গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমি বা হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম

হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম কি?

এতবড় নামটাকে ভেঙে ভেঙে বললে এসে দাঁড়ায়, হাইপার (তীব্র), এমেসিস (বমি),গ্রাভিডেরাম (গর্ভধারণ)। সুতরাং, গর্ভাবস্থায় কোনও মহিলা যদি অতিরিক্ত পরিমাণে বমি করেন, সেই অসুখকে বলে হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম। সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সকালের দিকে। ক্লান্তি যেন যেতেই চায় না। শুরু হয় বমি। সব পানি বেরিয়ে গিয়ে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। পুষ্টির অভাব তৈরি হয়। প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগে। বংশগত কারণে হতে পারে। আবার হরমোনের হেরফেরের কারণেও হতে পারে বমির কষ্ট। অনেকসময় ওজন বেশি থাকলেও হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম সমস্যা দেখা দিতে পারে গর্ভবতীর শরীরে।

গর্ভাবস্থায় বমি হয় অনেকেরই। প্রতি ১০০ জন গর্ভবতীর মধ্যে ১ জন নারীর এ রকম সমস্যা হতে পারে। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমি হলে যেসব সমস্যা হতে পারে–

কেটোসিস

অতিরিক্ত বমির কারণে গর্ভবতী মা ঠিকমত ও পরিমানমত শর্করা জাতীয় খাবার খেতে পারে না। এসময় প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদনের জন্য শরীর দেহের মধ্যে জমাকৃত শর্করা ভাঙা কেটোসিস হতে পারে। এর ফলে রক্তের অম্লতা বেড়ে যায়, শরীরের অম্ল-ক্ষার এর ভারসাম্য নষ্ট হয়।

ওজন কমে যাওয়া

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমি হওয়ার কারণে বিষণ্ণতায় ভোগা, শরীরের শক্তি লোপ পাওয়া, কাজে অনীহা বা মনোযোগ নষ্ট হতে পারে। অতিরিক্ত বমি করার কারণে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং এতেও শরীরের ওজনও কমে যায়।

গভীর শিরায় রক্ত জমাট

অতিরিক্ত বমি থেকে পানিশূন্যতার কারনে শরীরের গভীর শিরাগুলোতে (হৃদপিণ্ড থেকে দূরবর্তী শিরা যেমন, পায়ের শিরা) রক্ত জমাট বেঁধে যেতে পারে। এটা শরীরের জন্য খুবই বিপদজনক একটি অবস্থা।

অনেক সময় রোগীরা খুবই উদ্বিগ্ন থাকে, পানি শুন্যতায় ভোগে, তাদের নাড়ির গতি বেড়ে যায়, রক্তচাপ কমে যায়, জন্ডিস দেখা দেয়, প্রস্রাব স্বাভাবিকের তুলনায় কম হয়, দুর্বল লাগে এবং মুখে অনেক বেশী লালা উৎপন্ন হয়।

হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম ও মর্নিং সিকনেসের মধ্যে পার্থক্য কি?

অনেক মহিলায় গর্ভাবস্থায় মর্নিং সিকনেসে ভোগেন। এটা সাধারণত তেমন কোন ভয়ের কারণ নয়। মর্নিং সিকনেস সাধারনত গর্ভাবস্থার ১২ সপ্তাহের মধ্যে ঠিক হয় যায়। হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম হলো মর্নিং সিকনেসের তীব্র রুপ যার ফলে প্রচণ্ড বমি ভাব ও বমি হতে পারে।

মর্নিং সিকনেস এবং হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম দুটি ভিন্ন কন্ডিশন। এদের জটিলতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভিন্ন। তাই এ দুটোর পার্থক্য জেনে রাখা ভালো। এর ফলে এগুলোর প্রতিকার সহজ হয়।

মর্নিং সিকনেসে সাধারনত সাধারনত বমি বমি ভাব হয় এবং মাঝে মাঝে বমি হয়। এ সমস্যা সাধারনত ১২-১৪ সপ্তাহের ভেতর ঠিক হয়ে যায়। মর্নিং সিকনেসের কারণে মারাত্মক ধরনের পানিশূন্যতা হয়না। হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম হলে বমি ভাব এবং বমি হতেই থাকে এবং পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এর কারণে কোন খাবার বা তরল পেটে রাখাটা দুষ্কর হয়ে ওঠে।

মর্নিং সিকনেস সাধারনত গর্ভাবস্থার প্রথম মাসেই দেখা দেয়। মর্নিং সিকনেসের কারণে খাবারে অরুচি এবং দৈনন্দিন কাজে অনীহা আসতে পারে। হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরামের ক্ষেত্রে কিছু খেতেই ইচ্ছে করেনা, দৈনন্দিন কাযে অনীহা এবং শরীর ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে।

মর্নিং সিকনেসের ক্ষেত্রে বমি হওয়া সত্ত্বেও গর্ভাবস্থায় ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকবে। হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরামের ক্ষেত্রে পানিশূন্যতার পাশাপাশি মায়েদের গর্ভাবস্থার আগের ওজনের চাইতে অন্তত ৫ ভাগ ওজন কমে যায়।

যদি অনবরত বমি হতে থাকে এবং পানিশূন্যতা ও ওজন কমে যাওয়ার লক্ষন দেখা দেয় তবে ডাক্তারকে জানানো উচিত। তিনি পরীক্ষা করে দেখবেন সমস্যা টা হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম নাকি অন্য কিছু।

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমি হওয়া বা হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরামের লক্ষন

গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে প্রায় সবারই কিছুদিন বমি বমি ভাব ও বমি হতে পারে। কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে এই বমি বমি ভাব ও বমি হওয়াটা খুব তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা গর্ভবতী মাকে অসুস্থ করে ফেলে । প্রতি ১০০ জনে ১ জন নারীর এরকম হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমি হওয়া (হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম ) এর লক্ষণগুলো হচ্ছে –

  • অতিরিক্ত বমি বমি ভাব ও বমি হওয়া
  • পানিশূণ্যতা
  • ওজন কমে যাওয়া
  • বসা থেকে উঠে দাঁড়ালে রক্তচাপ কমে যাওয়া ( হাইপোটেনশন)
  • এছাড়াও ‘গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমি হওয়ার’ কারনে আর কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে যেমন, আপনি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতে পারেন।
  • কখনও কখন এই অবস্থায় বমি এত তীব্র হয় যে, পানি বা যেকোনো তরল খাবার গলা দিয়ে নামানটাই কঠিন হয়ে যায়। অতিরিক্ত বমি করার কারণে শরীর পানিশূন্য হয়ে পরে এবং শরীরের ওজনও কমে যায়।

যদি এমন হয় যে বমির কারনে আপনি শরীরে পানি বা তরল জাতীয় কোন কিছুই রাখতে পারছেন না, তাহলে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম কেন হয়?

হাইপারেমেসিস গ্রাভিডেরাম এর নির্দিষ্ট কোনো কারন এখনো জানা যায়নি, তবে এটা চিরস্থায়ী কোনো রোগ নয়।সাধারণর গর্ভের প্রথম তিন মাস পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি থাকে। সচরাচর প্রথম গর্ভের ক্ষেত্রেই এই রোগ দেখা যায়। পরিবারের ইতিহাস নিলে দেখা যায়,  রোগির বোন বা মায়েরও গর্ভাবস্থায় এইরকম সমস্যা হয়েছিল। যজম গর্ভ বা মোলার প্রেগনেন্সি থাকলে এরকম সমস্যা হওয়ার বিপদ বেশি। আবার অনেক বিশেষজ্ঞ  এই রোগের যে-যে কারণের কথা উল্লেখ করেন, তা হল—

  • অতিমাত্রায় এইচ.সি.জি হরমোন সৃষ্টিও হওয়া।
  • ভিটামিন-বি১, বি৬, এবং প্রোটিনের অভাবজনিত কারণ।
  • মানসিক কারণ।

হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরাম নির্ণয়

ডাক্তার আপনার মেডিকেল হিস্ট্রি এবং লক্ষনগুলো সম্পর্কে জানতে চাইবেন। ডাক্তার হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরামের সাধারন সাইনগুলো চেক করে দেখবেন যেমন- নিম্ন রক্তচাপ বা দ্রুত  হৃদস্পন্দন। রক্ত এবং প্রস্রাব পরীক্ষা করা হতে পারে পানিশূন্যতার লক্ষন আছে কিনা দেখার জন্য। এছারাও আরও কিছু পরীক্ষা করা হতে পারে যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে বমির কারণ অন্য কিছু নয়। বাচ্চার অবস্থা এবং যমজ বাচ্চা আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য আলট্রা সাউন্ডের পরামর্শ দেয়া হতে পারে।

হাইপারমেসিস গ্রাভিডেরামের চিকিৎসা

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমির জন্য বিশেষ চিকিৎসার দরকার হয়। বমির কারনে যদি শরীর অতিরিক্ত পানিশুন্য হয়ে যায়, তাহলে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে। হাসপাতালে ভালমত পরীক্ষা, নিরীক্ষা করে পানিশূন্যতার মাত্রা দেখা হয়, কেটোসিস হয়েছে কিনা সেটা দেখা হয় এবং সেই অনুযায়ী তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

ভর্তির পর সাধারণত রোগীকে নাকে নল দিয়ে অথবা স্যালাইনের মাধ্যমে খাবার দেয়া হয়। সেই সাথে বমির নিরাপদ অসুধ এবং ঘুমের অসুধ ও দেয়া হয়ে থাকে। রোগী বমির কারনে যেসকল তরল ও লবন হারিয়ে থাকে তা প্রতিস্থাপন করাও চিকিৎসার অন্যতম অংশ। এর পর ধীরে ধীরে রোগীকে স্বাভাবিক খাবারে ফিরিয়ে আনা হয় এবং বেশীর ভাগ রোগীই এতে ভালো হয়ে যায়।

হাইপেরেমেসিস গ্র্যাভিনডারামকে কিভাবে লড়বেন?

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, গর্ভাবস্থায় খাদ্যাভাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খানিক পরিবর্তন আনতে হবে সেই তালিকায়। যেমন –

ভিটামিন এড়ালে চলবে না – শরীরে ভিটামিন B1 ও B6-এর অভাব দেখা দিলে হাইপেরেমেসিস গ্র্যাভিনডারামের সমস্যা মেটানো সম্ভব। কোনওরকম সাপ্লিমেন্ট খাবেন না। সবজি খেতে হবে প্রচুর। বিনস্, কড়াইশুঁটি, বিটরুট, পনির, কলা ও মাছ খেতে হবে।

অল্প পরিমাণে বেশিবার খাওয়া – একবারে বেশি পরিমাণে খেলে চলবে না। অল্প পরিমাণে খেতে হবে দফায় দফায়। খাদ্যাতালিকায় রাখতে হবে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট।

পানির অভাব নয় –  বমি হলে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়। সেটা হলে চলবে না। এর জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে তরল গ্রহন করতে হবে। তা বলে কফি খাবেন না যেন। সেটা কিন্তু বিষের মতো কাজ করবে। শরীর থেকে আরও জল শুষে নেবে।

আদাই ভারসা – গর্ভাবস্থায় বমিবমিভাব কমানোর মোক্ষম ওষুধ আদা। বমি পেলে মুখে আদার একটি ছোটো টুকরো ফেলে দিন। নিমেষের মধ্যে বমিভাব কেটে যাবে। তবে বেশি পরিমাণে আদা খেলে কিন্তু হিতেবিপরীত হতে পারে। তাই আপনার জন্য কতখানি আদা স্বাস্থ্যকর স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের থেকে জেনে নিতে পারেন।

অতিরিক্ত বমির কারণে গর্ভের বাচ্চার কি কোন ক্ষতি হয়?

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমির কারনে সাধারণত বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয় না। তবে অতিরিক্ত বমির কারণে যদি গর্ভাবস্থায় আপনার ওজন কমে যায়, তাহলে জন্মের সময় বাচ্চার ওজনও কম হওয়ার একটা ঝুঁকি থাকে।

এর ফলে যদি আপনার ওজন প্রথম ট্রাইমেস্টারে খুব বেশী একটা নাও বাড়ে তাতেও তেমন ভয়ের কোন কারণ নেই যদি না আপনি হাইড্রেটেদ থাকতে পারেন এবং অন্তত অল্প কিছু হলে খেতে পারেন। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আপনার কিছু দিনের মধ্যেই আপনার রুচি ফিরে আসবে এবং ওজন বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করবে।

তবে অতিরিক্ত বমি হওয়া এবং অনেক দিন ধরে বমি হওয়ার সাথে প্রি-টার্ম বার্থ, বাচার ওজন কম হওয়া এবং বাচ্চা তুলনামূলক ছোট হওয়ার সম্পর্ক থাকে। তাই এমনটা হলে বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করা উচিত।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment