গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড । কেন জরুরী?

ফলিক এসিড কি?

ফলিক এসিড হোল ভিটামিন- বি৯ এর কৃত্রিম রূপ যা ফলেট (Folate) নামেও পরিচিত। শরীরের প্রত্যেকটি কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং গঠনের জন্য এ ভিটামিন প্রয়োজন। এটি আমাদের শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করে যা শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গে অক্সিজেন পরিবহনে সাহায্য করে।

আমাদের শরীরে স্বাভাবিক রক্ত কণিকা তৈরি এবং একধরনের রক্তশল্পতা রোধে (anemia) নিয়মিত ফলিক এসিড গ্রহন করা উচিত। ফলিক এসিড দেহের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। এটি ডিএনএ এর  গঠন,কোষ বিভাজন এবং ডিএনএ মেরামত করতে সাহায্য করে। এটি  কোষ বিভাজন এবং কোষের বৃদ্ধিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড অত্যন্ত জরুরি। লোহিত রক্তকণিকা তৈরির কাজে এবং রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করতে এই ভিটামিন শিশু ও পূর্ণ বয়স্ক উভয়েরই প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড কেন দরকার?

আপনি যদি গর্ভধারণ করেন বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা করেন সেক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিমানে ফলিক এসিড গ্রহন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড নিউরাল টিউব ডিফেক্ট (NTD) যেমন- স্পাইনাল কর্ড (Spina Bifida) ও ব্রেইনের (anencephaly) জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সাহায্য করে। নিউরাল টিউব হলো ভ্রুনের একটি অংশ যা থেকে মেরুদণ্ড ও মস্তিষ্কের গঠন হয়।

গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড

নিউরাল টিউব ডিফেক্ট সাধারণত ভ্রুনের বিকাশের একেবারে প্রথম দিকে শুরু হয় যখন অধিকাংশ মহিলায় বুঝতে পারেনা যে তারা গর্ভবতী। তাই গরভধারনের পরিকল্পনা করার সাথে সাথেই পর্যাপ্ত পরিমানে ফলিক এসিড গ্রহন শুরু করা উচিত।

Centers for Disease Control and Prevention (CDC) এর মতে যে সব মহিলা গর্ভধারণে অন্তত একমাস আগে থেকে বা গর্ভধারণের প্রথম ট্রাইমেস্টারে নিয়মিত ফলিক এসিড গ্রহন করে তাদের গর্ভের শিশুর নিউরাল টিউব ডিফেক্ট এর ঝুঁকি প্রায় ৭০ ভাগ কমে যায়।

আরও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ফলিক এসিড গর্ভের শিশুর আরও কিছু জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধ করে, যেমন- ঠোঁট কাটা (cleft lip), তালু কাটা (cleft palate) এবং আরও কিছু হৃদপিণ্ড সংক্রান্ত জটিলতা। এছাড়াও এটি গর্ভাবস্থায় মায়েদের প্রি-এক্লাম্পশিয়ার ঝুঁকি কমায়।

এছারাও গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা এবং বেড়ে ওঠা শিশুর কোষের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত ফলিক এসিড গ্রহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

কতটুকু ফলিক এসিড দরকার?

নিউরাল টিউব ডিফক্ট এর ঝুঁকি কমাতে বিশেষজ্ঞরা সাধারনত গর্ভধারণের অন্তত একমাস আগে থেকে দৈনিক ৪০০ মাইক্রোগ্রাম (mcg) ফলিক এসিড গ্রহনের পরামর্শ দেন। অনেক সময় অপরিকল্পিত গর্ভধারণের ঘটনা ও ঘটতে পারে। তাই বিয়ের পর থেকেই বা গর্ভধারণের উপযুক্ত বয়স হলেই নিয়মিত এ পরিমানে ফলিক এসিড গ্রহন শুরু করা উচিত। কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ গর্ভবতী হলে ফলিক এসিড গ্রহনের পরিমান দৈনিক ৬০০ মাইক্রোগ্রাম করার কথা বলে থাকেন।

আপনি যদি নিয়মিত মাল্টিভিটামিন গ্রহন করেন তাহলে লেবেল চেক করে দেখুন তাতে পর্যাপ্ত পরিমানে ফলিক এসিড আছে কিনা। যদি তাতে প্রয়োজনীয় ফলিক এসিড না থাকে তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে তা পরিবর্তন করতে পারেন বা আলাদা ফলিক এসিড সাপ্লিমেন্ট গ্রহন করতে পারেন। তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া কখনোই দৈনিক ১০০০ মাইক্রোগ্রামের বেশী ফলিক এসিড গ্রহন করা উচিত নয়।

 

কোন কোন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফলিক এসিড গ্রহনের প্রয়োজন পড়তে পারে?

যেসব গর্ভবতী নারী বা সম্ভাব্যগর্ভধারীণী ওবেসিটি বা শারীরিক স্থুলতায় আক্রান্ত, তাদের ক্ষেত্রে এনটিডি আক্রান্ত বাচ্চা জন্ম দেয়ার সম্ভাবনা বেশি। আপনার যদি অতিরিক্ত ওজন থাকে তাহলে গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করা উচিত। তিনি হয়তো আপনাকে দৈনিক ৪০০ মাইক্রোগ্রামের বেশী ফলিক এসিড গ্রহনের পরামর্শ দিবেন।

আপনার আগের গর্ভধারণ যদি এনটিডি আক্রান্ত হয়ে থাকে তবে কোন ব্যবস্থা না নেয়া হলে আপনার বর্তমান গর্ভস্থ বাচ্চাটিও একই সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে।এ ধরনের ক্ষেত্রে আপনাকে দৈনিক ৪০০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড গ্রহনের পরামর্শ ও দেয়া হতে পারে। তাই এ ধরনের ইতিহাস থাকলে গর্ভধারণের আগে অবশ্যয় বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করুন এবং সব খুলে বলুন।

এছাড়াও যদি গর্ভে যমজ সন্তান থাকে তাহলেও অতিরিক্ত ফলিক এসিড গ্রহনের প্রয়োজন পড়তে পারে।

কিছু কিছু মায়েদের জেনেটিক সমস্যার কারণে শরীরে সঠিক ভাবে ফলিক এসিড শোষণ হয়না। এসব ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে অতিরিক্ত ফলিক এসিড গ্রহনের প্রয়োজন পড়তে পারে। যাদের ডায়াবেটিস আছে ও খিঁচুনি প্রতিরোধী ওষুধ খাচ্চেন তাদের গর্ভের শিশু NTD তে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ সব ক্ষেত্রেও নিয়মিত চেকআপ এবং ফলিক এসিড গ্রহনের পরিমান জানতে বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করা উচিত।

 

কিভাবে ফলিক এসিডের চাহিদা পূরণ করা যায়?

অনেক প্রাকৃতিক উৎস থেকেই ফলিক এসিড পাওয়া যায়। ইদানিং অনেক খাবারেই কৃত্রিম ভাবে ফলিক এসিড যোগ করা হচ্ছে, যেমন- ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল, পাউরুটি, পাস্তা ইত্যাদি। এগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফলিক এসিডের চাহিদা কিছুটা হলেও পূরণ করে। কিন্তু গর্ভবতী বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন এমন মায়েদের জন্য এগুলোকে ফলিক এসিডের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

এসব খাবার লেবেল অনুযায়ী আপনি হয়তোবা সঠিক পরিমান গ্রহন করছেন কিন্তু নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না যে এতে আপনার শরীরে প্রয়োজনীয় ফলিক এসিড যাচ্ছে। এছাড়াও এ খাবারগুলো কেউ নিয়মিত খায়না।

প্রাকৃতিকভাবে যেসব খাবারে ফলিক এসিড পাওয়া যায় সেগুলোও বেশীরভাগ সময় পরিপূর্ণভাবে ফলিক এসিডের চাহিদা পূর্ণ করতে পারেনা। আশ্চর্যজনক হলেও গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের শরীর বেশীরভাগ প্রাকৃতিক উৎসের চাইতে সাপ্লিমেন্টে পাওয়া ফলিক এসিড আরও ভালোভাবে শোষণ করতে পারে। তাছাড়াও আমরা যখন এসব খাবার সংরক্ষণ করি বা রান্না করি তখন তাতে ফলিক এসিডের গুনাগুন নষ্ট হয়ে যায়।

তাই আপনি যদিও ফলিক এসিড সমৃদ্ধ খাবার গ্রহন করেন তবুও হয়তো গর্ভাবস্থায় আপনাকে সাপ্লিমেন্ট নেয়ার পরামর্শ দেয়া হতে পারে।

ফলিক এসিডের প্রাকৃতিক উৎসগুলো হোল-

ডালঃ

ডাল ও ডালের তৈরি বিভিন্ন খাবারে, যেমন- মসুর, মুগ, মাষকালাই, বুটের ডাল ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে ফলিক এসিড থাকে। এছাড়াও ডাল গর্ভকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টিমান যেমন আয়রন, ফাইবার ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ থাকে।

সবুজ শাক-সবজিঃ

সবুজ শাক সবজিতে, যেমন- পুঁইশাক, পাটশাক, মুলাশাক, সরিষা শাক, মটরশুঁটি, শিম, বরবটি, বাঁধাকপি, গাজর  ইত্যাদিতে প্রচুর খাদ্য উপাদান রয়েছে যা একজন মায়ের শরীরে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যেমন এক থেকে দুই কাপ সবজিতে উপাদান ভেদে ৫০ থেকে ৯০ মাইক্রোগ্রামের মতো ফলিক এসিড পাওয়া যায়।

কমলা বা টক জাতীয় ফলঃ

একটি বড় কমলা ৫৫ মাইক্রোগ্রামের মতো ফলিক এসিড বহন করে। আবার কমলার রসেও প্রচুর পরিমাণে উপাদানটি পাওয়া যায়। গর্ভবতী মায়ের জন্য এই কমলা ও কমলা থেকে তৈরি বিভিন্ন খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রোকলিঃ

বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিমানে সমৃদ্ধ ব্রোকলির প্রত্যেক আধা কাপে ১০৪ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড থাকে যা প্রত্যেক দিনের ফলিক এসিড চাহিদার চার ভাগের এক ভাগ। এছাড়াও এটি বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, আয়রন, ফাইবারের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

শস্যদানাঃ

বিভিন্ন রকমের শস্যদানা ও শস্যদানা দিয়ে প্রস্তুত খাবারে ফলিক এসিড প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। বিভিন্ন রকম শস্য দিয়ে তৈরী রুটি, পিঠা এক্ষেত্রে ভালো কাজ করে।

ফলিক এসিডের কোন সাইড এফেক্ট আছে?

ফলিক এসিডের কোন সাইড এফেক্ট পাওয়া যায়নি। খুবই কম ক্ষেত্রে এটি পেট খারাপের কারণ হতে পারে। ফলিক এসিড বা ফলেট ভিটামিন বি-৯ পরিবারের সদস্য। যেহেতু ফলিক এসিড পানিতে দ্রবণীয় তাই এটি শরীরে সঞ্চিত থাকে না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ করা ফলিক এসিড প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে যায়। তবে নিয়মিত অতিরিক্ত ফলিক এসিড গ্রহন করা কোনভাবেই উচিত নয়।

অন্য ওষুধের সাথে ফলিক এসিড নেয়া যায়?

ফলিক এসিড নেয়ার আগে ও পরে অন্তত দুঘণ্টা এন্টাসিড জাতীয়া ওষুধ না খাওয়ায় ভালো কারণ এতে শরীরের ফলিক এসিড শোষণ বাধাগ্রস্থ হতে পারে। অন্য কোন মাল্টিভিটামিন খেলে বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করে নিন। কারণ আপনার মাল্টিভিটামিনেই প্রয়োজনীয় ফলিক এসিড থাকতে পারে।

আপনি যদি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ খেয়ে থাকেন তবে ফলিক এসিড শুরু করার আগে বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করে নিশ্চিত হয়ে নিন সেসব ওষুধ ফলিক এসিড সাপ্লিমেন্টের সাথে নিরাপদ কিনা।

ফলিক এসিডের অভাব কিভাবে বোঝা যায়?

এর উপসর্গগুলো বেশ সুক্ষ্ম। সম্ভবত এসময় আপনার ডায়রিয়া, ক্ষুধামন্দা, ওজন কমে যাওয়া, দূর্বলতা, জিহ্বায় ব্যাথা, বুক ধরফড় করা ও বিরক্তিবোধ হতে পারে। কিন্তু ফলিক এসিডের অভাব সামান্য হলে এর কোন লক্ষণই আপনি টের পাবেন না। তবে লক্ষন থাকুক আর নাই থাকুক গর্ভাবস্থায় বা গর্ভধারণের আগে অনাগত সন্তানের কথা চিন্তা করে নিয়মিত ফলিক এসিড গ্রহন করতে হবে।

সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts

Leave a Comment