গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত গন্ধপ্রবন হয়ে ওঠা

তিন ভাগের দুই ভাগ মহিলায় বলেন তারা গর্ভকালীন সময়ে অতিরিক্ত গন্ধ প্রবন হয়ে ওঠেন বিশেষ করে প্রথম ট্রাইমেস্টারে। প্রকৃতপক্ষে এই গন্ধ প্রবন হয়ে ওঠাকেই গর্ভবতী হওয়ার প্রধান লক্ষন হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।

আগে যেসব গন্ধ ভালো লাগতোনা তা হয়তো এ সময় আরও প্রকট হয়ে ওঠে কিন্তু যেসব গন্ধ আগে পছন্দ করতেন তাতেও হয়তো আপনার নাক কুঁচকে যাবে। সব চাইতে অবাক করা বিষয় হলো আপনি হয়তো আপনার সঙ্গীর গায়ের গন্ধওদ সহ্য করতে পারবেন না।

এই নতুন উপসর্গে যদি বিরক্ত হয়ে থাকেন তাহলে মনে রাখুন এটা টেম্পোরারি। গর্ভকালীন অবস্থায় শেষের দিকে যদি তা দূর না হয় তবে প্রসবের পর অবশ্যয় অবস্থার উন্নতি হবে।

গর্ভকালীন সময়ে গন্ধপ্রবনতা কেন হয়?

এর কোন নির্দিষ্ট কারণ এখনো অজানা। তবে এর পেছনে অনেক থিওরি আছে। কিছু কিছু গবেশনায় বলা হয়েছে হরমোনই হোল এর প্রধান কারণ। গর্ভাবস্থার বেশীর ভাগ সমস্যার মূল কারণ হোল হরমোন। সাধারণত প্রজেস্টেরন হরমোনকেই বেশীরভাগ উপসর্গের জন্য দায়ী করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে গন্ধপ্রবন হয়ে ওঠার পেছনে এস্ট্রোজেন হরমোনের ভূমিকায় বেশী। আবার কিছু গবেষণায় মনে করা হয় গর্ভাবস্থায় গন্ধপ্রবন হয়ে ওঠা গর্ভাবস্থায় মর্নিং সিকনেস এর সাথে সম্পর্কিত।

আরেকটি থিওরি মতে এই উপসর্গ সৃষ্টি হয় গর্ভের শিশুকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য। প্রথম ট্রাইমেস্টারে গর্ভের শিশুর সবচাইতে নাজুক অবস্থায় থাকে। তাই মনে করা হয় এই সময়ে মায়েদের এই অতিরিক্ত গন্ধপ্রবন হয়ে ওঠা গর্ভের শিশুকে সম্ভাব্য বিপদের হাত থেকে রক্ষা করে।

যেমন- গবেষণায় দেখা গেছে মায়েরা গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে সিগারেট, অ্যালকোহল বা কফির গন্ধ সহ্য করতে পারেনা। আর নিকোটিন, অ্যালকোহল বা অতিরিক্ত ক্যাফেইন কোনটাই গর্ভাবস্থায় নিরাপদ নয়। তাই হয়তোবা মায়েরা এসবের প্রতি অতিরিক্ত গন্ধপ্রবন হয়ে ওঠেন।

 

এর সাথে কি মর্নিং সিকনেসের সম্পর্কে আছে?  

গর্ভাবস্থায় গন্ধপ্রবন হয়ে ওঠার কারনেই মর্নিং সিকনেস হয় তা বলা যায়না। তবে বেশীরভাগ মায়েরাই যারা মর্নিং সিকনেসে ভোগেন তাদের মতে কিছু কিছু গন্ধ এই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। যেমন- আপনার হয়তো এমনিতেই বমি বমি লাগছে, ঠিক এই সময় যদি হটাৎ কোন কোন গন্ধ নাকে ধাক্কা দেয় তাহলে হয়তো সব উগলে বেড়িয়ে আসবে। এর ফলে এমন হতে পারে পরবর্তীতে আপনি যখনই সেই একই গন্ধ পাবেন আপনার ব্রেইন স্বয়ংক্রিয় ভাবে আপনাকে সিগন্যাল দেবে যে আপনি এখন অসুস্থ হয়ে পড়বেন এবং আপনার বার বমি বমি ভাব হতে থাকবে।

তবে মায়েদের ভিন্ন ভিন্ন গন্ধের প্রতি প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন হয়।  সবার গন্ধপ্রবনতা একই হয়না। আরেকটি বিষয় গবেষণায় দেখা গেছে যে- যেসব মায়েদের জন্ম থেকেই ঘ্রাণশক্তি থাকেনা (anosmia) তারা বেশিরভাগই মর্নিং সিকনেসে ভোগেন না।

 

এর থেকে মুক্তির উপায় কি?

আপনার অবস্থা এমন হতে পারে যে আপনি যে গন্ধগুলো আগে খুবই পছন্দ করতেন কিন্তু এখন তা কোনভাবেই সহ্য করতে পারছেন না। আপনি আপনার গন্ধপ্রবনতা নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন না বা নিজের নাক ও কেটে ফেলতে পারবেন না কিন্তু এমন কিছু আপনি চেষ্টা করতে পারেন যাতে অসহ্য লাগা গন্ধ গুলো থেকে আপনি দূরে থাকতে পারেন –

  • একটা টিস্যু বা রুমালে গর্ভাবস্থায় নিরাপদ এবং আপনি সহ্য করতে পারেন এমন কোন এসেনশিয়াল তেল এর কয়েক ফোটা নিয়ে আপনার ব্যাগে রেখে দিতে পারেন। যখনই কোন দুর্গন্ধ নাকে আসবে তখনই রুমালটি নাকে চেপে ধরুন।
  • যদি আপনার কর্মস্থলে কোন গন্ধে আপনার অসুবিধা হয়, যেমন- অফিসে ব্যাবহার করা এয়ার ফ্রেশনার বা সহকর্মীদের গায়ের ঘ্রান ইত্যাদি, তবে তাদের ব্যাপারটা খুলে বলুন। অফিসের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে আলাদা বসার ব্যাবস্থা করতে পারেন। সহকর্মীদের ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা অফিসের বাইরে করার অনুরোধ করুন।
  • গন্ধ সাধারণত কাপড়ে অনেকক্ষণ লেগে থাকে। তাই এক কাপড় বেশিবার ব্যাবহার না করে নিয়মিত ধোয়ার চেষ্টা করুন। বিছানার চাদর, বালিশের কাভার ইত্যাদিও নিয়মিত ধুয়ে ফেলুন। কাপড় ধোয়ার কাজে এমন গন্ধযুক্ত সাবান ব্যাবহার করবেন না যা আপনি সহ্য করতে পারেন না।
  • এমন খাবার রান্না করুন যা আপনি সহ্য করতে পারেন। এছাড়াও রান্না সময় দরজা জানালা খুলে দিন যাতে রান্নার গন্ধ ঘরে আঁটকে  না থাকে। যদি খুব সমস্যা হয় তবে রান্নার কাজে অন্যদের সাহায্য নিন।
  • গন্ধবিহীন সাবান বা প্রসাধন সামগ্রী ব্যাবহার শুর করুন।
  • যে সব খাবারের গন্ধে সমস্যা হয় তা ফ্রীজে না রাখার চেষ্টা করুন বা বায়ু নিরোধক বক্সে রাখুন।
  • কোন কিছুর গন্ধে বমি আসলে লবনাক্ত কিছু খাওয়ার চেষ্টা করুন। একবারে বেশী খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে খান। বমি বমি ভাব হলে শুয়ে পড়তে পারেন বা খুব বেশী গন্ধ লাগলে নিজেই সে স্থান থেকে সরে পড়ুন।

মনে রাখবেন বেশীরভাগ মায়েরাই গর্ভাবস্থায় প্রথম ট্রাইমেস্টারে গন্ধপ্রবন হয়ে ওঠার সমস্যায় ভোগেন। দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের শুরুর দিকে সাধারণত এ সমস্যা চলে যায়। এর আগ পর্যন্ত অনাগত সন্তানের কথা ভেবে এটুকু সহ্য করতেই হবে।

সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment