অ্যানোমালি স্ক্যান কি এবং কেন করা হয় ?

আজকাল প্রায় সব গর্ভবতী মহিলাকে তাদের গর্ভকালীন সময়ের প্রথম তিন মাস অতিক্রম করার পর আলট্রাসাউন্ড (আলট্রাসনোগ্রাম) করার পরামর্শ দেয়া হয়। এটি একটি ব্যাথামুক্ত ও গর্ভকালীন সময়ের জন্য উপযুক্ত প্রক্রিয়া। মায়ের শরীরের ভেতরে থাকা ভ্রুনের অবস্থান ও বৃদ্ধি নিরীক্ষণ করার সুবিধার্থে এ প্রক্রিয়াটি ভ্রুনের প্রতিচ্ছায়া বা ইমেজ তৈরি করে। আলট্রাসাউন্ড স্ক্যান নিরাপদ কারণ- এ প্রক্রিয়ায় রেডিও তরঙ্গের পরিবর্তে ইমেজ তৈরি করার জন্য উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ তরঙ্গ ব্যাবহার করা হয়।

অ্যানোমালি স্ক্যান কি?

সম্প্রতি সাধারণ আলট্রাসাউন্ড স্ক্যান থেকে আরও উন্নত ও স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি তৈরি করার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে এবং আমাদের দেশেও আজকাল কিছু চিকিৎসা কেন্দ্রে এ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে যা অ্যানোমালি স্ক্যান বা Ultrasound level 2 নামে পরিচিত। অ্যানোমালি স্ক্যান করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় গর্ভাবস্থার ১৮ থেকে ২২ সপ্তাহ (পঞ্চম মাস)। অ্যানোমালি স্ক্যানকে মধ্য-গর্ভ অবস্থার স্ক্যানও বলা হয়। এই স্ক্যানের মাধ্যমে মাকে এবং গর্ভস্থ শিশুকে পরীক্ষা করা যায়। ডাক্তাররা দেখে নেন শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা এবং গর্ভফুল (প্ল্যাসেন্টা)-এর গতিবিধির উপরে নজর রাখেন।

এ প্রক্রিয়ায় স্ক্রিন এ গর্ভস্থ শিশুর শারীরিক আকার অনেকখানি স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় এবং বাচ্চার লিঙ্গ বা জেন্ডার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে এ স্ক্যানটি করার মূল কারণ হোল- গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি হচ্ছে কিনা বা কোন শারীরিক অস্বাভাবিকতা আছে কিনা তা খুঁটিয়ে দেখা। বেশ কিছু শারীরিক ত্রুটি অ্যানোমালি স্ক্যানে ধরা পড়ে যা সাধারণ আলট্রাসাউন্ড ইমেজে তেমন বোঝা যায়না।

অ্যানোমালি স্ক্যান কি কারণে করা হয়? 

অ্যানোমালি স্ক্যান দ্বারা বাচ্চার জন্মগত ত্রুটি নির্ণয় করা যায়। এনোমালি স্ক্যান পরীক্ষা করে বাচ্চার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কোনো ত্রুটি আছে কি না তা নিখুঁত ভাবে নির্ণয় করা যায়। আর ১৮-২২ সপ্তাহে বাচ্চার জন্মগত ত্রুটি নির্ণয়ের উত্কৃষ্ট সময়।

গর্ভকালীন অবস্থার দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের সময়ে অ্যানোমালি স্ক্যান-এর মাধ্যমে ডাক্তাররা নীচের বিষয়গুলি দেখেনঃ

১। গর্ভাশয়ে কয়টি শিশুর আছে, তার সংখ্যা। কখনও কখনও গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহের আগে পর্যন্ত যমজ সন্তান কে খুঁজে পাওয়া যায় না।

২। আপনার শিশুর মাথার গঠন ও আকৃতি। শিশুর মস্তিস্কে ত্রুটি থাকলে এই পর্যায়ে বুঝতে পারার সম্ভবনা থাকে, যদিও এরকম ঘটনা খুবই কম ঘটে।

৩। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শিশুর হৃদযন্ত্রের নিরীক্ষা। ডাক্তার হৃদযন্ত্রের চারটি প্রকোষ্ঠ দেখে নেন। উপরের দুটি প্রকোষ্ঠ এবং অলিন্দ (ATRIA) এবং নীচের দুটি প্রকোষ্ঠ এবং নিলয় (VENTRICLES) আয়তনে সমান হওয়া দরকার। প্রতিটি হৃদস্পন্দনের সাথে সাথে কপাটিকাগুলি খোলা এবং বন্ধ হওয়া দরকার। ডাক্তার প্রধান ধমনী এবং শিরাগুলিকেও দেখে নেন যেগুলি রক্ত প্রবাহকে হৃদপিন্ডে নিয়ে আসে বা হৃদপিন্ড থেকে সারা শরীরে নিয়ে যায়।

