গর্ভাবস্থায় চিকুনগুনিয়া | সতর্কতা জরুরী

চিকুনগুনিয়া কি?

চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। এটি সাধারণত স্বল্পস্থায়ী কিন্তু এর উপসর্গগুলো মারাত্মক আকার ধারন করতে পারে। চিকুগুনিয়া অন্যান্য মশা বাহিত রোগ যেমন জিকা এবং ডেঙ্গুর মত গর্ভবতী মা এবং শিশুদের জন্য বিপদের কারন হতে পারে।

চিকুনগুনিয়া মানবদেহ থেকে মশা এবং মশা থেকে মানবদেহে ছড়ায়। বাংলাদেশে ২০০৮ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথম চিকুনগুনিয়ার রোগী শনাক্ত হয়। ২০১১ সালেও দোহারে কিছু লোক আক্রান্ত হয়। অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০১৭ সালে রোগটি রাজধানীতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে রোগটির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। মূলত আফ্রিকা, এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশে এই রোগের প্রকোপ বেশি।

 

গর্ভাবস্থায় চিকুনগুনিয়া কেন বিপদজনক?

কিছু কিছু মায়েদের ক্ষেত্রে যারা গর্ভধারণের শুরুতে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে গর্ভপাত হওয়ার কিছু ঘটনা ঘটেছে। গর্ভাবস্থায় চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে তা সাধারণত মা ও অনাগত শিশুর তেমন কোন ক্ষতি করেনা। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে চিকুনগুনিয়া সংক্রমিত হয়না। বরং এ সময় এ রোগে আক্রান্ত মায়েদের গর্ভস্থ শিশুর একধরনের প্রতিরোধ ব্যাবস্থা তৈরি হয় যা বছর খানেক কার্যকর থাকে।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে যদি গর্ভাবস্থার শেষ দিকে বা প্রসবের ঠিক আগে আগে মা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হন তবে তা নবজাতকের মদ্ধেও সংক্রমিত হতে পারে। এক্ষেত্রে নবজাতক মারাত্মক ভাবে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে এবং তাই জন্মের পর তাকে নিবিড় পরিচর্যায় রাখার প্রয়োজন হতে পারে।

নবজাতকের চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে-

  • জ্বর
  • খেতে না চাওয়া
  • ফোলা ভাব
  • চামড়াই র‍্যাশ
  • খিঁচুনি এবং অন্যান্য জটিলতা

নবজাতকের চিকুনগুনিয়ার সম্ভাবনা থাকলে জন্মের পর অন্তত এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। এ ছারাও যেহেতু গর্ভাবস্থায় চিকুনগুনিয়ার হলে কিছু ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে তাই গর্ভাবস্থায় চিকুনগুনিয়ার লক্ষন দেখা দিলেই দ্রুত বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

তবে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধ শিশুকে খাওয়ানোতে কোনো বাধা নেই, বুকের দুধের মাধ্যমে চিকুনগুনিয়া ছড়ায় না।

 

চিকুনগুনিয়ার লক্ষন

রোগের শুরুতে প্রচণ্ড জ্বর, বমিবমি ভাব বা বমি, মাথাব্যথা, শরীর দুর্বল, শরীরে লাল র‍্যাশ এবং সর্বশরীরে বিশেষ করে মাংসপেশি, মেরুদণ্ড বা অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা এমনকি ফোলাও থাকে, চলাফেরা কঠিন হয়ে যায়। প্রচণ্ড জ্বরে রোগী অচেতনও হতে পারে। তিন-চার দিনের মাথায় জ্বর সেরে যাওয়ার পরও অনেকেই দুর্বলতা, অরুচি এবং বমিভাব অনুভব করেন। এ সমস্যা কয়েক মাস পর্যন্ত থাকতে পারে।

চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ রোগী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরোগ্য লাভ করে। শতকরা ১০ ভাগের কম রোগী জ্বর চলে যাওয়ার পরও শরীরের বিভিন্ন জয়েন্ট বা গিরায় এবং মাংসপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথায় ভোগে, যার অধিকাংশই দু-এক সপ্তাহের মধ্যেই দ্রুত আরোগ্য লাভ করে। স্বল্পসংখ্যক রোগী কয়েক মাস পর্যন্ত মারাত্মক ব্যথায় ভুগতে পারে। ব্যথার তীব্রতা এত বেশি যে, আক্রান্তের অনেকেই দীর্ঘদিনের জন্য স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ এর তীব্রতা অনুভব করতে পারবে না।

 

চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসা

চিকুনগুনিয়ার কোন ওষুধ এখনও আবিষ্কার হয়নি। তাই এ ক্ষেত্রে জ্বর, ব্যাথা এবং অন্যান্য উপসর্গ কমানোর ওষুধ দেয়া হয়। গর্ভাবস্থায় জ্বর কমানো জরুরী কারন দীর্ঘদিন জ্বর থাকলে তা গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করতে পারে।

জ্বরের জন্য শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। একটি বা দুটি ট্যাবলেট তিন বেলা অথবা সাপোজিটরি ব্যবহার করা যায়। পানি দিয়ে শরীর স্পঞ্জ করা এবং গোসল করাও এক্ষেত্রে কার্যকর। তবে গর্ভাবস্থায় ibuprofen বা  aspirin জাতীয় ওষুধ গ্রহন করা নিরাপদ নয়।

রোগীকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। প্রচুর পানি, ডাবের পানি, শরবত, গ্লুকোজ, স্যালাইন, স্যুপ-জাতীয় তরল খাদ্য এবং স্বাভাবিক খাবার খেতে হবে। ব্যাথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

অতিরিক্ত পরিশ্রম বা ভারী কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্লাস্টিকের ব্যাগে ঠাণ্ডা বরফকুচি দিয়ে সেঁক দিলে ব্যথা উপশম হয়। গরম সেঁক পরিহার করতে হবে। হালকা ম্যাসাজ এবং ফিজিওথেরাপি নেওয়া যেতে পারে। প্যারাসিটামল খেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যথা নিরাময় হয়। অন্য ব্যথার ওষুধ যেমন আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক, ন্যাপ্রোক্সেন কোনোক্রমেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া উচিত নয়। অবস্থা জটিল হলে ডাক্তারের পরামর্শ-মত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধের উপায় কি?

চিকুনগুনিয়া জ্বরের কোন প্রতিষেধক, ভ্যাকসিন বা টিকা এখনও আবিষ্কার হয়নি। এই রোগ থেকে পরিত্রাণের জন্য একটাই উপায় মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধ করার জন্য মশার আবাসস্থল এবং আশপাশের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা। অর্থাৎ ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং মশা প্রতিরোধটাই জরুরী।

এডিস মশা মূলত দিনের বেলা কামড়ায়, তবে রাতে বেশি আলো থাকলেও কামড়াতে পারে। মশার কামড় থেকে বাঁচার উপায় হলো শরীরের বেশিরভাগ অংশ ঢেকে রাখা, যেমন ফুলহাতা শার্ট এবং ফুলপ্যান্ট পরা, দিনে ঘুমালে মশারি ব্যবহার করা, স্প্রে, লোশন, ক্রিম, রিপেল্যান্ট ব্যবহার করা এবং দরজা-জানালায় নেট লাগানো ইত্যাদি।

যে কোন পাত্র, ফুলের টব, বাথরুম, ফ্রিজ বা এসির নিচে, বারান্দায় বা ছাদে জমে থাকা পানি ৩ থেকে ৫ দিন পরপর পরিষ্কার করলে এডিস মশার লার্ভা মারা যায়। পাত্রের গায়ে লেগে থাকা মশার ডিম অপসারণে পাত্রটি ঘষে পরিষ্কার করলে ভাল। অব্যবহৃত পাত্র উল্টে রাখা উচিত, যাতে পানি জমতে না পারে।

ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, টিনের কৌটা, ডাবের খোসা, কন্টেইনার, ব্যাটারির শেল, পলিথিন বা চিপসের প্যাকেট ইত্যাদিতে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে। নোংরা পুকুর বা ডোবা পরিষ্কার করতে হবে। ডেঙ্গু জ্বরের বেলায় স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশ বিস্তার করে; কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় মশা নোংরা অপরিষ্কার পানিতেও ডিম পাড়তে পারে। তাই পানি জমে থাকে এমন সকল স্থান পরিষ্কার রাখতে হবে। মশা নিধনের স্প্রে বা ফগিংয়ের মাধ্যমে মশার বংশ বিস্তারের স্থান ধ্বংস করতে হবে।

 

চিকুনগুনিয়া কি বার বার হওয়ার সম্ভাবনা আছে?

চিকুনগুনিয়া একবার হলে তা পরবর্তীতে আবার হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা। এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য উপাত্ত পাওয়া গেছে তাতে দেখা গেছে এ রোগে একবার আক্রান্ত হলে শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি উৎপন্ন হয় যা সারাজীবনের জন্য শরীরকে এ রোগ প্রতিরোধী করে তোলে।

চিকুনগুনিয়া রোগটি নতুন হলেও আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। এতে কেউ মারা যায় না। হয়তোবা কিছুদিন ভোগায়। তবে জীবন-বিধ্বংসী না হলেও রোগটিকে হেলাফেলা করা উচিত নয়। একটু সচেতন হলেই মোকাবেলা করা সম্ভব।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment