গর্ভধারণের প্রস্তুতি । যে ১০ টি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরী

গর্ভধারণ একটি জটিল প্রক্রিয়া। একটি সুস্থ স্বাভাবিক বাচ্চা প্রসবের জন্য গর্ভাবস্থায় প্রতিটি মুহূর্তে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। তবে শুধু গর্ভাবস্থায় নয়, এর প্রস্তুতি শুরু হওয়া উচিৎ গর্ভধারণের আগে থেকেই। গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে অন্তত মাস দুয়েক আগে থেকেই কিছু কিছু বিষয়ে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করা উচিৎ। এতে করে সুস্থ স্বাভাবিক গর্ভধারণ এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বাচ্চা প্রসবের সম্ভাবনা অনেক গুনে বেড়ে যায়। নিচে এমনি কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে যা কনসিভ করার আগে থেকেই করা উচিৎ।

 

১। বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করুন

গর্ভধারণের পরিকল্পনা করার সাথে সাথেই একজন বিশেষজ্ঞের সাথে সে ব্যাপারে আলোচনা করে নিন এবং প্রি-কনসেপশন চেকআপ করিয়ে নিন। এক্ষেত্রে আপনার ডাক্তার আপনার নিজের এবং পরিবারের মেডিকেল হিস্ট্রি জানতে চাইবেন। আপনার বর্তমান স্বাস্থ্য তিনি চেক করে দেখবেন এবং কোন ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট খাচ্ছেন কিনা সে সম্পর্কে জানতে চাইবেন। কিছু কিছু ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট গর্ভাবস্থায় নিরাপদ নয়, আবার কিছু কিছু ওষুধ কনসিভ করার আগেই বন্ধ করতে হয় বা পাল্টে ফেলতে হয় কারণ তা আপনার শরীরের চর্বিতে জমে থাকে এবং সমস্যার সৃষ্টি করে।

আপনার ডাক্তার আপনাকে ডায়েট, ব্যায়াম এবং কোন বাজে অভ্যাস থাকলে (ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি) সে সম্পর্কে পরামর্শ দিবেন। ডাক্তার আপনাকে মাল্টিভিটামিন খাওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন, এছাড়াও আপনার সব টীকা নেয়া আছে কিনা সে সম্পর্কে জানতে চাইবেন বিশেষ করে আপনি চিকেনপক্স বা রুবেলা প্রতিরোধী নাকি তা চেক করে দেখবেন।  আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে এ সময় তাও আপনি ডাক্তারের সাথে আলোচনা করতে পারেন। এছাড়াও ডাক্তার আপনাকে অন্য বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করবেন যদি আপনার কোন মেডিকেল কন্ডিশন থাকে, যেমন- অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, ব্লাডপ্রেসার ইত্যাদি যা গর্ভধারণের আগ থেকেই নিয়ন্ত্রনে রাখতে হয়।

এরপর ডাক্তার পরীক্ষা করবেন যে,আপনি সন্তান ধারণ করতে পারবেন কিনা?মানে বন্ধ্যা কি না তা পরীক্ষা করেন।অনেক কারণে একটি দম্পতি বন্ধ্যা হতে পারে।মহিলা ,পুরুষ উভয়ই এর জন্য দায়ী হতে পারে।এজন্য যথাযথ পরীক্ষা করে সমস্যা ধরা পড়লে,যার সমস্যা তার চিকিত্‍সা করাতে হবে।প্যাপ টেস্ট করাতে হবে,জরায়ুমুখে কোন সমস্যা আছে কিনা তা জানার জন্য।কেনোনা একটি সার্থক প্রসব সুস্থ জরায়ু ও গর্ভাশয়ের উপর নির্ভর করে।

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম গর্ভধারণে কিভাবে প্রভাব ফেলতে পারে?

২। Genetic Career Screening করিয়ে নিন

আপনার ডাক্তার আপনি এবং আপনার সঙ্গী দুজনকেই হয়তো Genetic Career Screening এর পরামর্শ দেবেন যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় আপনাদের দুজনের কেউ কি মারাত্মক বংশগত রোগ, যেমন- cystic fibrosis, sickle cell disease বা অন্যান্য রোগের বাহক কিনা। যদি আপনারা দুজনেই এসব রোগের বাহক হন তবে শিশুর এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রতি ৪ জনে ১ জন।

এসব বংশগত রোগে শিশুরা তখনই আক্রান্ত হয় যখন সে বাবা মা দুজনের কাছ থেকেই একটি করে ত্রুটিপূর্ণ জিন পায়। এসব রোগের বাহকের মধ্যে রোগের কোন লক্ষন থাকেনা।

৩। ফলিক এসিড নেয়া শুরু করুন

গর্ভধারণের আগে থেকেই ফলিক এসিড নেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। Centers for Disease Control and Prevention (CDC) এর মতে গর্ভধারণের অন্তত একমাস আগে থেকে শুরু করে প্রথম ট্রাইমেস্টারে যদি প্রতিদিন নিয়মিত ৪০০ মাইক্রোগ্রাম করে ফলিক এসিড গ্রহন করা হয় তবে গর্ভের শিশুর neural-tube defects যেমন- spina bifida হওয়ার সম্ভাবনা ৫০-৭০ ভাগ কমে যায়। ফলিক এসিড আরও অনেক জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সাহায্য করে।

আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে ফলিক এসিড শুরু করুন। তিনি হয়তো আপনাকে প্রি-ন্যাটাল মাল্টিভিটামিন দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে লেভেলে চেক করে দেখুন আপনার দৈনিক ফলিক এসিডের চাহিদা পূরণ হচ্ছে কিনা।

৪। ধূমপান, মদ্যপান বা ড্রাগের অভ্যাস থাকলে তা পরিহার করুন

যদি এসব বদভ্যাস থাকে তবে তা বন্ধ করার এখনি সময়। অনেক গবেষণাতেই দেখা গেছে এসব অভ্যাসের ফলে গর্ভপাত, সময়ের আগেই প্রসব, বাচ্চার ওজন কম থাকা ইত্যাদির সম্ভাবনা থাকে। আরও দেখা গেছে ধূমপানের ফলে মেয়েদের উর্বরতা হ্রাস পায় এবং ছেলেদের শুক্রাণু কমে যায়। এমনকি পরোক্ষ ধূমপানের ফলেও গর্ভধারণের ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এসব অভ্যাস ত্যাগ করা খুব একটা সহজ নয়। তাই এ ব্যাপারে আপনারের ডাক্তারের সাথে আলোচনা করতে পারেন।

৫। সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন

যদিও এখন থেকেই আপনাকে দুজনের খাবার খেতে হবেনা, কিন্তু এখন থেকেই স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন যাতে সুস্থ গর্ভধারণের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি আপনার শরীরে সঞ্চিত হতে থাকে। এখন থেকেই প্রচুর পরিমানে শাকসবজি, ফলমূল খাওয়ার চেষ্টা করুন। জাঙ্ক ফুড বাদ দিন। ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন দুধ, দই,  বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন- শিম, মটরশুঁটি, বাদাম, মাংস ইত্যাদি খাবার অভ্যাস গড়ে তুলুন। গর্ভধারণের আগে থেকে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।

৬। ক্যাফেইন গ্রহনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রন করুন

গর্ভাবস্থায় কতটুকু ক্যাফেইন নিরাপদ তার কোন নির্দিষ্ট ধারণা নেই। তবে বিশেশজ্ঞরা মনে করেন যেসব মহিলা কনসিভ করার চিন্তা করছেন তাদের বেশী পরিমানে ক্যাফেইন গ্রহন করা উচিৎ নয়। কারণ বেশ কিছু গবেষণায় অতিরিক্ত ক্যাফেইনের সাতে গর্ভপাতের সম্পর্ক দেখা গেছে। মনে রাখবেন ক্যাফেইন মানেই শুধুমাত্র চা, কফি নয়। সোডা, ব্ল্যাক টি, গ্রীন টি এবং বিভিন্ন ব্যাথার ওষুধেও ক্যাফেইন থাকে। তাই কিছু খাওয়ার আগে লেবেল চেক করুন।

৭। ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখুন

সঠিক ওজন কনসিভ করার জন্য সহায়ক। কিছু কিছু মহিলার ক্ষেত্রে BMI কম বা বেশী হলে গর্ভধারণ করা কঠিন হয়ে পরে। ওজন ঠিক থাকা গর্ভকালীন সময়েও অনেক উপকারী। ওজন বেশী হলে গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবের সময় অনেক জটিলতা দেখা দেয়। এ ছাড়াও যাদের ওজন কম থাকে এবং গর্ভাবস্থায়ও  ওজন ঠিক মতো বাড়েনা তাদের ক্ষেত্রে বেশীরভাগ সময় কম ওজনের বাচ্চা প্রসব করতে দেখা গেছে। তাই ওজন বেশী থাকলে বা কম হলে তা নিয়ন্ত্রনে আনার চেষ্টা করুন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।

আপনার ওজন যতই হোক দিনে অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করার অভ্যাস করে তুলুন। এই অভ্যাস আপনার শরীরকে ঝরঝরে ও সুস্থ সবল রাখবে, আপনি থাকবেন নীরোগ, সন্তান ধারণ ও ডেলিভারিকে অনেকটাই সহজ করে দেবে।

৮। দাঁতের যত্ন নিন

গর্ভধারণের আগেই দাঁতের যত্ন নেয়া শুরু করতে ভুলবেন না। গর্ভাবস্থায় নারীর দেহে হরমোনজনিত কিছু পরিবর্তনের কারণে দাঁত ও মাড়িতে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এ প্রতিক্রিয়ার ফলে প্রায় ৫০-৭০% গর্ভবতী মাড়ির প্রদাহে আক্রান্ত হন। মাড়ির এ প্রদাহকে চিকিত্সাবিজ্ঞানের ভাষায়, ‘প্রেগন্যান্সি জিনজিভাইটিস’ বলা হয়। এ সময় দাঁত ও মাড়িতে জমে থাকা খাদ্যকণা, যা হরমোনের প্রভাবে খুব সহজেই ডেন্টাল প্ল্যাকে রূপান্তরিত হয়।আর এসব সমস্যার ফলে গর্ভের বাচ্চার স্বাভাবিক বৃদ্ধিতেও ব্যাঘাত ঘটে।

তবে সুসংবাদ হোল- যারা গর্ভধারণের আগ থেকে এ ব্যাপারে সচেতন থাকেন তাদের ক্ষেত্রে এসব জটিলতা অনেক কম দেখা যায়। যেহেতু গর্ভকালীন সময় দাঁতের চিকিৎসার জন্য উপযোগী নয় তাই গর্ভধারণের আগেই ডেন্টিস্ট এর সাথে পরামর্শ করে নিন।

৯। নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখুন

গবেষণামতে যেসব মহিলা বিষণ্ণতায় ভোগেন তাদের অন্যদের তুলনায় গর্ভধারণে বেশী সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রত্যেকটি গর্ভধারণে ইচ্ছুক মহিলার বিশেষ করে যাদের নিজস্ব বা পারিবারিকভাবে বিষণ্ণতার হিস্ট্রি আছে তাদের গর্ভধারণের আগে অন্তত একবার মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিৎ। যদি আপনার বিষণ্ণতার কোন লক্ষন থাকে, যেমন- কোন কিছুতে উৎসাহ বোধ না করা বা আনন্দ না পাওয়া, খাবারে অরুচি, ঘুমের সমস্যা, সারাক্ষণ নিরাশ থাকা বা নিজেকে অপদার্থ মনে হওয়া ইত্যাদি, তবে আপানার ডাক্তারের সাথে আলাপ করুন। তিনি কোন থেরাপিস্ট বা সাইক্রিয়াটিস্ট এর কাছে আপনাকে রেফার করবেন।

১০। বিশ্রাম এবং ঘুমের দিকে খেয়াল রাখুন

অতিরিক্ত স্ট্রেস এবং ঘুমের অভাব দুটোই ইনফার্টিলিটির সাথে সম্পর্কিত। তাই তাই যথেষ্ট পরিমানে ঘুমানোর চেষ্টা করুন এবং চাপমুক্ত থাকুন। যদিও স্ট্রেস সরাসরি ইনফার্টিলিটির সাথে সম্পর্কিত না তবু এর ফলে এমন কিছু হয় যা কনসিভ করতে বাঁধার সৃষ্টি করে, যেমন- খাবারে অরুচি, ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, ইনসমনিয়া ইত্যাদি।

 

সবশেষে মনে রাখবেন পৃথিবীতে সবকিছু প্ল্যান অনুযায়ী হয়না কারণ যে কোন সময় যে কোন কিছুই ঘটতে পারে। তাই এসব প্রস্তুতি নেয়ার সাথে সাথে নিজেকে সামনে যা ঘটবে তার জন্য  মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখা উচিত।

সবার জন্য শুভ কামনা।

Related posts

Leave a Comment