনাকে সঠিক তথ্য পেতে ও সচেতন হতে সহায়তা করবে। এসময় অসুবিধা হলে তা নিজের কাছে চেপে রাখবেন না।

আমাদের সমাজে গর্ভধারণ ও মায়েদের সুস্থতা, সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলার চর্চা খুবই কম। এক্ষেত্রে আপনার কাছের বা বিশ্বস্ত কারো কাছে যেমন আপনার স্বামী, শাশুরি, মা, বোন, বন্ধু, অন্য কেউ, এমন কি ডাক্তার আপনার যাবতীয় কথা শেয়ার করতে পারেন। এটি আপনাকে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগকে নিয়ন্ত্রন করতে সাহায্য করবে।

গর্ভাবস্থায় একজন নারী বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হন। বিষয়টি সম্পর্কে অনেক সময় অন্যরা বেখেয়াল বা উদাসীন থাকতে পারে। তাই আপনার বর্তমান অবস্থা নিয়ে নিজেকে অগ্রাধিকার দিন এবং অন্যদের ‘না’ বলা শুরু করুন। হবু মায়েদের উপর হবু সন্তানের অমঙ্গলের আশঙ্কা দেখিয়ে পরিবার বা প্রতিবেশি থেকে অনেক ক্ষেত্রে খাওয়া দাওয়া, আচার অনুষ্ঠানে পালন করা নিয়ে নানা রকম উপদেশ, বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেয়া হয়। যেটি পালন না করতে পারলে বা অমঙ্গলের আশঙ্কায় হবু মা আরও বেশী মানসিক চাপের সম্মুখীন হন। এক্ষেত্রে ডাক্তারের কাছ থেকে বিধি নিষেধ জেনে নিন, পরিবারের সদস্যদের কারনসহ বুঝিয়ে বলুন।

একেক জনের গর্ভাবস্থার অভিজ্ঞতা একেক রকম। তাই কারো খারাপ অভিজ্ঞতা শুনে বা কারো কোন খাদ্য গ্রহনের পরে, বা কোন কাজের কারনে অসুবিধা হলে সেই রকম অভিজ্ঞতা যে আপনারও হবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। আপনার ডাক্তারই আপনার সমস্যার সঠিক সমাধান দিতে পারবেন, তার নির্দেশমত চলুন, সঠিক তথ্য সংগ্রহ করুন।

পর্যাপ্ত ঘুম ডিপ্রেশন কমায়। ডিপ্রেশনের রোগীদের নিদ্রাহীনতা দেখা দেয়্। তাই, প্রথমেই ঘুম সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রতিদিনের জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে নিদ্রাহীনতা দূর করা সম্ভব। প্রতিদিন ঠিক সময়ে ঘুমোতে যাওয়া এবং সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শোবার ঘর থেকে টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল এগুলো সরিয়ে রাখতে হবে। এভাবেই অনিদ্রা রোগ ধীরে ধীরে দূর করা সম্ভব।

গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতা দেখা গেলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসক কিংবা কন্সাল্ট্যান্টের সাথে যোগাযোগ করুন। মনে রাখবেন, এই সমস্যা একেবারেই অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয় যা শুধু আপনার সাথেই ঘটছে এবং এটি সম্পূর্ণভাবে নিরাময়যোগ্য। পৃথিবীর সকল মা অসাধারণ -হয়তো একেক জন একেক রকমের।  তাই গর্ভাবস্থার প্রথম থেকেই বিষণ্ণতার লক্ষন সনাক্ত করে তার প্রতিকারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

সবার জন্য শুভকামনা

Related posts

2 Thoughts to “গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতা । অবহেলা নয়, প্রতিকার জরুরী”

  1. […] পড়ে সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতকটির উপর। বিষণ্ণতা বা মানসিক অস্থিরতায় ভোগা মায়ের সন্তান পরবর্তীতে নানা ধরণের […]

  2. […] পড়ে সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতকটির উপর। বিষণ্ণতা বা মানসিক অস্থিরতায় ভোগা মায়ের সন্তান পরবর্তীতে নানা ধরণের […]

Leave a Comment