গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙ্গা কিভাবে বুঝবেন ?

গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙ্গা বলতে কি বোঝায়?

গর্ভের শিশু মায়ের পেটে একটা তরলভর্তি থলির মধ্যে থাকে যার নাম এমনিওটিক স্যাক(Amniotic Sac)। এই থলিটা ফেটে গেলে আপনার শরীর থেকে সেই পানির মত তরলটা সারভিক্স এর মাদ্ধমে যোনি পথে বের হয়ে যেতে থাকে। এটাকেই আমরা গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙ্গা নামে জানি। এই তরলটা একবারে অনেকটা বের হতে পারে আবার অল্প অল্প করে চুইয়ে বের হতে পারে। যেটাই হোক তখন সাথে সাথে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

তরল ভর্তি থলিটি দুই স্তর মেমব্রেন দিয়ে গঠিত হয়। তাই ডাক্তারি ভাষায় এই পানি ভাঙ্গাকে অনেক সময় “রাপচার্ড মেমব্রেন”(ruptured membranes)  নামেও অভিহিত করা হয়।

পানি কখন ভাঙ্গতে পারে?

অধিকাংশ মায়েদের পানি ভাঙ্গার আগেই প্রসব বেদনা শুরু হয়ে যায়। এটি প্রসবের প্রথম বা দ্বিতীয় স্তরের যে কোন সময় হতে পারে। পানি ভাঙ্গার সবচাইতে ভাল সময় হচ্ছে প্রসবের প্রথম স্তরের শেষের দিকে। কারন এই পানি মাকে এবং গর্ভের শিশুকে ইনফেকশন মুক্ত রাখে। এছারাও পানির কারনে মায়ের প্রসব ব্যাথা জরায়ুর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাথা অপেক্ষাকৃত কম অনুভুত হয়। এ সময়ে, অর্থাৎ ফুল টার্মে এবং প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার পরে পানি ভাঙ্গাকে স্পন্টেনিয়াস রাপচার অব মেমব্রেন বা SROM (Spontaneous Rupture Of Membranes) বলা হয়।

কিছু ক্ষেত্রে প্রসব ব্যথার আগেই পানি ভেঙ্গে যেতে পারে। তবে পানি আগে ভেঙ্গে গেলেও তার একটু পরেই মায়ের ব্যথা উঠে যায়। প্রতি ১০ জন মায়ের ১ জনের এমন হতে পারে। এভাবে যদি ফুল টার্মে থাকা অবস্থায় প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার আগেই পানি ভাঙ্গে তবে তাকে ডাক্তারি ভাষায় প্রি-লেবার রাপচার অব মেমব্রেন বা PROM (Prelabour Rupture of Membranes) বলা হয়।

প্রতি ১০০ জনে মায়ের মদ্ধে ২ জনের ৩৭ সপ্তাহের আগেই পানি ভাঙ্গতে পারে। এমনটা হলে তাকে ডাক্তারি ভাষায় প্রি-টার্ম প্রি-লেবার রাপচার অফ মেমব্রেন বা PPROM (Preterm Prelabour Rupture of Membranes) বলে।

তবে পানি ভাঙ্গার পর কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যথা না উঠলে, তাহলে ব্যথা ডাক্তার কৃত্রিম উপায়ে লেবার পেইন তুলে দিবেন(Induced Labor)। এটার কারণ থলিটার সুরক্ষা ছাড়া শিশু খুব অল্প সময়ের মধ্যে জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। পানি ভাঙ্গার পর আপনার প্রসব জন্ত্রনা আর তীব্রভাবে অনুভুত হবে।

আরও পড়ুনঃ প্রসব শুরু লক্ষনসমূহ

গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙ্গা কিভাবে বুঝবেন?

সত্যি কথা হোল, সবার ক্ষেত্রে পানি ভাঙ্গার অনুভুতি একই হবেনা। প্রত্যেকটি মা ই ভিন্ন। তাই এটি বোঝা কষ্টসাধ্য। এই তরলটা একবারে অনেকটা বের হতে পারে আবার অল্প অল্প করে চুইয়ে বের হতে পারে। প্রসবের যে কোন সময় পানি ভাঙ্গতে পারে আবার তার আগেও ভাঙ্গতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পানি নাও ভাঙ্গতে পারে এবং শিশু এমনিওটিক স্যাক সহ জন্মগ্রহণ করতে পারে।

গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙ্গা বলতে শুরুতেই মাথায় আসে হঠাৎ করে আন্ডার গার্মেন্টস ভিজে যাওয়া বা একসাথে অনেক তরল বেরিয়ে আসা। আসলে মাত্র ১০-১৫ ভাগ মায়েদের ক্ষেত্রে প্রসব বেদনা শুরুর ঠিক আগে পানি ভাঙ্গে এবং এদের মদ্ধে অল্প কিছু মায়ের এক সাথে অনেক তরল বেরিয়ে আসে।

বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে পানি ভাঙ্গার আগে মায়েদের নিয়মিত কন্ট্রাকশন হতে থাকে আবার কারো কারো প্রসব যন্ত্রণা শুরু হওয়ার পরে পানি ভাঙ্গে যা তারা বুঝতেই পারেনা।

যখন পানি ভাঙ্গে তখন যোনিপথে গরিয়ে তরল বের হতে পারে আবার প্রবলভাবে নির্গত হতে পারে। এটা নির্ভর করে তরলভর্তি থলিটি কোনদিকে ছিঁড়েছে তার উপর। বাচ্চা যখন জরায়ুর নিচের দিকে নেমে আসে তখন বাচার মাথার সামনের দিকে কিছু তরল থাকে এবং মাথার পেছনের দিকে বাকি তরলগুলো থাকে। সামনের তরলগুলোকে বলে ফোর ওয়াটার এবং পেছনের গুলোকে হাইন্ড ওয়াটার। পানি যদি পেছনের দিকে ভাঙ্গে তবে তা গড়িয়ে পরে এবং তা প্রস্রাব নাকি এমনিওটিক ফ্লুইড তা বোঝা কষ্টসাধ্য হয়।

এমনিওটিক ফ্লুইডের ৯৯ ভাগই পানি। তাই এটি দেখতে পরিষ্কার এবং গন্ধবিহীন হয়। মাঝে মাঝে তাতে হলুদ বা গোলাপি আভা থাকতে পারে। আর ভালোভাবে বোঝার জন্য পানি ভেঙ্গেছে মনে হলে আপনি ম্যাটারনিটি প্যাড ব্যাবহার করতে পারেন। ম্যাটারনিটি প্যাডটি ভিজে যাওয়ার পর কিছুক্ষন অপেক্ষা করুন। যদি দেখেন তরলগুলো হলুদ হয়ে গেছে তবে তা প্রস্রাব হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। আর এক্ষেত্রে প্যাড থেকে অ্যামোনিয়ার গন্ধ আসবে। এমনিওটিক ফ্লুইড হলে তা পানির মত পরিষ্কার থাকবে। তবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়াটাই ভালো।

যদি ডিউ ডেটের কাছাকাছি থাকেন বা ডিউ ডেট অতিক্রম করে যায় তবে নির্গত তরলের সাথে বাচ্চার প্রথম পায়খানা বা মিকোনিয়াম (meconium) মিশ্রিত থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে তরলের সাথে সবুজ বা বাদামী বর্ণের আভা থাকতে পারে। এ ধরনের দেখা গেলে দ্রুত ডাক্তারকে জানান কারন এমন হলে গর্ভের বাচ্চার মিকোনিয়াম মিস্রিত তরল গ্রহনের সম্ভাবনা থাকে।

প্রসব বেদনা শুরু হওয়ার আগেই পানি ভেঙ্গে গেলে কি হবে?

যদি সবকিছু ঠিক থাকে এবং আপনি গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহে থাকেন সে ক্ষেত্রে আপনার হাতে দুটো অপশন থাকে-

  • কৃত্রিম উপায়ে প্রসব যন্ত্রণা শুরু করা (Induced Labor)।
  • অপেক্ষা করে দেখা যদি প্রসব যন্ত্রণা নিজ থেকে শুরু হয়।

সাধারনত গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙ্গার ২৪-৪৮ ঘণ্টার মদ্ধে কন্ট্রাকশন শুরু হয়। ৬০ ভাগ মায়েদেরই ২৪ ঘণ্টার মদ্ধে কন্ট্রাকশন শুরু হয়। বাকিদের বেশীর ভাগেরই ৪৮ ঘণ্টার মদ্ধে শুরু হয়ে যায়। তাই কৃত্রিম উপায়ে প্রসব যন্ত্রণা শুরু করার আগে  ডাক্তার অন্তত ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

সবকিছু ঠিক থাকলে এ সময় ২৪ ঘণ্টার জন্য বাসায় যাওয়ার অনুমতি দেয়া হতে পারে। তবে এ সময় শারীরিক মিলন থেকে বিরত থাকতে বলা হবে কারন পানি ভেঙ্গে যাওয়ার পর বাচ্চার ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

পানি ভেঙ্গে যাওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পরেও প্রসব বেদনা শুরু না হলে কি হতে পারে?

পানি ভেঙ্গে যাওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পরেও যদি প্রসব বেদনা শুরু না হয় এবং আপনি যদি কৃত্রিম উপায়ে এর আগে প্রসব বেদনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে না থাকেন তবে কিছু ঝুঁকি থাকতে পারে। আপনি নিজেই হয়ত ইনফেকশনের শিকার হতে পারেন যা বাচ্চার মদ্ধে সংক্রমিত হতে পারে। তবে তা হবেই এমনটা  নয়। এ ক্ষেত্রে বাচ্চা জন্মের পর সাবধানতা হিসেবে বাচ্চাকে নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হতে পারে।

যদি আপনার বা আপনার বাচ্চার কোন ইনফেকশন দেখা যায় তবে ডাক্তার অতিসত্বর কৃত্রিম উপায়ে প্রসব বেদনা তোলার পরামর্শ দিবেন। কৃত্রিম উপায়ে প্রসব বেদনা তোলা মানে এই নয় যে আপনাকে সিজারিয়ান করতে হবে। তবে পরীক্ষায় দেখা গেছে যাদের নিজ থেকেই প্রসব বেদনা শুরু হয় তাদের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান করার হার কম।

৩৭ সপ্তাহের আগেই পানি ভেঙ্গে গেলে কি হতে পারে?

পানি ভাঙ্গার ঘটনা যদি গর্ভাবস্থায় ৩৭ সপ্তাহের আগে ঘটে তখন তাকে প্রি-টার্ম প্রি-লেবার রাপচার অফ মেমব্রেন বা PPROM (Preterm Prelabour Rupture of Membranes) বলে। । অপরিণত সময়ে পানি ভাঙ্গার কারনে নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসব হতে পারে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।  এছারাও অন্যান্য ঝুঁকির মদ্ধে আছে- মা বা বাচ্চার ইনফেকশন, প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন এবং আম্বলিকাল কর্ডের সমস্যা ইত্যাদি।

যদি আপনি অন্তত ৩৪ সপ্তাহের গর্ভবতী হন তবে এ সময় পানি ভেঙ্গে গেলে ইনফেকশন এড়ানোর জন্য ডেলিভারির পরামর্শ দেয়া হয়। যদি গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ৩৪ সপ্তাহের মদ্ধে থাকেন তবে ডাক্তার চেষ্টা করবেন ডেলিভারির জন্য অপেক্ষা করার যাতে এ সময়ের মদ্ধে গর্ভের শিশু আরেকটু পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইনফেকশন প্রতিরোধের জন্য আপনাকে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হতে পারে এবং শিশুর লাঙ্গসের বৃদ্ধির জন্য ইঞ্জেকশন (corticosteroids) দেয়া হতে পারে।

পরিশেষে এটুকু মনে রাখা জরুরী যে, গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙ্গা বিষয়ে বা গর্ভধারণের যে কোন বিষয়ে কোন ধরনের সন্দেহ হলে বা মনে প্রশ্ন আসলে তা বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ করে নেয়ে জরুরী।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment