গর্ভাবস্থায় চেকআপ । প্রথম ট্রাইমেস্টার

গর্ভাবস্থায় একজন নারী মা হবার আনন্দে যেমন বিভোর থাকেন, ঠিক তেমনি আবার নানা বিপদের কথা ভেবে থাকেন শঙ্কিত। গর্ভধারণ মানেই কমবেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা।তাই নিরাপদে মা হবার জন্য গর্ভে সন্তানের আগমন নিশ্চিত হওয়া মাত্র গর্ভকালীন পরিচর্যা শুরু করতে হবে। গর্ভকালীন পুরো সময় থেকে প্রসবের পর কিছুদিন পর্যন্ত নিয়মিত চিকিত্‍সকের পরামর্শ নিতে হবে।

 

প্রথম প্রি-ন্যাটাল ভিজিট কখন করতে হবে?

যখনি আপনি জানতে পারবেন যে আপনি গর্ভবতী তখনি যত দ্রুত সম্ভব কোন গাইনী ডাক্তারের সাথে দেখা করুন। যদি আপনি এখনো ঠিক করে না থাকেন যে পুরো গর্ভকালীন সময় আপনি কোন ডাক্তারের সাথে থাকবেন তবুও কোন একজনের সাথে পরামর্শ করুন গর্ভধারণ এর ব্যাপারে। এমন নয় যে আপনি প্রথমবার যার কাছে যাবেন তার কাছেই সবসময় যেতে হবে। আপনি যে কোন সময় আপনার পছন্দের ডাক্তারের কাছে শিফট করতে পারেন।

বেশীরভাগ ডাক্তারই আপনার প্রথম সাক্ষাতের দিন ঠিক করবেন আপনার গর্ভধারণের অষ্টম সপ্তাহে। অনেকে এর আগেও আপনাকে দেখতে পারেন যদি আপনার কোন মেডিকেল কন্ডিশন থাকে, পূর্বের গর্ভধারণে কোন সমস্যা থাকে, যোনিপথে রক্তক্ষরণ, পেট ব্যাথা বা অনেক বেশী বমি বমি ভাব বা বমির লক্ষন থাকে।

প্রথম সাক্ষাত অনেকটা দীর্ঘ হতে পারে। তাই লম্বা সময় থাকার প্রস্তুতি নিয়ে আসুন। সম্ভব হলে আপনার সঙ্গীকেও সাথে আনার চেষ্টা করবেন। গর্ভধারণের ব্যাপারে যা ই মনে আসুক, ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতে দ্বিধা বোধ করবেন না। প্রয়োজনে আপনার প্রশ্ন গুলো একটি কাগজে লিখে রাখতে পারেন। যদি মনে করেন কোন বিষয় ডাক্তারকে জানানো জরুরী তবে অবশ্যয় জানান।

 

প্রথম সাক্ষাতে ডাক্তার কি কি জানতে চাইতে পারেন?

গর্ভাবস্থার প্রথম সাক্ষাতে আপনার ডাক্তার বেশ কিছু বিষয় আপনার কাছ থেকে জানতে চাইতে পারেন-

স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত বিষয়-

  • আপনার মাসিক নিয়মিত হয় কিনা বা তা কতদিন স্থায়ী থাকে।
  • আপনার শেষ মাসিকের প্রথম দিন। ( সন্তানের সম্ভাব্য জন্ম তারিখ নির্ণয়ের জন্য)
  • শেষ মাসিকের পর আপনি কোন লক্ষন বা সমস্যা বোধ করছেন কিনা।
  • আপনার কোন যৌন রোগ আছে কিনা বা পূর্বে ছিল কিনা।
  • পূর্বে গর্ভধারণ করে থাকলে তার বিস্তারিত।

আপনার অন্যান্য মেডিকেল হিস্ট্রি-

  • দীর্ঘস্থায়ী কোন অসুখ আছে কিনা বা তার জন্য কি ওষুধ খাচ্ছেন।
  • ড্রাগ এলারজি আছে কিনা।
  • মানসিক কোন সমস্যা আছে কিনা।
  • আগে কোন সার্জারি হয়েছিল কিনা এবং কেন।

কিছু বিষয় যা আপনার গর্ভাবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে-

  • ধূমপানের বা মদ্যপানের অভ্যাস আছে কিনা।
  • আপনি কখনও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন কিনা বা তার সম্ভাবনা আছে কিনা।

 

এছাড়াও আপনার ডাক্তার আপনার পরিবারের অন্যান্যদের মেডিকেল হিস্ট্রি সম্পর্কে জানতে চাইতে পারেন, যেমন- পরিবারের কারও দীর্ঘস্থায়ী এবং মারাত্মক কোন অসুখ আছে কিনা। বেশীরভাগ রোগই কিছুটা হলেও বংশগত। তাই এ ব্যাপারে আপনার ডাক্তারের জানা থাকলে তিনি সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে পারবেন।

যতই স্পর্শকাতর হোক না কেন, যে কোন বিষয় আপনার ডাক্তারের সাথে শেয়ার করুন। মনে রাখবেন এ বিষয়গুলো জানা থাকলে আপনার ডাক্তারের পক্ষে আপনার এবং আপনার গর্ভের শিশুর জন্য সবচাইতে ভালো সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ হবে। এমন কোন বিষয় যা আপনি পরিবারের অন্যদের সাথে শেয়ার করতে চান না প্রয়োজন হলে তা গোপনে আপনার ডাক্তারকে জানান।

এ ছাড়াও আপনার বা সন্তানের বাবার বা পরিবারের কারও জেনেটিক বা ক্রমসোমাল ব্যাধী আছে কিনা, জন্মগত ত্রুটি আছে কিনা সে সম্পর্কেও আপনার কাছে জানতে চাওয়া হতে পারে।

 

প্রি-ন্যাটাল জেনেটিক টেস্টিং এর জন্য কি কি করা যেতে পারে?

আপনার চিকিৎসক আপনাকে কিছু স্ক্রিনিং টেস্ট এর পরামর্শ দিতে পারে যাতে আপনার গর্ভের শিশুর ডাউন সিন্ড্রোমের ঝুঁকি এবং অন্যান্য ক্রমোসোমাল ও জন্মগত সমস্যা সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়।

এছাড়াও আপনাকে carrier screening  পরামর্শ দেয়া হতে পারে। এর মাদ্ধমে রক্ত ও লালা পরীক্ষা করে দেখা হয় আপনার গর্ভের শিশু প্রায় ১০০ ধরনের জেনেটিক সমস্যার ঝুঁকিতে আছে কিনা। যেমন cystic fibrosis, sickle cell disease, thalassemia, এবং Tay-Sachs disease।

এ ছাড়াও গর্ভস্থ শিশুর ডাউন সিন্ড্রোম ও আরও কিছু সমস্যা নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করার জন্য আরও দুটি পরীক্ষার পরামর্শ দেয়া হতে পারে। এগুলো হোল- chorionic villus sampling (CVS) যা সাধারণত গর্ভাবস্থার ১০-১২ সপ্তাহে করা হয় এবং amniocentesis যা ১৬-২০ সপ্তাহে করা হয়ে থাকে।

এ দুটো পরীক্ষা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং গর্ভপাতের কিছু সম্ভাবনা থাকে। তাই যে সব মায়েরা বেশী ঝুঁকিতে থাকেন শুধুমাত্র তাদের ক্ষেত্রেই এ পরীক্ষাগুলো করার পরামর্শ দেয়া হয়। এ ছাড়াও সাধারণত অন্যান্য পরীক্ষার রেজাল্ট পাওয়ার পর এ পরীক্ষাগুলোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে থাকে।

 

প্রথম ট্রাইমেস্টারে আর কি কি পরীক্ষা করা হতে পারে?

 

শারীরিক পরিক্ষাঃ

ডাক্তার আপনার ওজন ও উচ্চতা মাপবেন। তা থেকে তিনি আপনার BMI পরিমাপ করবেন। BMI এর মাদ্ধমে সুস্থ গর্ভধারণের জন্য কতটুকু ওজন বাড়া উচিত সে সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়। আপনার ব্লাড প্রেসার এবং হার্ট রেটও মাপা হতে পারে।

ডাক্তার আপানার যোনি ও জরায়ু মুখ পরীক্ষা করে দেখবেন। জরায়ু মুখের পরিবর্তন এবং জরায়ুর আকার থেকে আপনি গর্ভাবস্থার কোন পর্যায়ে আছেন সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা পাওয়া যায়। cervical cancer সনাক্তকরণের জন্য Pap test করার পরামর্শও দেয়া হতে পারে।

 

রক্ত পরীক্ষাঃ

অনেক গুলো পরীক্ষার জন্য রক্ত নেয়া হবে আপনার। প্রথমেই আপনার রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করা হবে। এ ছাড়াও আপনার রক্তের Rh factor  পরীক্ষা করা হবে। Rh factor হোল একধরনের প্রোটিন যা ৮৫ ভাগ মানুষের রক্তেই পাওয়া যায়। আপনি যদি Rh negative হন সেক্ষেত্রে ২৮ বা ২৯ সপ্তাহের দিকে একটি ইঞ্জেকশন দেয়া হবে এবং প্রসবের অন্তত ৭২ ঘণ্টা আগে আবার দেয়ে হবে। এর কারণ হোল আপনি যদি Rh negative হন এবং আপনার গর্ভের শিশু যদি Rh positive হয় তবে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

রক্ত পরীক্ষায় আপনার human chorionic gonadotropin এর মাত্রা পরীক্ষা করা হবে। এটি একধরনের হরমোন যা থেকে বোঝা যায় গর্ভের শিশু ঠিকভাবে বেড়ে উঠছে কিনা। এছাড়াও রক্তে হিমোগ্লোবিন এর মাত্রা এবং লোহিত রক্ত কণিকা এবং শ্বেত রক্ত কনিকার পরিমান ও দেখা হবে। এ থেকে এনিমিয়া বা ইনফেকশন সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যাবে। এ ছাড়াও হেপাটাইটিস বি, সিফিলিস, এইছ আই ভি ও অন্যান্য যৌন রোগ এবং রুবেলার প্রতিরোধ ক্ষমতা ও পরীক্ষা করে দেখা হবে।

 

ইউরিন টেস্টঃ

urinary tract infections এবং আরও কিছু পরীক্ষার জন্য ইউরিন টেস্ট করা হতে পারে। যেমন- গ্লুকোজ এর মাত্রা ( গ্লুকোজ এর মাত্রা বেশী থাকা মানে ডায়াবেটিস এর লক্ষন) এবং প্রোটিন ( প্রি-এক্লাম্পশিয়ার লক্ষন)। যদি এগুলোর উপস্থিতি পাওয়া যায় তাহলে আরও কিছু পরীক্ষার পরামর্শ দেয়া হবে।

আল্ট্রাসাউন্ডঃ প্রথম ট্রাইমেস্টারে সাধারণত ১০ সপ্তাহের দিকে আপনাকে আল্ট্রাসাউন্ড করার পরামর্শ দেয়া হবে। এতে ভ্রুনের কোন অস্বাভাবিকতা থাকলে তা বোঝা যাবে এবং আপনার ডিউ ডেট সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যাবে।

 

উপরের পরীক্ষাগুলো ছাড়াও এ সময় আপনার ডাক্তার আপনাকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেবেন যেমন- কি কি খাবার খেতে হবে, কোন খাবার গুলো খাওয়া চলবেনা, গর্ভাবস্থায় ওজন বাড়া, প্রিন্যাটাল ভিটামিন ইত্যাদি। এ ছাড়াও গর্ভকালীন বিভিন্ন অসুবিধা এবং কোন কোন লক্ষন দেখলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন সে সম্পর্কে ধারনা দিবেন।

গর্ভকালীন সময়ে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার ডাক্তার এ সময় আপনার বিষণ্ণতার কোন লক্ষন আছে কিনা সেটাও খুঁটিয়ে দেখতে পারেন। তবে তিনি যদি এ ব্যাপারে জানতে না চান এবং আপনার মনে হয় যে আপনি বিষণ্ণতায় ভুগছেন তবে অবশ্যয় তা ডাক্তারের সাথে আলোচনা করুন। এ বিষয়ে তিনি আপনাকে সাহায্য করতে পারেন বা এমন কাউকে রেফার করতে পারেন যে আপনাকে সাহায্য করবে।

এ সময় তিনি আপনাকে গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম, ভ্রমন এবং শারীরিক মিলন সম্পর্কে পরামর্শ দিবেন। এছাড়াও যদি ফ্লু সিজন হয় তাহলে আপনাকে ফ্লু এর প্রতিষেধক নেয়ার পরামর্শ দেয়া হবে।

সবশেষে আপনাকে পরবর্তী সাক্ষাতের তারিখ জানানো হবে যা সাধারণত ৪ সপ্তাহ পরে হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।

যদি আপনার সবকিছু স্বাভাবিক থাকে তাহলে ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি মাসে একবার, ২৮-৩৬ সপ্তাহে প্রতি ২ সপ্তাহে একবার এবং এরপর প্রসবের সময় পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে সাক্ষাতের পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে।  যদি নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সুবিধা না থাকে তাহলে ন্যূনতম ৪ বার (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী ) ডাক্তার দেখাতে হবে।

  • ১ম ভিজিট – প্রথম ১৬ সপ্তাহ (৪ মাসের) মধ্যে
  • ২য় ভিজিট – ২৪-২৮ সপ্তাহ (৬-৭ মাসের) মধ্যে
  • ৩য় ভিজিট- ১ম মাস পর (৮ মাসের)মধ্যে
  • ৪র্থ ভিজিট- ৩৬ সপ্তাহ (ঌ মাসের) দিকে

 

সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts

2 Thoughts to “গর্ভাবস্থায় চেকআপ । প্রথম ট্রাইমেস্টার”

  1. […] গর্ভাবস্থায় চেকআপ । প্রথম ট্রাইমেস্ট… […]

Leave a Comment