৪। শিশুর পাকস্থলীও পরীক্ষা করা হয়। কখনও কখনও শিশু যে জরায়ু মধ্যস্থ তরল (AMNIOTIC FLUID)-এর উপর শুয়ে আছে তার কিছু অংশ গিলে ফ্যালে, যা শিশুর পাকস্থলীতে কালো বুদবুদের মত দেখায়।

৫। ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখে নেন যে শিশুর দুটি বৃক্ক (KIDNEY) আছে কিনা এবং তার মূত্রথলীতে (KIDNEY BLADDER) মূত্র বিনা বাধায় পৌঁছতে পারছে কিনা।

৬। শিশুর মুখও পরীক্ষা করা হয়, দেখা হয় তার ঠোঁট জোড়া কিনা। কখনও কখনও শিশুর মুখের মধ্যের তালু (টাকরা) আটকানো থাকলে বুঝতে পারা কঠিন হয়ে পড়ে।

৭। শিশুর মেরুদন্ড পরীক্ষা করা হয় উল্লম্ব ভাবে ও তির্যক ভাবে যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সব হাড়গুলি স্বাভাবিক আছে।

৮। শিশুর তলপেটের উপরের আবরণ পরীক্ষা করে দেখা হয় যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এই দেওয়াল ভিতরের সব প্রত্যঙ্গকে সামনের থেকে ঢেকে রেখেছে।

৯। কোন বিকলাঙ্গতা আছে কিনা দেখার জন্য ডাক্তার শিশুর হাত, পা, বাহু, পায়ের পাতা পরীক্ষা করে দেখেন।

উপরের বিস্তৃত পরীক্ষা করা ছাড়াও ডাক্তার নীচে দেওয়া বিষয়গুলি নজর করে দেখে নেনঃ

  • গর্ভফুল (প্ল্যাসেন্টা)
  • নাভিরজ্জু (গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর সংযোগ-গ্রন্থি)
  • গর্ভাশয় মধ্যস্থ তরল (AMNIOTIC FLUID)

গর্ভফুল (প্ল্যাসেন্টা) গর্ভাশয়ের সামনে (অ্যান্টেরিয়র) বা পেছনে (পোস্টেরিয়র) থাকতে পারে। এটা সাধারনতঃ গর্ভাশয় দেওয়ালের উপরের কাছাকাছি অংশে থাকে। গর্ভফুল নীচে নেমে এসে গর্ভাশয়ের উপরের অংশকে ঢেকে ফেলতে পারে। যদি গর্ভফুল গর্ভাশয়ের নীচে নেমে আসে (প্লাসেন্টা প্রিভিয়া) তবে তার অবস্থান জানার জন্য ডাক্তার তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে আরেকটি স্ক্যানের কথা বলতে পারেন। সেই সময়ের আগে গর্ভফুল (প্ল্যাসেন্টা) জরায়ু থেকে দূরে সরে যাওয়ার কথা।

ডাক্তার নাভিরজ্জুর তিনটি রক্তনালিকা (দুটি শিরা এবং একটি একক ধমনী) ও পরীক্ষা করে দেখেন। ডাক্তারেরা গর্ভাশয় মধ্যস্থ তরল-এর পরিমাণ দেখে নেন এটা নিশ্চিত করার জন্য সে শিশু স্বাধীনভাবে নড়া চড়া করতে পারবে। স্ক্যানের মাধ্যমে ডাক্তার শিশুর শারীরিক প্রত্যঙ্গগুলি মেপে দেখেন এবং তার শারীরিক বৃদ্ধিও পরীক্ষা করে দেখেন। ডাক্তার মেপে দেখেনঃ

  • মাথার পরিধি (এইচ.সি) এবং ব্যাস (মাথার খুলির কেন্দ্রীয় অংশ এবং উপরের অংশের মধ্যবর্তী ব্যাস বা বি.পি.ডি)
  • তলপেটের পরিধি (এ.সি)
  • ফিমার বা উরুর হাড়ের দৈর্ঘ্য (এফ.এল)

বেশীরভাগ ভ্রুনের বৃদ্ধি স্বাভাবিকই পাওয়া যায়। দুর্ভাগ্যক্রমে যদি কোন সমস্যা চিহ্নিত হয় তবে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে অতি দ্রুত পরামর্শ করা জরুরী। যেমন ডাক্তার যদি হার্ট এ কোন বড় সমস্যা আছে বলে ধারণা করেন ভ্রুনের ইকো স্ক্যান করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এ ধরণের বড় শারীরিক সমস্যা খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়। কোন সমস্যা চিহ্নিত হলে নিরাশ না হয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে হবে।

অ্যানোমালি স্ক্যান আমদের দেশের সব জায়গাতে সহজলভ্য নয়। তবে এ প্রক্রিয়া টি সম্পর্কে জানার পর কেউ যদি চিকিৎসক এর পরামর্শ ক্রমে উন্নত স্তরের এ স্ক্যানটি করাতে চান সেক্ষেত্রে করাতে পারেন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.