গর্ভকালীন সময়ে প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারনা

নারীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় হল গর্ভাবস্থা। শুধু নারী নয়, তার শিশুর জীবন কীভাবে গড়ে উঠবে তা অনেকটাই নির্ভর করে এ সময়ের ওপরে।দুঃখজনক হলেও সত্যি, যে সময়টাতে নিবিড় পরিচর্যা এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশের মাঝে গর্ভবতী মায়ের থাকা উচিত সে সময়টাতেই কিছু ভুল ধারণার কারণে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।

প্রাচীন এবং অকেজো কিছু ধারণা এখনও কিছু মানুষ আঁকড়ে ধরে আছেন। এগুলো হতে পারে ধর্মীয়, হতে পারে পারিবারিক কোনো প্রথা। পরিবারের প্রবীণ মানুষের কাছে এসব প্রথার মূল্য বেশি।তাদের মাথার ভেতরে এসব প্রথা এমনভাবে গেঁড়ে বসে আছে যে, গর্ভবতী মা এবং অনাগত শিশুর ক্ষতি হতে পারে জেনেও তারা এগুলো মেনে চলার ওপর জোর দেন। এর ফলে মা এবং শিশু উভয়েরই ক্ষতি হয়ে যায়।

আর তাই, আমাদের আজকের আলোচনা সেইসব হবু মায়েদের জন্য, যারা গর্ভকালীন অবস্থায় নানা ধরনের পরামর্শ ও বাধা নিষেধের মধ্যে পড়ে বুঝতে পারছেন না, কোনটি সত্যিকারের কার্যকরী পরামর্শ আর কোনটি নেহায়েত ভ্রান্ত ধারণা।

গর্ভবতী মায়ের খাবার

গর্ভবতী মা কি খেতে পারবেন আর কি খেতে পারবেন না তা নিয়ে রয়েছে প্রচুর কুসংস্কার। খাসির মাংস খেলে বাচ্চার শরীরে লোম বেশি হবে, সামুদ্রিক মাছ খেলে ক্ষতি হবে, জোড়া কলা খেলে যমজ বাচ্চা হবে, বেশি খাবার খেলে বাচ্চা বড় হয়ে জন্মদানের সময়ে ক্ষতি হবে ইত্যাদি। আসুন দেখি ঠিক কি কারণে এ কুসংস্কার ক্ষতি করছে গর্ভবতী মায়ের।

  • খাসির মাংস (বা অন্য যে কোনো খাবার) খাওয়ার সঙ্গে বাচ্চার শরীরে লোম বেশি হওয়ার সম্পর্ক নেই। বাচ্চার শারীরিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হয় তার পিতামাতার জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে। অনেকের গরুর মাংসে অ্যালার্জি থাকে, তারা খাসির মাংস খান। কিন্তু সেটাও যদি খাওয়া বন্ধ হয়ে যায় তাহলে মা এবং শিশু উভয়েই প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হন।
  • সামুদ্রিক মাছের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। উপরন্তু এতে থাকে উপকারি ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যা বাচ্চার মস্তিষ্ক গঠনে ভূমিকা রাখে।
  • জোড়া কলা খেলে যমজ বাচ্চা হবে- এটা নিতান্তই হাস্যকর কথা এবং এর পেছনে কোনো যুক্তি নেই। বাচ্চা যমজ হবে কি হবে না এটা আগে থেকে বলা খুবই কঠিন।

গর্ভবতী মায়ের কিছু অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নইলে বাচ্চা এবং মা উভয়েই পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং জন্মদানের সময় বিভিন্ন রকমের জটিলতা দেখা দিতে পারে। র্ভাবস্থায় পুষ্টি খুব জরুরি। মায়ের যা খেতে রুচি হয় তা-ই খেতে দিন। কোনো রকমের কার্পণ্য করবেন না। কোনো খাবার খেতে যদি ডাক্তার মানা করে দেয় তাহলেই শুধু সে খাবার বাদ দেয়া যাবে।

আরও পড়ুনঃ গর্ভাবস্থায় যেসব খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

অনেকের ধারনা গর্ভকালীন সময়ে মা যদি ভিটামিন খায় তবে নাকি গর্ভের বাচ্চা বেশি বড় হয়ে যায়। তাতে বাচ্চা প্রসবের সময় প্রসবে মার বেশি কষ্ট হয়, প্রসবে সমস্যা হতে পারে তাই মাকে ভিটামিন না খাবার পরামর্শ দেয় তারা। এটা ভুল ধারনা। আয়রন, ফলিক অ্যাসিড এগুলো বরং বাচ্চার কিছু জন্মগত ত্রুটি না হবার ক্ষেত্রে বিশেষ ভুমিকা রাখে।

আবার অনেকের মতে, একজন গর্ভবতী মাকে দুজনের খাবার খাওয়া উচিত। এটাও ভুল। কারণ অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের সঙ্গে মুটিয়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। অতিরিক্ত ওজনের মায়েদের ক্ষেত্রে প্রসবকালীন জটিলতা হবার সম্ভাবনা বেশি। প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি নারীর দৈনিক ২১শ’ ৬০ কিলো- ক্যালরি খাদ্যের প্রয়োজন হলেও একজন গর্ভবতীর প্রয়োজন হয় তার চেয়ে ৩৫০ কিলো ক্যালরি খাদ্যের। তা না হলে শিশু অপুষ্টিতে ভুগে ও কম ওজন নিয়ে শিশু জন্মায়। তবে খাবার যেমনই হোক না কেন, সেটা হতে হবে পুষ্টিকর। এ জন্য গর্ভবতী মায়ের খাবারে খাদ্যের সব কয়টি উপাদানের উপস্থিতি থাকতে হবে।

আরও পড়ুনঃ গর্ভাবস্থায় মায়ের খাবার ও পুষ্টি

ব্যায়াম থেকে বিরত থাকতে হবে 

আপনি হয়তো শুনে থাকবেন, গর্ভবতী নারীদের ব্যায়াম করা উচিৎ নয়, বরং নয় মাস পর্যন্ত একটানা বিশ্রাম করতে হবে। কথাটি মোটেও সত্যি নয়, বরং ডাক্তাররা বলেন, হবু মায়েদের ছোটখাট ব্যায়াম করা জরুরি। একটু হাঁটাহাঁটির পাশাপাশি ঘরের হালকা কাজকর্ম করায় কোনো ক্ষতি নেই। তবে হ্যাঁ, মনে রাখতে হবে গর্ভবতী মায়েদের জন্য অতিরিক্ত ব্যায়াম ও ঘরের ভারী কাজ করা সম্পূর্ণ নিষেধ।

প্রকৃতপক্ষে, হবু মায়েরা যদি হালকা শরীরচর্চা করেন, তবে সেটা গর্ভের ভ্রুণের জন্যও যথেষ্ট উপকারী। গর্ভাবস্থায় হালকা ব্যায়াম করার ফলে হবু মায়ের শরীর চনমনে থাকে, রাতে ভালো ঘুম হয় এবং তিনি কম বিষণ্নতায় ভোগেন। ২০১৭ সালে আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় জানানো হয়, গর্ভাবস্থায় শারীরিক ব্যায়াম মা এবং শিশু উভয় জন্য প্রধান শারীরবৃত্তীয় কাজ।

হাঁটাহাঁটি, সাঁতার, সাইক্লিং ও হালকা ধরনের ব্যায়াম হবু মায়েদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ওয়ার্ক-আউট। অবশ্যই কঠিন ও তীব্র ধরনের ব্যায়ামগুলো এড়িয়ে চলুন এই অবস্থায়।  তবে অবশ্যই মনে রাখতে হবে অ্যাজমা, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের ব্যায়াম করার ক্ষেত্রে কিছু বাঁধা নিষেধ থাকতে পারে, আর তাই এক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

আরও পড়ুনঃ গর্ভাবস্থায় শরীরচর্চা

গর্ভাবস্থায় কফি পান করা যাবে না

সকাল বেলায় এক কাপ কফি কি আপনার খুব প্রিয়? কিন্তু আপনি মা হবেন, এটি জানার সঙ্গে সঙ্গে আপনার জন্য কফি সম্পূর্ণ নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে! কারণ, কফি থেকে গর্ভপাত, নির্ধারিত সময়ের পূর্বে জন্মদান এবং কম ওজন সম্পন্ন বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আপনি আপনার সকালের খুব পছন্দের এক কাপ কফি খাবারের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়ার আগে একবার নিশ্চিত হয়ে নিন, কফি কি সত্যিই এতটা বিপজ্জনক?

আপনাকে সম্পূর্ণরূপে কফি বাদ দেওয়ার দরকার নেই। তবে এনএইচএস (National Health Service) থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, দিনে ২০০ মিলিগ্রামের বেশি কফি পান করা যাবে না। অর্থাৎ, আপনি দিনে এক কাপ কফি নিশ্চিন্তে পান করতে পারেন এবং এতে করে আপনার গর্ভের সন্তানের কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা নেই।

চাঁদ-সূর্যের অবস্থান

চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, ঠিক দুপুরবেলা, সন্ধ্যাবেলা, মাঝরাত এসব সময়ে বাইরে বের হওয়া যাবে না- এমন একটা প্রথা তো আপনারা জানেন, তাই না? এর কতটুকু ভিত্তি আছে বলে আপনাদের মনে হয়? উত্তর- একটুও না। গ্রহণের সময়ে কাজ করা যাবে না, খাওয়া যাবে না- এমন প্রথা একেবারেই ঠিক নয়।

সূর্যগ্রহণ যদি কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং এমন অবস্থায় যদি গর্ভবতী নারীর ক্ষুধা পায় তখন কি করবেন? এমন হাস্যকর একটা প্রথার জন্য তাকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাখা হবে রীতিমতো অন্যায়। আর জরুরি প্রয়োজনে দিনের যে কোনো সময়ে তাকে বাইরে যেতে হতে পারে। প্রথার দোহাই দিয়ে তাকে আটকানোটাও একেবারেই অনুচিত।

আরও পড়ুনঃ  গর্ভাবস্থায় চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণের প্রভাব।

গরম পানিতে গোসল 

অনেকে বলেন, গর্ভাবস্থায় হট শাওয়ার বা গরম পানিতে গোসল করা আরামদায়ক । আসলে কথাটি কতটুকু সত্যি এবং যুক্তিসঙ্গত?

এটি সত্যি যে, গর্ভাবস্থায় গরম পানি দিয়ে গোসল না করাই উত্তম। তবে কুসুম গরম পানিতে আপনি পাঁচ থেকে ছয় মিনিট সময় নিয়ে গোসল করতেই পারেন। তবে গর্ভাবস্থায় গরম পানির মধ্যে কোনো অবস্থাতেই বসে থাকা বা দীর্ঘ সময় ধরে গরম পানি শরীরে ঢালা ঠিক নয়। খেয়াল রাখতে হবে যাতে করে আপনার শরীরের তাপমাত্রা কোনোভাবেই ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উপরে না যায়।

দীর্ঘ সময় ধরে গরম পানিতে গোসল করলে ও বাথ টাবে বসে থাকলে আপনার শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা নিউরাল ডিসঅর্ডারের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই হবু মায়েদের উচিৎ অতিরিক্ত গরম পানি এবং অনেক সময় ধরে গরম পানিতে গোসল না করা, তবে কুসুম গরম পানিতে অল্প সময়ের জন্য গোসল করায় কোনো বাধা নেই।

গর্ভাবস্থায় সি-ফুড থেকে দূরে থাকতে হবে

বেশিরভাগ হবু মায়েদের পরামর্শ দেওয়া হয় যে, গর্ভাবস্থায় কোনোভাবেই সি-ফুড খাওয়া যাবে না। এটি একদম ভ্রান্ত ধারণা, বরং উচ্চ মাত্রায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ মাছ গর্ভবতী মা ও তার অনাগত সন্তানের জন্য বেশ উপকারি। কিছু কিছু সামুদ্রিক মাছে উচ্চ মাত্রার মারকারি থাকে। গর্ভাবস্থায় এসব মাছ এড়িয়ে চলা উচিত।

যে মায়েরা গর্ভকালীন অবস্থায় কমপক্ষে বারো আউন্স সি-ফুড গ্রহণ করে থাকেন, তাদের শিশুরা উচ্চতর মৌখিক বুদ্ধিবৃত্তি, উন্নত সামাজিক ও যোগাযোগ দক্ষতা সম্পন্ন হয়।

বাচ্চার লিঙ্গ

বাচ্চা মেয়ে হবে না ছেলে হবে, এটা ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়া বলতে পারা যায় না। অথচ আমাদের দেশে কিছু প্রচলিত ধারণা আছে- বাচ্চা ছেলে হলে মায়ের চেহারা খারাপ হয়ে যাবে। বাচ্চা মেয়ে হলে চেহারা উজ্জ্বল হয়ে যাবে। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো মিলে যেতে দেখা গেলেও ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলে দেয়া ঠিক না। আর আরেকটি খুব প্রচলিত এবং ক্ষতিকর কুসংস্কার আছে। তা হল, বাচ্চা ছেলে হবে না মেয়ে হবে তার পুরো দায় মায়ের। একেবারেই ভুল কথা।

বাচ্চার লিঙ্গ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে বাবার ওপরে। বাবার শরীর থেকে আসা শুক্রাণুর মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় বাচ্চা ছেলে হবে না মেয়ে হবে। আমাদের দেশে মেয়ে সন্তান জন্মালে এখনও মা’কে দোষারোপ করা হয়। আমরা বুঝতে চাই না যে মেয়ে সন্তান জন্ম নেয়াটা একটা আশীর্বাদ। আমরা এটাও বুঝতে চাই না যে বাচ্চার লিঙ্গ নির্ধারণে মায়ের কোনো হাত নেই।

অনেক সময়ই বাড়ির বয়স্ক সদস্যদের দেখবেন, গর্ভবতী মহিলাকে দেখেই তাঁর ছেলে হবে না মেয়ে, তা জোর গলায় বলে দেন। এর পেছনে রয়েছে এক বদ্ধমূল বিশ্বাস। তা হল অন্তঃসত্ত্বা মহিলার স্ফীত পেটটি যদি একটু নিচের দিকে ঝুলে থাকে, তা হলে গর্ভের সন্তানটি ছেলে। আর উপরের দিকে উঠে থাকলে তা মেয়ে। আসলে কিন্তু এর কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

আরও পড়ুনঃ সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে? প্রচলিত কুসংস্কার ও বাস্তবতা 

গর্ভাবস্থায় যৌন সম্পর্কে গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি হতে পারে। 

গর্ভের যে অংশে সাধারণ ভাবে ভ্রুণের অবস্থান হয়, তা চারপাশে সাতটা পর্দা দিয়ে ঘেরা থাকে। ইউটেরাসের পর্দা এতটাই মোটা ও শক্ত হয় যে সহজে কিছু সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। তাই কোনও কারণে ডাক্তার বারণ না করলে গর্ভাবস্থায় যৌন সম্পর্কে ভ্রুণের কোনও ক্ষতি হয় না।

আরও পড়ুনঃ গর্ভাবস্থায় সহবাস কতটা নিরাপদ। 

 

যদি আপনার কোনো বিষয় নিয়ে মনে শঙ্কা থাকে, তাহলে কারো কথায় হুজুগে গা না ভাসিয়ে নিজেই বিস্তারিত তথ্য জেনে নিন। আজকাল তথ্য প্রযুক্তি এতটাই হাতের নাগালে রয়েছে যে, আপনার যেকোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আপনি নিজেই মিটিয়ে ফেলতে পারেন। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মা এবং শিশুর ক্ষতি হয় এমন কিছুই করা যাবে না। কোন রকমের আশংকা  দেখা দিলেই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে । কুসংস্কার দূর করতে শিক্ষা, প্রচার মাধ্যম ও চিকিৎসকদের মাধ্যমে পরিবারের মা-বাবা, দাদি-নানি সহ অন্যান্যদের সচেতন করতে হবে। একমাত্র সচেতনতাই পারে কুসংস্কার গুলোকে দূর করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যকে উন্নত করতে।

সবার জন্য শুভকামনা

Related posts

Leave a Comment