গর্ভাবস্থায় টিকা । কোনগুলো নিরাপদ, কোনগুলো নয়

গর্ভাবস্থায় টিকা কেন জরুরী?

টিকা ক্ষতিকর সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। গর্ভাবস্থায় টিকা নিলে আপনি এবং আপনার সন্তান উভয়েই ক্ষতিকর সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাবেন।গর্ভাবস্থায় টিকা নিলে আপনার সন্তানটি জন্মের কয়েকমাস পরেও তার টিকা শুরু করার আগ পর্যন্ত নিরাপদ থাকে। আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আপনার গর্ভের সন্তানকে গুরুতর অসুখ থেকে রক্ষা করবে।

কিন্তু গর্ভাবস্থায় সব ধরনের টিকাই নিরাপদ নয়। টিকা সাধারণত তিন ধরণের হয় যেমন- জীবন্ত ভাইরাস, মৃত ভাইরাস এবং টক্সয়েড(ব্যাকটেরিয়া থেকে টানা রাসায়নিক ভাবে পরিবর্তিত প্রোটিন, যা অক্ষতিকর)। গর্ভবতী মহিলাদের জীবন্ত ভাইরাসের টিকা  যেমন- হাম, মামস ও রুবেলার (MMR) টিকা ইত্যাদি গ্রহণ করা উচিৎ নয়। কারণ এগুলো গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করতে পারে। গর্ভাবস্থায় সাধারণত মৃত ভাইরাসের টিকা যেমন–ফ্লু এর টিকা,টক্সয়েড টিকা যেমন টিটেনাস, ডিপথেরিয়া ও পারটুসিস (Tdap) টিকা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

গর্ভাবস্থায় যেসব টিকা নেয়া নিরাপদ

ফ্লু এর টিকা

মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (CCD) ফ্লু এর ঋতুতে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মার্চের সময়টাতে যে সকল নারীরা গর্ভবতী হবেন তাদেরকে ফ্লু শট নেয়ার পরামর্শ দেয়। ফ্লু এর টিকা মৃত ভাইরাস দিয়ে তৈরি বলে মা ও গর্ভজাত  সন্তান উভয়ের জন্যই নিরাপদ। কিন্তু ফ্লুমিস্ট একধরণের ন্যাজাল স্প্রে ভ্যাক্সিন যা জীবন্ত ভাইরাস দিয়ে তৈরি হয় বলে এটি অবশ্যই এড়িয়ে যেতে হবে প্রেগন্যান্ট নারীদের।

গর্ভাবস্থার মধ্যবর্তী সময়ে ফ্লুতে আক্রান্ত হলে তীব্র উপসর্গ বা নিউমোনিয়ার মত জটিল অবস্থার ও সৃষ্টি করতে পারে। মধ্যম মাণের ফ্লুতে আক্রান্ত হলেও জ্বর, মাথা ব্যথা, পেশীর ব্যথা, গলা ব্যথা ও কাশির মত যন্ত্রণাদায়ক উপসর্গগুলো দেখা দেয়। সাধারণত ৪ দিনেই উপসর্গগুলো কমতে থাকে। তবে কাশি ও দুর্বলতা ২ সপ্তাহ বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে থাকতে পারে।

টিটেনাস/ডিপথেরিয়া/পারটুসিস টিকা(Tdap)

Tdap গর্ভাবস্থার যে কোন সময়ই নেয়া যায়। তবে গর্ভকালের ২৭-৩৬ মাসের মধ্যে নেয়াটাই উপযুক্ত সময়। এই টিকা টক্সয়েড ধরণের বলে গর্ভাবস্থায় নেয়ার জন্য নিরাপদ।

টিটেনাসকে লক’জ ও বলা হয়। এর ফলে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয় এবং পেশীতে বেদনাদায়ক খিঁচুনি হয়। টিটেনাস সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া মাটিতে এবং পশুর বর্জ্যে পাওয়া যায়। মানুষের শরীরের ত্বকের কোন স্থানে কেটে গেলে এটি রক্তস্রোতে প্রবেশ করতে পারে। আপনার শরীরের কোথাও গভীর ও ময়লা ক্ষতের সৃষ্টি হলে চিকিৎসকের শরনাপন্ন হোন। গর্ভাবস্থায় টিটেনাসে আক্রান্ত হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

ডিপথেরিয়া শ্বসনতন্ত্রের সংক্রমণজনিত রোগ। এর ফলে শ্বাসকষ্ট হওয়া, প্যারালাইসিস হওয়া, কোমায় চলে যাওয়া এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

পারটুসিস ব্যাকটেরিয়া ঘটিত চূড়ান্ত রকমের সংক্রামক রোগ। এর ফলে ক্রমাগত ও গভীর কাশি হয় এবং উচ্চ শব্দ হয় বলে একে ‘হুপিংকাশি’ ও বলে।

গর্ভাবস্থায় টিটি টিকা দেয়ার নিয়ম 

টিটেনাস (ধনুষ্টংকার) থেকে রক্ষ পাওয়ার জন্য টিটি টিকা নিতে হয়। হবু মায়েদের টিটি টিকা নিতে হবে যেন বাচ্চার ধনুষ্টঙ্কার না হয়। যদি আগে কোণ টিকা নেওয়া না থাকে, তবে সবগুলোই দিতে হবে। শিশুদের যে পেন্টা ভ্যালেন্ট টিকা দেয়া হয় তাতে ধনুষ্টঙ্কার প্রতিরোধী টিকা থাকে। কিন্তু এই টিকা নবজাতককে সুরক্ষা দিতে পারে না বিধায় সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসূচির আওতায় আমাদের দেশে সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারী—যাদের বয়স ১৫ থকে ৪৯ বছর, তাদের জন্য ধনুষ্টঙ্কার ও রুবেলার বিরুদ্ধে টিটি ও এমআর টিকা দেয়া হয়।

টিটেনাসের ৫টি টিকার ডোজ সম্পন্ন থাকলে আর গর্ভাবস্থায় এই টিকা নেয়ার প্রয়োজন নেই। আর কেউ যদি কোনো টিকা না নিয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় ৫ মাসের পর ১ মাসের ব্যবধানে পর পর দুটি টিটি টিকা দিয়ে নিতে হবে। আর যদি পূর্বে দুই ডোজ টিকা নেয়া থাকে তাহলে প্রতি গর্ভাবস্থায় মাত্র একটি বুষ্টার ডোজ নিতে হবে।

মাকে দেয়া এই টিকা মা ও বাচ্চা উভয়েরই ধনুষ্টংকার রোগের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলে। প্রসবকালে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতায় অসতর্কতা এবং অপরিষ্কার ছুরি, ব্লেড বা কাঁচি ব্যবহার করলে (বাচ্চার নাভী কাটার সময়) অথবা নাভীর গোড়ায় নোংরা কিছু লাগিয়ে দিলে নবজাতকের ধনুষ্টংকার রোগ হয়।

টিটি টিকা সূর্যের হাসি চিহ্নিত ক্লিনিক, মেরিস্টোপস ক্লিনিক, বড় হাসপাতাল, সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও পাওয়া যায়।

হেপাটাইটিস বি এর টিকা

গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস বি এর টিকা নেয়া নিরাপদ। যদি আপনি স্বাস্থ্যকর্মী হন বা  আপনার পরিবারের কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে এই টিকা নিয়ে নিন।

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস জনিত সংক্রামক রোগ। এর ফলে যকৃতের প্রদাহ, বমি বমি  ভাব, ক্লান্তি এবং জন্ডিস দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এর ফলে দীর্ঘমেয়াদী লিভার ডিজিজ, লিভার ক্যান্সার এবং মৃত্যু ও হতে পারে।

গর্ভবতী নারী যদি হেপাটাইটিস বি তে আক্রান্ত হন তাহলে ডেলিভারির সময় এই ইনফেকশন নবজাতকের মধ্যে ছড়াতে পারে। সঠিকভাবে চিকিৎসা করা না হলে শিশুর পূর্ণ বয়স্ক অবস্থায় মারাত্মক যকৃতের রোগ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

CCD এর মতে সকল গর্ভবতী নারীরই হেপাটাইটিস বি শনাক্তকরণের পরীক্ষা করানো উচিৎ। কারণ অনেক সময় এই রোগটি তার উপস্থিতির জানান দেয় না।

গর্ভাবস্থায় যেসব টিকা নিরাপদ নয়

হাম, মামস ও রুবেলার (MMR) টিকা

সন্তানধারন করার আগে অবশ্যই মায়েদের ধাপে ধাপে সকল টিকা নিয়ে নেয়া উচিত। গর্ভবতী হওয়ার পূর্বে যে টিকাটি নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ তার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, রুবেলা টিকা। গর্ভবতী মায়ের রুবেলা ইনফেকশন হলে, সন্তান জন্মগত ত্রুতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে, অথবা জন্মের পূর্বেই মৃত্যুবরন করতে পারে। তাই গর্ভধারণের আগে রুবেলা টিকা নেয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন, রুবেলার টিকা নেওয়ার কমপক্ষে এক মাস পর মা গর্ভধারণ করে। অর্থাৎ রুবেলার প্রতিরোধ ক্ষমতা শরীরে তৈরি হওয়ার পর গর্ভধারণ করতে হবে।

ভেরিসেলা (চিকেনপক্স)

একবার চিকেনপক্স হলে বাকি জীবন আর হয় না। তাই এ ভ্যাকসিন দেয়ার প্রয়োজনীয়তা কম। তবে বড়দের চিকেনপক্স জটিল ও মারাত্মক আকার ধারণ করে। যাদের চিকেনপক্স হয় নি তারা জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে ২ ডোজ ভ্যাকসিন নিতে পারেন। প্রথম ডোজ দেয়ার ৪ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দিতে হয়। তবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে, দীর্ঘমেয়াদী অসুখ থাকলে, গর্ভবতী মা ও ৪ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভধারণের সম্ভবনা থাকলে, অসুস্থাবস্থায় এ টিকা না নেয়া ভালো।

গর্ভাবস্থায় চিকেনপক্স হলে শিশুর জন্মগত ত্রুটি বা গর্ভকালীন জটিলতা দেখা দিতে পারে। এম.এম.আর টিকার মত চিকেনপক্সের টিকাও গর্ভধারণের কমপক্ষে ১ মাস আগে নেয়া উচিত।

হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস

এ ভাইরাস মেয়েদের জরায়ুমুখ ক্যান্সারের জন্য দায়ী। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১২ হাজারের বেশি মেয়ে মৃত্যুবরণ করে এ ক্যান্সারে। অথচ ৩টি ভ্যাকসিনই পারে এ রোগ থেকে মুক্তি দিতে। ২৬ বছরের আগেই এ ভ্যাকসিন দেয়া ভালো। তবে ৪৫ বছর পর্যন্ত দেয়া যেতে পারে। বেশি ভালো হয় বিয়ের আগে বা প্রথম যৌনমিলনের আগে। প্রথম ডোজ ভ্যাকসিন দেয়ার ২ মাস পর দ্বিতীয় ডোজ ও ৬ মাস পর তৃতীয় ডোজ দিতে হয়। গর্ভাবস্থায়, অসুস্থাবস্থায় ও এ ভ্যাকসিনে অ্যালার্জি হলে এ ভ্যাকসিন দেয়া যাবে না।

কিছু কিছু টিকা গর্ভকালীন সময়ে একদমই নেয়া যাবে না। সেগুলো সম্পর্কে নজর দিতে হবে। এধরনের টিকা গুলো হল, মাম্পস, হাম, রুবেলা, ভ্যারিসেলা (চিকেন পক্স), বিসিজি, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস এবং ইয়েলো ফিভারের টিকা। এছাড়াও টাইফয়েড এবং জাপানিজ এনকেফালাইটিসের টিকাও পরিহার করা ভালো।

পরিস্থিতি বিবেচনায় গর্ভাবস্থায় যেসব টিকা নেয়া যেতে পারে

হেপাটাইটিস এ এর টিকা

হেপাটাইটিস এ এর টিকা যকৃতের এমন রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয় যা সাধারণত ছড়ায় সংক্রমিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে। জ্বর, ক্লান্তি ও বমি বমি ভাবের মত লক্ষণগুলো দেখা দেয় এই রোগে আক্রান্ত হলে। এটি হেপাটাইটিস বি এর সংক্রমণের মত মারাত্মক কোন রোগ নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই অসুস্থতা গর্ভজাত সন্তানের উপর কোন প্রভাব ফেলে না। বিরল ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস এ প্রিম্যাচিউর লেবারের সৃষ্টি করতে পারে এবং নবজাতকের ইনফেকশনও হতে পারে।

এই টিকা গর্ভাবস্থায় কতটুকু নিরাপদ তা এখনও জানা যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যেহেতু এটি মৃত ভাইরাস দিয়ে তৈরি সেহেতু গর্ভের সন্তানের উপর এর ঝুঁকির মাত্রা কম থাকবে।

নিউমোকক্কাল ভ্যাক্সিন

আপনার যদি দীর্ঘমেয়াদী কোন রোগ যেমন- ডায়াবেটিস অথবা কিডনি রোগ থাকে তাহলে আপনার চিকিৎসক আপনাকে নিউমোকক্কাল ভ্যাক্সিন নেয়ার পরামর্শ দেবেন। যা কয়েক ধরণের নিউমোনিয়া থেকে সুরক্ষা দেবে। গর্ভজাত সন্তানের ক্ষতির বিষয়টি এখনো অজানা, তবে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে ঝুঁকি কম।

এছাড়াও গর্ভবতী অবস্থায় যদি মাকে কোন ভ্রমণে যেতে হয়, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ নিয়ে ভ্রমনকালীন টিকা নেয়া যেতে পারে। গর্ভবতীকালীন ভ্রমণের সময়ে যেসব টিকা নেয়া হয়, সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে র‍্যাবিস এবং মেনিনজাইটিসের টিকা।

পরিশিষ্ট

আপনি নিজে গর্ভবতী হলে বা আপনার পরিবার ও বন্ধুদের কেউ গর্ভবতী হলে এই টিকাগুলো সময়মত যাতে নেয়া হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। এর ফলে অনাগত শিশু ও মা উভয়েই নিরাপদ থাকবেন।

যেকোন ভ্যাক্সিন নেবার আগে অবশ্যই আপনার গাইনী ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিন। এবং ভবিষ্যতে যাতে ট্র্যাক করা যায় এজন্য কবে কী ভ্যাক্সিন দিচ্ছেন তার চার্ট সংরক্ষণ করুন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment