আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট এবং মাসিকের ভিত্তিতে (LMP) নির্ণয় করা গর্ভের শিশুর বয়স এবং ডিউ ডেটের মধ্যে পার্থক্য হয় কেন?

আলট্রাসাউন্ড স্ক্যান কি পরীক্ষা করে?

আলট্রাসাউন্ড স্ক্যান এর বহুবিধ ব্যাবহার আছে। যেমন-

এর সাহায্যে আপনার গর্ভের সন্তান কতটা বড় হয়েছে সেটা জানতে পারবেন; জানতে পারবেন আপনার গর্ভাবস্থার কত সপ্তাহ চলছে। সাধারণত, সর্বশেষ মাসিকের তারিখ থেকে হিসাব করে গর্ভাবস্থার কত সপ্তাহ চলছে সেটা বের করা হয়। আপনার যদি সর্বশেষ মাসিক এর তারিখ সম্পর্কে সন্দেহ থাকে বা ভুলে যেয়ে থাকেন অথবা আপনার মাসিক চক্র যদি অনিয়মিত হয়, অর্থাৎ কোন মাসে দীর্ঘ দিন আবার কোন মাসে কম দিন হয়ে থাকে, তবে এ পদ্ধতিতে আপনি হিসাব করতে পারবেন না। তখন আলট্রাসাউন্ড স্ক্যানের মাধ্যমে ডাক্তার এটা নির্ণয় করবেন। একই ভাবে আলট্রাসাউন্ড স্ক্যানের মাধ্যমে আপনার প্রসবের সম্ভাব্য তারিখও জানা যাবে।

  • আপনার গর্ভে একাধিক শিশু আছে কিনা তা জানা যাবে
  • আপনার শিশুর মাথা অথবা মেরুদণ্ডে কোন প্রকার অস্বাভাবিকতা আছে নাকি সেটি সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যাবে
  • আপনার গর্ভফুল এর অবস্থান নির্ণয় করা যাবে। অনেক সময় গর্ভাবস্থার শেষের দিকে গর্ভফুলের অবস্থান বেশি নিচের দিকে নেমে আসে, সেক্ষেত্রে প্রসবের সময় বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়, ক্ষেত্রবিশেষে সিজারিয়ান সেকশনেরও প্রয়োজন হতে পারে।
  • আপনার শিশু স্বাভাবিক ভাবে বাড়ছে কিনা সেটা জানা যাবে ( গর্ভে জমজ শিশু থাকলে, এটি জানা খুবই জরুরী)।

আলট্রা সাউন্ড এবং LMP  ডিউ ডেটের মধ্যে পার্থক্য কেন হয়?

আপনার ডাক্তার গর্ভাবস্থার সময় বা জেস্টশনাল বয়স নির্ণয় করে আপনার শেষ মাসিকের (LMP) উপর ভিত্তি করে। তিনি আপনার কাছে জানতে চাইবেন আপনার শেষ মাসিকের প্রথম দিন কবে ছিল এবং তার উপর ভিত্তি করে আপনি কত সপ্তাহের গর্ভবতী তা নির্ধারণ করবেন। এভাবে আপনার শেষ মাসিকের প্রথম দিন হতে ৪০ সপ্তাহ হিসেব করে আপনার ডিউ ডেটও হিসেব করা হবে।

আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে গর্ভের বাচ্চার বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেমন মাথা, পেট ও পায়ের পরিমাপ করে বাচ্চার বয়স হিসেব করা হয়। ভ্রূণের উচ্চতা, মাথার দুই প্রান্তের দূরত্ব, পায়ের বড় অস্থি ভ্রূণের বয়সের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট সামঞ্জস্য রেখে বৃদ্ধি পায়। আর আলট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে এই পরিমাপগুলো নিয়েই ভ্রূণের বয়স নির্ধারণ করা হয়।

এ কারনেই প্রথম ট্রাইমেস্টারে করা আলট্রাসাউন্ডের রিপোর্ট আর মাসিকের ভিত্তিতে নির্ণয় করা বয়সে তফাত হতে পারে। আপনার কনসিভ করার দিন যদি শেষ মাসিকের প্রথম দিন হতে ঠিক ১৪ দিন পর না হয় বা আপনার পিরিয়ড যদি অনিয়মিত হয় সে ক্ষেত্রে এভাবে নির্ণয় করা বয়স নির্ভুল না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। সে ক্ষেত্রে আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে মোটামুটি নিখুঁতভাবে বয়স এবং ডিউ ডেট পাওয়া যাবে।

দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে মাসিকের উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা বয়স এবং আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে নির্ণয় করা বয়সের মধ্যে দু সপ্তাহ পর্যন্ত তফাত থাকতে পারে। এটা স্বাভাবিক। কারণ মাসিকের ভিত্তিতে হিসেব করা বয়সের গননা শুরু হয় শেষ মাসিকের প্রথম দিন থেকে, কনসেপশনের দিন থেকে নয়।

উদাহরণস্বরূপ ডাক্তার মাসিকের উপর ভিত্তি করে আপনার গর্ভাবস্থা ২০ সপ্তাহ হিসেব করলেও আলট্রা সাউন্ডে তা ১৯ সপ্তাহ আসতে পারে। এমনটা হলে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। এ ক্ষেত্রে ডাক্তার পরবর্তী আলট্রাসাউন্ড স্ক্যানের মাধ্যমে বাচ্চার বৃদ্ধির উপর নজর রাখবেন যাতে দুপদ্ধতিতে পরিমাপ করা ভ্রুনের বয়সের তফাত বাড়ছে কিনা তা বোঝা যায়।

আলট্রাসাউন্ড স্ক্যানে গর্ভের বাচ্চার বিভিন্ন অঙ্গের বয়সও বিভিন্ন দেখাতে পারে। বাচ্চার পা যদি ২০ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা নির্দেশ করে তবে বাচ্চার মাথা হয়তোবা ২১ সপ্তাহ নির্দেশ করতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক কারণে প্রত্যেকটি বাচ্চার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ভিন্ন হারে বাড়তে থাকে। যদি সব বাচ্চার সবকিছু একই হারে বাড়ত তাহলে জন্মের সময় পৃথিবীর সব বাচ্চার ওজন ও উচ্চতা একই হতো।

আলট্রা সাউন্ড এবং LMP  ডিউ ডেটের মধ্যে পার্থক্য বেশী হলে কি হতে পারে?

যদি আলট্রাসাউন্ড এবং জেস্টেশনাল বয়সের মধ্যে দু সপ্তাহের বেশী পার্থক্য থাকে তাহলে ডাক্তার হয়ত আবার স্ক্যান করতে বলবেন। এই পার্থক্য গর্ভকালীন সময়ের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন অবস্থা নির্দেশ করতে পারে।

প্রথম ট্রাইমেস্টার

গর্ভের শিশুর বয়সের দু সপ্তাহের বেশী পার্থক্য প্রথম ট্রাইমেস্টারে দুটি কারণে হতে পারে-

যদি আপনার অনিয়মিত মাসিক হয় তবে মাসিকের উপর উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা বয়স সবসময় সঠিক হয়না। যদি আপনার এমন হয় সে ক্ষেত্রে আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে গর্ভধারণের সময় এবং ডিউ ডেট হিসেব করা হবে।

যদি বাচ্চার প্রত্যাশিত আকার এবং আলট্রা সাউন্ডের মাধ্যমে পাওয়া আকারের মধ্যে অনেক বেশী পার্থক্য থাকে তবে তা গর্ভপাত বা ব্লাইটেড ওভাম নির্দেশ করতে পারে। এক্ষেত্রে বাচ্চার হার্টবিট ও পাওয়া যাবেনা। ডাক্তার পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবার আলট্রাসাউন্ড করতে পারেন। দুঃখজনক হলেও প্রথম ট্রাইমেস্টারে গর্ভপাতের সম্ভাবনা খুব বেশী থাকে। তবে একবার গর্ভপাত হওয়ার মানে এই নয় যে পরবর্তী গর্ভধারণেও আপনার একই সমস্যা হবে।

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার

যদি দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে দুটো বয়সের পার্থক্য দু সপ্তাহের বেশী হয় তবে ডাক্তার একমাস পরে আবার আলট্রা সাউন্ড করতে বলবেন। যদি দুটো স্ক্যানে বাচ্চার আকার তার বয়সের তুলনায় প্রত্যাশিত আকারের চাইতে কম হয় তার মানে হতে পারে গর্ভের বাচ্চা ঠিকমতো পুষ্টি পাচ্ছেনা। এর দুটো কারণ থাকতে পারে-

  • আপনি ঠিকমতো খাবার খাচ্চেন না
  • আম্বিলিকাল কর্ডের মাধ্যমে পর্যাপ্ত রক্ত প্রবাহিত হচ্ছেনা।

বাচ্চার সব ধরনের পুষ্টি মায়ের খাবার থেকেই আসে এবং আম্বিলিকার কর্ডের মাধ্যমে প্রবাহিত রক্তের সাহায্যে শিশুর দেহে পৌছায়। যদি মায়ের খাবার ঠিক থাকে তাহলে ডাক্তার ডপলার স্ক্যান করে দেখবেন বাচ্চার আম্বিলিকার কর্ডের মাধ্যমে রক্ত প্রবাহ ঠিক আছে কিনা। যদি আম্বিলিকার কর্ডের সবকিছু ঠিক থাকে তার মানে হলো আপনার বাচ্চা স্বাভাবিক ভাবেই ছোট।

যদি বাচ্চার আকার প্রত্যাশিত আকারের চাইতে দু সপ্তাহের বেশী হয় তবে তা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এর লক্ষন হতে পারে। ডায়াবেটিসের কারণে বাচ্চা বয়সের তুলনায় বেশী বড় হতে পারে। যদি এ সময় মায়ের সুগার লেভেল বেশী পাওয়া যায় তাহলে তার প্রতিকারের ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

তৃতীয় ট্রাইমেস্টার

তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে বাচ্চার আকার পরিমাপ করাটা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায় কারণ এ সময় বাচ্চা অনেক বড় হয়ে যায় এবং জরায়ুতে গুটিয়ে থাকে। বাচ্চা এ সময় নিচের দিকে নেমে যাওয়ার কারণেও বাচ্চার বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আলট্রাসাউন্ডে ধরা পড়েনা। এ সময় বাচ্চার উরুর হাড় বা ফিমারের উচ্চতা নিয়ে বাচ্চার উচ্চতা ঠিক আছে কিনা তা দেখা হয়। বাচ্চার পেটের পরিধি পরিমাপ করে বাচ্চার ওজন ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়।

যদি বেশ কয়েকবার করা স্ক্যানে বাচ্চার ওজন তার জেস্টেশনাল বয়সের তুলনায়  খুব কম বা খুব বেশী পাওয়া যায় তাহলে সময়ের আগেই ডেলিভারির পরামর্শ দেয়া হতে পারে।

কোন ডিউ ডেটকে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়?  

মাসিকের উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা বয়স পুরোপুরি সঠিক হবে যদি মাসিক নিয়মিত হয়, মাসিকের ঠিক ১৪ দিন পর অভুলেশন হয় এবং তখনই কনসিভ হয়- যা খুবই কম ক্ষেত্রে হতে পারে। তাই প্রথম ট্রাইমেস্টারে করা আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে নির্ণয় করা বয়স এবং ডিউ ডেটকেই সঠিক হিসেবে ধরা হয়। যদি আপনি শেষ মাসিকের সময় ঠিক ভাবে মনে করতে না পারেন বা যদি অনিয়মিত পিরিয়ড থাকে সেক্ষেত্রে প্রথম ট্রাইমেস্টারের আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে মোটামুটি সঠিকভাবে ডিউ ডেট নির্ণয় করা যায়।

যদি প্রথম ট্রাইমেস্টারে করা আলট্রাসাউন্ড এবং মাসিকের সময়ের উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা বয়সের মধ্যে পার্থক্য সাত দিন বা তার বেশী হয় তাহলে আলত্রাসাউন্ডের বয়সকেই সঠিক ধরা হয়। যদি পার্থক্য সাত দিনের মধ্যে থাকে সেক্ষেত্রে মাসিকের মাধ্যমে নির্ণয় করা বয়স সঠিক বলে ধরা হয়। প্রথম ট্রাইমেস্টারের পরে করা আলট্রাসাউন্ডের বয়স নিখুঁত হয়না। তাই প্রথম ট্রাইমেস্টারে করা ডিউ ডেটের সময় আর পরিবর্তন করা হয়না।

গর্ভাবস্থার বিভিন্ন সময়ে করা আলট্রাসাউন্ডে ভিন্ন ভিন্ন ডিউ ডেট দেখানো স্বাভাবিক। শুরুর দিকের আলট্রা সাউন্ডের ডিউ ডেট মোটামুটি নির্ভুল হয়। গর্ভাবস্থার সময় বাড়ার সাথে সাথে এর অ্যাকুরেসি কমতে থাকে। ১৮-২৪ সপ্তাহে করা আল্ট্রাসাউন্ডের ডিউ ডেটের পার্থক্য দু সপ্তাহ কম বেশী এবং ২৮ সপ্তাহের পর করা আলট্রাসাউন্ডের ডিউ ডেটের পার্থক্য তিন সপ্তাহ কম বেশী হতে পারে। তাই গর্ভাবস্থার শেষের দিকে আলট্রাসাউন্ড করা হয় বাচ্চার বৃদ্ধি দেখার জন্য, ডিউ ডেট নির্ণয়ের জন্য নয়।

সবার জন্য শুভকামনা

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.