গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ আসে কেন?

গর্ভধারণ একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার। স্বাভাবিক হলেও এ সময় শরীরে কিছু পরিবর্তন ঘটে। সে জন্য গর্ভকালীন কিছু সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। এগুলো তেমন উদ্বেগের বিষয় নয়, সহজে এসবের সমাধান সম্ভব। তবে অনেক সময় কিংবা অনেকের ক্ষেত্রে এসব সাধারণ সমস্যাও বেশ কষ্ট দেয়।

গর্ভাবস্থায় যেসব সাধারন সমস্যা দেখা দেয় তার মধ্যে অন্যতম হলো ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ। গর্ভাবস্থার একেবারে শুরু থেকেই এর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় জরায়ু বড় হয় এবং প্রস্রাবের থলিতে বাড়তি চাপ প্রয়োগ করে। এ কারণে প্রস্রাবের থলি পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রস্রাবের চাপ অনুভূত হয়। সে কারণে ঘন ঘন প্রস্রাব হয়। এ জন্য দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। ঘন ঘন প্রস্রাব হয় বলে পানি কম পান করা উচিত নয়। বরং পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। তবে চিকিত্সকের পরামর্শমতো প্রস্রাব পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে কোনো ইনফেকশন আছে কি না কিংবা ডায়াবেটিস আছে কি না তা দেখে নেওয়ার জন্য। থাকলে সে মোতাবেক চিকিত্সা নিতে হবে।

গর্ভাবস্থায় কেন ঘন ঘন প্রস্রাব হয় ?

গর্ভাবস্থার একটা স্বাভাবিক ঘটনা হচ্ছে বার বার টয়লেটে যাওয়া। প্রথম ও শেষ তিন মাসে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আসা খুব সাধারণ ঘটনা। সত্যি কথা বলতে, এটা গর্ভাবস্থার প্রথমদিকের লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং ঐ সময়ে শরীরে হরমোনের যাবতীয় পরিবর্তনের একটি অংশ।গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন প্রস্রাবের কারণ হলো- হরমোন, শরীরে রক্তের পরিমান এবং প্রবাহের গতি বৃদ্ধি এবং জরায়ুর বর্ধিত আকার।

গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তন মায়েদের শরীরে কিডনির দিকে রক্তপ্রবাহের গতি বাড়িয়ে দেয় যার ফলে মায়ের ব্লাডার দ্রুত ভর্তি হয়ে যায়। এতে এসময় ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ চাপতে পারে।

পুরো গর্ভাবস্থা জুড়ে মায়েদের শরীরে রক্তের পরিমান পূর্বের তুলনায় প্রায় ৫০ ভাগ বৃদ্ধি পায়। এর মানে হলো মায়ের কিডনিকে আরও অনেক বেশী তরল পরিশোধন করতে হয় যা মায়ের ব্লাডারে গিয়ে জমা হয় এবং ফলশ্রুতিতে ঘন ঘন প্রস্রাব হয়।

গর্ভাবস্থা যত এগুতে থাকে, আপনার শিশুর যত বিকাশ হতে থাকে ততই আপনার শরীরে মূত্রের উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে থাকে অথচ এ সময় মূত্রথলি আকারে সংকুচিত হতে থাকে কারণ বড় হয়ে ওঠা জরায়ু মুত্রথলিতে চাপ দিতে থাকে। আপনার মূত্রথলি খালি থাকলেও চাপের কারণে আপনার মনে হবে মূত্রথলি ভর্তি হয়ে আছে। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে যখন বাচ্চার মাথা নিচের দিকে চেপে আসবে, তখন এই অনুভূতি আরো বেশি হবে।

এছাড়া প্রস্রাবের সময় বার বার থামার কারণেও অনেক সময় মুত্রথলি পুরোপুরি খালি করা সম্ভব হয় না।

ঘন ঘন প্রস্রাবের সমস্যা গর্ভাবস্থায় কখন শুরু হয়?

ঘন ঘন প্রস্রাবের সমস্যাকে গর্ভধারণের অন্যতম লক্ষন হিসেবে বিবেচনা করা হয় যা প্রথম ট্রামেস্টারে ৬ সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বলা হয় দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে এর প্রবণতা কমে আসতে পারে যখন মায়ের জরায়ু পেলভিস থেকে উপরে উঠে যায়। কিন্তু গবেষণায় এটা প্রমানিত হয়নি। অনেক গবেষণাতেই দেখা গেছে এ সমস্যা গর্ভধারণের সময়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকে। যেসব মহিলারা আগে একবার গর্ভধারণ করেছেন তাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও বেশী হতে পারে। অর্থাৎ গর্ভধারণের পুরোটা সময় জুড়েই মায়েদের ঘন ঘন প্রস্রাবের সমস্যা থাকতে পারে।

ঘন ঘন প্রস্রাবের সমস্যা নিরাময় করার কোনো উপায় আছে কি?

