গর্ভধারণের লক্ষন । যে ১২ টি উপসর্গ দেখা দিতে পারে

আপনি কি গর্ভবতী? আপনার পিরিয়ড মিস হওয়ার কাছাকাছি সময়ে বা এক দুসপ্তাহের মদ্ধে কিছু গর্ভধারণের লক্ষন দেখা দিতে পারে। গর্ভধারণের ৬ সপ্তাহের মদ্ধেই প্রায় ৬০ ভাগ মহিলার গর্ভধারণের কিছু লক্ষন দেখা দেয় এবং ৮ সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ মহিলা এসব লক্ষন অনুভব করতে পারেন।

আপনি যদি মাসিকের হিসাব না রাখেন অথবা আপনার মাসিক যদি নিয়মিত না হয়, তবে আপনি হয়তো বুঝতে পারবেন না কখন মাসিক হওয়া উচিত। এমন সময় আপনি হয়তো সময়মতো মাসিক না হবার কারণ নিয়ে চিন্তিত। তখন যদি আপনি নিচের কোন একটি উপসর্গ নিজের মাঝে দেখতে পান, তবে তা গর্ভধারণের লক্ষন হতে পারে। নিশ্চিত হতে নিচের উপসর্গগুলো মিলিয়ে নিতে পারেন এবং বাসায় বসেই প্রেগন্যান্সি কিট দিয়ে টেস্ট করে নিতে পারেন।

গর্ভধারণের লক্ষন

খাবারে অনীহাঃ

যদি আপনি নতুন গর্ভবতী হন, এটা অস্বাভাবিক নয় যে কিছু কিছু খাবারের প্রতি আপনি অনীহা বোধ করবেন যা আপনার রুচি কমিয়ে দিবে। এ সময় আপনি বিভিন্নি খাবারের ব্যাপারে গন্ধপ্রবন ও হয়ে উঠতে পারেন যদিও এর কারণ নিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি, এটা হয়ত আপনার দেহে দ্রুত এস্ট্রোজেন এর পরিমাণ বৃদ্ধির একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এছাড়াও আপনি হয়ত দেখতে পাবেন যে কিছু বিশেষ খাদ্য যা আপনি মজা করে খেতেন তা হঠাৎ করে আপনার কাছে একেবারেই অসহ্য লাগছে।

আবার অনেকের মুখে তামাটে স্বাদ লাগে। অনেকসময় মুখে দুর্গন্ধও লক্ষ্য করা যায়। আসলে গর্ভাবস্থার  শরীরে হরমোনের মাত্রার তারতম্যের কারণেই এই তফাৎ হতে পারে।

মেজাজের ওঠানামাঃ

গর্ভাবস্থায় মেজাজের পরিবর্তন একটি সাধারণ বিষয়, আংশিকভাবে এর কারণ হরমোনের পরিবর্তন যা আপনার নিউরোট্রান্সমিটারের (মস্তিস্কের রাসায়নিক বাহক) এর মাত্রাকে প্রভাবিত করে। হরমোনের আধিক্যের জেরে এই রাগ, এই দুঃখ, কখনও অবসাদ আবার পরমুহূর্তেই আনন্দে ভরে ওঠা, এই ধরনের মুড সুইং হতেই থাকে। প্রেগন্যান্সির প্রথম সপ্তাহে যেসব গর্ভধারণের লক্ষন দেখা যায় তার মধ্যে অন্যতম এটি।

প্রত্যেকেই এ পরিবর্তনে আলাদা ভাবে সাড়া প্রদান করে থাকে। মা-হতে-যাওয়া এমন অনেকে উচ্চমাত্রায় আবেগপ্রবণ হয়ে উঠতে পারেন, যা ভাল বা মন্দ উভয় রকমেরই হতে পারে, আবার অনেকে এসময় বিষন্নতা/দুশ্চিন্তায় ভোগেন

নোটঃ যদি আপনি দুঃখিত বা নিরাশ বোধ করেন বা আপনার দৈনিক দায়িত্ব সমূহ যথাযথ ভাবে পালন করতে না পারেন, বা আপনি নিজেকে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলতে পারেন বলে মনে করেন, তবে আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে অথবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করুন।

পেটে গ্যাস হওয়া বা ফোলা ভাবঃ

গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে অধিকাংশেরই পেটে গ্যাস তৈরি হয় এবং তা নির্গত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এছারাও পেট ফাঁপার অনুভুতি হতে পারে, অনেকটা সেরকম যা অনেক মহিলা তাদের পিরিয়ড শুরুর ঠিক পূর্বে অনুভব করে থাকেন। এটিও হয় হরমোনের পরিবর্তনের কারনে।এ কারণে কোমরের কাছে আপনার কাপড় সাধারণ সময়ের চেয়ে আরও বেশী আঁটসাঁট মনে হতে পারে, যদিও এখন পযৃন্ত আপনার জরায়ুতে তেমন কোন পরিবর্তন আসেনি।

নিজের বাড়িতে এ গ্যাসের কারণে তেমন সমস্যা না হলেও বাড়ির বাইরে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। তবে এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হওয়ায় তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়াঃ

হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে এরসময় শরীরে যে ক’টি পরিবর্তন আসে তার একটি হল রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি। হরমোন পরিবর্তনের কারণে আপনার দেহের কিছু ধারাবাহিক প্রক্রিয়া দ্রুত হয় যা আপনার কিডনিতে রক্ত প্রবাহের হার বাড়িয়ে দেয়। এর কারণে আপনার মুত্রথলি আরও দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়, যার ফলে আপনার আরও বেশী বার মূত্রত্যাগ করার প্রয়োজন হয়। প্রেগন্যান্সির প্রথম দুই-তিন সপ্তাহে ঘন ঘন প্রস্রাব পাওয়া খুব স্বাভাবিক।

যতই আপনার গর্ভাবস্থা এগিয়ে যেতে থাকে, শিশুর বড় হওয়ার সাথে সাথে জরায়ুর আকার বাড়তে থাকে। । এ সমস্যাটি আরও জটিল হয় যখন আপনার ক্রমবৃদ্ধিমান শিশু আপনার মুত্রথলিতে আরও বেশী চাপ দিতে থাকে।

ক্লান্ত লাগাঃ

হঠাৎ ক্লান্ত বোধ করছেন? কিংবা ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়ছেন? কেউ এটা নিশ্চিত করে জানেন না কি কারণে গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে এই ক্লান্ত ভাব দেখা দেয়, তবে সম্ভবত প্রজেস্টেরন হরমোনের মাত্রার দ্রুত বৃদ্ধি আপনার ঘুম ঘুম ভাবের জন্য দায়ী। এছাড়াও মর্নিং সিকনেস ও রাতে ঘুম থেকে উঠে বার বার প্রস্রাব  করাও আপনার ক্লান্তিবোধ বাড়াতে কাজ করে

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার শুরুর সাথে সাথে আপনার এই ক্লান্তিবোধ কেটে গিয়ে আগের চেয়েও বেশি ভাল বোধ করবেন। অবশ্য আপনার গর্ভাবস্থার শেষ দিকে এই ক্লান্তিবোধ আবার ফিরে আসে, কারণ তখন স্বাভাবিকভাবেই  আপনি অনেক বেশি ওজন বহন করবেন এবং সে সময়ের বিশেষ কিছু গরভকালীন সমস্যা আপনার রাতের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবে।

স্তনে পরিবর্তনঃ

গর্ভাবস্থার প্রথম দিকের একটি চিহ্ন হল সংবেদনশীল, স্পর্শকাতর বক্ষ যা হরমোনের মাত্রার বৃদ্ধির কারণে হয়ে থাকে। আপনার পিরিয়ড শুরুর পূর্বে আপনি যেমন বোধ করেন আপনার বক্ষের স্পর্শকাতরতা এবং স্ফীতি তার চেয়ে বেশী ভাবে অনুভুত হতে পারে। গর্ভাবস্থার প্রথম ট্রাইমেস্টারের পরে আপনার এ ধরণের অস্বস্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে, কারণ আপনার দেহ হরমোনের পরিবর্তনের সাথে ততদিনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে।

গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়ার পর স্তনের আকারে পরিবর্তন আসা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে স্তনের বোঁটায় (Nipple )পরিবর্তন আসে। বোঁটা চেপে ধরলে একধরনের রস নিঃসৃত হতে দেখা যায়। এটাও এক ধরনের গর্ভধারণের লক্ষন। ক্রমেই স্তনের আকার বড় হতে পারে এবং ব্যাথা হতে পারে (অনেকের মাসিকের সময়ও এমন হতে পারে), সুঁড়সুঁড়িও অনুভূত হতে পারে।

হাল্কা রক্তপাত বা স্পটিং

কিছু কিছু মহিলা তারা গর্ভবতী কিনা তা জানার আগেই হাল্কা স্পটিং লক্ষ করে থাকেন। অনেকে এটাকে মাসিক মনে করতে পারেন। এটা ওভুলেশনের এক থেকে দু সপ্তাহের মধ্যে হতে পারে। এটাকে ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লীডিং বলে কারণ জরায়ুতে ভ্রুন স্থাপিত বা ইমপ্লেনটেশন এর সময় এ রক্তপাত হতে পারে যে প্রক্রিয়াটি ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার ৬ দিনের মধ্যেই শুরু হয়।

যদি পিরিয়ড শুরু হওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে একদিন বা দুদিন এ ধরনের স্পটিং দেখা যায় তবে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করে দেখতে পারেন। যদি রেসাল্ট নেগেটিভ আসে তবে কিছুদিন অপেক্ষা করুন। যদি যথাসময়ে পিরিয়ড শুর না হয় তবে আবার টেস্ট করুন।

নোটঃ প্রতি ৪ জন মায়ের ১ জনের প্রথম ট্রাইমেস্টারের শুরুর দিকে হালকা রক্তপাত হয়। এটি কোন সমস্যার কারণ নাও হতে পারেই। কিন্তু যেহেতু রক্তপাত হওয়া অন্য আরও জটিলতার লক্ষন হতে পারে তাই এটি দেখা গেলেই দেরী না করে ডাক্তারকে জানানো উচিত যাতে তিনি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন যে সবকিছু ঠিক আছে কিনা।গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ কোন গুরুতর সমস্যার কারণ নাও হতে পারে আবার তা কোন মারাত্মক জটিলতারও লক্ষন হতে পারে, যেমন- এক্টপিক প্রেগন্যান্সি, গর্ভপাত বা প্লাসেন্টা জনিত কোন সমস্যা ইত্যাদি।

বমি বমি ভাব, গন্ধের প্রতি সংবেদনশীলতাঃ

কনসিভ করার ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পর থেকে মর্নিং সিকনেস (সকালে ঘুম থেকে উঠার পর ক্লান্ত লাগা ও বমির ভাব হওয়ার প্রবনতা) দেখা দেয়। বমি বমি ভাব শুধু সকালেই নয় এমনকি দুপুরে ও রাতেও হতে পারে। গর্ভধারণের ৬ সপ্তাহ সময় থেকে সাধারণত মর্নিং সিকনেস বা বমি বমি ভাব দেখা দেয়। কিন্তু এটা কখনো কখানো ৪ সপ্তাহ থেকেও শুরু হতে দেখা যায়। পরবর্তী এক মাস ধরে সমস্যাটা আরো বেশী খারাপের দিকে যেতে থাকে। অর্ধেক মায়েদের ক্ষেত্রে মর্নিং সিকনেস ১৪ সপ্তাহ নাগাদ পুরোপুরি ঠিক হয়ে যায়। অন্যদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা ঠিক হতে আরও এক মাস সময় লাগতে পারে। তবে পুরো গর্ভকালীন সময় জুড়েই বমি বমি ভাব আসা যাওয়া করতে পারে।

পুরো গর্ভকালীন সময় জুড়ে মর্নিং সিকনেস সাধারণত থাকেনা তবে কিছু কিছু মায়ের ক্ষেত্রে তা হতে পারে। খুব অল্প সংখ্যক মায়েদের ক্ষেত্রে মর্নিং সিকনেস দ্বিতীয় এমনকি তৃতীয় ট্রাইমেস্টারেও থাকতে পারে। আবার কিছু ভাগ্যবান মায়েদের পুরো গর্ভধারণের সময়জুড়ে এর কোন লক্ষণই দেখা যায়না।

পিরিয়ড মিস হওয়াঃ

গর্ভধারণের সবচেয়ে প্রচলিত ও তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষণ হলো পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়া। প্রতিমাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নারীদের পিরিয়ড হয়ে থাকে (সাধারণত ২৮ দিন পর পর)। সেক্ষেত্রে, খেয়াল রাখুন আপনার পিরিয়ড ঠিক সময়ে হচ্ছে কিনা। যদি ২৮ দিন পর পিরিয়ড না হয়, তাহলে হয়তো আপনি গর্ভধারণ করেছেন। অন্যান্য লক্ষণগুলো মিলিয়ে নিতে পারেন তখন এবং সাথে প্রেগন্যান্সি কিট দিয়ে পরীক্ষা করে নিতে পারেন।

কোনো নারীর যদি আগে থেকেই অনিয়মিত মাসিক হয়ে থাকে। তাদের ক্ষেত্রে গর্ভধারণের এ লক্ষণটি একটু সমস্যার সৃষ্টি করবে। ঠিক কবে থেকে মাসিক বন্ধ হলো তা সনাক্তকরণ একটু কঠিনই হবে। যদি আপনার পিরিয়ড নিয়মিত না হয় অথবা আপনি আপনার ঋতুচক্রের হিসাব ঠিকমত না রাখতে পারেন, তবে আপনার পিরিয়ড সময়মত শুরু হয়নি তা বুঝতে পারার পূর্বেই বমিভাব এবং বক্ষের স্পর্শকাতরতা এবং বাথরুমে ঘন ঘন যাওয়া আপনার গর্ভধারণের পূর্বাভাস হতে পারে।

শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চাইতে বেড়ে যাওয়াঃ

যদি আপনি আপনার দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা লিপিবদ্ধ করে রাখেন এবং দেখেন যে আপনার দেহের তাপমাত্রা অন্তত ১৮ দিন ধরে স্বাভাবিকের চাইতে বেশী আছে, তবে তা গর্ভধারণের লক্ষন হতে পারে।

মাথা ধরাঃ

গর্ভধারন করলে মাথার যন্ত্রণা হতে পারে। গর্ভধারণ করার প্রথম সপ্তাহের শুরুতেই মাথা ব্যথা শুরু হতে পারে। হরমোনের মাত্রা শরীরে বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই সমস্যা হয়।

কোষ্ঠকাঠিন্য

গর্ভধারণের লক্ষন আরেকটি হলো কোষ্ঠকাঠিন্য। এটি হরমোনের মাত্রার তারতম্যের কারণেই হয়। হরমোনের বৃদ্ধির কারনে শরীরের হজম প্রক্রিয়ার গতি কমে যায় যার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে।

গর্ভধারণের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য

বাসায় প্রেগনেন্সি টেস্ট

দোকানে যেসব টেস্টিং কিট পাওয়া যায় সেগুলো দিয়ে পিরিয়ড মিস হওয়ার অন্তত এক সপ্তাহ পরে টেস্ট না করলে ভুল রেসাল্ট আসতে পারে। তাই যদি পিরিয়ড মিস হওয়ার এক সপ্তাহের মদ্ধেই আপনি টেস্ট করেন এবং নেগেটিভ রেসাল্ট পান তবে কিছুদিন অপেক্ষা করে আবার পরীক্ষা করুন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনার গর্ভধারণের লক্ষন দেখে গর্ভধারনের বিষয়টি নিশ্চিত হবার বেশ আগে থেকেই আপনার বাচ্চার গঠন শুরু হয়, তাই যখন থেকেই আপনি এ সুসংবাদ জানার জন্য অপেক্ষা করছেন তখন থেকেই নিজের যত্ন নিন। আর যখনই ইতিবাচক ফল পাবেন, সাথে সাথে আপনার গাইনি ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

আরও পড়ুনঃ বাসায় বসে প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিভাবে করবেন। 

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

One Thought to “গর্ভধারণের লক্ষন । যে ১২ টি উপসর্গ দেখা দিতে পারে”

  1. Taskin

    period miss hoye 20 days hoye gese. 6 7dn age period howar kisu ta lokkhn dekha diyesilo but akhno hoy ne. sorir a o kono problem dekha dey ne. akhn ki kora uchite. please help korben….

Leave a Comment