স্বাভাবিক প্রসবে কাটা ছেড়া বা এপিসিওটমি

এপিসিওটমি কি?

অনেক সময় প্রসব চলাকালীন সময়ে ডাক্তার মায়ের যোনিপথের কিছু জায়গা (পেরিনিয়ামের বা যোনির শুরু থেকে পায়ুপথ পর্যন্ত টিস্যু)  কেটে দিতে পারেন যেন যোনিপথ বড় হয়ে আসে। এতে বাচ্চা সহজেই বেরিয়ে আসতে পারে। একে এপিসিওটমি (Episiotomy) বলে। অনেক সময় কেটে না দিলে এই জায়গাটা চাপে এমনিতেই ছিড়ে যায়, যার জন্য সেলাই দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। প্রসবের কোনও পর্যায়ে এপিসিওটমি প্রয়োজন হলে ডাক্তার আপনার সম্মতি নিয়ে তবেই এপিসিওটমি দিবেন।

এপিসিওটমি কেন লাগতে পারে?

একসময় অনেক ডাক্তাররাই প্রসবের সময় পেরিনিয়াম কাট বা এপিসিওটমি করতেন। এখন প্রয়োজন ছাড়া এপিসিওটমি করা হয় না। সাধারনত যে সব অবস্থায় এপিসিওটমি করা হয়-

  • বাচ্চা আকারে বড় হলে।
  • দ্রুত প্রসবের দরকার হলে।
  • স্বাভাবিকভাবে যদি টিয়ার বেশী হবে বলে অনুমান করা হয়।
  • বাচ্চার অবস্থান যদি অস্বাভাবিক হয়।
  • বাচ্চা ডেলিভারীর সময় যদি বাইরের কোনকিছু যেমন ফোরসেপ, ভ্যাকুয়ামের সাহায্য নিতে হয়।

বাচ্চার যদি কোনও সমস্যা হয় (ফিটাল ডিস্ট্রেস) তবে এপিসিওটমি লাগতে পারে। ফিটাল ডিস্ট্রেস এ বাচ্চার হৃদস্পন্দন অত্যন্ত দ্রুত/ ধীরে যেতে থাকে। এটি নির্দেশ করে যে পেটের ভেতর শিশু যথেষ্ট অক্সিজেন পাচ্ছে না, এবং বাচ্চার স্থায়ী বিকলাঙ্গতা বা এড়াতে বাচ্চাটিকে দ্রুত প্রসব করানো প্রয়োজন।

আগে প্রথম ডেলিভারির সময় সাধারণত নিয়মিতভাবে এপিসিওটমি করা হতো। তখন মনে করা হতো এর ফলে প্রসব তাড়াতাড়ি হয় এবং প্রসবের কারণে আপনাআপনি যোনি ছিঁড়ে যাওয়ার তুলনায় কেটে দেয়া স্থান আরও তাড়াতাড়ি শুকায় ও বিভিন্ন জটিলতা কম হয়। তবে গত ২০ বছরের গবেষণায় দেখা গেছে এটা আসলে সব ক্ষেত্রে ঠিক নয়। এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে এর ফলে বিভিন্ন জটিলতা কমে। তাই বিশেষজ্ঞরা এখন রুটিনমাফিক এপিসিওটমি না করার পক্ষে।

গবেষণায় দেখা গেছে যাদের প্রসবের সময় নিজ থেকেই যোনির স্থান ছিঁড়ে যায় তাদের ক্ষত এপিসিওটমি করা মহিলাদের চাইতে কম সময়ে শুকায় বা একই সময় লাগে। এবং প্রায় সময়ই এদের ক্ষেত্রে এপিসিওটমি করাদের চাইতে কম জটিলতা সৃষ্টি হয়।

এপিসিওটমি করা হলে প্রসবের সময় বেশী রক্তপাত হতে পারে, সেরে ওঠার সময় বেশী ব্যাথা হতে পারে এবং স্বাভাবিক সহবাসের জন্য বেশী সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। এপিসিওটমির কারণে ইনফেকশনের সম্ভাবনাও বেড়ে যায় এবং সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে একবার এপিসিওটমি করলে পরের বার প্রসবের সময় ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।

এপিসিওটমি কিভাবে করা হয়?

যদি প্রসবের সময় কোন ধরনের অবশকারী ওষুধ দেয়া না হয়, তবে এপিসিওটমির সময় ডাক্তার পেরিনিয়ামের অংশবিশেষ অবশ করার জন্য অবশকারী ইঞ্জেকশন দেবেন। স্বাভাবিক প্রসবে ব্যাথার পরিমান এতই তীব্র থাকে যে তারঠিক পরপর এই ধরনের কাঁটাছেঁড়া বা সেলাই এত তীব্র মনে নাও হতে পারে।

সাধারনত এই কাট দুইধরনের হয়। উপর থেকে নিচে এবং আড়াআড়ি। উপর থেকে নিচে কাটা হলে তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যায়, কিন্তু পায়ুপথ পর্যন্ত চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে আড়াআড়ি কাটা হলে পুরোপুরি ভালো হতে সময় কিছু বেশী লাগে।

বাচ্চা প্রসবের পর আবার অবশকারী ওষুধ দেয়া হয় এবং স্থানটি সেলাই করে দেয়া হয়।

এপিসিওটমি থেকে সেরে ওঠা

বাচ্চা প্রসবের এক ঘন্টার মধ্যেই এপিসিওটমি সেলাই করে দেয়া হয়। কাটার পর ক্ষতস্থান থেকে বেশ রক্ত বের হতে পারে তবে সেলাই করার পর এবং চাপ দিয়ে ধরে রাখলে এই রক্তপাত কমে আসবে।

এমন সেলাই দেয়া হয় যেন তা মিলিয়ে যায় তাই সেলাই কাটতে হাসপাতালে যেতে হয় না। বাচ্চা জন্মের এক মাসের মধ্যেই সেলাই ঠিক হয়ে যায়। এসময় কি করবেন আর কি করবেন না তা ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন। হাসপাতাল থেকে ছুটি পাবার সময় ডাক্তারের থেকে এসম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।

এপিসিওটমির স্থানে দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যাথা থাকা স্বাভাবিক। হাঁটা বা বসার সময় ব্যাথা বেশি লাগতে পারে। প্রস্রাবের সময়ও ক্ষতস্থানে ব্যাথা হতে পারে।

ব্যাথা মানিয়ে নেয়া

এপিসিওটমির পর কিছুটা ব্যাথা হওয়া স্বাভাবিক। তবে ব্যাথানাশক হিসেবে এ্যাস্পিরিন খাওয়া নিরাপদ নয় কেননা এটি মায়ের দুধের সঙ্গে বাচ্চার শরীরে চলে যেতে পারে। অন্য যে কোন ব্যাথানাশক ওষুধ খাওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

এপিসিওটমি অথবা প্রসবকালীন চাপে ছিড়ে (Tear) গেলে তার সেলাই শুকাতে সপ্তাহখানেক থেকে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। এটা নির্ভর করে কতখানি কাটা হলো তার উপর। সাধারনত এই সেলাই কাঁটার দরকার পড়ে না। নিজ থেকেই মিলিয়ে যায়। তবে এপিসিওটমি বা টিয়ার হলে ঠিকমতো তার যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।

ডোনাট-আকৃতি বালিশ ব্যবহার করে বা নিতম্ব শক্ত করে বসলে ব্যাথা কম অনুভূত হয়।গবেষকদের মতে শতকরা ১ শতাংশ নারী এপিসিওটমি স্থানে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করবেন যা তাদের প্রাত্যহিক কাজ-কর্মেও প্রভাব ফেলতে পারে। এরকম ব্যাথা আরও শক্তিশালী ব্যাথানাশক দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে – যেমন কোডিন। এসব ওষুধ সেবন করলে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখতে হবে। তবে অপারেশনের দুই-তিন সপ্তাহের পর এই ব্যাথা থাকার কথা না। যে কোন ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করতে হবে।

দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে এবং সেলাই এর যায়গায় চাপ কমাতে যোনি এবং পায়ুর (পেল্ভিক ফ্লোর) মাংসপেশি শক্তিশালী করার জন্য ব্যায়াম করতে পারেন।পেল্ভিক ফ্লোর ব্যায়াম করতে থেমে থেমে মল বা বায়ুত্যাগ থামানোর মতন করে পায়ু ও যোনির মাংসপেশি ক্রমান্বয়ে শক্ত এবং নরম করতে হয়।

বালিশের ওপর বরফ-ব্যাগ দিয়ে বা তোয়ালের ভেতর বরফ রেখে এর উপর বসলেও ব্যাথা কম লাগবে। তবে বরফ সরাসরি ত্বকের ওপর প্রয়োগ করলে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে।

কাটাস্থান খোলা রেখে দিলে তাড়াতাড়ি শুকায়। প্রতিদিন এক বা দুবার আন্ডারওয়্যার খুলে ১০ মিনিট বিছানায় একটি তোয়ালে বিছিয়ে তার ওপর শুয়ে থাকুন, ঘা দ্রুত শুকাবে।

সাধারনত এপিসিওটমির ক্ষত নিজ থেকেই সেরে যায়। কারো ক্ষেত্রে কম বা বেশী সময় লাগতে পারে। তবে যদি ব্যথা থেকে যদি জ্বর আসে বা ক্ষত থেকে পুঁজ জাতীয় কিছু বের হতে দেখেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বাথরুম করা

এইসময় মল নরম রাখাটা খুবই জরুরী। প্রচুর পানি ও শাকসবজি খান। ইসবগুলের ভুষি খেতে পারেন। দরকার হলে মল নরম রাখার ওষুধ খেতে পারেন।

ক্ষতস্থান এবং এর আশপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। নইলে ইনফেকশন হতে পারে। বাথরুমে গিয়ে গরম পানি দিয়ে যোনি এবং আশপাশ পরিষ্কার করুন। প্রস্রাব করার সময় গরম পানি দিলেও আরাম লাগবে। কমোডে বসার চেয়ে লো-ডাউনএ পায়ের ওপর বসলে প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া করবে না।

পায়খানা করার সময় ক্ষতস্থানে একটি পরিষ্কার প্যাড রাখুন। শৌচ করার পর ভালভাবে মুছে ক্ষতস্থান শুকনা করে নিন। মোছার সময় খেয়াল করে সামনে থেকে পেছন দিকে মুছবেন। এতে করে ইনফেকশন হবার সম্ভাবনা কম হবে।

সহবাসের সময় ব্যাথা হলে

যদি আপনার এপিসিওটমি হয়ে থাকে তবে সহবাসে সময় প্রথম কয়েক মাস ব্যাথা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এপিসিওটমি হয়েছে এমন মহিলাদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনের মতেই প্রসবের পর সহবাসে ব্যাথা হয় এবং সময়ের সাথে সাথে এই ব্যাথা চলে যায়।

যদি সহবাসে সমস্যা হয় তবে তা আপনার স্বামীকে জানান। ব্যাথা নিয়ে সহবাস করলে পরবর্তীতে সহবাসকে সুখকর না মনে হয়ে কষ্টদায়ক মনে হবে এবং আপনি এবং আপনার স্বামী উভয়েরই এতে সমস্যা হবে।

অনেক সময় যোনি শুকনো থাকলেও ব্যাথা হতে পারে। এজন্য পানি-জাতীয় লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার করতে পারেন। তৈল-জাতীয় লুব্রিক্যান্ট যেমন ভ্যাসলিন, ময়সচারাইজিং লোশান ব্যবহার করবেন না কেননা এতে যোনির প্রদাহ হতে পারে।

হাসপাতাল ছাড়ার আগেই ডাক্তারের সঙ্গে এব্যাপারে কথা বলে নিতে পারেন। এর পরেও যে কোনও সময় ডাক্তারের কাছে গিয়ে এবিষয়ে আলাপ করতে পারেন।

ইনফেকশন

ক্ষতস্থানে ইনফেকশনের কোনও চিহ্ন আছে কিনা ভাল করে লক্ষ্য করুন, যেমন লাল ভাব, ফুলে ওঠা, পুঁজ বের হওয়া বা সবসময় ব্যাথা হওয়া। এরকম কিছু হলে আপনার ডাক্তারকে জানান যেন তিনি সেইমতে ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন।

এপিসিওটমি রোধে করনিয়

ডাক্তাররা দরকার ছাড়া এপিসিওটমি করবেন না। একান্তই দরকার পড়লে এটা এড়ানোর উপায় নেই। তবে আগে থেকে কিছু ব্যাপার যদি জানা থাকে, তবে ক্ষেত্রেবিশেষে তা এড়ানো সম্ভব।

গর্ভাবস্থার শেষ ছয় সপ্তাহ যোনি এবং এর আশপাশ মাসাজ করলে এপিসিওটমি লাগে না বা ছিঁড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে না – এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। পেরিনিয়াম ম্যাসাজ আপনি চাইলে আগে থেকেও করতে পারেন। গর্ভধারনের ৩৪ সপ্তাহের পর থেকে আপনি বাড়িতে বসে প্রতিদিন এই ম্যাসাজ করতে পারেন। হাত ভালোমতো ধুয়ে পরিস্কার করে হালকা কোন লুব্রিকেন্ট যেমন ওলিভ ওয়েল হাতে লাগিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি যোনির ভেতরের দিকে ঢুকিয়ে তা চাপ দিয়ে নিচের দিকে পায়ু পর্যন্ত আনুন। প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট করে ডেলিভারির আগ পর্যন্ত করতে পারেন। এতে পেরিনিয়াম এরিয়া প্রসারিত হয় এবং পুশ করার সময় কাটাছেঁড়ার ঝক্কি এড়ানো সম্ভব হতে পারে।

এপিসিওটমি করা হয় প্রসবের দ্বিতীয় স্তরে, যখন থেকে পুশ করা শুরু হয়।এপিসিওটমি এড়ানো একমাত্র সম্ভব যখন বাচ্চার মাথা যোনি থেকে দৃশ্যমান হয় যেই অবস্থায়। ডাক্তার এসময় আপনাকে ঠেলতে বারন করবেন এবং লম্বা শ্বাস নিতে বলবেন বা দ্রুত ছোট ছোট কয়েকটি শ্বাস নিতে বলবেন। এতে ধিরে ধিরে বাচ্চার মাথা বের হয়ে আসবে এবং যোনির আশপাশে ছিঁড়ে যাবে না। তবে যদি বাচ্চা বের হতে বেশি দেরি হয় তবে প্রয়োজনবোধে ডাক্তার এপিসিওটমি দিতেই পারেন।

স্বাভাবিক প্রসবে এপিসিওটমির দরকার হলে ডাক্তার তা করবেন, এতে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। ডেলিভারির আগেই ডাক্তারের সাথে কথা বলে এই ব্যাপারে আপনার ইচ্ছা, সুবিধা-অসুবিধা ভালোমতো জেনে নিন। সুস্থভাবে বাচ্চার জন্মদানই সকলের লক্ষ্য। গর্ভধারনের সময় থেকেই এইসব ব্যাপারগুলোতে ধারনা থাকা দরকার।

Related posts

Leave a Comment