সত্যিকার অর্থে এ সমস্যা নিরাময়ের কোন উপায় নেই! আমরাও ভাবি, থাকলে ভালোই হতো। কিন্তু তাই বলে আপনি পানি খাওয়া কমিয়ে দেবেন না যেন। দিনে আপনাকে ৮ থেকে ১০ গ্লাস পরিমান তরল শরীরে নিতেই হবে, আর এর বেশিরভাগটাই হতে হবে পানি। তরলের মাত্রা কমিয়ে দিলে আপনার পানিশূন্যতা হতে পারে। আপনার বাচ্চা যাতে ঠিকমতো পুষ্টি পায় সেজন্য আপনাকে প্রচুর পানি খেতেই হবে।

রাতে বার বার টয়লেটে যাওয়া কমাতে আপনি হয়তো শোবার দুই-এক ঘণ্টা আগে থেকে অল্প করে পানি খেতে পারেন। চা, কফি খাওয়া বন্ধ রাখতে পারেন কারণ এগুলো প্রস্রাবের উৎপাদন বাড়ায়। প্রস্রাব করার সময় ব্লাডার বা মুত্রথলী পুরোপুরি খালি করার চেষ্টা করুন। প্রস্রাব করার সময় সামনের দিকে ঝুকে থাকুন এতে ব্লাডার পুরোপুরি খালি হতে সাহায্য করবে। কখন প্রস্রাব চেপে রাখবেন না। প্রস্রাব চেপে রাখলে পেলভিক ফ্লোর পেশী আরও বেশী দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তবে আপনি যাই করুন না কেন, রাতে আপনার প্রস্রাবের পরিমান বেড়ে যেতে পারে কারণ আমাদের পায়ে যে পানি থাকে, যখন আমরা শুয়ে থাকি তা সহজেই রক্তে মিশে যায় এবং ব্লাডারে ফেরত আসে।

যদি কোন কিছুতেই কাজ না হয় তাহলে বাচ্চার জন্ম হওয়া পর্যন্ত কয়েক মাস এভাবেই চলতে হবে। বাচ্চার জন্মের পর যে আপনার নির্ঘুম রাত কাটাতে হবে তার জন্য প্রকৃতি আপনাকে আগে থেকেই প্রস্তুত করে নিচ্ছে, এরকম দার্শনিক চিন্তা করে মনকে মানিয়ে নিতে পারেন।

গর্ভাবস্থায় ঘুমের সমস্যা ও তার প্রতিকার সম্পর্কে জেনে নিন।

গর্ভাবস্থায় কখনো কখনো প্রস্রাব লিক করে কেন?

গর্ভাবস্থায় ব্লাডার বা মুত্রথলীর উপর জরায়ুর চাপ এবং দুর্বল পেলভিক ফ্লোর পেশীর কারণে হাঁচি, কাশি, হাঁসার সময়, ভারী কিছু আলগানোর সময় বা কিছু কিছু ব্যায়াম যেমন জগিং এর সময় প্রস্রাব লিক করতে পারে। এটাকে স্ট্রেস ইউরিনারি ইনকোনটিনেন্স বলে। এটা সাধারন তৃতীয় ট্রাইমস্টারে বা প্রসবের পর বেশী হয়। স্ট্রেস ইউরিনারি ইনকোনটিনেন্সের কারণে যোনিপথের আশপাশের এলাকা বেশীর ভাগ সময় প্রস্রাব দিয়ে ভেজা থাকার জন্য ছত্রাক সংক্রমণ ও ঘা হওয়ার সম্ভবনা অনেক বেড়ে যায়। এমনকি  এর ফলে প্রস্রাবে জীবাণু সংক্রমণ হয়ে থাকে ।  তাই সাবধান থাকতে হবে।

এটা নিরাময়ের জন্য যখনই প্রস্রাবের চাপ আসবে তখনই ব্লাডার পুরোপুরি খালি করার চেষ্টা করুন। আর ব্যায়ামের আগেও ব্লাডার খালি করার চেষ্টা করুন।

কেগেল ব্যায়ামের মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব কারণ এর ফলে পেলভিক ফ্লোর পেশী শক্ত হয়। কেগেল ব্যায়ামের গর্ভধারণে প্রথম থেকে শুরু করা উচিত এবং প্রসবের পরও করা ভালো। অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্যাড ব্যাবহার করতে পারেন।

ঘন ঘন প্রস্রাব কখন সমস্যার কারণ?

গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন প্রস্রাবের সাথে যদি নিচের উপসর্গগুলো থাকে তবে অবশ্যয় তা ডাক্তারকে জানাতে হবে-

  • প্রস্রাবের সময় যদি ব্যাথা ও জ্বালা-পোড়া হয়।
  • প্রস্রাবের সাথে রক্ত দেখা গেলে।
  • প্রস্রাবের প্রচন্ড বেগ থাকা সত্ত্বেও যদি মাত্র কয়েক ফোঁটা প্রস্রাব হয়

আপনার হয়তো মুত্রনালীর প্রদাহ (Urinary Tract Infection) থাকতে পারে। আপনার প্রস্রাবকে তরল করার জন্য বেশি বেশি পানি খান এবং যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তার দেখান। মুত্রনালীর প্রদাহ ভালো করার জন্য আপনাকে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে সেখান থেকে আপনার কিডনি ইনফেকশনও হতে পারে। তখন অপরিণত সময়ে বাচ্চা প্রসব করানোর একটা ঝুঁকি এসে যাবে।

গর্ভাবস্থায় ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন।

ঘন ঘন প্রস্রাব কবে বন্ধ হবে? 

বাচ্চা প্রসবের পর দ্রুতই ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ আসা বন্ধের ব্যপারে আপনি আশাবাদি হতে পারেন। তবে বাচ্চা প্রসবের পর আসলে প্রথম কয়েকদিন আপনার গর্ভাবস্থার তুলনায় আরো বেশি পরিমানে এবং বেশি বার প্রস্রাব হবে। কারণ তখন আপনার শরীর গর্ভাবস্থায় রক্তে জমা জমিয়ে রাখা অতিরিক্ত তরল বের করে দেয়। তবে, এর কিছুদিন পরেই আপনার প্রস্রাবের চাপ গর্ভাবস্থার আগে যেমন ছিলো সেই অবস্থায় ফিরে যাবে।

কিছু কিছু মায়েদের বিশেষ করে যাদের বয়স বেশী তাদের ক্ষেত্রে প্রস্রাব লিক করার সমস্যা বেশকিছুদিন থাকতে পারে। তবে তা যদি বেশীদিন স্থায়ী হয় তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment